আইভান দ্য টেরিবল: মহান পিতামহের ভয়ঙ্কর নাতি

“মানব সমাজের ইতিহাস, শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।”

কার্ল মার্ক্সের বিখ্যাত এ উক্তিটি ইতিহাসের তিক্ত সত্যই তুলে ধরে। পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দুটি শ্রেণীই চোখে পড়বে। শাসক আর শাসিত। আর এই শাসকদের মধ্যে ইতিহাসে জনদরদী শাসক যেমন ছিল, তেমনি ছিল অসংখ্য নিপীড়নকারী অত্যাচারী শাসকও। এরকমই কয়েকজন আলোচিত, সমালোচিত, কুখ্যাত সম্রাট, রাজা তথা রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে রোর বাংলায় ধারাবাহিকভাবে লেখা হবে। আজ প্রথম পর্বে থাকছে ‘আইভান দ্য টেরিবল’ এর গল্প।

আইভান দ্য টেরিবলের দাদা আইভান দ্য গ্রেট; image source: alamy.com

রাশিয়ান গ্র্যান্ড প্রিন্স তৃতীয় আইভান ভেসিলিভিখ এর অর্জনের গল্প প্রায় সকলেরই জানা। তিনি রাশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘকাল শাসন করা শাসকদের একজন। তার আমলে রাশিয়া বা তৎকালীন ‘রাস’ (রুথেনিয়া) এর আয়তন তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। কমে যায় ‘গোল্ডেন হোর্ড’ এর অত্যাচার। মস্কো ক্রেমলিনেরও ব্যাপক সংস্কার করেন তৃতীয় আইভান। রাশিয়ান ‘স্টেট’ এর ভিত্তি একপ্রকার তার শাসনামলেই তৈরি হয়। এতসব অর্জনের জন্য তার উপাধি হয়ে যায় ‘আইভান দ্য গ্রেট’। অথচ তার নাতি চতুর্থ আইভানের উপাধি কি জানেন? ‘আইভান দ্য টেরিবল’ বা ভয়ঙ্কর আইভান! মহান দাদার নাতি কী করেছিলেন যে তিনি মহান না হয়ে হয়ে গেলেন ভয়ঙ্কর? আজকের পর্বে তুলে ধরবো সেই কাহিনী।

জন্ম

রুরিক রাজবংশে বাবা তৃতীয় ব্যাসিল এবং মা এলেনা গ্লিনস্কায়ার ঘরে ১৫৩০ সালের ২৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন চতুর্থ আইভান ভেসিলিভিখ। আইভানের বয়স যখন তিন বছর তখন তার বাবা মারা যান। শিশু আইভানকেই রাজা (গ্র্যান্ড প্রিন্স) বলে ঘোষণা করা হয়। তবে অভিভাবক হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব চলে যায় আইভানের মা এলেনার কাঁধে। রাজপ্রতিনিধি হিসেবে এলেনার পাঁচ বছরের শাসনকালে রাশিয়ায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে বয়ার (মধ্যযুগীয় রাশিয়ায় সমাজের উচ্চস্তরের পরিবারগুলো হচ্ছে বয়ার পরিবার) পরিবারগুলোর সাথে। ১৫৩৮ সালে এলেনা মারা যান।

