Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

ফুটবল বিশ্বকাপের সেরা পাঁচ ম্যাচ

৫. ‘গড ডিডন্ট সেভ দ্য কুইন’

আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড, ১৯৯৮

ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড নামা মানেই অন্য রকম ব্যাপার। ছড়ায় উত্তাপ, বিরাজ করে যুদ্ধংদেহী মনোভাব। অথচ আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড কোনোভাবেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে যুদ্ধ এবং এর পরে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’, এই দুই দলের খেলাকে আর খেলা রাখেনি, পরিণত করেছে রীতিমতো যুদ্ধে।

‘৯৮ এর বিশ্বকাপ। সেইন্ট এঁতিয়েন স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় আবার দেখা হলো এই দুই দলের।

ম্যাচটা যে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের, তা বোঝা যাচ্ছিল খেলার শুরু থেকেই। উত্তেজনায় কোনো অভাব ছিল না। খেলার পঞ্চম মিনিটেই পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা, দর্শকরা নিজেদের সিট খুঁজে গুছিয়ে বসতেও পারেননি তখনও। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ‘বাতিগোল’ গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।

রাজরক্তে আগুন ধরে গেল ব্রিটিশদের! সমতা ফেরাতে তারা নিল মাত্র ৫ মিনিট। বিপজ্জনকভাবে ডি-বক্সে ঢুকে পড়া মাইকেল ওয়েনকে বাধা দিলেন রবার্তো আয়ালা। রেফারি কী করতেন তিনিই ভালো জানেন, তবে ওয়েনের ‘কিঞ্চিৎ’ অভিনয় তাকে উদ্বুদ্ধ করল পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিতে। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে খেলায় ফেরালেন ইংল্যান্ড ক্যাপ্টেন এবং স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়েরার। শিয়েরারের গোলের আগে ৮ ম্যাচ গোল হজম না করে ছিল আর্জেন্টিনা।

এর কিছুক্ষণ পর। ম্যাচের ১৬ মিনিট। মাঝমাঠ থেকে ওয়েনের উদ্দেশ্যে অসাধারণ এক পাস দিলেন বেকহ্যাম। মাইকেল ওয়েন সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসেছেন, সেই বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরষ্কারও উঠেছিল তার হাতে। তিনি বলটা পায়ে নিয়েই যে দৌড়টা দিলেন তা ফুটবলামোদীদের চোখে ভাসে এখনও। বিদ্যুৎ গতিতে ডি-বক্সের ডান কোনায় দৌড়ে গেলেন তিনি, জোরালো এক শটে আর্জেন্টাইন গোলকিপার কার্লোস রোয়াঁকে পরাস্ত করে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। “ইট’স এ ওয়ান্ডারফুল গোল!” গোলটা এতটাই চমৎকার ছিল যে, নিজের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেললেন ধারাভাষ্যকার।

সেই গোল করার পথে ওয়েন; সোর্স: Telegraph.co.uk

পিছিয়ে পড়ে জেগে উঠলো আর্জেন্টিনাও। কিন্তু তাদের সকল আক্রমণ ভোঁতা হয়ে যাচ্ছিলো ইংল্যান্ডের ডিফেন্সের সামনে। কিন্তু একনাগাড়ে আক্রমণের ফলে গোল পেয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। বিরতির ঠিক আগে বক্সের বাইরে ফাউল করা হয় আর্জেন্টাইন নাম্বার সেভেন ক্লদিও লোপেজকে। ফ্রি-কিকে শট নেন ভেরন, তার এক বুদ্ধিদীপ্ত পাসে বল পান প্রায় ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা হ্যাভিয়ের জানেত্তি, বাঁ পায়ের শটে গোল করে স্কোরে সমতা নিয়ে আসলেন খেলায়।

বিরতির ঠিক পরের কথা। চরম হঠকারী একটা কাজ করে বসলেন ডেভিড বেকহ্যাম, শুয়ে থাকা অবস্থায় লাথি মারলেন সিমিওনেকে। এই দৃশ্য রেফারির নজর এড়াল না, সরাসরি লাল কার্ড দিয়ে দিলেন তিনি।

