Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

কাউচসার্ফিং: কী, কেন ও কীভাবে?

বিশ্বব্যাপী একাকী ভ্রমণ ও কম খরচের ভ্রমণের ধারণা বদলে দিয়েছে যে ক’টি জনপ্রিয় মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট, সম্ভবত সেসবের মাঝে প্রথম পাঁচেই থাকবে কাউচসার্ফিং। কাউচসার্ফিং মূলত একটি বিনামূল্যে ভ্রমণ-আবাসন বিষয়ক প্লাটফর্ম। একাকী ভ্রমণকারী, কম খরচের ভ্রমণকারীরা এই মাধ্যমটি অনেক বেশি পরিমাণে ব্যবহার করে থাকেন, বিশেষত পশ্চিমা দেশের ভ্রমণকারীরা।

আপনি যদি একজন কম খরচের ভ্রমণকারী হন, নিয়মিত বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ান এবং কম খরচে থাকার জায়গা বা ফ্রি থাকার জায়গার সন্ধানে থাকেন, তবে আপনার জন্যই কাউচসার্ফিং। এই ওয়েবসাইটে একটি একাউন্ট এবং এর যথাযথ ব্যবহার আপনার ভ্রমণের ২৫-৩০% খরচ কমিয়ে আনতে পারে। আমাদের দেশে এখনও কাউচসার্ফিং অতটা জনপ্রিয় না হলেও আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ভেতর ভারতীয় এবং পাকিস্তানী ভ্রমণকারীরা এই মাধ্যমটি বেশ ব্যবহার করে থাকেন। আজ আমরা জানব কাউচসার্ফিংয়ের আদ্যোপান্ত ও ব্যবহারবিধি।

কাউচসার্ফিং ওয়েব ভিউ; Image Source: accessify.com

যেভাবে এলো কাউচসার্ফিং

এই ধারণাটি সর্বপ্রথম আনেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের কম্পিউটার প্রোগ্রামার কেসি ফেনটন। কেসির যখন ২১ বছর বয়স তখন তিনি বোস্টন থেকে আইসল্যান্ড ভ্রমণের একটি স্বল্পমূল্যের বিমান-টিকেট পান, কিন্তু তার আইসল্যান্ডে থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তিনি তখন ইউনিভার্সিটি অফ আইসল্যান্ডের ছাত্রদের ডাটাবেইজ হ্যাক করেন এবং ১,৫০০ ছাত্রকে বিনামূল্যে থাকার জায়গা দেওয়ার জন্য ই-মেইল করেন। প্রায় ১০০ জনের কাছ থেকে সাড়া পান তিনি, যারা তাকে বিনামূল্যে থাকার জায়গা দিতে রাজি হয়। তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেন এবং তার বাসায় থেকে আইসল্যান্ড ভ্রমণ শেষ করেন।

কেসি বোস্টনে ফেরার সময় বিমানে বসেই এই কাউচসার্ফিংয়ের ধারণাটি দাঁড়া করান। ১৯৯৯ সালের ১২ জুন তিনি এর ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন করে নেন। কাউচসার্ফিং ২০০৩ সালে একটি অলাভজনক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং couchsurfing.com নামে ২০০৪ সালে ওয়েবসাইট চালু করা হয়। বর্তমানে এই মাধ্যমটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১২ কোটি ভ্রমণকারী হোস্ট এবং সার্ফার উভয়ভাবেই ব্যবহার করে থাকে।

যেভাবে মেম্বার হবেন

couchsurfing.com-এ একটি একাউন্ট খুলুন। আর দশটা ওয়েবসাইটে একাউন্ট খোলার মতোই এটা। কাউচসার্ফিং-এ দুই ধরনের সদস্য আছে। ভেরিফায়েড আর নন-ভেরিফায়েড। ভেরিফায়েড একাউন্ট করতে গেলে আপনাকে ৬০ ডলার ফি প্রদান করতে হবে। ফি আপনি ক্রেডিট কার্ড বা ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড দিয়েও প্রদান করতে পারেন। এরপর ফোন ভেরিফিকেশন করে নিন। ন্যাশনাল আইডি কার্ড ভেরিফিকেশন ও হতে পারে। ভেরিফায়েড আইডি হলে আপনার হোস্ট এবং সার্ফার পেতে সুবিধা হবে। নন-ভেরিফায়েড আইডিতে কেউ হোস্ট করতে চায় না, সার্ফিংও করতে চায় না।