চতুর্থ আইভান ভেসিলিভিখ; image source: Bio.com

টেরিবল হবার প্রাথমিক প্রক্রিয়া

আইভান দ্য টেরিবল বা চতুর্থ আইভান ভেসিলিভিখ ছিলেন সম্পূর্ণ রাশিয়ার প্রথম জার। তামিল মুভিতে আমরা যেমন দেখি বখে যাওয়া প্রতিটি নায়কেরই থাকে একটি বিষাদময় অতীত। ঠিক ইতিহাসে কুখ্যাত আইভানেরও রয়েছে একটি বিশেষ পটভূমি। এই পটভূমি সম্বন্ধে খুব একটা জানা যায় না । তবে শৈশবে বাবাকে হারানো এর একটি বড় কারণ। অন্যদিকে শিশুকাল থেকেই মার সঙ্গ না পেয়ে (যিনি আইভানের অভিভাবক হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন) এবং গৎবাধা রাজকীয় জীবনের যান্ত্রিকতায় আইভান হয়ে ওঠেন খিটখিটে স্বভাবের। জটিল মানসিকতার আইভান মেধাবী হলেও শৈশব থেকেই ঘন ঘন ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যেতেন। শিশুর স্বভাবসুলভ কোমলতাও যেন আইভানের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল!

মা মারা যাবার পর সবকিছু আরো এলোমেলো হয়ে যায়। আইভানের অভিভাবকের দায়িত্ব পায় সমাজের উঁচু শ্রেণীর লোকজন তথা বয়াররা। সংবেদনশীল এবং মেধাবী আইভানের ভাবলেশহীন নির্দয় ব্যক্তিতে পরিণত হবার পেছনে এ পর্যায়ের অভিভাবকদেরও অবদান রয়েছে। তারা আইভানের সাথে যথেষ্ট খারাপ ব্যবহার করতো। অবহেলিত হতে হতে একসময় তাদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন আইভান। সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন যে তার মাকে এই বয়াররাই হত্যা করেছে। কথিত আছে হতাশা দূর করতে বালক আইভান প্রায়ই বিড়াল, কুকুর এবং অন্যান্য পোষা প্রাণীর উপর অত্যাচার চালাতেন!

ক্ষমতায় আরোহণ ও উন্নয়ন কাজ

১৫৪৭ সালের ১৬ আগস্ট গ্র্যান্ড প্রিন্স থেকে ‘জার এন্ড গ্র্যান্ড প্রিন্স অব রাশিয়া’ হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন আইভান। ‘জার’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিস শব্দ ‘সিজার’ থেকে যার অর্থ করা হয় সম্রাট। সে বছরই আইভান অ্যানাস্তাসিয়া রমানোভাকে বিয়ে করেন। (যার থেকে পরবর্তীতে রমানোভ রাজবংশের উদ্ভব হয়)

আইভানের প্রথম স্ত্রী অ্যানাস্তাসিয়া রমানোভা; image source: pinterest.com

১৫৪৯ সালে আইভান রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাজের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির সহায়তায় তিনি নানাবিধ উন্নয়ন কাজ করেন। গ্রামগুলোতে স্বায়ত্তশাসন অনুমোদন করেন। কর ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন। চার্চের জন্য তৈরি করেন বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন। অন্যদিকে সমাজের বয়ার শ্রেণীর লোকজনের জন্যও বিশেষ আইন প্রণয়ন করেন যেন তারা সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করতে না পারে। নিজের শাসনামলের এই সময়ে আইভানও নিজের দাদার মতোই বিখ্যাত হবার পথে হাঁটছিলেন।

১৫৪২ সালে আইভান সাবেক রাশিয়ান মেট্রোপলিটন মাকারির সংস্পর্শে আসেন। যুবক আইভান মাকারির চিন্তা-ভাবনা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। মাকারির স্বপ্ন ছিল যুবক আইভানকে প্রভাবিত করে রাশিয়াকে একটি গোঁড়া খ্রিস্টীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা। তার উদ্দেশ্য একরকম সফল হয়। ১৫৪৭ সালে আইভানের আদেশে চার্চের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং সনাতন পদ্ধতির পুনঃস্থাপন করা হয়। ১৫৪৯ সালে প্রথমবারের মতো কোনো চার্চের ফাদারকে জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিতে সদস্যপদ অনুমোদন দেন আইভান। এসব কাজের পাশাপাশি এ সময় রাশিয়ান আর্মির উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন আইভান।

