শিরোনামে ‘ক্ল্যাসিকস’ দেখেই আপনার মস্তিষ্কে বিশাল কোনো নাম জায়গা দখলের আগেই জানিয়ে রাখি, আমাদের আজকের গল্পে বিশ্ব ক্রিকেটের বিশাল কোনো রথী-মহারথী নেই। নেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব চিরচেনা নামও। বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে নামগুলি মাথায় দুম করে টোকা দেয় না, তেমন কিছু চরিত্র আজকের আলোচনার আসরে দখলে নেবেন দারুণ দাপুটে অবস্থান। চেনা কিছু নামের সঙ্গে থাকবেন কিছুটা কম চেনা বা কম পরিচিত কেউ; অথবা সময়ের আস্তরন পড়ে বিস্মৃত কিছু চরিত্রও হয়তো জেগে উঠবেন।
আর ভূমিকা না করে বলেই ফেলি, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঘরোয়া মঞ্চের দারুণ কিছু ব্যাটিং প্রদর্শনী নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
শুরুর আগে…
বাংলাদেশ ক্রিকেট এখনো পুরোপুরি অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এই দেশে ক্রিকেটের আবেগ ও বাজার যত বেশি ও বড় হোক না কেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটাই এখানে এখনো মূল (এবং তর্কসাপেক্ষে একমাত্র)। বিপিএল ‘বাণিজ্যলক্ষ্মী’ বলেই হয়তো অমন জামাই আদর পেয়ে থাকে। নতুবা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট তেমনই শ্রী-হীন, অনুজ্জ্বল।
ক্রিকেট কর্তাবৃন্দের মনোযোগ বহুমাত্রিক বলেই হয়তো প্রথম শ্রেণিতে ‘যোগ-সমেত মন’ দেয়ার সময় হয়ে ওঠে না। তবে সমর্থক-অনুরাগী বা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট মানুষজনও মোটা দাগে খুব একটা আগ্রহ পান না এসবে, সেজন্য ঘরোয়া ক্রিকেটের আয়োজন এখনো তেমনই গরীবী। হয়তো সেই কারণেই ঘরোয়া ক্রিকেটের দারুণ সব ইনিংস, ফাইফার, স্পেল, সেঞ্চুরি, কিংবা টইটম্বুর উত্তেজনার ম্যাচগুলি আলোচনায় আসে না সেভাবে। কাজও হয় না সেসব নিয়ে। এখানেও একটা ব্যাপার চলে আসে, আগ্রহ বা মনোযোগ। মানুষ সেসব নিয়েই তো কাজ করবে, যাতে আছে মানুষের আগ্রহ!
মানুষের অনাগ্রহ ও অনুৎসাহ মাথায় রেখেও বিপজ্জনক কাজটায় নেমেছি আমরা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঘরোয়া আসরের চমৎকার কয়েকটি ইনিংসের সঙ্গে পাঠক ও ক্রিকেট অনুরাগীদের মেলবন্ধনই আমাদের অভিপ্রায়। বিপদ কিছু থাকলেই বা ভয় কীসে!
অবাক চূড়ায় তামিম-রকিবুল
দ্বিধায় ছিলেন তামিম ইকবাল, দিনের শেষ হতে খুব বেশি বাকি নেই। নামবেন কি নামবেন না, ভাবছিলেন। দ্বিধা ঝেড়ে ব্যাটিং করতে নেমে খেলতে পারলেন না এক বলও। ও প্রান্তে পিনাক ঘোষ মোটে ২ বল খেলেছেন, আম্পায়ার টেনে দিলেন সেদিনের যবনীকা। বলা ভালো, সূর্য-প্রদীপ সেদিনের মতো আলো গুটিয়ে নিতেই পর্দা নামে মঞ্চের।
পূর্বাঞ্চলের হয়ে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে খেলছেন তিনি। টসে হারা মধ্যাঞ্চল প্রথম দিন শেষের আগেই গুটিয়ে গেলে পূর্বাঞ্চল নামে ব্যাটিংয়ে।
পরদিন মঞ্চে তামিম তার পার্টটুকু শুরু করলেন আগ্রাসী ভূমিকায়। শহীদুলকে দু’টি বাউন্ডারিতে স্বাগত জানিয়ে ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ প্রবাদবাক্য স্মরণ করিয়ে দিলেন সবাইকে। ক’দিন বাদে দ্বিতীয় ধাপের পাকিস্তান সফর। প্রায় এক যুগ পর সেখানে টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। সে সফরের প্রস্তুতি তো আছেই, তাছাড়া ক’দিন আগের প্রথম পর্যায়ের পাকিস্তান সফরটাও খুব একটা সুবিধের ছিল না। তিনি রান পেলেও তার ব্যাটিংয়ের ধরনে সমালোচনায় মুখর গোটা বাংলাদেশ।
প্রথম ১৪ বলে ৫ চারে উড়ন্ত সূচনা পেলেও পরে নিজেকে সংযত করে নেন। লাঞ্চ থেকে ফিরে আধঘন্টার মধ্যে তুলে নেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের ১৬তম সেঞ্চুরি। অধিনায়ক মুমিনুলের সঙ্গে জমে গেছে জুটিটা। টি-ব্রেকে গেলেন দেড়শ’ পেরিয়ে। হাতছানি দিচ্ছে দুইশ’। তামিম জানেন, এই উইকেটে তার ব্যাটিংয়ে আঁচড় কাটার মতোও কোনো বোলার প্রতিপক্ষের নেই। স্থিতধী ও সুস্থির থাকলেই দুইশ’ পদতলে লুটিয়ে পড়বে অবলীলায়। মুস্তাফিজুরকে পেটালেন খুব, শুভাগতকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে পেরোলেন দুইশ’, খেলতে হয়েছে ২৪২ বল। তামিম দিন শেষ করলেন ২২২ রানে – প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার সর্বোচ্চ স্কোর।
বাঘ যেমন রক্তের নেশায় হয়ে উঠে উন্মত্ত, তামিমও বুঝে যান, এদিন বিশেষ একটি দিন। এদিনের প্রতিটি মুহূর্ত তার হয়ে কথা বলার জন্য উন্মুখ। তাড়াহুড়ো করলেন না একদম। ড্রিংকসের আগেই তবু হয়ে যায় আড়াইশ’। লাঞ্চের পর আরো সতর্ক হয়ে ওঠেন তামিম, সময় বরমাল্য হাতে তার জন্য প্রস্তুত, তিনি পায়ে ঠেলতে পারেন না তা।
মধ্যাহ্নের সূর্যটা সবটুকু তেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে মাথার উপর। তার নিচে ইতিহাসের দোর ঠেলে আস্তে করে ঢুকলেন তামিম ইকবাল। শুভাগত’র বলটাকে ঠেলে দিয়ে ছুটে যান প্রান্ত বদলের জন্য, ইতিহাস হওয়ার লক্ষ্যে। প্রায় সাড়ে ন’ঘন্টা মধ্যমাঠে কাটিয়ে ৪০৭ বল থেকে ৩০০ রান। যাতে রয়েছে ৪০টি চার, কোনো ছয় নেই।
শুভাগতর বলেই পেরোলেন রকিবুলকে, ৩১৪—বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ইনিংস। ছয়ের শূন্যস্থান পূরণ করতে যেন মরিয়া হয়ে উঠলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী ও শুভাগতকে মাঠের বাইরে আছড়ে ফেললেন তিনবার। অধিনায়ক যখন ইনিংস সমাপ্তির ডাক দিচ্ছেন, তখনও তামিম ইকবাল অপরাজিত, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ইনিংসের ইমারত গড়ে ফেরার সময় তার পাশে তারকা-খচিত ৩৩৪ রান; ৫৮৫ মিনিটে খেলেছেন ৪২৬ বল, মেরেছেন ৪২টি চার ও ৩টি ছয়।
আহা, রকিবুল!
