২০১৩ সালে রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল প্রদেশের একটি আদালত রায় দেয় যে, রুশ সরকার ইব্রাহিম মুসায়েভ নামক একজন আজারবাইজানি শরণার্থীকে আজারবাইজানি সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। মুসায়েভকে আজারবাইজানি সরকারের নিকট হস্তান্তর করার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়ায় তো প্রায় ২০-৩০ লক্ষ আজারবাইজানি বসবাস করে, তাদের মধ্যে মুসায়েভকে নিয়ে আজারবাইজানি সরকারের কেন এত মাথাব্যথা ছিল? এর উত্তর হলো– মুসায়েভ কোনো সাধারণ ব্যক্তি ছিল না, সে ছিল তদানীন্তন আজারবাইজানি গোয়েন্দা সংস্থা ‘জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়’ বা ‘এমটিএন’–এর (আজারবাইজানি: Milli Təhlükəsizlik Nazirliyi, ‘মিল্লি তেহলুকেসিজলিক নাজিরলি’) একজন কর্মকর্তা। এবং মুসায়েভের বক্তব্য ছিল, আজারবাইজানি সরকার গোপনে তুরস্কের কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কুর্দিস্তান শ্রমিক দল’কে (কুর্দি: Partîya Karkerên Kurdistanê, ‘PKK’) সাহায্য করছে, এবং তার কাছে এর বিস্তারিত প্রমাণ রয়েছে!
একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অপর একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সক্রিয় কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে সহায়তা প্রদান কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু তুর্কি–আজারবাইজানি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি অনন্যসাধারণ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আজারবাইজান স্বজাতীয় রাষ্ট্র তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আজারবাইজান ও তুরস্কের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সম্পর্কে আজারবাইজানি রাষ্ট্রপতি হায়দার আলিয়েভ মন্তব্য করেছিলেন, তুরস্ক ও আজারবাইজান হচ্ছে ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ (আজারবাইজানি: Bir millət, iki dövlət; তুর্কি: Bir millet, iki devlet)৷ ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি অনুযায়ী, আজারবাইজান ও তুরস্ক পরস্পরের ‘কৌশলগত অংশীদার’ (strategic partner)। আজারবাইজানি–আর্মেনীয় দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে তুরস্ক আজারবাইজানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে তুরস্ক ও আজারবাইজানের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান।
অন্যদিকে, ১৯৭৮ সাল থেকে পিকেকে তুর্কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত, এবং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে তুরস্কের জাতিগত কুর্দি–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন কুর্দিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হাজার হাজার তুর্কি সৈন্য নিহত হয়েছে, এবং তুর্কি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য পিকেকে এখনো একটি বড় হুমকি হিসেবে বিরাজ করছে। তুর্কি সরকারের দৃষ্টিতে, পিকেকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন (terrorist organization), এবং অন্যান্য রাষ্ট্রও যাতে ‘পিকেকে’কে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে, সেজন্য তুরস্ক তাদের ওপর নিয়মিত চাপ প্রয়োগ করে থাকে। তুরস্কের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আজারবাইজানও ২০১১ সালে ‘পিকেকে’কে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এজন্যই মুসায়েভের দাবি আজারবাইজানি সরকারের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। কারণ, আজারবাইজান কর্তৃক পিকেকেকে গোপনে সহায়তা প্রদান কেবল যে তুর্কি–আজারবাইজানি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিরই লঙ্ঘন নয়, আজারবাইজানের নিজস্ব আইনেরও গুরুতর লঙ্ঘন। এজন্যই মুসায়েভকে চুপ করানোর জন্য আজারবাইজানি সরকার ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজারবাইজান কেন পিকেকেকে সহায়তা করেছে? আজারবাইজানি–পিকেকে সংযোগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই বা কীরকম?