গোল্ডেন হোর্ড দমন

১৫৫২-৫৬ সালের মধ্যে আইভানের সৈন্যবাহিনী কাজানের তাতার খানাতে গুঁড়িয়ে দেয়। তার পররাষ্ট্রনীতির ধরনটাই ছিল এমন। তার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গোলীয় গোল্ডেন হোর্ডকে উৎখাত করা। এই গোল্ডেন হোর্ডই ছিল তখন রাশিয়ার আর বাল্টিক সমুদ্রের মাঝে সবচেয়ে বড় বাধা। ফলে গোল্ডেন হোর্ডের উৎখাত বাল্টিকে সমুদ্রে রাশিয়ার গমন সহজ করে দেয়। কিন্তু গোল্ডেন হোর্ড উৎখাত করে মত পরিবর্তন করেন আইভান। তিনি আরো বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে পুরোটা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তখন থেকেই তার জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়তে শুরু করে।

গোল্ডেন হোর্ড যোদ্ধা; image source: systema.spetsnaz

নতুন নতুন স্বাধীন অঞ্চল দখলের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে আইভান রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারেননি। অর্থনীতি এবং একইসাথে সংস্কৃতি বিপর্যস্ত হয়। এর উপর আইভান এক বিতর্কিত আইন জারি করে অসংখ্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং পরবর্তীতে সেগুলো নিজের সমর্থকদের মাঝে বন্টন করে দেন। তিনি একটি পুলিশ বাহিনী গঠন করেন যাদের বাহন হয় কালো ঘোড়া এবং ইউনিফর্মও কালো। ভয়ানক বৈকি! এই এই কালো পোষাকধারী পুলিশ বাহিনীর কাজকর্মও ছিল বিতর্কিত। মূলত ভিন্নমত দমন করতেই আইভান এই পুলিশবাহিনী গঠন করেছিলেন।

লিভোনিয়ান যুদ্ধ

আইভান দ্য টেরিবলের শাসনামলের অধিকাংশ সময়জুড়েই রাশিয়াতে কোনো না কোনো যুদ্ধ লেগেই ছিল। লিভোনিয়ান যুদ্ধ এর মধ্যে অন্যতম। যে অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য তিনি গোল্ডেন হোর্ড দমন করেছিলেন, সে সুবিধা তিনি পাচ্ছিলেন না। কারণ বাল্টিক সমুদ্র রাশিয়ার জন্য তখনো উন্মুক্ত হয়ে যায়নি। কিন্তু ইউরোপীয়দের সাথে বাণিজ্য করতে হলে বাল্টিকের বিকল্প নেই। তাই আইভান সিদ্ধান্ত নেন বাল্টিক পর্যন্ত যে করেই হোক যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। আর এর ফলে ১৫৫৮ সাল থেকে শুরু হয় লিভোনিয়ান যুদ্ধ

বর্তমান লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া ছিল তৎকালীন লিভোনিয়ার অন্তর্গত। আইভান সহজেই লিভোনিয়াকে হারিয়ে দেন। কিন্তু যুদ্ধ সেখানে শেষ হলো না। প্রথমত লিভোনিয়ার মিত্রপক্ষ লিথুনিয়া আইভানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। আর তাদের পাশে দাঁড়ালো পোল্যান্ড (লিথুনিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র)। যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করলো সুইডেনের ১৫৬৯ সালে পোল্যান্ডকে সাহায্য করার মাধ্যমে। এই সুযোগে কাজান তাতার হারানোর প্রতিশোধ নিতে আস্ত্রাখান আক্রমণ করে বসলো ক্রিমিয়ান তাতার। তারা মস্কোর সিংহভাগ বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিলো।

