Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The business has since evolved into Obsidian, an integrated creative studio focused on delivering insight driven campaigns, brand work, and creative production for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Obsidian website, click here.

বিতর্কের তুঙ্গে বীরে দি ওয়েডিং

যৌনতা ও নারীবাদ নিয়ে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বলিউড সিনেমা ‘বীরে দি ওয়েডিং’। ‘অশালীন’ সংলাপের জন্য পাকিস্তানের সেন্সরবোর্ড কর্তৃক ইতোমধ্যেই দেশটিতে নিষিদ্ধ সিনেমাটি এখন নিজ দেশেই বয়কটের আন্দোলনে খাবি খাচ্ছে। ১ জুন মুক্তি পাওয়া দু’ঘন্টার এই কমেডি সিনেমা ইতোমধ্যে আয় করে ফেলেছে প্রায় ৮১ কোটি রুপি। প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ব্যবসা করা সিনেমাটির সাফল্যের পারদ চড়িয়ে দেবার কাজটিও করেছে সিনেমাটিকে ঘিরে থাকা বিতর্কসমূহ।

বীরে দি ওয়েডিং সিনেমাটির একটি পোস্টার; Source: The Express Tribune

রিয়া কাপুর-একতা কাপুরের প্রযোজনায় আর শশাঙ্ক ঘোষের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে বীরে দি ওয়েডিং। বলিউডের আর দশটি ফ্রেন্ডস-কমেডি জনরার সিনেমার মতো নয় এটি। এই গল্পে চার বন্ধুর সকলেই মেয়ে এবং ধনী পরিবারের সন্তান। চার বন্ধুর চরিত্রে ছিলেন খ্যাতনামা অভিনেত্রী কারিনা কাপুর, সোনম কাপুর, স্বরা ভাস্কর ও তুলনামূলক অখ্যাত শিখা তালসানিয়া। গল্পের চার বন্ধুর প্রত্যেকেই বেশ আমুদে, অ্যালকোহল পান করে, গাঁজা সেবন করে, নিজ নিজ পরিবার-সঙ্গীদের গালমন্দ করে, বিয়ে ও যৌনতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা আর আলোচনা করে। গল্পে দেখা যায়, কালিন্দির (কারিনা) বাগদান তার বয়ফ্রেন্ড ঋষভের (সুমিত ব্যাস) সাথে হলেও বিয়ে নিশ্চিত নয়। আরেক বন্ধু অবনীর (সোনম) বিয়ের জন্য যেখানে তার মা চাপ দিতে থাকে, সেখানে তার বন্ধু মীরা (শিখা)-কে দেখানো হয় শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানের স্ত্রী। দুই বছর বয়সী সন্তানের মা মীরা ছিলো দাম্পত্য নিয়ে অসুখী; অন্যদিকে আরেক বন্ধু সোনাক্ষী (স্বরা) এগোচ্ছিলো বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে।

তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে যাবার জন্য মূল অনুঘটক ভাবা হচ্ছে একটি দৃশ্যকেই। দৃশ্যটিতে দেখা যায়, গল্পের বিবাহিত চরিত্র সাক্ষী সোনি স্বামীর অনুপস্থিতিতে ভাইব্রেটরের সাহায্যে স্বমেহন করছেন। উক্ত চরিত্রে ছিলেন স্বরা ভাস্কর।

মূলত একে ঘিরেই সমালোচনায় ফেটে পড়েন অনেকে। সিনেমাটিতে দেখানো দৃশ্যসমূহ ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ পরিপন্থী, এমন সব অভিযোগ আসতে থাকে এর বিরুদ্ধে। স্বরা ভাস্করসহ সিনেমার কলাকুশলীরাও ব্যতিব্যস্ত সামাজিক মাধ্যমে উক্ত অভিযোগের জবাব দিতে। স্বরার বুধবারের টুইট বলছে,

“যে সংস্কৃতিতে নারীর যৌনতার ব্যাপারে অদ্ভুত নীরবতা অবলম্বন করা হয় বা এড়িয়ে যাওয়া হয় নতুবা লজ্জা পাওয়া হয়, সেখানে একজন নারী নিজেই নিজেকে তৃপ্ত করছেন এমনটা দেখানো নারী-ক্ষমতায়নের একটি পর্যায়ই বটে।”