বস্তুত আজারবাইজান ও পিকেকের মধ্যেকার সম্পর্ক জানতে হলে প্রথমে আজারবাইজানের সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। আজারবাইজানি সংবিধান অনুযায়ী, আজারবাইজান একটি গণতান্ত্রিক, আধা–রাষ্ট্রপতি শাসিত, ধর্মনিরপেক্ষ এবং এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্লেষকরা আজারবাইজানি সরকারব্যবস্থাকে ‘কর্তৃত্ববাদী, অগণতান্ত্রিক ও পরিবারতান্ত্রিক’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। ১৯৯৩ সাল থেকে ‘ইয়েনি আজারবাইজান পার্তিয়াস’ বা ‘নতুন আজারবাইজান দল’ রাষ্ট্রটির শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। ১৯৯৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দলটির নেতা হায়দার আলিয়েভ আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, এবং ২০০৩ সালে তার মৃত্যুর পর থেকে তার ছেলে ইলহাম আলিয়েভ দেশটির শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছেন। অর্থাৎ, আজারবাইজানের স্বাধীনতা লাভের বছরখানেক পর থেকেই আলিয়েভ পরিবার দেশটির একচ্ছত্র শাসকে পরিণত হয়েছে।
হায়দার আলিয়েভ, যাকে বর্তমানে আজারবাইজানের ‘মহান নেতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, ছিলেন একজন সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও কমিউনিস্ট নেতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালে তিনি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘এনকেভিডি’তে যোগদান করেন এবং পরবর্তী ২৮ বছর তিনি সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করেন। এই সূত্রেই তুরস্কের কুর্দিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৬৪ সালে তিনি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’র আজারবাইজানি শাখার উপপ্রধান নিযুক্ত হন, এবং এর তিন বছরের মধ্যেই ১৯৬৭ সালে সংস্থাটির প্রধান নিযুক্ত হন। এসময় তার পদমর্যাদা ছিল মেজর জেনারেল। এর দুই বছর পর ১৯৬৯ সালে তিনি আজারবাইজান কমিউনিস্ট দলের প্রথম সচিব (এবং সেই সূত্রে আজারবাইজান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের শাসক) নিযুক্ত হন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

এসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তুরস্কের মধ্যেকার সম্পর্ক ভালো ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধে তুরস্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ অবলম্বন করেছিল এবং এটি ছিল মার্কিন–নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তুরস্ক ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করত। তুরস্কের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আজারবাইজানি কেজিবি (অর্থাৎ কেজিবির আজারবাইজানি শাখা) বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। ১৯৭৮ সালে যখন পিকেকে প্রতিষ্ঠিত হয়, এটির পিছনে আজারবাইজানি কেজিবির সক্রিয় ভূমিকা ছিল, এবং আজারবাইজান সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের নেতা হিসেবে হায়দার আলিয়েভ পিকেকের সৃষ্টি ও শক্তিবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। আজারবাইজানি কেজিবি পিকেকেকে অস্ত্রশস্ত্র, রসদপত্র ও অর্থ সরবরাহ করত, এবং আজারবাইজানের অভ্যন্তরে পিকেকেকের গুপ্ত প্রশিক্ষণ ঘাঁটিও ছিল। সোভিয়েতদের উদ্দেশ্য ছিল, পিকেকেকে ব্যবহার করে ন্যাটো সদস্য তুরস্ককে অস্থিতিশীল করে তোলা।