মঙ্গোলদের কাজান খানাতে আক্রমণ; historyfiles.co.uk

রাশিয়ার অবস্থার আরো অবনতি হলো যখন ১৫৭৫ সালে সুইডিশ ও পোলিশ আর্মি মিলে লিভোনিয়ার বিস্তৃত অংশ রাশিয়ার দখলমুক্ত করলো। এ সময় পোল্যান্ডের নতুন রাজা স্টিফেন ব্যাথরি রাশিয়াতে বড়সড় আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে আইভান শেষপর্যন্ত পোপের শরণাপন্ন হন যুদ্ধ বন্ধের জন্য। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরীর মধ্যস্থতায় অবশেষে ১৫৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি ২৪ বছর দীর্ঘস্থায়ী লিভোনিয়ান যুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধের শর্ত অনুযায়ী রাশিয়া লিভোনিয়ার উপর সব ধরনের দখল তুলে নেয়। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে ফিনল্যান্ডীয় উপসাগরের তীরবর্তী কয়েকটি শহর থেকেও দখলদারিত্বের অবসান ঘটায়। তখন রাশিয়ার চারদিকে কেবল হতাশা। দীর্ঘ ২৪ বছর যুদ্ধ করার ফল ছিল একেবারেই শূন্য।

দ্য অপ্রিচনিনা এবং দুটি ধ্বংসাত্মক শর্ত

আইভান দ্য টেরিবল আদতে প্রাথমিকভাবে বেশ জনপ্রিয়ই ছিলেন। তবে ১৫৫৮ তে শুরু হওয়া লিভোনিয়ান যুদ্ধটাই তার জন্য কাল হলো। এই যুদ্ধে ক্রমান্বয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছিল এবং আইভানের হতাশাও বেড়েই চলেছিল। এর মাঝে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এলো তার স্ত্রী অ্যানাস্তাসিয়ার মৃত্যু। উপরে উপরে যতই রুক্ষ হন না কেন, প্রথম স্ত্রী অ্যানাস্তাসিয়ার প্রতি আইভানের ছিল অগাধ ভালোবাসা। স্ত্রীর মৃত্যুতে আইভানের যেন মস্তিস্কবিকৃতি ঘটলো।

স্বভাবসুলভ সন্দেহপ্রবণ আইভান প্রথমেই নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য বয়ারদের সন্দেহ করলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য তার সন্দেহ এসময় আরো প্রবল হয়। তিনি হঠাৎ করেই মস্কো ত্যাগ করেন। সিংহাসন ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। এর মধ্যে এরকম ঘোষণা মাস্কোভাইটকে বিচলিত করে তোলে। তারা আইভানকে সিংহাসনে প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ জানান। বলে রাখা ভালো, মাস্কোভাইট হচ্ছে মস্কোকেন্দ্রিক চার্চের পাদ্রীদের নিয়ে গঠিত একটি সংগঠন যা রাশিয়ার সকল রাষ্ট্রীয় কাজে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখতো।

আইভান সিংহাসনে প্রত্যাবর্তন করেন ঠিকই, কিন্তু দুটি শর্ত দিয়ে। প্রথম শর্ত হচ্ছে তিনি ‘দ্য অপ্রিচনিনা’র পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা লাভ করবেন। দ্বিতীয়ত যেকোনো রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদেরকে ফাঁসি এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দিতে হবে! অপ্রিচনিনা হচ্ছে মস্কো এবং এর আশেপাশের সমস্ত অঞ্চল। নিরুপায় মস্কোভাইট আইভানের দুটি শর্ত মেনে নিয়ে তাকে সিংহাসনে ফিরিয়ে আনলো।

