হারিস আল-সুদানি: আইএসের ভেতর থেকে যে ইরাকি গুপ্তচর রক্ষা করেছিল বাগদাদকে

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাগদাদের পিচ্ছিল হাইওয়ে ধরে কাছের একটি উন্মুক্ত বাজারের দিকে ছুটে যাচ্ছে একটি সাদা রংয়ের কিয়া পিকআপ ট্রাক। প্রচণ্ড শীতেও দরদর করে ঘামছে ড্রাইভার, জঙ্গি সংগঠন আইএসের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য আবু সুহাইব। প্রতিটি বাঁক নেওয়ার সময়, প্রতিটি স্পীড ব্রেকার পার হওয়ার সময় তার নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। কারণ তার ট্রাকের ভেতরে রাখা ছিল ১ হাজার ১০০ পাউণ্ড ওজনের মিলিটারি গ্রেডের বিস্ফোরক। আবু সুহাইবের দায়িত্ব ছিল বিস্ফোরক ভর্তি ট্রাকটিকে বাগদাদের একটি জণাকীর্ণ বাজারের অভ্যন্তরে নিয়ে পার্ক করা এবং এরপর নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে সেটির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিউ ইয়ার্স ইভ উপলক্ষ্যে বাজার করতে আসা মানুষদেরকে হত্যা করা।

লেবাননে ট্রেনিংয়ের সময় ক্যাপ্টেন হারিস; Image Source: Newyork Times

আবু সুহাইবের ভয়ের যথেষ্ট কারণ ছিল। বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল রাস্তায় যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বাগদাদের বিশৃঙ্খল হাইওয়েতে হঠাৎ কোনো গাড়ি ছুটে এসে তার পিকআপের সাথে ধাক্কা খেতে পারে। অথবা একটু পরপর স্থাপিত সরকারি বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিগুলোর যেকোনোটিতে শুরু হওয়া ছোটখাট সংঘর্ষ রূপ নিতে পারে বড় ধরনের গোলাগুলিতে। এর যেকোনোটিই বিস্ফোরকসহ তার ট্রাকটিকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে এসব কিছু ছাড়িয়ে আবু সুহাইবের ভয়ের আরেকটি কারণ ছিল। তার প্রকৃত পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়। কারণ তিনি ছিলেন আইএস ছদ্মবেশী একজন স্পাই, গুপ্তচর।

আবু সুহাইবের প্রকৃত নাম হারিস আল-সুদানি। ইরাকের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির হয়ে পূর্ববর্তী ১৬ মাস ধরে তিনি বিশ্বের ভয়ংকরতম জঙ্গি সংগঠন আইএসের অভ্যন্তরে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছিলেন। তার পাচার করা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকি বাহিনী ব্যর্থ করে দিয়েছিল আইএসের ৩০টি গাড়ি বোমা এবং ১৮টি আত্মঘাতী হামলা। তার এবং তার মতো আরো কিছু গুপ্তচরের কারণেই ইরাকের অন্যান্য অংশ আইএসের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রাজধানী বাগদাদ হয়ে উঠেছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে ইরাকের সবচেয়ে নিরাপদ শহর। ইরাকি গোয়েন্দাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, হারিস ছিলেন সম্ভবত আইএসের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারা বিশ্বের সবচেয়ে সফল গুপ্তচরদের মধ্যে একজন। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ দিনটিতে, হারিস যখন বিস্ফোরক ভর্তি ট্রাক নিয়ে বাগদাদের বাজারের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, তখন তার সন্দেহ হচ্ছিল, তার পরিচয় হয়তো আইএসের কাছে ফাঁস হয়ে গেছে।