সিনেমার একটি দৃশ্য; Source: NDTV

বিতর্কিত দৃশ্য নিয়ে সিনেমাসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

স্বমেহনের দৃশ্যটির মূল ভাবনা ছিলো প্রযোজক রিয়া কাপুরের। সিনেমার পরিচালক শশাঙ্ক ঘোষ নির্মাতা-ব্যাকরণ ও মিডিয়াকথনের চিরাচরিত রীতি মেনেই একে ‘গল্পের প্রয়োজনে’ আখ্যা দিয়েছেন। স্বরা ভাস্করও একাধিক টুটের মাধ্যমে সাফাই গেয়েছেন দৃশ্যটির। তবে সবচেয়ে গুছিয়ে সম্ভবত বলেছেন সিনেমার অভিনেতা সুমিত ব্যাস। তিনি বলেন,

“স্বরার চরিত্রর পটভূমি ফুটিয়ে তুলতেই এই দৃশ্যের অবতারণা। বিয়ে নিয়ে চূড়ান্ত অখুশি ও সঙ্গীর সাথে কোনোরূপ সংসর্গ না থাকাটা বোঝানোর জন্য এমন দৃশ্যে যদি কোনো ছেলেকে দেখানো হতো, তবে হয়তো সকলের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিকই মনে হতো। নারী বলেই এবং সম্ভবত ভারতীয় সিনেমায় এমন দৃশ্য প্রথম বলেই এতটা সমালোচনা হচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো এমনটা করা একটু বেশিই দুঃসাহস হবে, তাই দৃশ্যটি মজার ছলেই উপস্থাপন করা হয়েছিল, কোনো ‘স্টেটমেন্ট’ দেবার চেষ্টা ছিল না। কিন্তু অবধারিতভাবেই সকলের আলোচনায় সেটি ‘স্টেটমেন্ট’ ও ‘বিগ ডিল’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।”

ওদিকে এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে নির্মাতা করন জোহর সরাসরি সিনেমাটির নির্মাতাদের পক্ষই নিয়েছেন। তার মতে, সিনেমাকে উপলক্ষ করে মানুষ যে স্বমেহন নিয়ে এখন আলোচনায় মুখর হয়েছে, এই দিকটিও বেশ ইতিবাচক। তিনি বলেন,

“আলোচনা জারি থাকা সবসময়ই দারুণ। সমাজের গদবাঁধা ভাবনা-চিন্তার জন্য দোস্তানা সিনেমা নিয়েও অনেকে অনেক সমালোচনা করেছেন, আর আমার মতে এত সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক ছিল। কেননা বিষয়বস্তুর একরকম একঘেঁয়ে উপস্থাপনই ছিল তাতে। কিন্তু এই সমালোচনাটা হলো বলেই সমকামিতার মতো বিষয় সকলের আলোচনার টেবিলে চলে এলো, যা নিয়ে সচরাচর কেউ বলেই না!”

একই যুক্তিতে মূলধারার সিনেমায় স্বমেহনের দৃশ্য রাখারও সাফাই গাইছেন করন।

সমালোচনার অন্যান্য কারণ 

আলাদা করে ঐ দৃশ্যটি ছাড়াও এই সিনেমা বিতর্কের মুখে পড়েছিলো আরো কিছু কারণে, এমনকি টুইটার থেকে এসেছিলো বয়কটের ডাকও। জানুয়ারিতে কাশ্মীরের একটি মন্দিরে নিয়ে শিশু আসিফাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো ভারতের মতো ফুঁসে উঠেছিলেন কারিনা, সোনম ও স্বরারাও। তাদের এ ভূমিকাকে ‘দ্বিচারিতা’ আখ্যা দিয়ে বীরে দি ওয়েডিং সিনেমার বিরুদ্ধে টুইটারে চলতে থাকে সমালোচনা।

কেন দ্বিচারিতা বলা হচ্ছে? সেসব টুইটারবাসীদের অভিযোগ, কিছুদিন আগে ভারতে মসজিদে ধর্ষণের একটি ঘটনায় ‘নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার’ এই অভিনেত্রীরা কিছুই বলেননি। অবশ্য পূর্বের একটি টুইট রিটুইট করে স্বরা ভাস্কর নিন্দুকদের দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই ঘটনার প্রতিবাদও তিনি করেছিলেন!