১৯৮২ সালে হায়দার আলিয়েভ সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী’ নিযুক্ত হন, এবং বাকু ছেড়ে মস্কোয় চলে যান, কিন্তু তার উত্তরসূরীরা পিকেকেকে সহায়তা প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। বস্তুত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগপর্যন্ত সোভিয়েতরা (এবং বিশেষত সোভিয়েত আজারবাইজানিরা) পিকেকেকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আর্মেনিয়ার সঙ্গে চলমান নাগর্নো–কারাবাখ যুদ্ধ এবং ১৯৯২ সালের জুনে ‘বৃহত্তর তুর্কি জাতীয়তাবাদী’ আবুলফাজ এলচিবের ক্ষমতায় আরোহণের প্রেক্ষাপটে আজারবাইজান রাজনৈতিকভাবে তুরস্কের নিকটবর্তী হয়, ফলে আজারবাইজান ও পিকেকের মধ্যেকার সংযোগ (সাময়িকভাবে) ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে এলচিবে ক্ষমতাচ্যুত হন, এবং হায়দার আলিয়েভ আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।
আলিয়েভ তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন, এবং তিনিই ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ ধারণার প্রবক্তা। কিন্তু তার শাসনামলে নতুন করে অভিযোগ উত্থাপিত হয় যে, আজারবাইজানি সরকার গোপনে পিকেকেকে অস্ত্র সহায়তা প্রদান করছে, এবং এমনকি আজারবাইজানের অভ্যন্তরে পিকেকের ঘাঁটিও রয়েছে। হায়দার আলিয়েভের মৃত্যুর পর ইলহাম আলিয়েভের শাসনামলেও আজারবাইজানি সরকারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তদুপরি, ২০০২ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে আজারবাইজানি বিরোধী দলগুলোর ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও আজারবাইজানি সরকার পিকেকেকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানায়। কেবল তুর্কি–আজারবাইজানি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই ২০১১ সালে আজারবাইজানি সরকার পিকেকে-কে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।

কিন্তু এরপরও যে আজারবাইজানি সরকার পিকেকেকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে, সেটি উঠে এসেছে ইব্রাহিম মুসায়েভের বক্তব্যে। মুসায়েভ ছিল আজারবাইজানি গোয়েন্দা সংস্থা ‘এমটিএন’–এর নাখচিভান শাখার একজন কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, ‘নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র’ আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষুদ্র স্বশাসিত প্রোটো–রাষ্ট্র যেটি আর্মেনীয় ভূমির মাধ্যমে আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, এবং যেটির সঙ্গে ইরান ও তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে। ‘এমটিএন’ অফিসার হিসেবে মুসায়েভ ইরানি আজারবাইজানের ওপর নজরদারি করত এবং সেখানে একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত।
এসময় সে জানতে পারে যে, আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন অস্ত্রবাহী বিমান নাখচিভান বিমানবন্দরে আসছে, এবং এই অস্ত্রশস্ত্র গোপনে পিকেকের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য সে তুরাক জেয়নালভ নামক নাখচিভান বিমানবন্দরের একজন টেকনিশিয়ানকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে। ২০১১ সালের ২ আগস্ট বাকু থেকে নাখচিভানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্রসহ একটি মালবাহী বিমান বাকু থেকে নাখচিভানে আসে। সেটি থেকে গাড়িতে মাল নামানোর সময় একজন নেশাগ্রস্ত আজারবাইজানি সামরিক কর্মকর্তা ভুলে কিছু কাগজপত্র গাড়িতে ফেলে যায়। জেয়নালভ সেগুলো স্ক্যান করে মূল কাগজগুলো গাড়িতে রেখে দেয়, এবং স্ক্যানকৃত কাগজগুলো মুসায়েভের কাছে পৌঁছে দেয়। এই কাগজগুলোতে ছিল সরবরাহকৃত অস্ত্রের বিবরণ, এবং যাদের কাছে এগুলো সরবরাহ করা হবে তাদের নাম – পিকেকে।