হারিসের বাবা-মা এবং কন্যা; Image Source: Newyork Times

হারিস আল-সুদানির কখনোই ইরাকের গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। জীবন সম্পর্কে তিনি ছিলেন একেবারেই উদাসীন। বাগদাদ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও তিনি সেটাকে কাজে লাগাতে পারেননি। পড়াশোনার পরিবর্তে মেয়েদের পেছনে সময় নষ্ট করাই ছিল তার প্রধান শখ। ফলে তার পড়াশোনার ফলাফল খারাপ হতে শুরু করে। পরপর কয়েকবার ফেল করার পর তার বাবা আবিদ আল-সুদানি তাকে চূড়ান্ত শর্ত বেঁধে দেন, হয়তো সঠিক পথে ফিরে আসতে হবে, অথবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। হারিসের অন্য কোনো উপায় ছিল না। তিনি পূর্বের উশৃঙ্খল জীবন ত্যাগ করেন, পরিবারের আয়োজনে রাগাদ শালুব নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করেন এবং পড়াশোনার জগতে ফিরে আসেন। ইংরেজি ও রাশিয়ান ভাষা নিয়ে পড়াশোনার পর তিনি কম্পিউটারের উপর ট্রেনিং নিয়ে ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত একটি কোম্পানীতে টেকনিশিয়ানের চাকরিতে যোগ দেন।

সে সময় ইরাকের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা ছিল একটি নিয়মিত ঘটনা। মার্কিন আগ্রাসনের পর সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে ইরাকের সাবেক বাথ পার্টির সদস্যরা যখন অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তখন তাদের সাথে যোগ দেয় আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন জিহাদী সংগঠনও। সে সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক, আবু আলি আল-বাসরি নতুন একটি গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করেন, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নেতাদের উপর নজরদারি করা। ২০০৬ সালে ইরাকি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে বাছাইকৃত সেরা ১৬ জন অফিসার নিয়ে তিনি গঠন করেন আল-সুক্বুর (The Falcons) নামের এ বিশেষ বাহিনী। হারিসের ভাই, মুনাফ আল-সুদানি ছিলেন এই ফ্যালকন বাহিনীতে একেবারে প্রথম দিকে নিয়োগ পাওয়া একজন সদস্য।

হারিসের বাগদাদের বাসার ছাদে তার স্ত্রী রাগাদ শালুব ও তিন সন্তান রিয়াম, রাওয়ান ও মুয়ামাল; Image Source: Newyork Times

ভাইয়ের পীড়াপিড়ীতে অতিষ্ঠ হয়ে হারিস নিজেও একসময় আবেদন করে বসেন ফ্যালকনে যোগ দেওয়ার জন্য। কম্পিউটার টেকনিশিয়ান হিসেবে তেলক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজরদারির অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি সহজেই সুযোগ পেয়ে যান। প্রাথমিক ট্রেনিং শেষে ২০১৩ সালে তাকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সদস্যদের টেলি যোগাযোগ এবং ওয়েবসাইট ব্যবহারের উপর নজরদারি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এ দায়িত্বই পাল্টে দেয় হারিসের জীবনকে। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি অনুভব করেন, দেশের জন্য তারও কিছু করার সামর্থ্য আছে। ফলে ২০১৪ সালে যখন ইসলামিক স্টেট তথা আইএস নামে নতুন একটি সংগঠন একের পর এক ইরাকের বিভিন্ন শহর দখল করতে শুরু করে, তখন তাদের অভ্যন্তরে গুপ্তচর নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে হারিস আগ্রহের সাথে তাতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

হারিসকে লেবাননে কয়েক মাসের কঠোর ট্রেনিংয়ে পাঠিয়ে ছদ্মবেশী জিহাদী হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। হারিস ছিলেন শিয়া, কিন্তু শৈশবে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন সুন্নী প্রধান রামাদি শহরে। ফলে রামাদির আঞ্চলিক ভাষার টান তার পক্ষে বেশ সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও সুন্নীদের বিভিন্ন রীতিনীতিসহ তাকে অনেক কিছুই নতুন করে শিখতে হয়েছিল। তাকে মুখস্ত করতে হয়েছিল জিহাদী সংগঠনগুলোর পছন্দের কুরআনের আয়াত এবং হাদিসগুলোও। ট্রেনিং শেষে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হয়ে তিনি বাগদাদের অদূরে আইএসের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি তারমিয়াতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানকার মসজিদে নিয়মিত গমন করার মাধ্যমে আইএসের আস্থা অর্জন করে সংগঠনটিতে যোগ দেন। আইএসের অভ্যন্তরে তাকে নতুন করে আবার ট্রেনিং নিতে হয়। এবারের ট্রেনিং ছিল আইএসের দৃষ্টিতে ইসলামের ব্যাখ্যার উপর এবং বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরকের উপর।