তামিম ও রকিবুল একসঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন। রকিবুলের সঙ্গী সাকিব-মুশফিকুর-তামিম-মেহরাব যখন আন্তর্জাতিক আঙিনায় ধাতস্থ হচ্ছেন, রকিবুল তখনও ঘরোয়া ক্রিকেটে তল খোঁজার চেষ্টা করছেন।
আগের রাতেই বন্ধু তামিম ইকবালের ব্যাটে দেখেছেন রূপকথা, অপর দুই বন্ধু সাকিব ও মুশফিকুর রহিমও পেয়েছেন ফিফটি। তিন তরুণের অবাক উচ্ছ্বাসে বিহ্বল ভারতীয় ক্রিকেট। ঐতিহাসিক জয়টাকে সেভাবে উপভোগ করতে পারলেন না, নেমে পড়তে হলো মাঠে। জাতীয় ক্রিকেট লীগের শেষ ম্যাচ, বরিশাল ও সিলেট মুখোমুখি ফতুল্লায়। শিরোপার নির্ধারণ হয়ে গেছে আগেই। নিয়ম রক্ষার ম্যাচটি ঘিরে আগ্রহ থাকার কথা নয় কারো। তার উপর বিশ্বকাপ সময়ে কে খবর রাখে এসবের?
রকিবুল হাসানের বিশেষ কিছু করার দরকার ছিল মনোযোগ আকর্ষণের জন্য, এবং করলেনও তিনি। সিলেট ও খুলনার বিপক্ষে দু’টি ফিফটি পেয়েছিলেন, শেষ ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাস ছিল সেটাই। প্রায় দেড়দিন ব্যাটিং করে অলআউট হলো সিলেট, গড়লো ৪০৮ রানের বিশাল পাহাড়। জবাব দিতে নেমে হান্নান সরকারের দারুণ সূচনার পরও ব্যর্থ হলেন ইমরান আহমেদ, নাসিরুদ্দীন ফারুক ও হুমায়ুন কবীর। ১৩০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফলোঅন শঙ্কায় বরিশাল। প্রথমে শাহীন হোসেনের সঙ্গে ১৬৭ রানের জুটিতে আড়াল হলো ফলোঅন আশঙ্কা, তারপর জুটি বাঁধলেন আরেক তরুণ-কিশোর ১৫ বছর বয়সী আরিফুল হকের সঙ্গে। দ্বিতীয় দিন শেষে ৪৭ রানে থাকা রকিবুল তৃতীয় দিন শেষ করলেন ব্যাট হাতে স্কোরকার্ডে ১৮৬ রান জমা দিয়ে। সঙ্গী আরিফুল ৬১ রানে অপরাজিত। বরিশাল তখন টপকে গেছে সিলেটকে, আর রকিবুলকে ডাকছে ইতিহাস।
৪র্থ ও শেষ দিনে একের পর এক হার্ডল অতিক্রম করলেন তরুণ রকিবুল। প্রথমে দুইশ’, তারপর আড়াইশ’। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ইনিংসের পর এবার পাখির চোখ করলেন তিনশ’ রানের মাইলফলকটা। আরিফুলের বিদায়ে টেইল উন্মুক্ত হয়ে গেলে সঙ্গীর অভাব বোধ করেছিলেন নিশ্চয়ই, তবে আলী আরমান দারুণ সঙ্গ দিলেন তাকে। শেষ দিনের শেষ বেলায় পৌঁছে রকিবুল ছুঁয়ে ফেললেন সেই ম্যাজিক ফিগার। বিশ্বকাপের ডামাডোলে আচমকা বাংলাদেশ ক্রিকেট আবিষ্কার করে, জামালপুরের কুড়ি বছরের এক তরুণ ছোকরা ইতিহাস গড়ে বসেছে!
সতীর্থ ও বন্ধুদের গার্ড অব অনার এবং ফুলেল বৃষ্টিতে সিক্ত হওয়ার আগে রকিবুল মধ্যমাঠে রেখে আসেন অপরাজিত ৩১৩; প্রায় ১১ ঘন্টা ও ছয় শতাধিক বলের সুদীর্ঘ সংগ্রাম, পরিশ্রম ও সযতনে গড়ে তোলা অবিশ্বাস্য এক রূপকথা!