এর তিন সপ্তাহের মধ্যেই আজারবাইজানি কর্তৃপক্ষ জেয়নালভকে গ্রেপ্তার করে, এবং তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়। বন্দি থাকা অবস্থায় জেয়নালভের মৃত্যু ঘটে। আজারবাইজানি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ত্বকের ক্যান্সারের কারণে জেয়নালভের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার পরিবারের দাবি, পুলিশি নির্যাতনের ফলে জেয়নালভ মারা গেছে। অন্যদিকে, মুসায়েভকে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানায় যে, এই বিষয়টির সঙ্গে আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও তুর্কি–আজারবাইজানি কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রশ্ন জড়িত, সুতরাং এই বিষয়ে সে যেন কাউকে কোনো কিছু না জানায়। শুধু তাই নয়, জেয়নালভের বিধবা স্ত্রী গুলনার জেয়নালোভা তার স্বামীর মৃত্যু নিয়ে বেশি সরব হয়েছিল, এজন্য তাকে চুপ করানোর জন্য মুসায়েভকে নির্দেশ দেয়া হয়।

নির্দেশ মোতাবেক মুসায়েভ জেয়নালোভার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে, এবং এক পর্যায়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই দৃশ্যটির ভিডিও করে রাখা হয়, এবং সেটি প্রকাশ করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে আজারবাইজানি কর্তৃপক্ষ জেয়নালোভাকে তার স্বামীর মৃত্যুর বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। কিন্তু মুসায়েভের মতে, তাকে দিয়ে যেসব কাজ করানো হচ্ছিল, সেগুলো তার বিবেকে সায় দিচ্ছিল না, সুতরাং সে আজারবাইজান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে সে আজারবাইজান থেকে রাশিয়ায় পালিয়ে যায়, এবং ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শরণার্থী’ হওয়ার জন্য আবেদন জানায়। ইতোমধ্যে আজারবাইজানি সরকার মুসায়েভের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, এবং তাদের অনুরোধে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ কর্তৃপক্ষ মুসায়েভকে গ্রেপ্তার করে। ইয়ারোস্লাভলের একটি আদালত তাকে আজারবাইজানের নিকট হস্তান্তরের পক্ষে রায় দেয়, এবং রুশ সরকার তাকে আজারবাইজানি কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করে। এরপর আর মুসায়েভের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বস্তুত মুসায়েভ একা নয়, ২০০০–এর দশকের প্রথম থেকেই বিভিন্ন আজারবাইজানি বিরোধী দল অভিযোগ করছিল যে, আজারবাইজানি সরকার পিকেকের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছে, এবং আজারবাইজানের মাটিতে পিকেকের গোপন ঘাঁটি রয়েছে। তারা দাবি করে যে, সুমগাইৎ পৌর পরিষদের সিনিয়র সদস্যরা এবং রাষ্ট্রপতি হায়দার আলিয়েভের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর প্রধান বায়লার এয়্যুবভ গোপনে পিকেকেকে সহায়তা করছেন। উল্লেখ্য, এয়্যুবভ নিজেও জাতিগতভাত কুর্দি, আজারবাইজানি নন। অবশ্য আজারবাইজানি সরকার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। ২০০২ সালের জুনে আজারবাইজানি গোয়েন্দা সংস্থা ‘এমটিএন’ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, পিকেকের সঙ্গে আজারবাইজানি সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, এবং বিগত বছরগুলোতে তারা আজারবাইজানের মাটিতে গ্রেপ্তারকৃত ৩৩ জন পিকেকে সদস্যকে তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করেছে।
তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালের প্রথমদিকে তদানীন্তন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রেজেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান আজারবাইজান সফরকালে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, পিকেকে সদস্যরা ‘সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে’র আড়ালে আজারবাইজানে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। জবাবে তুরস্কে নিযুক্ত আজারবাইজানি রাষ্ট্রদূত মামেদ আলিয়েভ তুর্কি সরকারকে জানান যে, আজারবাইজানের মাটিতে পিকেকের কোনো উপস্থিতি নেই। