
প্রফেসর ইউভাল নোয়াহ হারারি বর্তমান বিশ্বের একজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ, ঐতিহাসিক এবং বুদ্ধিজীবী। ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার বই ‘স্যাপিয়েন্স এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ হিউম্যানকাইন্ড’, ‘হোমো ডেয়াস এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টুমরো’, ‘টোয়েন্টি ওয়ান লেসনস অফ দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’র মতো বইয়ের রচয়িতা তিনি। ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ‘ ২০১৮-তে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত প্রফেসর হারারি একুশ শতকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমস্যা, সম্ভাবনা, ভবিষ্যত এবং তার সম্ভাব্য দিকদর্শন বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যটি রোর বাংলার পাঠকদের জন্য জন্য বাংলায় অনুবাদ করা হলো। আজ থাকছে প্রথম পর্ব।
আজকে আমাকে যে বিষয়ে কথা বলতে ডাকা হয়েছে, তা হলো একবিংশ শতাব্দীতে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের ভূমিকা। আপনারা হয়তো জানেন যে, আমি ইসরায়েলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়াই। আমার বিশ্বাস, ইতিহাস কেবল অতীতের অধ্যয়ন নয়, বর্তমান পাঠ কিংবা ভবিষ্যতদর্শনেও ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম ভূমিকা আছে। সেই বিশ্বাস থেকে বলতে পারি, আজকের বক্তৃতার বিষয়বস্তু আমার কাছে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কিছুকাল আগেও আমরা মনে করেছিলাম বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারা যেন ঝিমিয়ে পড়ছে, এবং মানবসভ্যতা ধীরে ধীরে শান্তিময় বৈশ্বিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু ইদানীং বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা তার বিপরীত চিত্রই দেখি। জাতীয়তাবাদ রাজনীতির ময়দানে বেশ জোরেশোরেই প্রত্যাবর্তন করেছে। এই প্রত্যাবর্তন সারা পৃথিবীর অল্প কয়েক জায়গায় ঘটেছে, তেমনটাও নয়; পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত কিংবা ইসরায়েলের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর নেতৃত্বে এসেছেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ঝাণ্ডাধারীরা।
বিশ্বরাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের এই পুনর্জাগরণের তাৎপর্য কী? একবিংশ শতাব্দী আমাদের সামনে যেসব অভূতপূর্ব সমস্যার জন্ম দিচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে আরও দিতে যাচ্ছে, জাতীয়তাবাদ কি তার যথেষ্ঠ কার্যকর সমাধান দিতে পারবে? না কি কেবল পলায়নপ্রবৃত্তিকে উসকে দিয়ে বিশ্বমানব এবং পরিবেশকে ঠেলে দেবে অবধারিত ধ্বংসের দিকে?

এই প্রশ্নগুলোতে যাওয়ার আগে আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকাই। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে একটা বেশ জনপ্রিয় মিথ হচ্ছে- জাতীয়তাবাদ মানবচিত্তের স্বাভাবিক-সনাতন-চিরায়ত কোনো প্রবৃত্তি। ইতিহাস বলে, এই মিথ সত্য নয়। ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রত্যয়ের উদ্ভব বিবর্তনীয় ইতিহাসে গোষ্ঠীতন্ত্রের অন্যান্য সংস্করণগুলোর অনেক পরে। আমরা, অর্থাৎ হোমো সেপিয়েন্স মানুষ অন্যান্য ‘এইপ’দের মতোই সামাজিক জীব।
