Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The business has since evolved into Obsidian, an integrated creative studio focused on delivering insight driven campaigns, brand work, and creative production for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Obsidian website, click here.

আগ্রায় সম্রাট হুমায়ুন: মুঘল রাজদরবারের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব

চৌসার যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর কোনমতে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে এসে সম্রাট হুমায়ুন আগ্রায় পৌঁছালেন। এ সময় আগ্রায় উপস্থিত ছিলেন সম্রাটের সৎ ভাই কামরান মির্জা, আসকারি মির্জা, গুলবদন বেগমসহ সম্রাটের অন্যান্য আত্মীয়রা। মির্জা হিন্দালও আগ্রাতেই ছিলেন। কিন্তু সম্রাটের আগমন সংবাদে নিজের বিদ্রোহের কারণে লজ্জিত হয়ে দ্রুত আলোয়ারের দিকে পালিয়ে গেলেন। সম্রাট তাকে আগ্রা আসার নির্দেশ দিলে হিন্দাল মির্জা আগ্রায় উপস্থিত হলেন। সম্রাট হিন্দাল মির্জাকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নিলেন।

মুহাম্মদ সুলতান মির্জাকেও তার দুই পুত্রসহ আগ্রায় আসার নির্দেশ দেওয়া হল। উপস্থিত হলে তাদেরও ক্ষমা করে দিয়ে সম্রাট বুকে টেনে নিলেন। রাজপরিবারে পারিবারিক পুনর্মিলনী সম্পন্ন হল। সম্রাট হুমায়ুন এবার মেতে গেলেন কীভাবে শের খানকে পরাজিত করে চৌসার যুদ্ধে হারার প্রতিশোধ নেয়া যায় তা নিয়ে।

চৌসার যুদ্ধে মুঘল সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ফলে যুদ্ধে মোতায়েন করার মতো তেমন সৈন্য তার কাছে ছিল না। আক্ষরিক অর্থেই সম্রাট সে সময় সৈন্য স্বল্পতায় ভুগছিলেন। চাইলেই কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করে তড়িঘড়ি করে একটা সেনাবাহিনী দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারতেন। কিন্তু শের শাহের সুপ্রশিক্ষিত আর চৌকস সেনাবাহিনীর সামনে সে সেনাবাহিনী হবে নিতান্তই শিশুতুল্য। এ সংকট মোকাবেলার জন্য তিনি একটা সমাধান হাতের কাছেই পেয়ে গেলেন।

সম্রাটের ভাই কামরান মির্জার কাছে এ সময় প্রায় ২০ হাজারের মতো চৌকস মুঘল যোদ্ধা ছিল। হিন্দালের বিদ্রোহ দমন করতে তিনি এ সৈন্য পাঞ্জাব থেকে নিয়ে এসেছিলেন। সম্রাট হুমায়ুন কামরানের কাছে এই সৈন্য ধার চাইলেন। সম্রাটকে অবাক করে দিয়ে কামরান মির্জা বললেন, শের শাহের মোকাবেলায় তিনিই যেতে আগ্রহী।

কামরান মির্জা সম্রাটকে আরো বললেন, সম্রাট বিগত কয়েক মাসের ধকলে বেশ পরিশ্রান্ত। তিনি বিশ্রাম নিক। সম্রাটের জন্য কামরান মির্জাই বিজয় ছিনিয়ে আনবেন। সম্রাট কামরানের এ প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করলেন। আর এর সাথে সাথেই মুঘল রাজদরবারে শুরু হয়ে গেল এক মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব।

আপাতদৃষ্টিতে দেখলে কামরানের প্রস্তাবটি বেশ ভালোই ছিল। সম্রাট আসলেই বিগত কয়েকমাসের পরিশ্রমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। আগ্রা আসার পরে তিনি বেশ কিছুদিন টানা অসুস্থও ছিলেন। সে হিসেবে সম্রাটের পক্ষ থেকে কামরানের যুদ্ধে যাওয়াটাই উত্তম প্রস্তাব। তবে সত্যিকার অর্থে ব্যাপারটা তেমন সহজ ছিল না। কামরানকে খুব একটা বিশ্বাস করতেন না সম্রাট। কামরান সবসময়ই মুঘল সালতানাতের মসনদের জন্য নিজেকে যোগ্য ভাবত।

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন; Image Source: Wikimedia Commons