লাল কার্ড দেখলেন বেকহ্যাম; সোর্স: the18.com

ম্যাচ ওখানেই আর্জেন্টিনার দিকে ঝুলে যেতে পারতো, যদি না ইংল্যান্ডের সল ক্যাম্পবেল থাকতেন। অসাধারণ খেলেছিলেন তিনি সেই ম্যাচে, নির্ধারিত ৯০ মিনিট তো বটেই, তার নেতৃত্বে ইংলিশ ডিফেন্ডাররা অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটও আটকে রেখেছিলেন আর্জেন্টিনার ১১ জনকে।

আর কোনো গোল না হওয়ায় ফলাফলের জন্য প্রয়োজন হয় টাইব্রেকার নামের এক লটারির। প্রথম ৪ শটে ৩ বার করে লক্ষ্যভেদ করেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। পঞ্চম শটে আয়ালা আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিলে ‘ডু অর ডাই’ পরিস্থিতিতে চলে যায় ইংল্যান্ড। সেই অবস্থায় শেষ শট নিতে এগিয়ে এলেন ডেভিড ব্যাটি। তিনি সফল হলে খেলা যাবে সাডেন ডেথে, নয়তো ফেরার পথ ধরতে হবে ইংল্যান্ডকে।

দ্বিতীয়টা হলো। বুলেট গতির শট নিলেন বটে, কিন্তু তা ঠেকিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন গোলকিপার। উল্লাসে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল আর্জেন্টাইন শিবির, আর আরেকবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়লো ইংল্যান্ড দল।

৪. ‘গোলরক্ষক’ সুয়ারেজে উদ্ধার উরুগুয়ে

উরুগুয়ে বনাম ঘানা, ২০১০

ম্যাচটাকে এককথায় বলা যায় থ্রিলার!

তবে এরকম থ্রিলারের কথা কোনো লেখকের মাথাতেও আসবে না। অথবা ম্যাচটা সিনেমা হলে, এরকম সমাপ্তির কথা ভাবতেও পারবেন না কোনো পরিচালকও। আসলে এই ম্যাচের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর, যেখানে সুয়ারেজ নামের একজন খেলোয়াড় একইসাথে নায়ক এবং খলনায়ক।

১৯তম বিশ্বকাপের আসর বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকাতে, ২০১০ সালে। সেবারই প্রথমবারের মতো আফ্রিকার কোনো দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফিফা। আর সেই বিশ্বকাপেই সেমি ফাইনালের দোরগোড়া থেকে বিদায় নেয় ঘানা।

২০১০ সালের ২রা জুলাই। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে এবং ঘানা। মঞ্চ সাজানোই ছিল ঘানার জন্য, আফ্রিকার অন্যান্য দল আগেই বাদ পড়ায় গোটা মহাদেশ তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। কিন্তু তাদের সবাইকে হতাশ করে ‘হাতে করে’ উরুগুয়েকে সেমিতে নিয়ে যান লুইস সুয়ারেজ।

ঘানা সবসময়ই আফ্রিকার মধ্যে অন্যতম সেরা দল ছিল, তবে সেবার সুলে মুনতারি, আসামোয়া জিয়ান, জর্জ মেনসাহদের নিয়ে গড়া দলটা ছিল দুর্দান্ত। জার্মানির গ্রুপ থেকে রানার্স আপ হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল তারা, দ্বিতীয় রাউন্ডে অতিরিক্ত সময়ের গোলে পরাজিত করেছিল আমেরিকাকে। এরপরেই কোয়ার্টারে দেখা হয় উরুগুয়ের সাথে।

ম্যাচের শুরু থেকেই প্রচণ্ড আক্রমণ করে খেলতে থাকে দুই দল, তবে প্রথম দিকে আক্রমণের ধারটা বেশি ছিল উরুগুয়েরই। গোটাকয়েক অতিমানবীয় সেভ করে দলকে বাঁচান ঘানার গোলকিপার রিচার্ড কিংসন।

আক্রমণের গতি বাড়ায় ঘানাও। প্রথমার্ধ শেষ হতে আর যখন মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি, তখনই প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে গোল করে দলকে আনন্দে ভাসান সুলে মুনতারি। সে অবস্থায় বিরতিতে যায় দল।

বিরতির ঠিক ১০ মিনিট পরে। ডি-বক্সের বাইরে ফাউল করায় ফ্রি-কিক পায় উরুগুয়ে, ফ্রি-কিক নিতে আসেন দিয়েগো ফোরলান। সে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছিলেন তিনি, সেই ম্যাচের ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরষ্কারও তার। বক্সের বাইরে থেকে তিনি চমৎকার একটা ফ্রি-কিক নিলেন, চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারলেন না কিংসন। সমান হয়ে গেল স্কোর।

পরের ৩৫ মিনিটে আর গোল হলো না কোনো। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হলো, সেই অতিরিক্ত সময়ও শেষ হয়ে গেল প্রায়। আর তখনই সেই কাণ্ড করে বসলেন লুইস সুয়ারেজ!