অত্যাচারের রাজত্ব কায়েম

আইভানের নতুন অপ্রিচনিনার কোর্ট বা রাজসভা; image source: fineartamerica.com

শর্ত পূরণ করে ক্ষমতায় ফিরে পরবর্তী ২৪ বছর স্বৈরাচারী বনে যান আইভান। আর তখনই নিজের নামের পাশে গ্রোজনি বা টেরিবল শব্দটি স্থায়ী রূপ দেয়ার বন্দোবস্ত করেন তিনি। তৈরি করলেন নিজের আগের তৈরি পুলিশ বাহিনীর চেয়েও ভয়ানক এবং শক্তিশালী রক্ষীবাহিনী। রক্ষীবাহিনীতে প্রায় ৬,০০০ সদস্য নিয়োগ করা হয়। অপ্রিচনিনা রক্ষার্থে তৈরি করা হয়েছিল বলে এর নাম দেয়া হয় ‘অপ্রিচনিকি’। অন্যদিকে অপ্রিচনিনার অন্তর্গত সকল রাজ্যের সমস্ত কর আইভানের সৃষ্টি করা নতুন সভায় জমা হতো। আইভান স্বতন্ত্র বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করলেন। তিনি দেশের প্রশাসনিক কাজ থেকে নিজেকে আপাতদৃষ্টিতে প্রায় সরিয়ে নেন। সেসব কাজ করার জন্য তিনি নিজের কয়েকজন অনুগত বয়ার এবং মধ্যবিত্ত লোককে নিয়োগ দেন। আর তাদের হাতে শুরু হয় রক্তপাত। একদিকে আইভানের প্রশাসনিক আমলা ও অন্যান্য লোকজন ব্যাপক আকারে দুর্নীতি শুরু করে। অন্যদিকে তার তৈরি রক্ষীবাহিনী অপ্রিচনিকি রাশিয়ান জনগণের উপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালায়।

আইভান দ্য টেরিবলের ভয়ানক কর্মকান্ডের সব তথ্য জানা যায় না। কারণ তার শাসনামলের প্রায় সকল লেখা প্রমাণাদি ও দলিল মস্কোর একটি ‘গ্রেট ফায়ার’ এর সময় পুড়ে যায়। তাই ইতিহাসবিদরা অপ্রিচনিনা পরবর্তী সময়ের আইভানের কর্মকান্ড নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তবে অধিকাংশের মতে আইভানের মূল দ্বন্দ্ব ছিল বয়ারদের সাথে যারা তার একক ক্ষমতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন।

কিছুকাল নিষ্ক্রিয় থেকে পুনরায় গাত্রোত্থান করেন আইভান। তিনি ভেবেছিলেন বয়ারদের অত্যাচার ও নিপীড়নের দ্বারা দমিয়ে রাখা গেলে রাশিয়ায় কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেহেতু মধ্যবিত্তরা প্রতিবাদের সাহস পাবে না। ১৫৭০ সালে আইভান রাশিয়ার উত্তর পশ্চিমে একটি প্রশাসনিক শহর নভগরদ অপ্রিচনিকি দ্বারা আক্রমণ করেন। প্রায় এক হাজার মানুষের বসতি নভগরদ সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় অপ্রিচনিকি। সে শহরে ছিল অধিকাংশ বয়ারশ্রেণীর লোকদের বসবাস যারা কেউই অপ্রিচনিকির হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এ সময় মস্কোতেও তিনি বয়ারদের উপর অত্যাচার চালানো শুরু করেন। বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যান্য মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে আইভান একে একে প্রভাবশালী বয়ারদের হত্যা করতে থাকেন। তাদের মধ্যে অনেককে প্রকাশ্যে বর্বরতম পন্থায় হত্যা করা হয়। আইভানের এই বর্বরতার সময় ৩ হাজারের অধিক মানুষ হয় বয়ার হবার জন্য, নয়তো বিরুদ্ধাচরণের জন্য নিষ্ঠুরভাবে খুন হয়েছেন।