কত কাছে, তবু কত দূরে…
তামিম ইকবালের ৩৩৪* ২০২০ সালে, আর রকিবুল হাসানের অপরাজিত ৩১৩ রানের ইনিংস ২০০৭ সালে। এই দু’জনের এই ১৩ বছরের মধ্যিখানে আরো কয়েকজন সম্ভাবনা জাগিয়েও, সফল হতে পারেননি। আমাদের এবারের গল্প সেসব হতভাগ্যদের নিয়েই।
নাসির হোসেন ততদিনে তার ‘ম্যাজিক’টা হারিয়ে ফেলেছেন। মধ্যমাঠে নাসির হোসেন মানে যে আস্থা ও ভরসা ছিল, তা অনেকটাই মিইয়ে গেছে তখন। আন্তর্জাতিক আঙিনায় নাসির হোসেনকে দেখলে মনে হতে পারে, সেরা সময় বুঝি ফেলে এসেছেন এই ভদ্রলোক।
তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে তখনও অন্যতম আস্থার প্রতীক নাসির হোসেন। ব্যাটিং এবং বোলিং, দুই ক্ষেত্রেই। নাসিরের শুরুটা ছিল বরিশালের হয়ে। পরে রংপুর বিভাগ হলে নাসির খেলতে শুরু করেন রংপুরের হয়ে। টায়ার-১ এ রংপুর-বরিশাল মুখোমুখি আসরের শেষ ম্যাচে। শিরোপা নির্ধারণ হয়েই গেছে এক প্রকার, সে মুকুট টানা দ্বিতীয়বারের মতো খুলনার।
টসজয়ী বরিশাল দ্বিতীয় দিনের প্রথম ঘন্টাতেই টানলো ইনিংসের সমাপ্তি। স্কোরবোর্ডে উঠলো ৩৩৫। শুরুটা বাজে হলো রংপুরের, ৮১ রানে নেই তিন টপ অর্ডার। নাসির হোসেন নামলেন এই সময়, সঙ্গী পেলেন পোড় খাওয়া একজন—নাঈম ইসলাম। সেই নাঈমও ছেড়ে গেলেন তাকে, সঙ্গী এবার আরিফুল। দিনশেষের আগে আগে সেঞ্চুরি করলেন নাসির।
সময়ের সাথে সংযত হয়ে ওঠে নাসিরের ব্যাট। তৃতীয় দিনে গোটা দিনটা ব্যাটিং করেও অপরাজিত নাসির। দলের লিড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৫, নাসির অপরাজিত ২৭০-এ। নিয়ম রক্ষার এই ম্যাচে সাজেদুল জয়-পরাজয় ভুলে তাকিয়ে রইলেন নাসিরের ব্যাটের দিকে। শেষদিনে আবারও ব্যাটিংয়ে তাই রংপুর।

ধীরে-সুস্থে এগিয়ে যাচ্ছেন নাসির, লক্ষ্যটা নাগালের মধ্যেই এসে পড়েছে। ১০ ঘন্টার অধ্যবসায়ে তিলে তিলে সাজিয়েছেন ২৯৫ রানের ইনিংস। কিন্তু আচমকা স্বপ্নটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল এক অভিষিক্ত তরুণ, লিংকন দে সঞ্জয়। সে ম্যাচেই নেমেছেন মাঠে, তার প্রথম উইকেটটা স্মরণীয় হলো নাসির হোসেনের আক্ষেপ আর হতাশা দিয়ে। ফজলে মাহমুদের হাতে ধরা পড়লেন নাসির। ৫১০ বল থেকে ৩২ চার ও ৩ ছয়ে সাজানো ৬০৩ মিনিটব্যাপী ২৯৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংসটা শেষ হলো ‘৫ রানের’ এক দুঃখ সঙ্গী করে।
মার্শাল আইয়ুব: আশার গল্প, হতাশার গল্প
মার্শাল আইয়ুবের গল্পটাও একগুচ্ছ হতাশার। আশা জাগিয়েও বিসিএলের উদ্বোধনী আসরেই বাজিমাতের সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে পড়ে ক্ষণিকের অসাবধানতায়।
মধ্যঞ্চলের ফাইনালটা এক প্রকার নিশ্চিতই ছিল। ফাইনাল খেলতে হলে পূর্বাঞ্চলকে বিশেষ কিছু করে দেখানোর প্রয়োজন ছিল। শেষ লেগের আগে পূর্বাঞ্চল টেবিলের তলানিতে থাকলেও সুযোগটা হাতছাড়া হয়নি তখনও। তবে দক্ষিণাঞ্চল এগিয়ে ছিল অনেকটা, উত্তরাঞ্চলেরও সুযোগ ছিল। মধ্যাঞ্চলকে টপকে ফাইনালে যেতে হলে দারুণ কিছুর প্রয়োজন ছিল পূর্বাঞ্চলের। টস জিতে ফিল্ডিং নিয়ে শুরুটাও ছিল ভীষণ আশা-জাগানিয়া। লাঞ্চের পর মধ্যাঞ্চলের টপাটপ ৪ উইকেট তুলে নেয় পূর্বাঞ্চল। নাবিল সামাদ ম্যাজিকে ৪৭/০ থেকে মধ্যঞ্চল হয়ে পড়ে ৫৬/৪। চার নাম্বারে নামা মার্শাল আইয়ুবের সঙ্গী হিসেবে যোগ দেন মেহরাব হোসেন জুনিয়র। ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত পারফর্মার মার্শাল, শুরুটা দেখেশুনে করলেও আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