উরুগুয়ের ডিফেন্সে তুমুল আক্রমণ চালাচ্ছিল ঘানা, ফলশ্রুতিতে খেলার অন্তিম মুহূর্তে ফ্রি-কিক পায় তারা। বল হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন প্যান্টসিল, আন্দ্রে আইয়ুর মাথায় ড্রপ খেয়ে বল গেল কেভিন প্রিন্স বোয়াটেঙের দিকে, হাত দিয়ে ক্লিয়ার করার চেষ্টা করলেন উরুগুয়ের কিপার ফার্নান্দো মুসলেরা। বল হাতে রাখতে পারলেন না তিনি, বল গেল আপিয়াহ’র কাছে, তার বাম পায়ের শট সুয়ারেজ ঠেকিয়ে দিলেন পা দিয়ে। ঠেকানোর ফলে বলটা লাফিয়ে উঠল, চিতার গতিতে সামনে এগিয়ে এসে হেড করলেন আদিয়াহ। বল জালে ঢোকা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিন্তু না!

অবলীলায় হাত দিয়ে বল ঠেকিয়ে দিলেন সুয়ারেজ, যেন মুসলেরা নন, তিনিই গোলকিপার!

সুয়ারেজ যখন গোলরক্ষক; সোর্স: breaking112.com

এরকম হ্যান্ডবলের পরে লাল কার্ড দেখাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না রেফারি, সাথে ঘানাকে দিলেন পেনাল্টি। এমন অবস্থা তখন, পেনাল্টিই খেলার শেষ শট, গোল হোক বা না হোক, নেয়ার সাথে সাথেই বাঁশি বাজিয়ে দেবেন রেফারি।

পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এলেন আসামোয়া জিয়ান, ফোরলানের সাথে পাল্লা দিয়ে দারুণ খেলেছিলেন তিনিও। আগের ম্যাচেই আমেরিকার সাথে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে জিতিয়েছেন, একই ঘটনার পুনারবৃত্তি কী ঘটবে আজও?

“ও! হি মিসড!”

ধারাভাষ্যকার সম্ভবত নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তখন। শট নিলেন জিয়ান, অধিক উত্তেজনার কারণে বল বারে লেগে বাইরে চলে গেল। সুয়ারেজ টানেলের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে যাননি তখনও, ডাগআউটে দাঁড়িয়ে আছেন। জিয়ানের মিস দেখে তিনি যেভাবে উল্লাস করলেন, তাতে বোঝা গেল, তিনি কতখানি মরিয়া হয়ে ছিলেন এই ম্যাচ জেতার জন্য।

পেনাল্টি মিস করেছেন তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না জিয়ান; সোর্স: thenational.ae

পেনাল্টি মিসের ফলে মনোবল বলে আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না ঘানার। খেলা টাইব্রেকারে গেলে প্রথম ৪টা শটের ২টাই মিস করা সে ইঙ্গিতই দেয়। উরুগুয়ের ম্যাক্সিমিলিয়ানো পেরেইরা মিস করলেও শেষ শটে গোল করে উরুগুয়েকে আনন্দে ভাসান সেবাস্টিয়ান অ্যাব্রু।

ম্যাচ শেষ হলে ফেটে পড়েন ঘানার কোচ মিলোভান রায়েভাক, সুয়ারেজকে সরাসরি প্রতারক বলে অভিহিত করেন। উরুগুয়ের কোচ অস্কার তাবারেজ সেটা মানতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, “সুয়ারেজ ভুল করেছে, শাস্তিও পেয়েছে। এমনকি পেনাল্টিও পেয়েছে ঘানা। প্রতারণার কথা আসছে কোথা থেকে?