চৌসার যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের পর সম্রাট যদি কামরান মির্জাকে শের শাহের মোকাবেলায় যেতে দেন, আর কামরান বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেনাবাহিনীর উপর কামরানের প্রভাব বেড়ে যাবে। এতে যেকোনো সময়ই হুমায়ুন হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারেন। তাছাড়া চৌসায় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে সম্রাট নিজে না গিয়ে কামরানকে পাঠালে তা সম্রাটের দুর্বলতা হিসেবেই সবাই ধরে নেবে।

অন্যদিকে কামরানের নিজেরও কিছু জোরালো যুক্তি ছিল। কামরানের দৃঢ় বিশ্বাস চৌসায় মুঘল সেনাবাহিনীর যে ভরাডুবি হয়েছে, তার পুরো দায় সম্রাটের। কামরানের এই অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, তা-ও না। সম্রাট হুমায়ুনের পরিস্থিতি আঁচ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার খেসারতই হচ্ছে চৌসার পরাজয়।

এখন তার কাছে থাকা ২০ হাজার সৈন্যের সদ্ব্যবহার যে হুমায়ুন করতেই পারবেন, সেই ব্যাপারে কামরান নিশ্চিত ছিলেন না। আর কোনোভাবে যদি তার এই বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তিনি নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন। পারস্যের সেনাবাহিনীর হাত থেকে কান্দাহার রক্ষার জন্য তার এই বাহিনী অবশ্যই দরকার পড়বে। পারস্য সাম্রাজ্য ইতোমধ্যেই দুইবার কান্দাহারের দিকে হাত বাড়িয়েছে। তারা যে আবারো চেষ্টা করবে না, এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তাছাড়া কামরান যখন আগ্রায় অবস্থান করছিলেন, তখন উজবেক নেতা উবায়দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করলে মধ্য এশিয়ার পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কামরান যত দ্রুত সম্ভব পাঞ্জাব পৌঁছাতে চাইছিলেন। নিজের সাথে থাকা ২০ হাজার সৈন্য আগ্রায় রেখে গেলে তিনি সেরকম পরিস্থিতিতে তেমন কিছুই করতে পারবেন না। মোট কথা, হুমায়ুন আর কামরান মির্জার মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়ার যথেষ্ট ঘাটতি ছিল, যা মুঘল সাম্রাজ্যকে ক্রমেই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল।

এদিকে মরার উপর খাড়ার ঘা পড়ল। হিন্দুস্তানের অস্বস্তিকর আবহাওয়া আর খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়মের কারণে কামরান মির্জা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে গেলেন। তার অসুস্থতা প্রায় দুইমাস স্থায়ী হল। একপর্যায়ে অসুস্থতা মারাত্মক আকার ধারণ করল। চেহারা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল। হাত-পা নাড়াতে পারতেন না তিনি। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, সবাই তার বেঁচে থাকার আশা পর্যন্ত ছেড়ে দিল। তবে দুই মাস পরে আল্লাহর ইচ্ছায় মুঘল দরবারের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক আবুল বকা’র চিকিৎসায় তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন। সুস্থ হলেও বিপদ পুরোপুরি যায়নি। তিনি এ সময় ধারণা করলেন সম্রাট হুমায়ুনই তাকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছেন।

কামরানের এ সন্দেহের কথা শুনে হুমায়ুন দ্রুত তার কাছে ছুটে আসলেন। সম্রাট হুমায়ুন কামরানকে বললেন, তিনি এ কাজ করেননি এবং কখনোই এ ধরনের ঘৃণিত কাজ করতে পারেন না। কিন্তু তাতেও কামরান খুব একটা ভরসা পেলেন না। তিনি দ্রুত লাহোরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে, সম্রাটের কাছ থেকে লাহোরে যাওয়ার অনুমতি পেলেন না তিনি। এতে তিনি আরো ক্রুদ্ধ হয়ে হায়দার মির্জাকে নিজের দলে টেনে নিয়ে লাহোর যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। বাধ্য হয়ে হুমায়ুনকে সরাসরি এসবে হস্তক্ষেপ করতে হল।

সম্রাট হুমায়ুন কামরান মির্জাকে বললেন, শের খান আর আমার মাঝে যুদ্ধ লেগে গেছে। এই যুদ্ধের উপরে বাবরের সাম্রাজ্য আর তার পুত্রদের ভাগ্য নির্ভর করছে। হায়দার মির্জা যদি লাহোরে চলে যায়, তাহলে তিনি তো নিরাপদ জায়গায় চলে গেলেন। কিন্তু এখানে থাকা বাকিরা মারা পড়বে। আর আমার পরাজয়ের পর লাহোরের পরাজিত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