স্বরার সেই টুইট; Source: Twitter

এরপরও বিতর্ক ছাড়েনি এই সিনেমার অভিনেত্রীদের পিছু। বিখ্যাত বলিউড কোরিওগ্রাফার সরোজ খান কিছুদিন আগে বিতর্কিত ‘কাস্টিং কাউচ’ প্রথার পক্ষে কথা বলে ঝড় তুলেছিলেন! বীরে দি ওয়েডিং এর প্রচারণার সময় এই অভিনেত্রীদের যখন এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে বলা হয়, তারা হেসে ফেলেন এবং প্রসঙ্গ এড়াতে চান। এ নিয়ে হয়ে যায় আরেক চোট তুমুল সমালোচনা। উল্লেখ্য, কাস্টিং কাউচ প্রথা হচ্ছে সেই প্রথা, যেখানে কাজ পাইয়ে দেবার বিনিময়ে কর্তৃপক্ষকে যৌনতা দ্বারা ‘খুশি’ করতে হয়।

পক্ষে বিপক্ষে নানান মত

আসিফা হত্যাকাণ্ডের সময় সোনম, স্বরা, কারিনা প্রতিবাদস্বরূপ নিচের ছবি তিনটি (কোলাজ) পোস্ট করেছিলেন-

Source: Twitter

তাদের এই প্রতিবাদী “I AM HINDUSTAN” ও “I AM ASHAMED” এই দুই ট্যাগলাইনকে ব্যাঙ্গ করে একটি কৌতুকাচ্ছল টুইট ভাইরাল হয় টুইটারে। কপি করে সেটিই পোস্ট করতে থাকেন সকলে। নিচে সেই টুইটটি-

Source: Twitter

দ্য প্রিন্টের রুহি তিওয়ারির মতে, “নারীর স্বাধীনতা বোঝানোর জন্য প্রতিটা ফ্রেমে নারীকে শুরাপান, ধূমপান করতে আর গালি দিয়ে, যৌনতা নিয়ে আলাপ করতে দেখাবার প্রয়োজন নেই।” তার মতে, এই সিনেমার সবচেয়ে বড় ত্রুটি হচ্ছে, এই দৃশ্যগুলোকে নাকি অনেকটা গায়ের জোরে আরোপিত মনে হয়েছে!

টুইটারে এক সমালোচক সিনেমাটিতে স্বমেহনের দৃশ্য রাখবার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে বলেছেন, “আপনাকে আপনার বাবা-মা সারাদিন কী করলেন জিজ্ঞেস করলে কি তখন সকালে মলত্যাগের কথাও বলেন? বলেন না। কারণ ঐটুকু না বলা বিচক্ষণতা।”

লেখক ও ভালোবাসা-যৌনতা বিষয়ক ভারতীয় ওয়েবসাইট ‘এজেন্টস অব ইশক’ এর প্রতিষ্ঠাতা পারমিতা বোহরার মতে, সিনেমাটি ‘অযত্নে নির্মিত’ হলেও নারীবাদী দিক থেকে তা সফল। লস অ্যাঞ্জেলেসের লয়োলা ম্যারিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক অনুপমা কাপসে এ নিয়ে কথা বলেন আল জাজিরার সাথে। তিনি বলেন, “প্রথাগত কাঠামোর ভেতরে থেকেও সিনেমাটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী সিনেমা। সিনেমাটি বিয়ে নিয়ে। কিন্তু বলিউডি মূলধারার সিনেমা হয়েও এটি ভারতীয় বিয়ে সম্পর্কিত অনেক ধারণাকে ভাঙতে সক্ষম হয়েছে।” ঘরকন্নার কাজে একতরফা অনুরাগ দেখিয়ে নারীকে কেবল মায়ের রূপে দেখাবার বলিউডি প্রবণতা থেকে নারী চরিত্রকে বিচ্ছিন্ন করতে পারাই এই সিনেমার একমাত্র সাফল্য বলে মনে করেন তিনি। আলোচনা-সমালোচনার ভীড়ে একটি সাধারণ দিক হচ্ছে, চরম প্রশংসাকারীও সিনেমাটির নির্মাণশৈলীকে খুব একটা নম্বর দিচ্ছেন না। নিচের টুইটটিই যেমন-

Source: Twitter

Featured Image Source: The Indian Express

Related Articles