সবচেয়ে মজার কথা বলেছিলেন সুয়ারেজ নিজে। তার ভাষায়, “এতদিন হ্যান্ড অফ গড ছিল ম্যারাডোনার দখলে। আজ থেকে এটা আমার।

৩. ‘একটি আগুনঝরা ম্যাচ’

ফ্রান্স বনাম ব্রাজিল, ১৯৮৬

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে অনেক কিছুই হয়েছে। গ্যারি লিনেকার বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন, এনজো শিফো হয়েছিলেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়। কার মনে আছে সেসব? ৮৬’র বিশ্বকাপ মানেই ম্যারাডোনা, গোটা দুনিয়া বুঁদ হয়ে ছিল ম্যারাডোনায়। ম্যারাডোনার কীর্তিতে অনেকে হয়তো জানেনই না যে, কোয়ার্টারে কী অসাধারণ এক খেলা হয়েছিল ফ্রান্স আর ব্রাজিলের মাঝে।

ব্রাজিল বিশ্বকাপে এসেছিল জিকো-ফ্যালকাও-সক্রেটিসদের নিয়ে গড়া সোনালী এক প্রজন্ম নিয়ে। কিন্তু কোনো শিরোপা জয় ছাড়া সোনালী প্রজন্মের তকমা গায়ে লাগিয়ে লাভ কী? ৪ বছর আগে তাদেরকে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় করে দিয়েছিল ইতালি, আরও ভালো করে বললে পাওলো রসি। অন্যদিকে টগবগ করে ফুটছিল ফ্রান্স, বছর দুয়েক আগে ইউরো জিতে বিশ্বকাপটাও জিততে চাইছিল তারা। তাদের স্বপ্নের সারথীর নাম ছিল মিশেল প্লাতিনি।   

বিশ্বকাপে হাত ছোঁয়ানোর এটাই ছিল শেষ সুযোগ ব্রাজিলের সোনালী প্রজন্মের জন্য। সে লক্ষ্যে ম্যাচের প্রথম থেকেই আগুন ঝরাতে থাকে ব্রাজিল। শুধু ব্রাজিলই নয়, গুয়াডালাজারার জালিস্কো স্টেডিয়ামে মাথার উপরে অকৃপণভাবে আগুন ঢালছিল সূর্যও। তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি। তা সত্ত্বেও, প্রচণ্ড গতিতে খেলতে থাকে ব্রাজিল, তাদের আক্রমণ সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলেন ফ্রান্স গোলকিপার জোয়েল ব্যাটস। শেষপর্যন্ত গোলের মুখ খুলে ফেললেন ব্রাজিলের নাম্বার নাইন কারেকা।

গোল খাওয়ার পরে দ্বিগুণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লো ফ্রান্স। আক্রমণে আক্রমণে ঝাঁঝরা করে ফেলতে লাগল ব্রাজিলের ডিফেন্স। দম ফেলার সময় পাচ্ছিলেন না ব্রাজিলের গোলকিপার কার্লোস। ফ্রান্সের সুযোগ এলো ৪১ মিনিটে। ডান প্রান্ত দিয়ে ঢুকে পড়লেন ডমিনিক রশেঁতু, হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন বল। গোল করার জন্য ডাইভ দিলেন ইয়ানিক স্টপিরা, মিস করলেন তিনি। বল চলে গেল প্লাতিনির কাছে। ওদিকে বল ধরার জন্য এগিয়ে এসে স্টপিরার সাথে সংঘর্ষ হয়েছে কার্লোসের, বল ধরা তো পরের কথা, উঠেই দাঁড়াতে পারেননি তখনও। তিনি সামলে নেবার আগেই বাঁ পায়ের আলতো টোকায় বল জালে পাঠিয়ে দিলেন প্লাতিনি।

বিরতির পরে আক্রমণের ধার আরও বাড়ে দুই দলের। জুনিয়রের গোলাসম শট ফেরান ব্যাটস, কিছুক্ষণ পরে কারেকার হেড থেকে প্রায় নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন তিনি। আক্রমণে আরও ধার বাড়ানোর জন্য মুলারকে উঠিয়ে জিকোকে নামান ব্রাজিলের কোচ টেলে সান্তানা। জিকো নামার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। বল নিয়ে দুরন্ত গতিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ব্রাঙ্কো, বল ধরার কোনো চেষ্টা না করে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন ব্যাটস।

গোটা ম্যাচ জুড়ে নায়ক হয়ে থাকা ব্যাটসের খলনায়ক হয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার তখন। পেনাল্টি নেয়ার জন্য এগিয়ে আসলেন জিকো, অসীম সাহসিকতায় তার পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়ে নিজের ‘পাপ’ নিজেই মোচন করলেন জোয়েল ব্যাটস।