কাউচসার্ফিং কিন্তু পুরোটাই সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রমের ধারণার উপর তৈরি ওয়েবসাইট। আপনার ভেরিফিকেশনের এই ৬০ ডলার কাউচসার্ফিং পুরোটাই সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করে। আপনি যদি নিয়মিত একাকী ও কম খরচের ভ্রমণকারী হন তাহলে পরামর্শ রইল কাউচসার্ফিংয়ে একটি ভেরিফায়েড একাউন্ট করার। এই ৬০ ডলারের বিনিয়োগ একবারেই উঠে আসবে যদি কোনো হোস্টের বাসায় বিনামূল্যে থেকে কোনো দেশে এক সপ্তাহ ভ্রমণ করেন।

একাউন্ট খোলার পর হোস্ট হিসেবে আপনি একজন সার্ফারের জন্য কোন কোন সুবিধা দিতে পারবেন সেটা বিস্তারিত লিখুন। আপনার বাসায় হোস্ট করার ক্ষেত্রে পালনীয় কোনো বিধি-নিষেধ থাকলে সেটিও বিস্তারিত লিখুন। আপনার প্রোফাইলটি ভালোভাবে সাজান। আর আপনার যদি ভেরিফায়েড একাউন্ট করার মতো ৬০ ডলার দেওয়ার সামর্থ্যও না থাকে, তবে নন-ভেরিফায়েড একাউন্ট দিয়ে কয়েকজন সার্ফারকে হোস্ট করুন। আপনার পরিচিতি অন্যান্য কাউচসার্ফিং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আপনার সম্পর্কে কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স যোগ করুন। এভাবেও অনেকে ধীরে ধীরে কাউচসার্ফিং প্রোফাইল গড়ে তোলে, তবে ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ।

যেভাবে ব্যবহার করবেন

সব সময় চেষ্টা করবেন কাউচসার্ফিং ভেরিফায়েড হোস্টের বাসায় থাকার। ভ্রমণ তারিখের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে কাউচসার্ফিংয়ে হোস্ট চেয়ে অনুরোধ করুন। যারা আপনার অনুরোধ গ্রহণ করে আপনাকে মেসেজ দেবে তাদের প্রোফাইলগুলো ভালোভাবে ঘুরে দেখুন। তাদের প্রোফাইলে অন্যদের রেফারেন্সের মন্তব্যগুলো পড়ুন। সব সময় চেষ্টা করুন সবচেয়ে বেশি হোস্ট করেছে এমন হোস্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার।

আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাকে এবার মেসেজ দিন। ২/৪ দিন মেসেজ চালাচালি করে সম্পর্কটা একটু হালকা করে নিন। ভ্রমণের ঠিক ২/১ দিন আগে তাকে আবার মেসেজ দিন। তার বাসার ঠিকানা, ফোন নাম্বার এবং গুগল ম্যাপে অবস্থান ভালো করে জেনে ভ্রমণ করুন।

আপনি যদি হোস্ট হন তাহলে সার্ফারের প্রোফাইল ভালোভাবে দেখে নিন। তাকে আপনার বাসার ঠিকানা, ফোন নাম্বার এবং গুগল ম্যাপে অবস্থান ভালোভাবে বুঝিয়ে দিন। আর সার্ফার আপনার শহরে পৌঁছানোর সময়ে আপনি ফ্রি থাকলে আর নিজের কোনো যানবাহন থাকলে এবং সম্ভব হলে তাকে এয়ারপোর্ট, রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল থেকে নিয়ে আসুন এবং ভ্রমণ শেষে আবার পৌঁছে দিন। হোস্ট খোঁজার সময় চেষ্টা করুন শহরের মাঝামাঝি বা সিটি সেন্টারের আশেপাশে থাকে এমন হোস্ট নেওয়ার, তাহলে যাতায়াতে অনেক সুবিধা পাবেন। হোস্ট চেয়ে অনুরোধ করার সময় এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে দেবেন, তাহলে সিটি সেন্টারের আশেপাশের হোস্টরাই আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে।