তারমিয়া শহরে ইরাকি সেনাবাহিনীর একটি অভিযান; Image Source: Newyork Times

আইএসে যোগ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই মসুলে অবস্থিত সংগঠনটির এক উচ্চপদস্থ নেতার কাছ থেকে ক্যাপ্টেন হারিসের কাছে প্রথম ফোন আসে। হারিস আইএসের নেতাদেরকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে, তিনি বাগদাদের স্থানীয় অধিবাসী এবং কারো সন্দেহের কোনো উদ্রেক না ঘটিয়েই তিনি বাগদাদে নিয়মিত আসা যাওয়া করতে পারবেন। ফলে আইএসের দখলে থাকা অন্যান্য শহর থেকে আসা আত্মঘাতী হামলাকারীদেরকে বিভিন্ন সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট এড়িয়ে নিরাপদে বাগদাদে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি আইএস তার উপর ন্যস্ত করে। এছড়াও আত্মঘাতী হামলাকারী না থাকলে শুধুমাত্র বিস্ফোরক নিয়ে বাগদাদের কোনো স্থানে রেখে এসে দূর থেকে মোবাইল ফোন বা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানোর দায়িত্বও পড়ে তার ওপর।

ক্যাপ্টেন হারিস তার যাত্রাপথ এবং গন্তব্য সম্পর্কে আগেই ফ্যালকনকে জানিয়ে দিতেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে হারিস আত্মঘাতী হামলাকারীকে ফাঁদে ফেলে গাড়ি থেকে বের করত এবং এরপর আগে থেকে লুকিয়ে থাকা ফ্যালকন বাহিনী এসে তাকে গ্রেপ্তার অথবা হত্যা করত। গাড়ি বোমার ক্ষেত্রে ফ্যালকন সদস্যরা প্রথমে হারিসের গাড়িকে পেছন থেকে ইলেক্ট্রনিক জ্যামারবিশিষ্ট গাড়িতে করে অনুসরন করত (নিচের ভিডিওতে ফ্যালকন বাহিনী হারিসের সাদা কিয়া ট্রাকটিকে অনুসরণ করছে), যেন দূর থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ট্রিগার করে কেউ বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটাতে না পারে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে বোমাগুলোকে অকার্যকর করা হতো। আইএসের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য এরকম ক্ষেত্রে ফ্যালকন সাজানো বিস্ফোরণ ঘটাত এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে আহত ও নিহতের মিথ্যা সংবাদ প্রচার করার ব্যবস্থা করত।

https://int.nyt.com/data/videotape/finished/2018/07/1533053674/a94c8835-656b-426e-9b33-7ef102886115-2-640w.mp4

ফ্যালকনের অপারেশনগুলো আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকি এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীকে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে দিচ্ছিল। তাদের গুপ্তচরদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী আইএসের অন্তত সাতজন উচ্চপদস্থ নেতাকে হত্যা করতে এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে কয়েক ডজন বিমান হামলা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পরাজিত হতে থাকা আইএসও সময়ের সাথে সাথে তাদের আক্রমণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে শুরু করেছিল। ফলে হারিসের দায়িত্বও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আর কাজের চাপে তিনিও ভুল করে বসেছিলেন। ২০১৬ সালের শেষের দিকের এক অপারেশনে বাগদাদে যাওয়ার পর তিনি এক ফাঁক করে নিজের পরিবারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার মোবাইল ফোনের জিপিএসের উপর নজরদারি করে আইএস সেটা টের পেয়ে গিয়েছিল। সেবার অবশ্য তার বড় ধরনের কোনো বিপদ হয়নি, কিন্তু নিঃসন্দেহে আইএসের সন্দেহের তালিকায় চলে গিয়েছিল তার নাম।