জিকোর পিছন পিছন ছুটছেন লুইস ফার্নান্দেজ, কিন্তু ম্যাচ শেষে ছবিটা পুরোই বদলে গিয়েছিল; সোর্স: fifa.com

 

খেলার বাকি সময়ে আর কোনো গোল হলো না, হলো না অতিরিক্ত সময়েও। অতিরিক্ত সময়ের শেষের দিকে অসাধারণ এক ক্রস করলেন কারেকা, বল পা ছোঁয়াতে পারলেই গোল হয়ে যায়। কিন্তু ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা সক্রেটিস মিস করলেন তা, খেলা চলে গেল টাইব্রেকারে।

টাইব্রেকারের শট মিস করলেন সক্রেটিস, মিস করলেন ফ্রান্সের প্লাতিনিও। ব্রাজিলের শেষ শট নিতে আসলেন জুলিও সিজার, পাহাড়সম চাপ নিয়ে বল মেরে দিলেন সাইড বারে।

ব্রাজিলের সকল শট নেয়া শেষ, ফ্রান্সের আর একটা বাকি। ফ্রান্সের শেষ শট নিতে আসলেন লুইজ ফার্নান্দেজ, বরফের মতো শীতল মাথায় বল গোলপোস্টে ঢুকিয়ে দিলেন।

সাথে সাথে উল্লাসে ফেটে পড়ল দর্শকের একাংশ, ফার্নান্দেজকে এসে জড়িয়ে ধরলেন অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি।

আর জিকো?

তার নাম লেখা থাকল ট্র্যাজিক হিরো হিসেবেই।

২. ‘দুই সেরার এক ধ্রুপদী লড়াই’

উরুগুয়ে বনাম হাঙ্গেরি, ১৯৫৪

১৬ জুলাই, ১৯৫০। মারাকানায় বিশ্বকাপের অঘোষিত ফাইনাল চলছে, খেলছে উরুগুয়ে আর ব্রাজিল। সেই বিশ্বকাপ হয়েছিল লিগ ভিত্তিতে, অর্থাৎ যে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাবে বিশ্বকাপ তার। এই সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের দরকার ছিল একটি ড্র, অন্যদিকে জিততেই হতো উরুগুয়েকে।

এই অবস্থায় খেলার ৪৭ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ব্রাজিলের ফ্রিয়াকা। চিৎকার-চেঁচামেচিতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে মারাকানা। ৬৬ মিনিটে সমতা আনেন উরুগুয়ের শিয়াফিনো। তারপরেও এতটুকু চিন্তিত হয়নি ব্রাজিলিয়ানরা। কারণ, বিশ্বকাপ জিততে একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল।

খেলার ৭৯ মিনিট তখন। প্রায় ২ লক্ষ ধারণক্ষমতার মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিলেন ২৪ বছরের এক তরুণ, নাম অ্যালসিডেস ঘিঘিয়া। তার জয়সূচক গোলেই ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার ট্রফি হাতে তুলল উরুগুয়ে।

বছর দুয়েক পরের কথা। ইউরোপে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাঙ্গেরির সোনালী প্রজন্ম ফুটবলারেরা। আদর করে তাদেরকে ডাকা হচ্ছে ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স। দলের নেতা ব্যাকব্রাশ করা চুলের খাটো এক ভদ্রলোক, নাম ফেরেঙ্ক পুসকাস। সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ে তাকে ডাকা হতো গ্যালোপিং মেজর।

১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপের ৫ম আসর বসলো সুইজারল্যান্ডে।

৪ বছর আগের বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে দল তখন আরও পরিণত। আর হাঙ্গেরি তখন মাঠে নামেই প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে। ২ বছর আগে, ফিনল্যান্ডে অলিম্পিকের যে আসর বসেছিল তাতে যুগোশ্লাভিয়াকে হারিয়ে সোনা জিতেছিল তারা। সে সময় যুগোশ্লাভিয়া মোটেও হেলাফেলা করার মতো দল ছিল না। যা-ই হোক, সে বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব আর কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে উরুগুয়ে আর হাঙ্গেরির দেখা হলো সেমি ফাইনালে। সৃষ্টি হলো শতাব্দীর সেরা এক স্মরণীয় উপাখ্যানের।