যেভাবে কাজ করে কাউচসার্ফিং; Image Source: tripsavoy.com

করণীয়-বর্জনীয়

একজন হোস্ট বা সার্ফার হিসেবে আপনার কিছু মানবিক গুণাবলী থাকতেই হবে। আপনাকে হতে হবে বিনয়ী, ভ্রমণপিপাসু, গল্প বলিয়ে, পরিশ্রমী আর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। খুব দ্রুততম সময়ে একজন অপরিচিত মানুষের বন্ধু হওয়ার মতো গুণাবলী আপনার থাকতে হবে।

আপনি একজনের বাসায় গিয়েছেন, সেখানে গিয়ে কিছুদিনের জন্য হলেও তাদের পরিবারের একজন সদস্য হওয়ার চেষ্টা করুন। হোস্টের পরিবারের সবার সাথে বন্ধুর মতো মেলামেশার চেষ্টা করুন। বাসায় থাকার সময়ে পরিবারের একজন সদস্যের মতো তাদের পারিবারিক কাজকর্ম, রান্নাবান্না, খাওয়া, আড্ডা সবকিছুতে অংশ নিন, আপনার দেশের ভালো কোনো স্থানীয় খাবার রান্না করতে পারলে একদিন রান্না করে তাদের খাওয়ান। এতে পারিবারিক আড্ডাও হবে, স্থানীয় মানুষের জীবনাচার সম্পর্কে জানা হবে, পরিবেশটাও সুন্দর হবে।

হোস্টের পরিবারের সাথে নিজের ভ্রমণগল্প, পারিবারিক গল্প, দেশের গল্প, নিজ দেশের সাংস্কৃতিক তথ্য ইত্যাদি ভাগাভাগি করুন ও তাদেরটা জানতে চান। আপনি হোস্ট হলে এভাবেই সার্ফারকে আপনার পরিবারের একজন সদস্য বানিয়ে নিন। হোস্টের পরিবারের শিশুদের প্রতি বন্ধুসুলভ হোন। সম্ভব হলে প্রতিদিন ভ্রমণ করার পরে হোস্টের বাসায় ফেরার সময় বাচ্চাদের জন্য ছোটখাট চকলেট বা এই ধরনের উপহার  কিনে আনুন।

সার্ফার হিসেব সবসময় হোস্টের পারিবারিক আচার-সংস্কৃতি মেনে চলুন, আপনাকে দেওয়া থাকার স্থানটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্নভাবে গুছিয়ে রাখুন। ভ্রমণ শেষে ফেরার সময় যেমন পেয়েছিলেন সেভাবেই রেখে আসুন।

কাউচসার্ফিং সৌজন্যতা

আপনি যখনই কোনো একজন হোস্টের বাসায় যাবেন, তখনই বিষয়টা এমন নয় যে তার জন্য আপনাকে কিছু নিয়ে যেতে হবে। কাউচসার্ফিং একটি সামাজিক ও বিনামূল্যে আবাসন ধারণার উপরে তৈরি করা ভ্রমণ-সহায়ক ওয়েবসাইট এবং পুরোপুরি বিনামূল্যের কাজেই। এটা বাধ্যতামূলকও নয়। তবে আপনি একজন মানুষের বাসায় যাচ্ছেন, কিছুদিন থাকবেন, খাবেন, তিনি সময় পেলে আপনাকে নিয়ে তার শহরে ঘোরাবেন, এমনকি অনেক হোস্ট বিমানবন্দর, রেল স্টেশন বা বাস টার্মিনাল থেকে গেস্টকে নিয়ে আসা ও পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করে থাকেন, সেহেতু এই হোস্ট মানুষটির একজন সার্ফারের জন্য বেশ অর্থ-সময়-শ্রম ব্যয় হয়। এজন্য কাউচসার্ফিং সব সময়ই হোস্টের জন্য কিছু উপহার প্রদান করাটা সমর্থন করে, যদিও এটা বাধ্যতামূলক কিছু নয়। এই সৌজন্যতা আসলে হোস্ট-সার্ফারের জন্যই ভালো। এটা দুজনের সম্পর্ককে আরো সুন্দর করে দেয়।