এরপর সম্রাট হায়দার মির্জাকে বললেন, তার দায়িত্ব তো শুধু কামরানের প্রতি না। বরং তার দায়িত্ব মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি। সম্রাটের কথা বিবেচনা করে হায়দার মির্জা দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আগ্রায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে কামরান আরো ক্রুদ্ধ হলেন। অবশেষে কামরানের জেদের কাছে হার মেনে সম্রাট তাকে লাহোর যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তবে তার সৈন্য রেখে যেতে বললেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী তিনি সৈন্য রেখে গেলেন। তবে পরিমাণে সেটি ছিল মাত্র ১ জাহার জন। 

কামরান লাহোরে চলে গেলেন। আগ্রায় রেখে গেলেন একরাশ হতাশা। মুঘল যোদ্ধারা মুঘল পরিবারের প্রভাবশালী এই দুইভাইকে একসাথে দেখে কিছুটা ভরসা পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু কামরানের হুট করে চলে যাওয়াতে তাদের হতাশা বেড়ে গেল। একে তো গোটা মুঘল সাম্রাজ্য শের শাহের আতঙ্কে ভুগছিল, তার উপর কামরানের লাহোরে চলে যাওয়া কেউই মেনে নিতে পারল না। তিনি শুধু নিজে গেলেও হতো। যাওয়ার সময় রাজদরবারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমিরদেরও নিজের সাথে নিয়ে গেলেন। হুমায়ুন আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন সাম্রাজ্যের এ বিপদের দিনে সবাইকে নিজের পাশে রাখতে। কিন্তু কেউই তার পাশে এসে দাঁড়াল না।

এদিকে চৌসার যুদ্ধে অকল্পনীয় সহজ বিজয় অর্জনের পর শের শাহ সম্রাট হুমায়ুনের মতো সময় নষ্ট করলেন না। তিনি দ্রুত বিভিন্ন জায়গায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে লাগলেন। চৌসার যুদ্ধের পর পরই শের খান খাওয়াস খানকে চেরুহের দিকে পাঠিয়ে দিলেন সেখানকার জমিদারদের দমন করার জন্য। নানা সময় এরা বিদ্রোহ করে শের শাহকে বেশ ভালোই বিরক্ত করত। খাওয়াস খানকে চেরুহের দিকে পাঠিয়ে হাজী খাঁ বটনী আর জালাল খাঁ বিন জালুকে শের শাহ পাঠালেন বাংলার রাজধানী গৌড় অধিকার করতে। সম্রাট হুমায়ুনের পক্ষে এ সময় মাত্র ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে গৌড় রক্ষা করছিলেন জাহাঙ্গীর কুলি বেগ।

বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় দুর্গের অভ্যন্তরের দৃশ্য; Image Source: mouthshut.com

সম্রাট হুমায়ুন বাংলা ত্যাগ করার পূর্বে জাহাঙ্গীর কুলি বেগকে বাংলার রাজধানী গৌড় ধরে রাখার জন্য নিয়োজিত করে আসেন। জাহাঙ্গীর কুলি বেগের কাছে তখন ৫ হাজার সৈন্য ছিল। পরিমাণে এটি অল্প। এই সৈন্য নিয়ে সাহসিকতার সাথে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে হয়। নিরাপদে সৈন্যসহ তাকে আগ্রা ফিরে যেতে দেয়া হয়ে, এই শর্তে চুক্তি করলেন তিনি। কিন্তু আফগানরা বিশ্বাসঘাতকতা করল। জাহাঙ্গীর কুলি বেগসহ রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর এই ৫ হাজার সৈন্যের ইউনিটটিকে গৌড়ে জীবন দিতে হল।

শের খান; Image Source: thefamouspeople.com

এর কিছুদিন পরই আগ্রায় সম্রাট খবর পেলেন শের শাহ লখনৌ অতিক্রম করে কনৌজের দিকে এগিয়ে আসছে। সম্রাটকে এবার আগ্রা ছেড়ে আরেকবার যুদ্ধের ময়দানে নিজের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য নামতে হবে। সম্রাটকে এটাও মনে রাখতে হবে, মুঘল সেনাবাহিনীর সেই জৌলুস এখন আর নেই। খুবই সাধারণ একটা বাহিনী থাকছে এবার তার সাথে। 

রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনী তার নিজস্ব জৌলুস হারিয়ে এমন অবস্থায় পৌছে গিয়েছিল যে, গহোরের রাজা বীরভান সম্রাটকে এই পরামর্শ দিতে বাধ্য হলেন, যে করেই হোক শের শাহের সাথে এখন যুদ্ধ এড়িয়ে আগ্রা ত্যাগ করে বাহিনী নিয়ে পন্না রাজ্যের পার্বত্য অঞ্চলে চলে যাওয়া যাক। নিরাপত্তার আড়ালে সেখানে বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করে এরপর শের শাহের মুখোমুখি হওয়া যাবে। বীরভানের এই কথা থেকেই আসলে মুঘল সেনাবাহিনীর তখনকার অবস্থা বোঝা যায়।

যদিও এক দিক থেকে বীরভানের পরামর্শ খুবই বাস্তবধর্মী, কিন্তু মুঘল সম্রাটের জন্য শত্রুর আক্রমণের মুখে নিজের রাজধানী ফেলে পালিয়ে যাওয়া আর যাই হোক, সম্মানের বিষয় হতে পারে না। সম্রাট হুমায়ুন তাই বীরভানের এই পরামর্শ উপেক্ষা করে কনৌজ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ভোজপুরে গঙ্গার তীরে সেনাবাহিনী নিয়ে গেলেন। গঙ্গার অপর তীরে শের শাহের অবস্থান। সাথে বিশাল আফগান সেনাবাহিনী। এরা সব দিক থেকেই মুঘল সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ। তবে আকারের দিক থেকে মুঘল সেনাবাহিনীই বড় ছিল।

ভোজপুরে গঙ্গা পাড় হতে গিয়ে মুঘল ও আফগান সেনাবাহিনীর মাঝে ছোটখাট কিছু সংঘর্ষ হল। এরপর সম্রাট ভোজপুর দিয়ে নদী পার না হয়ে নদীর তীর বরাবর হেঁটে ৫০ কিলোমিটার দূরে কনৌজে ঘাটি গাড়লেন। চৌসার মতোই কনৌজেও একই অবস্থা হল। দুই বাহিনী নদীর দুই পাশে অবস্থান নিল।

যুদ্ধের পূর্বে দুই বাহিনীর অবস্থান; ছবি: মোগল সম্রাট হুমায়ুন, মূল (হিন্দি): ড হরিশংকর শ্রীবাস্তব, অনুবাদ: মুহম্মদ জালালউদ্দিন বিশ্বাস

শের শাহ এবার সম্রাটের নিকট দূত পাঠালেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন দুই বাহিনী নদীর দুই পাশে না থেকে এক পাশে এসে যুদ্ধ করুক। সেক্ষেত্রে সম্রাট নিজে নদী পার না হতে চাইলে শের শাহ নদী পাড়ি দিতে প্রস্তুত। তবে তখন সম্রাটকে তার বাহিনী নিয়ে বেশ কয়েক মাইল পিছিয়ে যেতে হবে। অথবা চাইলে সম্রাট নিজেই নদী পাড়ি দিতে পারেন। শর্তগুলো সেক্ষেত্রেও একই থাকবে।

শের শাহের প্রস্তাব শোনার পর সম্রাট হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিই নদী পার হবেন। তা না হলে শত্রুরা তাকে দুর্বল ভাবতে পারে। শের শাহ তার বাহিনী নিয়ে ১৫ কিলোমিটারে মতো পিছিয়ে গেলেন। হুমায়ুন নদী পার হলেন। তবে নদী পাড় হওয়া হুমায়ুনের জন্য লাভজনক কিছু বলে বিবেচিত হল না।

যুদ্ধের গন্ধ পেয়ে নদী পার হওয়ার সময়ই তড়িঘড়ি করে গড়ে তোলা মুঘল সেনাবাহিনীর অনেক যোদ্ধা পেছন থেকে পালিয়ে গেল। তাছাড়া নদী পাড়ি দেয়ার পর হুমায়ুনের অবস্থানও অসুবিধাজনক ছিল। হুমায়ুন যে জায়গায় শিবির ফেললেন, তা ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক নিচু। অন্যদিকে শের শাহ তার পছন্দমতো উঁচু ভূমিতে শিবির ফেললেন।

যুদ্ধ জয় শুধু গায়ের জোর বা সেনাবাহিনীর সক্ষমতার উপরেই নির্ভর করে না। বাহিনীর অবস্থান এবং যুদ্ধ করার জায়গাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সম্রাট হুমায়ুন চৌসার মতো কনৌজেও সেই একই ভুল করলেন। যুদ্ধের শুরুতেই নিজের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেললেন। 

সামনেই যুদ্ধ। আর হিন্দুস্তানে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে হলে এই যুদ্ধে জয়লাভ করা ছাড়া সম্রাট হুমায়ুনের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। কী ঘটতে যাচ্ছে মুঘল সাম্রাজ্যের ভাগ্যে?