১৯৫৪ সালে ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্সদের দল; সোর্স: worldsoccer.com

হাঙ্গেরির পক্ষে কথা বলছিলো তাদের সাম্প্রতিক ফর্ম। টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা। আর উরুগুয়ের পক্ষে ছিল বিশ্বকাপে অপরাজিত থাকার ইতিহাস। বিস্ময়কর শোনালেও সত্যি যে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত একটি ম্যাচও হারেনি উরুগুয়ে।

ইনজুরির থাবা ছিল দুই দলেই, দুই দলই মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছিল তাদের সেরা খেলোয়াড়টিকে ছাড়া। ইনজুরির কারণে খেলেননি হাঙ্গেরির ফেরেঙ্ক পুসকাস আর উরুগুয়ের অবদুলিও ভ্যারেলা।

পুসকাস না থাকায় যে আসলে কিছু যায় আসে না, তা বুঝিয়ে দেয়ার কাজটি শুরু করেন হাঙ্গেরির জোল্টান জিবর। ১২ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অসাধারণ এক হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ন্যান্দর হিদেকুটি। পুসকাস না থাকায় হাঙ্গেরির তেমন কোনো সমস্যা না হলেও ভ্যারেলা না থাকায় ঝামেলায় পড়ে যায় উরুগুয়ে। প্রচুর সুযোগ তৈরী হলেও একজন দক্ষ ফিনিশারের অভাবে সেগুলো গোলে পরিণত হচ্ছিল না।

ম্যাচ শেষ হতে আর ১৫ মিনিট বাকি। হাঙ্গেরি খুব সহজেই জিতে যাবে এমনই যখন ভাবছে সবাই, তখনই বিপুল বিক্রমে খেলায় ফিরে এলো উরুগুয়ে। আসলে তারাও তো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, তাদেরও তো অহং বলে একটা জিনিস আছে, নাকি? তাই তো হুয়ান হোবার্গ নামের উরুগুয়ের এক খেলোয়াড় ১০ মিনিটের মধ্যে ২ গোল করে উরুগুয়ের আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলেন আবার।

পিছিয়ে পড়েও সমতা এনে উরুগুয়ের তখন আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। কিন্তু খেলায় নাটকীয়তা বাকি ছিল আরও। খেলার অতিরিক্ত সময়ে বারে লাগল উরুগুয়ের শিয়াফিনোর শট। সেই শিয়াফিনো, যিনি কিনা ৪ বছর আগে মারাকানাতে পিছিয়ে পড়েও খেলায় ফিরিয়েছিলেন উরুগুয়েকে। তবে উরুগুয়ে সত্যিই বিপদে পড়ে যায়, যখন ডিফেন্ডার ভিক্টর আন্দ্রাদে অসুস্থ হয়ে মাঠের বাইরে চলে যান। হাঙ্গেরির একজন চতুর স্ট্রাইকার ছিল, নাম স্যান্ডর ককসিস। ১০৯ এবং ১১৭ মিনিটে ২ গোল করে উরুগুয়ের কফিনে শেষ পেরেক মেরে হাঙ্গেরিকে ফাইনালে নিয়ে যান তিনি।

দীর্ঘ ২৪ বছর পরে বিশ্বকাপে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পায় উরুগুয়ে।

খেলা শেষ হওয়ার পরে হাঙ্গেরির কোচ গুস্তাভ সেবেস বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত যতগুলো দলের মুখোমুখি হয়েছি তাদের মধ্যে উরুগুয়েই ছিল সেরা।

পরিসংখ্যান বলবে, এই ম্যাচে জয়ী দলের নাম হাঙ্গেরি আর পরাজিত দলের নাম উরুগুয়ে। কিন্তু এই ম্যাচে আসল জয়ীর নাম তো ফুটবল।

১. ‘ম্যাচ অফ দ্য সেঞ্চুরি’

ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানি, ১৯৭০

জার্মানরা যে সহজে হাল ছাড়তে জানে না, সেই প্রমাণ ফুটবলে বহুবার দিয়েছে তারা। অনেক কঠিন অবস্থা থেকেও ম্যাচ বের করে আনার কৃতিত্ব আছে তাদের। কিন্তু বিশ্বকাপে ইতালির সামনে পড়লেই কেমন যেন বিকল হয়ে যায় জার্মান মেশিন। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই দল, তার মধ্যে তিনবার জয়ী দলের নাম ইতালি, বাকি দুবার ড্র হয়েছে ম্যাচ।