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, আজারবাইজানের মাটিতে যদি পিকেকের উপস্থিতি না–ই থাকে, তাহলে এমটিএন আজারবাইজানের মাটি থেকে ৩৩ জন পিকেকে সদস্যকে কীভাবে গ্রেপ্তার করল? এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, সোভিয়েত শাসনামলে আজারবাইজান মস্কোর নির্দেশে পিকেকের উত্থান ও বিস্তারে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এখন তো আর আজারবাইজানকে মস্কোর নির্দেশ অনুসরণ করতে হয় না। তদুপরি, বাহ্যিকভাবে তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে আজারবাইজান কেন গোপনে তার ‘মিত্র’ তুরস্কের স্বার্থবিরোধী কাজ করছিল? এর উত্তরও খুব একটা সহজ নয়, কিন্তু বিশ্লেষকরা কিছু কিছু বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
প্রথমত, আজারবাইজানের তুর্কিপন্থী বিরোধী দলগুলোর মতে, দেশটিতে প্রায় দেড় লক্ষ জাতিগত কুর্দি বসবাস করে, এবং তাদের অনেকেই অত্যন্ত প্রভাবশালী। কুর্দিরা আজারবাইজানি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত, এবং আজারবাইজানের বহু ব্যাঙ্ক, নির্মাণ কোম্পানি, হোটেল প্রভৃতির মালিক হচ্ছে কুর্দিরা। এমনকি, দাবি করা হয় যে, হায়দার আলিয়েভ নিজেও জাতিগতভাবে আজারবাইজানি ছিলেন না, তিনি ছিলেন কুর্দি! অবশ্য এই দাবিটির সত্যতা যাচাই করার উপায় নেই, কারণ অন্যান্য কেজিবি কর্মকর্তাদের মতো আলিয়েভের প্রাথমিক জীবনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। কিন্তু এই দাবিটি যদি সত্যি হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তুর্কি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি তার সহানুভূতি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আজারবাইজানে অবস্থিত তুর্কি দূতাবাসের প্রাক্তন প্রেস অ্যাটাশে ও প্রখ্যাত তুর্কি কূটনীতিবিদ তুরগুত এরের মতে, হায়দার আলিয়েভই হচ্ছেন পিকেকের প্রকৃত স্রষ্টা!
দ্বিতীয়ত, কট্টর তুর্কিপন্থী আবুলফাজ এলচিবেকে ক্ষমতাচ্যুত করে হায়দার আলিয়েভ ক্ষমতায় এসেছিলেন। তুর্কি সরকার তার সঙ্গে সহযোগিতা করে, কিন্তু স্বভাবতই প্রাক্তন সোভিয়েত উপপ্রধানমন্ত্রী আলয়েভকে আঙ্কারা ভালো চোখে দেখত না। ফলে ১৯৯৫ সালের মার্চে সংঘটিত আজারবাইজানি সামরিক অভ্যুত্থানে তুরস্ক সক্রিয়ভাবে অভ্যুত্থানকারীদের সহায়তা প্রদান করে। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আজারবাইজানি বিশেষ পুলিশ বাহিনী ‘ওপন’–এর কমান্ডার কর্নেল রোভশান জাভাদভ এবং আজারবাইজানি সশস্ত্রবাহিনীর কিছু সদস্য তাঁর পক্ষ অবলম্বন করছিল। অভ্যুত্থানকারীদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতি হায়দার আলিয়েভকে উৎখাত করা। তুর্কি সশস্ত্রবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তারা এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এবং তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা ‘এমআইটি’, তুর্কি পুলিশের ‘স্পেশাল অপারেশন্স ডিপার্টমেন্ট’, তুর্কি উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘গ্রে উলভস’ ও তুর্কি মাফিয়ার কিছু সদস্য এই অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল।
এই অভ্যুত্থানটি ব্যর্থ হয়, এবং হায়দার আলিয়েভ ক্ষমতায় টিকে থাকতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তুরস্কের একটি অভ্যন্তরীণ স্ক্যান্ডালে এই অভ্যুত্থানে তুর্কিদের জড়িত থাকার তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এর ফলে স্বভাবতই আজারবাইজানি সরকার তুরস্কের ওপর সন্তুষ্ট হয়নি। এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বাকু বাহ্যিকভাবে তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে ভিতরে ভিতরে পিকেকেকে সহায়তা করে চলেছে, এরকম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