বহুবছর যাবৎ, অন্তত এখন থেকে ৫,০০০ বছর আগ অব্দি, মানুষ ছোট ছোট দল-উপদলে বাস করতো। দলগুলো ছিল ছোটো, তবে সেখানে জীবন ছিল দারুণ অন্তরঙ্গ; দলের সবাই সবাইকে চিনত, জানত। মোটামুটি ৫,০০০ বছর আগে বহুবিধ প্রয়োজনে এই দলগুলো একসাথে বড় গোষ্ঠী গড়ে তুলতে শুরু করল। এই গোষ্ঠীকরণ প্রক্রিয়া থেকে একপর্যায়ে জন্ম হলো ‘জাতিসত্তা’র। এই পর্যায়ে এসে মানবগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত হলো।
আমরা বলেছি, মানুষের আদি দল-উপদল-গোত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। জাতিগোষ্ঠীতে এসে এই ঘনিষ্ঠতা হ্রাস পেল, কেননা জাতিগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা অনেক বেশি এবং তারা অধিকাংশই পরস্পরের কাছে অচেনা আগন্তুক। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জন্যেও এই কথা একইভাবে প্রযোজ্য। আমার দেশ ইসরায়েলের জনসংখ্যা মোটামুটি আট মিলিয়ন, যারা সকলে আমার মতো ইসরায়েলি নাগরিকত্ব সনদ ধারণ করেন, যদিও আমি তাদের সবাইকে চিনি না, জীবদ্দশায় চেনার সম্ভাবনাও খুব বেশি নয়। কিন্তু আমরা সবাই একে অপরকে ভাই, বোন বা বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করি, যদিও এই সম্পর্কগুলোর অস্তিত্ব কেবল আমাদের কল্পনায়।
যা-ই হোক, জাতি কিংবা জাতীয়তাবাদ যদি মানবসভ্যতার অতিসাম্প্রতিক আবিষ্কারই হয়ে থাকে, তাহলে মনে প্রশ্ন জাগে- এর উদ্ভবই বা হলো কীভাবে? উত্তরে বলা যেতে পারে, সমাজবিবর্তনে মানুষ আপন প্রয়োজনে, সমস্যা-সমাধানের জন্যই জাতিসত্তার সৃষ্টি করেছে। জাতিগোষ্ঠী বৃহৎ পরিসরে এমন অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে, যা আদি দল-উপদল-গোত্রগুলোর পক্ষে সম্ভব ছিল না। সিন্ধু, নীল, ইউফ্রেতিস এবং হোয়াংহো উপত্যকায় এরকম প্রথম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী বা জাতিরাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল এখন থেকে চার-পাঁচ হাজার বছর আগে।
তার আগপর্যন্ত এই নদ-নদীগুলোর তীর দখল করে ছিল ছোট ছোট স্বাধীন গোত্র। খাদ্য-পানীয়-জীবিকা নির্বিশেষে গোত্রজীবন ছিল বহুলাংশেই নদীকেন্দ্রিক। নদীগুলো ছিলো তাদের সম্পদ, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শঙ্কার কারণ। গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন নদীতে যথেষ্ঠ পানি থাকতো না- নদী শুকিয়ে যেত, খরাকবলিত গোত্রগুলো তখন না খেয়ে মারা যেত। একই ঘটনা ঘটত বর্ষায় নদী ফুলে-ফেঁপে উঠে দিক-দিগন্ত ভাসিয়ে দিলে। কিন্তু এই গুরুতর সমস্যার কোনো সমাধান ছিল না ছোট ছোট গোত্রগুলোর কাছে, কেননা শ’খানেক লোকের একেকটা গোত্র একটা ছোট জায়গা দখল করে বাস করত, এবং তখন পর্যন্ত পরস্পরের সাথে তাদের মধ্যে খুব বেশি আন্তঃযোগাযোগ ছিল না। ধারণা করা হয়, এই সমস্যা সমাধানের নিমিত্তেই গোত্রগুলো পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে সহাবস্থানের দিকে অগ্রসর হয় এবং একীভূত হয়ে গড়ে তোলে জাতি এবং জাতিরাজ্য। এবার অধিকৃত এলাকা বেড়ে গেল, একত্রিত হলো হাজারখানেক মানুষ এবং গড়ে তুললো বাঁধ, শস্যক্ষেত্র, জলাধার ইত্যাদি।