১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল। মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি এই দুই দল। ম্যাচটিকে বলা হয় ‘গেম অফ দ্য সেঞ্চুরি’। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এই ম্যাচ জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

খেলা শুরু হওয়ার ৮ মিনিটের মাথায় গোল করে ইতালিকে লিড এনে দেন রবার্টো বোনিনসেগনা। স্টেডিয়ামে উপস্থিত কোনো দর্শক অথবা টিভির সামনে বসে থাকা লাখ লাখ দর্শক যদি উত্তেজনাপূর্ণ এক ম্যাচের আশা করে থাকেন, তবে তিনি ভুল করলেন। কারণ, গোল করেই খোলসে ঢুকে গেল ইতালি, সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক খেলা শুরু করল তারা। ইতালির সেই রক্ষণদুর্গ ভাঙে, সে সাধ্য কার!

মুলার কাটানোর চেষ্টা করছেন একজন ইতালিয়ান খেলোয়াড়কে; সোর্স: fifa.com

খেলার ৮ মিনিট থেকে ৯০ মিনিট। ম্যাড়মেড়ে এক ম্যাচে পুরোটা সময় ধরে ব্যর্থ আক্রমণ করে গেল জার্মানি। কিন্তু তারা জাতিতে জার্মান, হাল ছাড়া তাদের রক্তে নেই। তাই তো খেলা শেষ হতে যখন আর কয়েক মুহূর্ত বাকি, ঠিক তখনই ইতালির রক্ষণ ভেঙে ফেললেন ডিফেন্ডার কার্ল হেইঞ্জ স্লেলিংগার। গ্রাবস্কির ক্রস ধরে গোল করলেন তিনি, অন্তত আরও আধাঘণ্টা খেলায় টিকিয়ে রাখলেন জার্মানিকে।

নির্ধারিত সময়ে ফলাফল না এলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। মজাটা শুরু হয় এখান থেকেই। খেলার উল্টো পিঠ দেখা গেল এবার। ৯৪ মিনিটে গোল করে জার্মানিকে এগিয়ে নেন ‘ডা বোম্বার’ খ্যাত জার্ড মুলার। ৯৮ মিনিটে স্কোর ২-২ করেন বার্গনিচ। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে রিভার আঘাতে স্কোর হয়ে যায় ইতালি ৩-২ জার্মানি।

আচ্ছা, এই ইতালিই না গোটা ম্যাচ ধরে আক্রমণ ঠেকিয়ে যাচ্ছিল শুধু?

১১০ মিনিটে আবারো মুলার শো। স্কোর হয় ৩-৩। কিন্তু পরের মিনিটেই স্কোর ৪-৩ করেন সুপার সাব জিয়ান্নি রিভেরা। জার্মান মেশিন চলতে থাকে তারপরেও। কিন্তু আর গোল করতে পারেনি তারা। শেষ বাঁশি যখন বেজে উঠল, তখন শতাব্দীর সেরা ম্যাচে জয়ী দলের নাম ইতালি।

সেই ম্যাচে খেলেছিলেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। তখনও তিনি ক্যাপ্টেন হননি। পরে তিনি  বলেছিলেন, “ম্যাচের প্রথম ৯০ মিনিট কেমন বিরক্তিকর ছিল তা ভুলেই গেছে সবাই। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিট? স্রেফ অসাধারণ।

এই ম্যাচে হেরে যে জার্মানরা অখুশি ছিল, তা-ও নয়। কারণ, কোয়ার্টারে জার্মানি খেলেছিল ইংল্যান্ডের সাথে, সেই ম্যাচও অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছিল। পরপর দুই ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ায় জার্মান ক্যাপ্টেন উয়ি সিলার নিজেই স্বীকার করে নেন, ফাইনালে দুর্ধর্ষ ব্রাজিলের সামনে কোনোভাবেই পেরে উঠত না ‘ক্লান্ত’ জার্মানি।

এই ম্যাচের ধকল ভালোভাবেই পড়েছিল আজ্জুরিদের উপরে। ক্লান্তির কারণে ফাইনালে তারা ব্রাজিলের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি। ফাইনালে ৪-১ গোলে তাদেরকে পরাজিত করে চিরদিনের জন্য জুলে রিমে কাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। 

 

Related Articles