তথ্যসূত্র

  1. মোগল সম্রাট হুমায়ুন, মূল (হিন্দি): ড হরিশংকর শ্রীবাস্তব, অনুবাদ: মুহম্মদ জালালউদ্দিন বিশ্বাস, ঐতিহ্য প্রকাশনী, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০০৫
  2. তারিখ-ই-শের শাহ; মূল: আব্বাস সারওয়ানী, অনুবাদ গ্রন্থের নাম: শের শাহ, অনুবাদক: সাদিয়া আফরোজ, সমতট প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  3. হুমায়ুননামা, মূল: গুলবদন বেগম, অনুবাদ: এ কে এম শাহনাওয়াজ, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, প্রকাশকাল: জানুয়ারী ২০১৬

এই সিরিজের আগের পর্বসমূহ

১। প্রাক-মুঘল যুগে হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা || ২। তরাইনের যুদ্ধ: হিন্দুস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেওয়া দুই যুদ্ধ || ৩। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: দাস শাসনামল || ৪। রাজিয়া সুলতানা: ভারতবর্ষের প্রথম নারী শাসক || ৫। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: খিলজী শাসনামল || ৬। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তুঘলক শাসনামল || ৭। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তৈমুরের হিন্দুস্তান আক্রমণ ও সৈয়দ রাজবংশের শাসন || ৮। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: লোদী সাম্রাজ্য || ৯। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর গঠন এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস || ১০। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রশস্ত্র || ১১। জহির উদ-দিন মুহাম্মদ বাবুর: ‘একজন’ বাঘের উত্থান || ১২। বাদশাহ বাবরের কাবুলের দিনগুলো || ১৩। বাদশাহ বাবর: হিন্দুস্তানের পথে || ১৪। বাদশাহ বাবরের হিন্দুস্তান অভিযান: চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি || ১৫। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান: হিন্দুস্তানে বাবরের চূড়ান্ত লড়াই || ১৬। খানুয়ার যুদ্ধ: মুঘল বনাম রাজপুত সংঘাত || ১৭। ঘাঘরার যুদ্ধ: মুঘল বনাম আফগান লড়াই || ১৮। কেমন ছিল সম্রাট বাবরের হিন্দুস্তানের দিনগুলো? || ১৯। মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যু: মুঘল সাম্রাজ্য এবং হিন্দুস্তানের উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের অকাল পতন || ২০। সিংহাসনের ষড়যন্ত্র পেরিয়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের অভিষেক || ২১। মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন দিগন্ত: সম্রাট হুমায়ুনের ঘটনাবহুল শাসনামল ||  ২২। দিল্লি সালতানাত থেকে মুজাফফরি সালতানাত: প্রাক-মুঘল শাসনামলে গুজরাটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস || ২৩। মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের গুজরাট অভিযানের প্রেক্ষাপট || ২৪। সম্রাট হুমায়ুনের গুজরাট অভিযান: সুলতান বাহাদুর শাহের পলায়ন || ২৫। সম্রাট হুমায়ুনের গুজরাট অভিযান ও গুজরাটের পতন || ২৬। গুজরাট থেকে মুঘলদের পলায়ন: মুঘল সাম্রাজ্যের চরম লজ্জাজনক একটি পরিণতি || ২৭। শের খান: হিন্দুস্তানের এক নতুন বাঘের উত্থানের গল্প || ২৮। শের খানের বাংলা অভিযান || ২৯। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ হত্যাকাণ্ড: সাম্রাজ্যবাদী পর্তুগীজদের বিশ্বাসঘাতকতার একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ || ৩০। শের খানের বাংলা বিজয় || ৩১। সম্রাট হুমায়ুনের বাংলা বিজয়: বাংলা থেকে শের খানের পশ্চাদপসরণ || ৩২। মির্জা হিন্দালের বিদ্রোহ: মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আগ্রা যাত্রা || ৩২। চৌসার প্রান্তরে শের শাহ বনাম হুমায়ুন: যুদ্ধের মহড়া || ৩৩। ব্যাটল অফ চৌসা: মুঘল সাম্রাজ্যের ছন্দপতনের সূচনা || ৩৪। চৌসার যুদ্ধে বিজয়: বিজয়ী শের খান হলে ‘শের শাহ’

ফিচার ইমেজ: theholidayindia.com

Related Articles