প্রথম দিন পুরো ওভার খেলা হতে না পারলে আটকে থাকেন ৯৫-তে, পরদিনও কুয়াশার কারণে খেলা শুরু হতে দেরি। তবে খেলা শুরুর মিনিট কয়েকের মধ্যেই ছুঁয়ে ফেলেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার।

মেহরাব ও মার্শাল—দুইজনের ব্যাটেই অবিশ্বাসের দল জমা হতে থাকের একের পর এক। মার্শাল আবুল হাসানকে এক ওভারে তিনবার বাউন্ডারি ছাড়া করেন, ফয়সালকে চার ও ছয় দিয়ে স্বাগত জানান। মার্শাল দেড়শ’ পেরোন, মেহরাবও তাই। দু’জনের জুটিতে ছাড়িয়ে যায় তিনশ’। মার্শালের আগের ১৮১ ছাড়িয়ে যান অনায়াসে, পেরিয়ে যান দুইশ’। মাস কয়েক আগে জাতীয় লিগে ঢাকা মেট্রোর হয়ে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ২০৯ করেছিলেন, ছাড়িয়ে যান সেটাও। তাকে ধাওয়া করেন মেহরাবও। দ্বিতীয় দিনশেষে দুই ডাবল সেঞ্চুরিয়ানই অপরাজিত; মেহরাব ২০৬, মার্শাল ২৫১।
তৃতীয় দিনের সকালটাও বিলম্বে শুরু। কুয়াশা ঝামেলা পাকায়। মেহরাব লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন নাবিলের বলে। ৪৯৪ রানের জুটিটা ভাঙলেও আইয়ুব তখনও ২৬০ রানে অপরাজিত। মেহরাবের বিদায়ের পর আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন মার্শাল, এনামুল হক ও নাবিল সামাদদের পিটিয়ে নাজেহাল করে ফেলেন। চোখের পলকে পৌঁছে যান দুইশ’ আশির ঘরে।
এনামুল হকের বলটা আচমকা প্যাডে আঘাত হানলে শেষ হয়ে যায় প্রায় সাড়ে ন’ঘন্টায় সযতনে গড়ে তোলা ৩৬৭ বলে ২৮৯ রানের দারুণ আনন্দদায়ী ইনিংস। ইনিংসটিতে ছিল ৩০টি চার ও ৪টি ছয়।
মোসাদ্দেকের আগমনী বার্তা

মোসাদ্দেকের শুরুটা ছিল জঘন্য। অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ থেকে ফিরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল তার। প্রথম ম্যাচেই পেলেন পেয়ার, ঢাকা বিভাগের হয়ে খেলতে নেমে ‘০’ করলেন দুই ইনিংসেই। পরের আসরে বরিশাল বিভাগের হয়ে দেখা দিলেন পুরো অন্যরকম একজন হয়ে। পরপর দুই টেস্টে দু’টি ডাবল সেঞ্চুরি করে ইতিহাস তো করলেনই, একই বছরে তিনটা ডাবল সেঞ্চুরি করে অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন।
বরিশাল বনাম ঢাকা। এবার মোসাদ্দেক খেলছেন বরিশালের হয়ে। টসজয়ী বরিশাল ৯৫ রানে ৩ উইকেট হারালে মাঠে নামেন মোসাদ্দেক। আগের ম্যাচেই ২৫০ করেছিলেন, আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর ছিল তার ভেতরটা। সেবারে খানিক সংযত ভাব থাকলেও, এবার আর রাখলেন না তা। শুরু থেকেই দারুণ দাপুটে ব্যাটিং করে গেলেন। সজীব ও আল আমিনের পর সোহাগ গাজীর সঙ্গে মাত্র ২২ ওভারে স্কোর বোর্ডে জমা দিলেন ১৩৮ রান, যাতে সোহাগই ছিলেন ভীষণ আক্রমণাত্মক। তিনি ৮৬ বলে ৯৪ করে ফিরলেও মোসাদ্দেক পেয়ে যান সেঞ্চুরি, দিন শেষ করেন ঠিক দেড়শ’ই। বরিশাল প্রথম দিনেই পেরিয়ে যায় চারশ’। বলাই বাহুল্য, তাতে মোসাদ্দেকেরই ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
পরদিনও তার ব্যাটে তেমনই রান-উচ্ছ্বাস। বরিশাল ৪৬৩ রানে হারায় আট উইকেট, কিন্তু তিনি পেয়ে যান ব্যাক টু ব্যাক দ্বি-শতক। তারপর ছুটতে থাকেন আরো বড় লক্ষ্যের দিকে। অধিনায়ক কামরুল ইসলাম রাব্বির সঙ্গে ১৩৪ রান জমা করেন ১৭০ বল থেকে, যাতে কামরুলের অবদান ৬২ বল থেকে মোটে ২৩!
তখন মনে হচ্ছিল, তিনশ করা সময়ের ব্যাপার তার জন্য। দিনটা আজ তার, তাকে কিছুতেই আটকানো যাবে না। ঠিক তখনই গোলমাল করে ফেললেন। মেহেদী হাসান রানার বলে বোল্ড হয়ে গেলেন। তবে তার আগে দারুণ চিত্তাকর্ষক ২৮২ রান জমা দেন মাত্র ৩০৯ বলে, স্ট্রাইকরেট ৯১.২৬! সোয়া সাত ঘন্টার ব্যাটিংয়ে ৩৭টি চারের পাশাপাশি মেরেছেন ৫টি ছয়।
লিটন দাসের ‘মোনালিসা’ চিত্রাঙ্কন
‘লিটন দাস ইজ পেইন্টিং আ মোনালিসা উইথ হিজ ব্যাট!’