২০১৬ সালের শেষের দিকে আইএস ইরাক এবং সিরিয়াতে তাদের পরাজয়ের সংবাদ চাপা দিয়ে তাদের সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য পুরো বিশ্বব্যাপী একাধিক বড় মাপের হামলা করতে শুরু করে। সে বছর ১৯ ডিসেম্বর এক আইএস জঙ্গি বার্লিনের ক্রিসমাস মার্কেটের মধ্য দিয়ে ট্রাক্টর চালিয়ে ১২ জনকে হত্যা করে। এর পরপরই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি বাগদাদেও বড়দিন এবং নববর্ষ উপলক্ষ্যে বড় মাপের একাধিক হামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরকম একটি হামলার দায়িত্ব এসে পড়ে হারিসের উপর। তার উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়, পিকআপ ট্রাক ভর্তি ১,১০০ পাউন্ডের সি-৪ বিস্ফোরক নিয়ে বাগদাদ আল-জাদিদ মার্কেটে বিস্ফোরণ ঘটানোর।

https://int.nyt.com/data/videotape/finished/2018/07/1533053674/8c2f0a32-b452-499a-af53-4a1537597105-900w.mp4

ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে ক্যাপ্টেন হারিস আল-সুদানি আইএসের দেওয়া সাদা রংয়ের কিয়া পিকআপ ট্রাকটিতে করে বাগদাদ আল-জাদিদের মার্কেটের দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু নির্ধারিত রাস্তায় না গিয়ে যখনই তিনি পিকআপ থেকে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করানোর জন্য ফ্যালকনের সেফ হাউজের দিকে যাত্রা শুরু করেন, তখনই তার মোবাইল ফোনটি বেজে ওঠে। মসুল থেকে আইএসের এক উচ্চপদস্থ নেতা জানতে চায়, তিনি কোথায়। হারিস যখন জানান তিনি বাগদাদের দিকে যাচ্ছেন, তখন অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, “তুমি মিথ্যা বলছ। আমি জানি তুমি বাগদাদের রাস্তায় নেই।” হারিস বুঝতে পারেন, তিনি আইএসের সন্দেহ থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেননি। তারপরেও উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি উত্তর দেন, “তাহলে আমি মনে হয় রাস্তা ভুল করে ফেলেছি। এক্ষুণি ঠিক রাস্তায় ফিরে যাচ্ছি।”

ফিরে গিয়ে বাগদাদের সঠিক রাস্তা ধরেন হারিস। ফোনে ফ্যালকনের সাথে যোগাযোগ করে বিস্ফোরণ স্থলের পাশেই একটি নতুন জায়গায় তাদের সাথে মিলিত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। নির্ধারিত স্থানে ফ্যালকন সদস্যরা এসে উপস্থিত হয়, যাদের মধ্যে হারিসের ভাই মুনাফও ছিল। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফ্যালকনের দক্ষ অফিসাররা ট্রাকটি থেকে ২৬ ব্যাগ সি-৪ বিস্ফোরক, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, বল বিয়ারিং এবং একটি ইলেকট্রনিক ডিটোনেটর উদ্ধার করে (উপরের ভিডিওতে ফ্যালকনের সদস্যরা ট্রাক থেকে বিস্ফোরকের প্যাকেট উদ্ধার করছে)। হারিস খালি পিকআপটি নিয়ে মার্কেটের নির্ধারিত স্থানে রেখে ফিরে আসেন। সেদিন সন্ধ্যার সময় ইরাকি এবং অন্যান্য আরব টিভি চ্যানেলগুলো ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, বাগদাদ আল-জাজিদের মার্কেটের নিকটবর্তী আল-বেইদা সিনেমা হলের সামনে একটি সাদা রংয়ের পিকআপ ট্রাক বিস্ফোরিত হয়েছে, তবে এতে কেউ নিহত হয়নি।

হারিসের ভাই মুনাফের বুকে হারিসের চেহারার উল্কি; Image Source: Newyork Times

বছরের শেষ দিনের ঐ অপারেশনটিই ছিল হারিস আল-সুদানির জীবনের শেষ সফল অপারেশন। জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে আরেকটি অপারেশনের দায়িত্ব দেয় আইএস। সেটি ছিল তারমিয়া শহরের অপর প্রান্তের একটি ফার্মহাউজে বিস্ফোরণ ঘটানোর। কিন্তু বাগদাদ থেকে দূরে হওয়ায় ফ্যালকন সদস্যদের পক্ষে সেখানে গিয়ে বোমা নিষ্ক্রিয়া করা সম্ভব ছিল না। জানুয়ারির ১৭ তারিখ সকাল বেলা হারিস ফার্মহাউজে প্রবেশ করেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও তার কাছ থেকে নতুন কোনো সংবাদ না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ফ্যালকনের সদস্যরা। তারা বুঝতে পারে, আইএস হয়তো হারিসের পরিচয় জেনে ফেলেছে এবং ঐ ফার্মহাউজে নিয়েই হয়তো তাকে হত্যা করেছে অথবা অন্ততপক্ষে আটকে রেখেছে।