মাত্র শ’খানেক লোক নিয়ে এভাবে নিরাপদ-সমৃদ্ধ-স্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকা গড়ে তোলা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না, জাতিরাজ্য গঠনের পর সেই সমস্যা দূর হলো অনেকখানি। এভাবে বহু সহস্র বছর ধরেই রাজ্য কিংবা রাষ্ট্রগুলো তার অধিবাসীদেরকে জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা, নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি প্রদান করে এসেছে। এভাবে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ, জাতীয়তাবোধ এবং এর সাথেই সম্পর্কিত আরেকটি ধারণা ‘দেশপ্রেম’কে মানুষের আবিষ্কৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিগত উপাদান বলেই মনে হয়। কেননা, এই ধারণাগুলোই আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষাধিক অধিবাসীর মধ্যে এক অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে এবং এর সুবাদেই সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষেরাও পরস্পর পরস্পরের কথা চিন্তা করছে, একসাথে কাজ করছে, নিজেদেরকে এক ও অভিন্ন মনে করছে।
কিছু তাত্ত্বিক অবশ্য মনে করেন, ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রত্যয়টা না থাকলেই পৃথিবীটা শান্তিস্বর্গ হতো। কিন্তু এটা তো সত্য, এই ধারণাটুকু না থাকলে মানুষ এখনও আদিম সমস্যাজর্জর জীবনে গোষ্ঠীগত বিশৃঙ্খলার মধ্যেই বাস করত! আজকের দিনে পৃথিবীর সমৃদ্ধিশালী-শান্তিপূর্ণ দেশগুলো, যেমন- সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, জাপান- এদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব তাদের জাতীয়তাবোধ অত্যন্ত দৃঢ়। আবার, যাদের তা নেই, যেমন- সোমালিয়া, কঙ্গো বা আফগানিস্তান- এরা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং নৈরাজ্যপূর্ণ।
তো, একুশ শতকে জাতীয়তাবাদ এবং জাতিরাষ্ট্রের গুরুত্বের প্রশ্নে আমাদেরকে যে মৌলিক জিজ্ঞাসার অনুসন্ধান করতে হবে, তা হলো রাষ্ট্র এখনো আমাদের প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানের, সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের, মানুষের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের একক (Unit) কিনা, যেমনটা আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছিল পাঁচ হাজার বছর আগে। এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, না।
রাষ্ট্র এখন আর আমাদের বড় সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করার বা সমাধান করার সঠিক পর্যায় নয়। একুশ শতকে এসে রাষ্ট্র সিন্ধু কিংবা হোয়াংহো নদের তীরে বাস করা সেই যুগের ঐ আদি বিচ্ছিন্ন দল-উপদল-গোত্রগুলোর মতো। আজকের দিনেও রাষ্ট্রগুলো এক বৈশ্বিক, অভিন্ন নদীর তীরে বাস করছে- সে নদী হলো তথ্যের নদী, তার ভেতর দিয়ে বইছে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের স্রোতধারা। সেই যুগের মতোই এই নদী আজ মানবসভ্যতার সমৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম এবং একইসাথে সত্যি, লাগামছাড়া হলে এই আশীর্বাদই হয়ে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর মানববিনাশী অভিশাপ।