তৃতীয়ত, ২০০০–এর দশকের শেষদিকে তুরস্ক আর্মেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা চালায়, এবং এর ফলে আজারবাইজানি সরকার তুরস্কের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। উইকিলিকসের ফাঁসকৃত তথ্য অনুযায়ী, আজারবাইজানি রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ সরাসরি তুর্কি নেতৃবৃন্দকে ‘মিথ্যুক’, ‘ঠগ’ প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য তুর্কি–আর্মেনীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা পরিত্যক্ত হয়, এবং এর ফলে তুর্কি–আজারবাইজানি সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের ওপর চাপ প্রদানের উদ্দেশ্যে আজারবাইজানি সরকারকে পিকেকেকের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছিল, এমনটিও কিছু বিশ্লেষক মনে করে থাকেন।
চতুর্থত, কিছু কিছু তুর্কি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দাবি অনুযায়ী, আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নাখচিভান প্রজাতন্ত্রের সরকার পিকেকের প্রতি সহানুভূতিশীল, এবং তারা সক্রিয়ভাবে পিকেকেকে সহায়তা প্রদান করছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, নাখচিভানের রাষ্ট্রপ্রধান ভাসিফ তালিবভ নিজেও জাতিগতভাবে কুর্দি। অবশ্য এখন পর্যন্ত এই দাবিগুলো সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কিনা, সেটি নিশ্চিত নয়।
সর্বোপরি, আজারবাইজানের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণভাবে বহুমুখী, কিন্তু তারা সাধারণত তাদের বৃহৎ প্রতিবেশী রাশিয়াকে সন্তুষ্ট রাখতে আগ্রহী। রাশিয়া পিকেকেকে ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করেনি, এবং তুর্কিদের দাবি অনুযায়ী, রুশরা এখনো পিকেকের কাছে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। তাদের এই দাবি সঠিক হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে আজারবাইজানি সরকার পিকেকে ও রাশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে, এরকম হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আজারবাইজানি সরকার এই দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে এবং তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পিকেকের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্রব নেই। তাদের মতে, আজারবাইজানের তুর্কিপন্থী বিরোধী দলগুলো এই মিথ্যা খবর প্রচার করেছে, যাতে তারা তুর্কি সরকারের অধিকতর সমর্থন লাভ করতে পারে এবং যাতে আজারবাইজানের বর্তমান সরকারকে উচ্ছেদের জন্য তাদেরকে সহযোগিতা করে। আজারবাইজানের বিরোধী দলগুলো এই দাবি অস্বীকার করেছে।
অবশ্য বর্তমানে বাকু ও পিকেকের মধ্যেকার এই সম্পর্ক আর বিদ্যমান আছে কিনা, সেটি অস্পষ্ট। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য প্রচারমাধ্যমে আসে নি। ২০২০ সালের নাগর্নো–কারাবাখ যুদ্ধের সময় তুর্কি সরকার ও রুশ বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘এসভিআর’ জানিয়েছে যে, পিকেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিরীয় কুর্দি মিলিট্যান্টরা আর্মেনিয়া ও আর্তসাখের পক্ষে (এবং আজারবাইজানের বিপক্ষে) যুদ্ধ করেছে। এই দাবিটি সত্যি হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে বলা যায়, বাকু–পিকেকে অক্ষে একটি নতুন সাংঘর্ষিক মাত্রা সংযোজিত হয়েছে। কিন্তু তুর্কি বা রুশদের কেউই এই বিষয়ে কোনো প্রমাণ প্রদান করেনি, এবং আর্মেনীয়রা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এমতাবস্থায় বাকু–পিকেকে অক্ষের বর্তমান পরিস্থিতি প্রকৃতপক্ষে কেমন, সেটি বোঝার কোনো উপায় নেই।