আইএসের শক্তিশালী ঘাঁটি হওয়া সত্ত্বেও তারমিয়া থেকে ক্যাপ্টেন হারিসকে উদ্ধার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী। তিনদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে এক বিশাল অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নিহতও হয়। কিন্তু হারিসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি সেখানে। ফ্যালকন অবশ্য এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। দীর্ঘ ছয়মাস ধরে তারা তাদের তদন্ত অব্যাহত রাখে। অবশেষে সেই সাদা পিকআপ ট্রাকটি আবার অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করে, এর ভেতর একটি আড়িপাতা যন্ত্র ছিল। অর্থাৎ শেষ অপারেশনে হারিসের সাথে ফ্যালকনের পুরো কথপোকথনই আইএসের কাছে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। আর সেজন্যই আইএস হারিসকে গুম করে ফেলেছে।

বাগদাদে হারিসের বাড়ির সামনে তার বিশাল আকারের পোস্টর; Image Source: Newyork Times

ফ্যালকনের সদস্যরা আইএসের এক সংবাদদাতার কাছ থেকে জানতে পারে, হারিসকে আল-কাইম নামক একটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেটি আইএসের আরেকটি শক্তিশালী ঘাঁটি। ফ্যালকনের পক্ষে কাইমে অপারেশন পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারা তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ২০১৭ সাল জুড়ে আইএসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশন এবং শেষপর্যন্ত আইএসের পরাজয়েও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যুদ্ধ শেষেও তারা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। গত মে মাসে তারা মার্কিন বাহিনীর সাথে মিলে স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে তুরস্ক এবং সিরিয়াতে লুকিয়ে থাকা আইএসের পাঁচজন উচ্চপদস্থ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে। এখনও তারা ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় মার্কিন এবং রাশিয়ান উভয় বাহিনীর সহায়তায় আইএসের অবশিষ্ট অংশের বিরুদ্ধে অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে এবং আইএসের প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

হারিসের মৃতদেহ উদ্ধারের আশাও ফ্যালকন ছেড়ে দেয়নি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে, হারিসের নিঁখোজের সাত মাস পরে আইএস একটি প্রপাগাণ্ডা ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় আইএস জঙ্গিরা চোখ বাঁধা বন্দীদেরকে গুলি করে হত্যা করছে। হারিসের পরিচিতরা অনেকেই বিশ্বাস করেন, সেই বন্দীদের মধ্যে একজন ছিলেন হারিস। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইরাকি বাহিনী আইএসের হাত থেকে আল-কাইম মুক্ত করে। ফ্যালকন হারিসের মৃতদেহের সন্ধানে একটি টিম পাঠায় সেখানে। কিন্তু খালি হাতে ফিরে আসে তারা।

আল-কাইম শহরে ইরাকি বাহিনীর অভিযানের একটি দৃশ্য; Image Source: Newyork Times

ফ্যালকনের সদস্যরা এখনও আশা করে, কোনো একদিন হয়তো এই বীর গুপ্তচরের মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যাবে, যে তার জীবন দিয়ে বাগদাদকে নিরাপদ রাখার জন্য কাজ করে গিয়েছিল। আশা করে হারিসের পরিবারের সদস্যরাও, যারা হারিসের নিখোঁজ সংবাদ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্তও জানত না যে, হারিস ফ্যালকনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছিল। দায়িত্ববোধ হারিসের কাছে এতোই বড় ছিল, তিনি তার স্ত্রীকেও জানাননি তার এই গোপন মিশনের কথা। 

ফিচার ইমেজ- Newyork Times

Related Articles

Exit mobile version