টন্টনে উইন্ডিজের বিপক্ষে যখন ৬৯ বলে ৯৪ করার পথে লিটন দাস, উইন্ডিজ কিংবদন্তি ইয়ান বিশপের মুখ চিরে বের করে এনেছিলেন এই উক্তি। যারাই দেখেছিল সেই ইনিংস, স্রেফ মুগ্ধই হয়েছিল। ব্যাট তো নয়, যেন তুলি হাতে মাঠে নেমেছিলেন লিটন। শুধু সেদিন নয়, লিটনের ব্যাটিং মানেই শৈল্পিক কবজির মোচড়। পুরোটাই অলস সৌন্দর্য্য আর কবজির কমনীয়তা। আভিজাত্য আর সৌন্দর্য্যের চমৎকার মিশ্রণ।
ঘরোয়া ক্রিকেটে লিটনের ব্যাট বরাবরই দিয়েছে বড় ইনিংস। সেখান হতে তিনটে নিয়ে আজকের আলোচনা। যেখানে অন্যরা খাবি খেয়েছে, রান পেতে বেগ পেতে হয়েছে সকলের, সেখানেই অনায়াসে লিটন ছন্দ তুলেছেন অদ্ভুত ব্যাটিং আনন্দে।
-
মধ্যাঞ্চল বনাম পূর্বাঞ্চল, বিসিএল ২০১৭ (২১৯ রান)
২০১৭ বিসিএলের কথাই ধরা যাক। মধ্যাঞ্চল বনাম পূর্বাঞ্চল, পঞ্চম আসরের উদ্বোধনী ম্যাচ। টসজয়ী পূর্বাঞ্চল ফিল্ডিং নেয়ার সিদ্ধান্তে পুরোপুরি সফল। দিনের ঘন্টা দেড়েক বাকি থাকতেই অলআউট মধ্যাঞ্চল। আট নাম্বারে নামা মোশাররফের ৪৬-ই যেখানে সর্বোচ্চ, সেখানে দাঁড়িয়েই দিন শেষের আগেই লিটন করে ফেললেন ৬০, পূর্বাঞ্চলের স্কোর ১৯ ওভারে বিনা উইকেটে ৯৫।
পরদিনও একই রকম সাবলীল লিটন। সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলে একদিক থেকে ফুল ফুটিয়েই চলেছেন সবুজ নন্দনে। সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার সময় ২৪১ বল থেকে ২১৯ রান সারা হয়ে গেছে তার, সঙ্গে ২৬টি চার আর ৪টি ছয়। সময় নিয়েছেন ৬ ঘন্টারও কম। ৩৬৭ রানের দলীয় সংগ্রহে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর কত জানেন? মেহেদী মারুফের ৪১! দ্বিতীয় ইনিংসেও তথৈবচ মধ্যঞ্চল। পৌনে তিন ঘন্টার দাঁত-চাপা সংগ্রামে শামসুরের ৫১ ছাড়া আর কেউ পঞ্চাশ পেরোতে পারেনি।
-
মধ্যাঞ্চল বনাম পূর্বাঞ্চল, বিসিএল ২০১৮ (২৭৪ রান)
পরের আসরের শেষ ম্যাচে দু’দলের লড়াইটা ছিল হাইস্কোরিং। পূর্বাঞ্চল ও মধ্যঞ্চলের লড়াইয়ে লিটনের ব্যাটে আবার পুষ্প-উচ্ছ্বাস। টসজয়ী মধ্যঞ্চল আব্দুল মজিদের ডাবল সেঞ্চুরিতে ৫৪৬ রানের সুউচ্চ অট্টালিকা বিনির্মাণ করলে, লিটন-নামক ডানায় চড়ে পূর্বাঞ্চল নির্মাণ করলো তার চেয়েও উঁচু এবং তার চেয়েও চকমকে-উজ্জ্বল প্রাসাদ।
প্রায় দেড়দিন ফিল্ডিংয়ের পর ব্যাটিংয়ে নেমেই খুনে-উল্লাসের শুরুটা হলো মোহাম্মদ শরীফকে দিয়ে। প্রথম ওভারেই দুটো চার। পরের ওভারে আবু হায়দারকে স্বাগত জানানো হলো চার ও ছয় দিয়ে। টানা দুই উইকেট খোয়ালেও লিটনের মোনালিসা অঙ্কন থেমে যায় না, তিনি একের পর এক তুলির আঁচড় কাটতেই থাকেন সবুজ গালিচায়। ৯০ বলে সেঞ্চুরির পর আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেন লিটন। ৪৬ ওভারে ২৬৪/৩ অবস্থায় যে পূর্বাঞ্চল দিন শেষ করে, তার মূলে লিটনের অপরাজিত ১২৫ বলে ১৩৯।

পরের দিনও একই রকম উন্মাতাল লিটন। ১৯২ বলে ছুঁয়ে ফেলেন দুইশ’। ২৪২ বলে আড়াইশ’ করা লিটন আরো বড় অর্জনের লক্ষ্যে সংযত ও ধীরস্থির হয়ে পড়েন একদম। হঠাৎ খোলসবন্দী হওয়াটাই কাল হলো কি না কে জানে, ইলিয়াস সানির বলটায় পড়ে গেলেন লেগ বিফোরের ফাঁদে। ২৭৪ রানে থেমে গেল নান্দনিক ধ্বংসযজ্ঞের যাত্রা। ২৯৩ বল ও ৪৯৬ মিনিটের সমন্বয়ে সাজানো ইনিংসটাতে ৩৫টি চারের সঙ্গে ছিল ২টি ছয়।
-
রংপুর বনাম রাজশাহী, এনসিএল ২০১৮ (২০৩ রান)
জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ সবে হতে শুরু করেছেন। শুরুটা ভালো হলেও বড় হয় না ইনিংস। তবে দলের অধিনায়ক ও ম্যানেজমেন্ট আস্থা হারায় না। এশিয়া কাপ ফাইনালে ১১৭ বলে ১২১ করে লিটন দাস প্রতিদান দেন সেই আস্থার। এবং প্রমাণ করে দেন, কেন তাকে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট শিল্পী বলে অভিহিত করা হয়!
এশিয়া কাপ ফাইনালের ক’দিন পর জাতীয় লিগে রাজশাহীর বিপক্ষে ম্যাচ। রংপুরের হয়ে খেলছেন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি বরাবরই ভয়ঙ্কর এবং অবিশ্বাস্য। তবে এবার যোগ হয়েছে আত্মবিশ্বাস ও নিজের সামর্থ্যে অগাধ আস্থা। রাজশাহীর বোলিংকে স্রেফ কচুকাঁটা করলেন তিনি।
প্রথম ইনিংসে সুবিধা করতে পারেননি। রংপুর মাত্র ১৫১ করেছে। জবাবে রাজশাহী ৫৮৯ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছে। ৪৩৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমেই তাণ্ডব শুরু করলেন লিটন। রাজশাহীর বোলাররা হয়তো গাল পাড়ছিলেন সতীর্থ ব্যাটসম্যানদের। কেন বাপু, কেন অত রান জমা দিতে গেলে! এখন ও ব্যাটা, রাগটা তো ঝাড়ছে আমাদের উপরই!
ফরহাদ রেজাকে প্রথম ওভারে দুই চার মেরে সেই যে শুরু হলো প্রলয়-নৃত্য, সামনে যাকেই পেয়েছেন, প্রচণ্ড পিটিয়েছেন। ৪৪ বলে ফিফটির পর রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিতে শুরু করলেন। শফিকুল ইসলামের এক ওভারে মারলেন চারটি চার।
৮১ বলে সেঞ্চুরির পর লিটন এবার রীতিমতো ‘পাগলা ঘোড়া’ যেন! অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল, বাঁধনহারা। ধ্বংসও কখনো কত্ত নান্দনিক! কত্ত সুন্দর! কত মনোহর!