এ তো গেল সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের কথা। পত্নীশোকে বাতুল বনে যাওয়া আইভানের ক্রোধ থেকে রক্ষা হয়নি তার নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র আইভানেরও! কোনো অজ্ঞাত কারণে আইভান তার পুত্রবধূর উপর ছিলেন বেজায় নারাজ। একদিন সামান্য ভুলের অজুহাতে তিনি ভীষণ রকম পেটালেন গর্ভবতী পুত্রবধূকে। ফল যা হবার তাই হলো, গর্ভপাত ঘটলো। জুনিয়র আইভান তখন মস্কোর বাইরে ছিলেন। মস্কো ফিরে এসে এ ঘটনায় ক্রুব্ধ হয়ে আইভানের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান জুনিয়র আইভান। বাদানুবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একপর্যায়ে আইভানের হাতে তার পুত্র আইভান খুন হন! এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ১৫৮১ সালে। এরই কিছুদিন পর তিনি সেন্ট ব্যাসিল’স ক্যাথেড্রাল এর নির্মাতাকে (নির্মাণ কাজ শেষ হবার পর) অন্ধ করে দেন।

অপ্রিচনিনার পতন

স্বৈরাচারী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন তার পতন অনিবার্য। এই বাস্তবতা আইভানের ক্ষেত্রেও ভিন্ন ছিল না। ১৫৬৫ সালে গঠিত অপ্রিচনিনা টিকে থাকলো মাত্র ৭ বছর। ক্রিমিয়ান তাতারের আক্রমণ থেকে মস্কোকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় অপ্রিচনিনা ভেঙে ফেলা হয়। আইভানের সমর্থকদের দখলকৃত সম্পত্তি সেগুলোর প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হয়। অপ্রিচনিকিও ভেঙে ফেলা হয়।

আইভান তার স্ত্রীদের সাথে; image source: tumblr.com

অপ্রিচনিনার পতনের পর আইভান ইংল্যান্ডের সাথে সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী পরিবারের এক রমণীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত ছিলেন বলেও শোনা যায়। জীবনের শেষদিকে গিয়ে তিনি আরো পাঁচটি বিয়ে করেন! ১৫৭০ থেকে ১৫৭৯ এর মধ্যে তিনি এই বিয়েগুলো করেন।

মৃত্যু

১৫৮১-তে নিজের ছেলেকে হত্যা করার পর থেকেই ভীত হয়ে পড়েন আইভান। সর্বদা মৃত্যুর কথা ভাবতে লাগলেন তিনি। এ সময় তিনি এতোটাই ভীত হয়ে পড়লেন যে প্রতিদিন ভবিষ্যদ্বক্তাদের দ্বারা নিজের মৃত্যুর সময় জানার চেষ্টা করেন। এমনকি ডাকিনীর সহায়তায় আয়ু বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেন বলেও জানা যায়!

অবশেষে ১৫৮৪ সালের ১৮ মার্চ স্ট্রোক থেকে মৃত্যুবরণ করেন আইভান দ্য টেরিবল। সেই সাথে শেষ হয় তার দীর্ঘকালের স্বৈরাচারী শাসন। তিনি একদিকে যেমন অনাগত রাশিয়ার কেন্দ্রীয় শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিলেন, অন্যদিকে মস্কোর ক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিলেন। কিন্তু অপ্রিচনিনার সাত বছরের ভয়াবহতা তাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে ‘আইভান দ্য টেরিবল’ হিসেবে।

আইভানের মৃত্যুর পর রুরিক রাজবংশের একমাত্র বেঁচে থাকা বংশধর আইভানের ছোট ছেলে ফিওদোর সিংহাসনে বসেন। তবে দুর্বলচিত্তের ফিওদোর সিংহাসনের অযোগ্য প্রমাণিত হন। রাশিয়াতে দেখা দেয় প্রচণ্ড রকমের বিশৃঙ্খলা। ১৫৯৮ সালে ফিওদোরের মৃত্যুর সাথে সাথে রুরিক রাজবংশের পতন ঘটে এবং রাশিয়ায় শুরু হয় সর্বনাশা ‘টাইম অব ট্রাবলস’।

ফিচার ইমেজ-  analysis-review.com

Related Articles

Exit mobile version