সেই যুগে যেমন কোনো একক গোত্র হোয়াংহো বা সিন্ধুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না, আজকের যুগেও কোনো রাষ্ট্র এককভাবে তত্ত-তথ্য-উদ্ভাবনের এই বৈশ্বিক নদী বা এর উপর্যুপরি তরঙ্গঘাতকে মোকাবেলা করতে পারে না। আজকের দিনে যেসব বড় বড় সমস্যা মানবসভ্যতার সামনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার কোনোটির চরিত্রই এখন আর আঞ্চলিক বা দেশীয় নয়, বরং বৈশ্বিক। এই ‘বড় সমস্যা’গুলোর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের আশঙ্কা, পরিবেশ সমস্যা এবং মারণক্ষম প্রযুক্তির উদ্ভাবন। চলুন, সমস্যাগুলোর একটু ভেতরে ঢুকে এদের ধরন-প্রকৃতি বিচার করা যাক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালে রবার্ট ওপেনহাইমারের হাত ধরে সারা বিশ্ব পরিচিত হয় বিধ্বংসী পারমাণবিক বোমার সাথে। এর পরের দুই দশকের পটপরিবর্তনে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়- কোনো দেশ একাকী এই মারণাস্ত্র থেকে নিজেকে বা পুরো পৃথিবীকে নিরাপদ রাখতে পারবে না। ‘স্নায়ু যুদ্ধে’র সময় অনেকেই ভেবেছিলেন পরাশক্তিগুলোর শীতলতা শীঘ্রই ‘চরম-উষ্ণতা’য় রূপ নেবে এবং পৃথিবী ক্রমশ এগিয়ে যাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
সৌভাগ্যবশত তা হয়নি। শীতল স্নায়ু যুদ্ধ শীতলভাবেই শেষ হয়েছে। লক্ষণীয় যে, এই সমাপ্তি কোনো একক দেশের চেষ্টায় হয়নি, হয়েছে অনেকগুলো দেশের সামষ্টিক প্রচেষ্টায়। সেসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার বাইরেও চীন, ভারত এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যান্য দেশগুলোর ভূমিকা এ প্রেক্ষাপটে স্মর্তব্য। মধ্যযুগে কয়েক হাজার বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ ছিল তদানীন্তন দেশগুলোর একরকম রুটিনমাফিক কাজ। সেসময়ে ধরেই নেয়া হতো যুদ্ধ প্রশাসনিক কাজের অনিবার্য এবং স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু আধুনিক কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমরা দেখেছি বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে উঠেছে। এই সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরবর্তীতে অনেকগুলো অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ এড়ানো গেছে।
১৯৪৫ সালের পর থেকে ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে তেমন বড় কোনো সংঘাত লক্ষ্য করা যায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পরাশক্তিগুলো এখন নিজেদের মধ্যে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হবার ব্যাপারে নিরুৎসুক হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিমুখতার এই দৃশ্য যে সারাবিশ্বেই ঘটছে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। আমি বাস করি মধ্যপ্রাচ্যে, সেখানে ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনের মতো হটস্পটগুলোতে সহিংসতা-সংঘর্ষের খবর আমার অজানা নয়। এরপরেও ২০১৭ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারাবিশ্বে গড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে স্থূলতা,সড়ক দুর্ঘটনা এবং আত্মহত্যায়। সেই হিসেবে আমরা বোধহয় বলতেই পারি, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যক্তি নিজেই তার সবচেয়ে সম্ভাব্য শত্রু।
পরিসংখ্যানগতভাবে সেনাবাহিনী, জঙ্গি বা কোনো দুষ্কৃতিকারীর হাতে নিহত হওয়ার চেয়ে এটা অনেক বেশি সম্ভাব্য, আপনার নিজের ভুলের জন্যেই আপনার মৃত্যু ঘটবে। চিনি এখন গোলাবারুদের চেয়ে বেশি বিপদজনক; অতিরিক্তি পিৎজা-বার্গার এবং কোকাকোলা খাওয়ার কারণে আজ আপনার মৃত্যুর সম্ভাবনা আল-কায়েদার বা আইসিসের বোমা বিস্ফোরণে নিহত হবার চেয়ে বেশি! এই ‘উন্নতি’কে ভালো একরকম ভালোই বলতে হবে!