১০৮ বলে দেড়শো পেরোনো লিটন এবার তাইজুলের পরপর ২ বলে চার ও ছয় মেরে ১৪০ বলে পেরোলেন দুইশ’। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে দ্রুততম! এক বল পর তাইজুলের বলেই সাব্বির রুমনের হাতে ধরা পড়লেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের স্থায়িত্ব চার ঘন্টারও (২২০ মিনিট) কম। ফেরার সময় শিল্পীর পাশে জ্বলজ্বল করছে ১৪২ বলে ২০৩! ৩২টি চার, ৪টি ছয়। স্ট্রাইকরেট? প্রায় ১৪৩!
আরো ক’টি স্মরণীয় গপ্পো
***
শামসুর রহমানের প্রতিভা ও হিটিং কোয়ালিটি সম্পর্কে সংশয় ছিল সামান্যই। অভিষেকের পর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০৭ রান তাড়ায় তার ১০৭ বলে ৯৬ দিয়ে প্রমাণও রেখেছিলেন। মাস কয়েক পর বিসিএলে পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে মধ্যঞ্চলের হয়ে মাঠে নামার সময় দারুণ আত্মবিশ্বাসী তিনি। শ্রীলংকা-সিরিজ সামনে, ভালো খেলতে পারলে খুলে যাবে শ্বেত পোষাক গায়ে চড়ানোর স্বপ্ন দুয়ার।
দ্বিতীয় দিনের শুরুতে মধ্যঞ্চলের হয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে শামসুর রহমান শুরুটা করলেন আক্রমণাত্মক। আধঘন্টাতেই পঞ্চাশ পেরোলো মধ্যাঞ্চল। ৬ ওভারে ৬১ রানের স্কোরে নাফিসের অবদান ২৩ বলে ২৩! অপর প্রান্তের সঙ্গীদের আসা-যাওয়ার ভেতরেই একশ’র উপর স্ট্রাইকরেট রেখে খেলতে থাকেন শামসুর। সময়ের সঙ্গে খানিকটা স্থিতধী হলেও আক্রমণ কমে না। স্ট্রাইকরেট নেমে আসে একশ’র নিচে, তবে দিন ফুরোনোর আগেই দুইশ’ পেরিয়ে যান তিনি। দিনের শেষে তার নামের পাশে উজ্জ্বল হয়ে লেখা থাকে – ‘২২৯’!
তিনশ’র সুখস্বপ্ন মাথায় নিয়ে পরদিন ব্যাটিংয়ে নামা শামসুর সাবলীল এগোলেও সঙ্গীহীন হওয়ার আতঙ্কেও ভুগতে থাকেন। নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে শেষ পর্যন্ত যখন মাশরাফির বলে নাফিসের হাতে ধরা পড়েন, তখন পর্যন্ত ২৮৬ বল থেকে নামের পাশে জমা করেছেন ২৬৭ রান । প্রায় পৌনে সাত ঘন্টার ইনিংসটায় ২৭টি চারের সঙ্গে মেরেছেন ১০টি ছয়।
***
আশরাফুল মানেই রূপকথা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের যত বড় বড় ইতিহাস, যত বড় বড় কীর্তি, তার সবটাতেই যেন আশরাফুলই থাকবেন। আশরাফুল যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘মহাপুরুষ’ বা ‘সুপারম্যান’, তিনি যা পারেন তা পারেন না আর কেউ। তিনি যেদিন খেলেন, সেদিন পৃথিবীর তাবৎ বীরপুরুষের দলও হয়ে পড়ে অসহায়। তখন পর্যন্ত বাংলাদশের টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ১৫৮ তার নামের পাশে। অস্ট্রেলিয়ার মতো অপরাজেয় শক্তিও বশ মেনেছে আশরাফুলের ব্যাটে।
সেই আশরাফুলের ঢাকা বিভাগ আতিথ্য গ্রহন করলো চট্টগ্রামের। প্রথম দিনটা চট্টগ্রাম ব্যাটিং করলো। এবং দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ব্যাটিংয়ে ঢাকা। ৫৮ রানে ৪ উইকেট খুঁইয়ে স্বাগতিকদের মতো অল্পতেই গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। তবে আশরাফুল ও মার্শাল আইয়ুব দাঁড়ালেন বুক চিতিয়ে। তরুণ মার্শাল আইয়ুব স্বপ্নপুরুষ আশরাফুলের সংস্পর্শে যেন নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে জানলেন নতুন করে। দু’জনের ব্যাটে ঢাকা এগোলো তরতর করে। চট্টগ্রামের রঙ হতে থাকলো ফিকে। কিন্তু চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সবুজ ক্রিকেট কানন পুলকিত হয়ে উঠল দারুণ।

আশরাফুলের স্ট্রোকদ্যুতিতে চোখ ঠিকরে গেল সবার। শুরুতে সংযমী থাকলেও সময়ের সাথে আশরাফুল হয়ে উঠলেন দুর্বার। প্রথম পঞ্চাশ পেরোতে দুই ঘন্টা ও ৯১ বল পর্যন্ত সময় নিলেও পরের পঞ্চাশ পেলেন আরো দ্রুত। ১৬৪ বলে পঞ্চাশ পেরিয়ে দেড়শ’ ছুঁলেন মাত্র ২০৩ বলে। দিন শেষ করলেন ১৬৬ রানে। পরদিনও মার্শালের সঙ্গে জুটিটা এগিয়ে চলে তরতর। আশরাফুল এগিয়ে যান বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বলতর এক মুকুটের রাজাধিরাজ হতে।
মিনহাজুল আবেদীন পেয়েছিলেন দ্বিশতক, খালেদ মাসুদ ও নাজিমউদ্দীনেরও ছিল, আশরাফুল ছাড়িয়ে গেলেন সবাইকে। মার্শালের সঙ্গে ৪২০ রানের জুটিটা ভেঙে যায়, আশরাফুল আড়াইশো পেরিয়ে ছুটতে থাকেন তিনশ’র পানে।
কিন্তু ইলিয়াস সানির বলটায় গোলমাল হয়ে গেল, ধীমান ঘোষের হাতে ধরা পড়লেন। সাত ঘন্টার রূপকথার অবিশ্বাস্য যাত্রাটা থেমে গেল হঠাৎ। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের (তৎকালীন) সর্বোচ্চ স্কোরটা সারা হয়ে যায় ইতঃমধ্যেই। ৩২৯ বল থেকে ২৬৩ রান, ৩১টি চার ও ১টি ছয়। আশরাফুলের ‘আশার ফুল’ হয়ে ওঠার আরো একটি দিনের উপাখ্যান লেখা আছে এতেই। সে ফুল অবশ্য আমাদের জন্য নেহায়েত মরীচীকা হয়েই ধরা দিয়েছে পরে।
***

ফরহাদ রেজা জাত লড়াকু। ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত ও নিয়মিত পারফর্মার। ব্যাটে ও বলে দুই বিভাগেই সমান দাপট তার। সানজামুল ইসলাম ও মুক্তার আলীর সঙ্গে যেবার প্রতি-আক্রমণে চট্টগ্রামের বোলিং আক্রমণকে ছেলেখেলা করলেন, সে ইতিহাস বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাইটব্যাক।
৭৭/৬ থেকে স্কোর গিয়ে দাঁড়ালো ৬৭৫/৯ ডিক্লেয়ার; সাত-আট-নয় নাম্বার ব্যাটসম্যানই পেয়েছেন বড় ইনিংস। অবিশ্বাসে চোখ ছানাবড়া হতে এর চেয়ে বেশি আর কী লাগে?