এখন ভাবতে পারেন, উপহার হিসেবে কী নেবেন? আপনি যেটা করতে পারেন সেটা হলো আপনার দেশকে পরিচিত করে, আপনার দেশের পর্যটন খাতকে পরিচিত করে এমন কিছু উপহার হিসেবে নিন। যেমন, বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত টি-শার্ট। অনলাইনে এমন টি-শার্ট আজকাল ২৫০-৩০০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। উপহার হিসেবে আরো নিয়ে যেতে পারেন আপনার সংস্কৃতির কোনো শো-পিস, যেটা তার বসার ঘরের শোভাবর্ধন করবে। সুন্দর করে প্যাকেট করে নিয়ে হোস্টকে উপহার দিলে তিনি খুশি হবেন এবং এই উপহারটি তার বসার ঘরে রেখে দিলে এটা যেমন সারাজীবন তাদের নিকট আপনার স্মৃতি হয়ে থাকবে, তেমনই আপনার দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের ভিন্ন একটা দেশে পরিচিত করাবে।

এছাড়া আরো একটা কাজ করা যায়। নিজের নাম, ছবি ও যোগাযোগের তথ্য দিয়ে কাঠের উপর প্রিন্ট করে ছোট ছোট চাবির রিং বানিয়ে নিন। এই স্বল্পমূল্যের গিফটটি হোস্টের কাছে সারাজীবনের জন্য আপনার স্মৃতি ফেলে আসার মতো। এছাড়া যেন সে সারাজীবন আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে এটা তার একটা উপায় হতে পারে। ভিজিটিং কার্ড দিয়ে আসলে হয়তো সে একদিন ভুলে যাবে, কিন্তু এই চাবির রিং সে সারাজীবন ব্যবহার করলে আপনাকে রোজই মনে করবে, মাঝে মাঝে যোগাযোগ করবে। সারাজীবনের জন্য একজন বন্ধু বাড়বে। আপনি একজনের বাসায় থেকে-খেয়ে ভ্রমণে কয়েক হাজার টাকা সাশ্রয় করছেন, সেখানে কয়েকশ টাকা আপনার খরচ করা উচিত। কাউচসার্ফিং ব্যবহারে এই সৌজন্য দয়া করে মেনে চলুন।

নিতে পারেন এমন উপহার; Image Source: artistaexpert.com

সাবধানতা

কাউচসার্ফিং ব্যবহারে কি কোনো ঝুকিঁ নেই? প্রশ্নটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে মনে দানা বেঁধে উঠেছে। একেবারে নেই তা বলা যাবে না। আজ পর্যন্ত কাউচসার্ফিং ব্যবহার করে প্রতারণা, ছিনতাই, কিংবা ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে এমন ইতিহাস একেবারে কম। তবুও ব্যবহার করার আগে হোস্ট এবং সার্ফার উভয়ের প্রোফাইলের রেফারেন্সগুলা ভালোভাবে পড়ে ফেলুন। যেহেুতু ভ্রমণের আগে থেকেই টুকটাক অনলাইন আলাপ হয়ে যাবে, সুতরাং আপনি হোস্ট বা সার্ফার সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবেন। আর ভ্রমণের সময় আপনার কাছে ভ্রমণ স্থানের স্থানীয় পুলিশের নাম্বার রাখবেন।

সবশেষে, ভ্রমণ হোক নিজেকে জানার জন্য, সৃষ্টিকে জানার জন্য, বিশ্বকে জানার জন্য। ভ্রমণ হোক সুন্দর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। সঠিকভাবে কাউচসার্ফিংয়ের ব্যবহার আপনার ভ্রমণকে করবে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আনন্দদায়ক।

This is a Bengali article on Couchsurfing. References have been hyperlinked inside.

 

Related Articles