কিন্তু এই অবস্থা যে চিরকাল চলতে থাকবে, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। একে টেকসই করা অবশ্যই আমাদের কর্তব্য। মানুষ পারমাণবিক যুদ্ধকে এড়াতে পেরেছিল কোনো ঐশী প্রত্যাদেশের বলে নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া এবং দূরদর্শিতার কারণে। কিন্তু এর কোনো নিশ্চয়তা নেই যে আমরা সবসময়ই সঠিক এবং বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নিতে থাকব। একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আমি বলতে পারি, মানুষের, বিশেষত নেতাগোছের মানুষদের পাগলামো, উদ্ভট সিদ্ধান্ত ইতিহাসের গতিপথকে নানাসময়ে দারুণভাবে বদলে দিয়েছে। বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও যে এই পাগলামোর ভূমিকা অপরিবর্তিত আছে, তা কিম জং উনের নিউক্লিয়ার বোমার সুইচ বড়, না কি ডনাল্ড ট্রাম্পের সুইচ বড়- এই বিতর্ক চলতে দেখে বোঝা যায়।
এমতাবস্থায় মানবসভ্যতার অস্তিত্বের স্বার্থেই আমাদের অন্য যেকোনো দেশীয় স্বার্থের উর্ধ্বে পারমাণবিক যুদ্ধকে প্রতিহত করতে হবে। জাতীয়তাবাদী নেতা এবং তাদের সমর্থকরা, যারা ‘মাই নেশন ফার্স্ট’ জাতীয় স্লোগান দেন বা তাদের দেশকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তারা কি একটু ভেবে দেখবেন কীভাবে তারা কোনোরকম বৈশ্বিক সহযোগিতা বা কার্যকর আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া ছাড়াই কেবল তার দেশের কথা চিন্তা করে, তার দেশকেই এরকম মারণাস্ত্রের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন?

দ্বিতীয় যে বৈশ্বিক সমস্যা মানবসভ্যতার সামনে আজ বড় হয়ে উঠেছে, তা হলো পরিবেশ বিষয়ক সমস্যা। গোটা বিশ্বের বাস্তুতন্ত্রকে এমনভাবে অস্থিতিশীল করে আমরা ডেকে এনেছি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ বিপর্যয়। হাজার বছরের বিবর্তনীয় পথ-পরিক্রমায় হোমো সেপিয়েন্স মানুষ এত বেশি জীবপ্রজাতির বিলুপ্তি ঘটিয়েছে যে ‘সিরিয়াল কিলার’ তকমাটা তাদের জন্যই উপযুক্ত। এখন অবিবেচকসুলভ, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্য প্রজাতির তো বটেই, স্বপ্রজাতির অস্তিত্বকেও তারা বিপন্ন করে তুলেছে।
আমরা যে পারমাণবিক বিপদের কথা বললাম, তা বড়জোর অদূর-ভবিষ্যতের ব্যাপার- কাছাকাছি তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না; কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন আজকের অনস্বীকার্য বাস্তবতা। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকেরা তা স্বীকার করতে না চাইলেও এই বিপর্যয় আমাদের চারপাশেই ঘটছে। আরও পঞ্চাশ বছর যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে মুম্বাই শহরে বাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে- হয় ভারত মহাসাগর পুরো শহরকে ভাসিয়ে দেবে অথবা এতোই গরম পড়বে যে, এখানে অন্তত মার্চ-এপ্রিল-মে’র গরমের সময়ে বাস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এই সমস্যার চরিত্রও কিন্তু আঞ্চলিক বা দেশীয় নয়, নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক, সার্বজনীন। কেননা বাস্তুতন্ত্র কোনো একক দেশের ব্যাপার নয়, কোনো দেশ বাস্তুতান্ত্রিকভাবে স্বাধীন-সার্বভৌমও নয়, সে যত শক্তিশালী দেশই হোক না কেন, বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপারে অন্য দেশ কী করছে- তা তাকে প্রভাবিত করবেই।
মুম্বাইয়ের ভবিষ্যত বিপর্যয় ঠেকাতে ভারত সরকার হয়তো অনেক পদক্ষেপ নিতে পারে; যেমন- কার্বন নিঃসরণের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা, নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, এ সংক্রান্ত গবেষণায় আরো অর্থ বিনিয়োগ করা ইত্যাদি। কিন্তু এই মহৎ নীতিগুলো যদি কেবল ভারত গ্রহণ করে, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, আমেরিকা তাদের প্রচলিত পদ্ধতিতেই এগোতে থাকে, মুম্বাই কিন্তু তখনো বিপর্যস্ত হবে। নগর পুড়লে কি দেবালয় এড়ায়? ভারত সরকার যদি সত্যিই জলবায়ু বিপর্যয় এড়াতে চায়, তাহলে তার উচিত হবে বৈশ্বিক সাহায্য এবং বৈশ্বিক বোঝাপড়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া।
[চলবে]