সানজামুলের সঙ্গে জুটি বেঁধে ৬২ ওভারে স্কোরবোর্ডে জমা দিলেন ৩৪৭ রান, একদিনেই ৪২৪ রাজশাহী। সানজামুল ১৭২ করে আউট হলেও ফরহাদ রেজা অপরাজিত ১৮২ করে। শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফরহাদ নিজেকে সংযত করেন দেড়শ’র পর। ১৬৬ বলে ১৫০ করা ফরহাদ পরদিন দ্বিশতক পৌঁছেন ২৪১ বলে। লাঞ্চের পরও ফরহাদ খুব একটা উচ্ছৃঙ্খল হন না, আড়াইশো পেরিয়ে যান ৩০৮ বল খেলে। তিনশ’ও অসম্ভব মনে হচ্ছিল না তার।
কিন্তু আলী আকবরের বলে ধরা পড়েন তামিমের হাতে। ততক্ষণে তার নামের পাশে লেখা হয়ে গেছে ২৫৯ রান, সেটা করতে খেলতে হয়েছে ৩৩৪ বল। মধ্যমাঠে কাটানো ৪৬০ মিনিটের মাঝে ৩৫টি চার ও ৫টি ছয়ও মেরেছেন।
***
মুমিনুলের বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য অজানা নয় কারো। সেই নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্ল্যাসিক ১৮১ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন বড় ইনিংসের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই ১৮১-কে আর ছাড়িয়ে যেতে না পারা নিঃসন্দেহে মুমিনুলের তো বটেই, বাংলাদেশ ক্রিকেটেরও বড় আক্ষেপের জায়গা।
পূর্বাঞ্চলের হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিপক্ষে ম্যাচটার নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি। সামনে শ্রীলংকা সিরিজ, নিজেকে ঝালিয়ে নেয়ার ব্যাপার আছে। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে মুমিনুল দেখেন, তার সতীর্থ বন্ধুরা একপ্রান্ত থেকে আসছে আর যাচ্ছে। শুরুটা ভালো করলেও কেউ ইনিংস বড় করতে পারছে না। ইনিংস বড় করার দায়িত্বটা মুমিনুল তুলে নেন নিজের কাঁধে। স্বভাবসুলভ ব্যাটিংয়ে মুমিনুল দিন শেষ করেন ১৬৯-এ। পরদিনও তার ব্যাটিংয়ে একইরকম চমৎকারিত্ব। একসময় পেরিয়ে যান চট্টগ্রামের হয়ে বরিশালের বিপক্ষে করা ২৩৯, জীবনের প্রথম আড়াইশো পেরিয়ে আরো বড় অর্জন যখন হাতছানি দিয়ে ডাকছে, ঠিক সেসময়ই আব্দুর রাজ্জাককে পড়তে ভুল করে ফেললেন মুমিনুল। লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে থেমে গেলেন ২৫৮-তে। ৩৪৪ বল ও ৪৮৪ মিনিটব্যাপী ইনিংসটায় মেরেছেন ২৩টি চার ও ৩টি ছয়।
***

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আব্দুল মজিদ ধারাবাহিক একজন। ঢাকা বিভাগ বনাম ঢাকা মেট্রো ম্যাচ। অনেকের মতে, ঢাকা ডার্বি। ফতুল্লায় বসেছে ডার্বির আসর। রনি তালুকদারকে সঙ্গে করে আব্দুল মজিদ গড়ে বসেন ইতিহাস। টসে হেরে ব্যাট করতে নামা ঢাকা বিভাগ উদ্বোধনী জুটিতেই পায় ৩১৪ রান। রনি তালুকদার ১৬৩ করে আউট হলেও আব্দুল মজিদ ১৭৩ রানে অপরাজিত থেকে যান। পরদিনও একই রকম সাবলীল আব্দুল মজিদ। এত দারুণ উদ্বোধনী ভিতের পরও আর কেউ দাঁড়াতে না পারলে একা হয়ে পড়েন আব্দুল মজিদ। দুইশ’ পেরিয়ে আরো বড় অর্জনের দিকে ছুটতে গিয়ে দেখেন, একের পর সঙ্গী ছেড়ে যাচ্ছে তাকে, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন তিনি। আড়াইশ’ পেরিয়ে নবম সঙ্গীও তাকে ছেড়ে গেলে ইনিংস ঘোষণার ডাক দেন অধিনায়ক।
অপরাজিত আব্দুল মজিদ ২৫৩ রান সঙ্গী করে প্যাভিলিয়নে ফিরেন ব্যাট উঁচিয়ে। ৩৮৩ বল খেললেও উইকেটে কাটিয়েছেন ৫৭৫ মিনিট। ২৬টি চারের সঙ্গে ২টি ছয়ও দেখা যায় তার পাশে।
ঐ নতুনের কেতন উড়ে…
***

দক্ষিণাঞ্চলের কাণ্ডটা অদ্ভুত। ১১৪/৪ অবস্থায় ইনিংস ঘোষণা। মধ্যঞ্চলের প্রথম ইনিংসের তুলনায় তখনো ১২১ রানে পিছিয়ে তারা! বড় ব্যবধানে জিতে পয়েন্ট হস্তগত করার হিসেবনিকেশ মাথায় নিয়েই এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। তবে তা পরে বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে, কে জানত!
নাজমুল হোসেন শান্ত। শুরু থেকেই বিবেচিত বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ হিসেবে। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেভাবে রূপান্তর করতে না পারলেও বোদ্ধামহলে ধারণা, আজ হোক বা কাল, এই ছেলে রাজত্ব করবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।
দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই নাজেহাল মধ্যঞ্চল। ২১ রানে নেই ২ উইকেট। নাজমুল হোসেন শান্ত প্রথমে রকিবুলকে নিয়ে সামাল দিলেও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে মধ্যাঞ্চল। তবে একপাশ থেকে নামের মতো শান্ত, সুস্থির ও অবিচল থাকেন নাজমুল। যে উইকেটে অন্য ব্যাটসম্যানরা সংগ্রামে লিপ্ত, সেখানে আশ্চর্য সাবলীল তিনি, ১৫৩ বলে পেয়ে যান সেঞ্চুরি। দিনশেষে অপরাজিত থাকেন ১২২-এ। দলের স্কোর তখন ২০৯/৬।
পরের দিন লাঞ্চের পরপরই ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যান নাজমুল। মুস্তাফিজুর রহমান অনুর্ধ্ব-১৯ এর বন্ধু। তার সঙ্গে মাত্র ৭ দশমিক ২ ওভারে আধা ঘন্টারও কম সময়ে স্কোরবোর্ডে জমা দেন ৬৬ রান, যাতে মুস্তাফিজুরের অবদান ১৫ বলে ৩! তার আড়াইশো পেরোলে অধিনায়ক ইনিংস ঘোষণার সংকেত দেন। তখন ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংসটি তার নামের পাশে জ্বলছে তারকা চিহ্ন নিয়ে। ৩৯৬ মিনিট ও ৩১০ বল থেকে ২৫৩*; ২৫টি চারের সঙ্গে ৯টি ছয়।
***

সাইফ হাসানের অভিষেক বরিশালের হয়ে। অভিষেকেই তিন ঘন্টার অধ্যবসায়ে ৬৩ রানের ইনিংসে জানিয়ে দিয়েছিলেন, লম্বা দৌঁড়ের ঘোড়া হতে পারেন তিনি। বছর দুয়েক আগে সেই বরিশালের বিপক্ষে ঢাকার হয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করে প্রমাণ দিয়েছিলেন, সে সম্ভাবনা মিথ্যে নয়। সেবার ২০৪ রানের ইনিংসটা সাজিয়েছিলেন সোয়া ন’ঘন্টা সময় নিয়ে।
বছর দুয়েক পর জাতীয় লিগে রংপুরের বিপক্ষে আরো একটি ডাবল সেঞ্চুরিতে সে সম্ভাবনায় দিয়েছেন আরো জোরালো হাওয়া। ৩২৯ বলে ২২০ রানের ইনিংসটাতে চার মাত্র ১৯টি, ছয় মেরেছেন দুইটি। উইকেটে কাটিয়েছেন ৪৮৮ মিনিট। অথচ বয়স মোটে ২১ পেরিয়েছে তার!
***
জাকির হাসান আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। মিরাজ-শান্তদের সঙ্গে খেলেছেন অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে ক্রিকেট অনুরাগীদের নজরে আছেন তিনিও।
পূর্বাঞ্চলের হয়ে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে খুলনায় যে দ্বিশতকের মালিক বনে যান তিনি, উইকেট হয়তো অপেক্ষাকৃত সহজতর ছিল তা। গোটা চারদিনে সাড়ে তিনশো ওভারের কাছাকাছি খেলা হলেও উইকেট পড়েছে সাকুল্যে ১৬টি। প্রতি ২১ ওভারে একটি উইকেট, উইকেটপ্রতি রান উঠেছে ছিয়াশিরও বেশি। তারপরও কুড়ি বছরের এক ছোকরা তাসকিন-আবু হায়দার-মোশাররফদের সামলে ৩২০ বল থেকে করেছেন ২১১ রান, এবং উইকেটে প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টা কাটিয়েছেন; সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ইনিংসে ২৩টি চার থাকলেও ছিল না কোনো ছয়।
এবার পরিসমাপ্তি
ব্যাপ্তি ও কলেবর বিবেচনায় বেশ বড় হয়ে গেছে হয়তো। প্রত্যেকটা ইনিংস আলাদা আলোচনা, আলাদা আলেখ্য দাবি করে নিশ্চিতভাবেই। সেসবও অন্য কোনো সময় হবে হয়তো। আপাতত এক আলোচনায় বা এক আড্ডায় বেশ ক’টা ইনিংসের আলোকপাত করতে গিয়ে লেখার কলেবর বেড়ে গেছে। সেজন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে?
আশা করছি, পাঠক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই এই দীর্ঘ আলোচনা পাঠ করবেন। বিরক্তি পেলেও ভদ্রতা দেখিয়ে প্রকাশ করবেন না। এবং লেখককে (মামা বাড়ির আবদার আর কি!) উৎসাহিত করবেন আরো বিশাল ও আরো দীর্ঘ আলেখ্য অবতারণার জন্য।
আচ্ছা, রসিকতা থাক। তবে আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা, এরপর বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের আলোচনায় পাঠক কিঞ্চিৎ আগ্রহী হবেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অর্জনগুলো কেবল সেখানে পড়ে না থেকে কিছুটা হলেও ক্রিকেট পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হবে।