Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The business has since evolved into Obsidian, an integrated creative studio focused on delivering insight driven campaigns, brand work, and creative production for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Obsidian website, click here.

ব্র্যাডলি লাউরি: ক্যান্সারে ঝরে যাওয়া এক সংশপ্তকের গল্প

মৃত্যু এক অবধারিত অখন্ডনীয় সত্য। একে এড়ানোর যেমন উপায় নেই, তেমনি পথ নেই একে রুখে দেবারও। পারেনি সকলের প্রিয় ‘ব্র্যাডলি লাউরি’ও। ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর অবশেষে শেষনিদ্রায় চলে গেল এই ছোট্ট সুপারহিরো। কে এই ব্র্যাডলি লাউরি আর কেনই বা তাকে নিয়ে সরব বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো? কীভাবেই বা ফুটবলার জার্মেইন ডিফোর সাথে তার সখ্যতা? উত্তর থাকছে এখানে।

এক অসামান্য যোদ্ধা

ব্র্যাডলি লাউরি ছ’বছর বয়সী এক ফুটফুটে হাস্যোজ্বল মুখ যার শৈশবটা হয়তো হতে পারতো আর আট-দশটা সাধারণ শিশুদের মতো। কিন্তু ইংল্যান্ডের ডারহাম কাউন্টির ব্ল্যাকহল কলিরির এই শিশুটি দুর্লভ ধরণের ক্যান্সার ‘নিউরোব্লাস্টোমা’য় আক্রান্ত ছিল যা তার জন্মের ১৮ মাস পরই ধরা পড়ে। এরপর বছর দুয়েক ক্যান্সারের সাথে লড়ে বড় অস্ত্রোপচার এবং উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি নেবার পর তার অবস্থার উন্নতি হয়। একবার ক্যান্সারকে হারাবার পর ২০১৬ সালের জুলাই মাসে জানা যায় তার ক্যান্সারটি আবারো ফিরে এসেছে এবং একই বছরের ডিসেম্বরে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন- ক্যান্সারের সর্বশেষ প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে গেছে ছোট্ট ব্র্যাডলি, হাতে আছে মাত্র কয়েক মাস। তার ডিজনিল্যান্ডে গিয়ে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা বাতিল করে তাকে নিয়ে আসতে হয় হাসপাতালের বেডে। অবশেষে ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২০১৭ সালের ৭ই জুলাই চিরতরে ঘুমিয়ে যায় ছোট ‘সুপারহিরো’ ব্র্যাডলি।

ব্র্যাডলি লাউরি। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

ব্র্যাডলির এ অবস্থার কথা তার বাবা-মা প্রকাশ করার পরপরই চারিদিকে পরিচিত হয়ে ওঠে শিশুটি। শিশুটির দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তার বাবা-মা প্রচারণা চালিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে যান। হাসপাতালের বেডে শুয়েও তার মায়াকাড়া হাসির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন তারা। তারা ক্রিসমাসে ব্র্যাডলিকে ক্রিসমাস কার্ড পাঠানোর জন্য আহ্বান করলে প্রায় তিন লাখ পনের হাজার ক্রিসমাস কার্ড আসে তার জন্য, এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এর মতো দেশও বাদ যায়নি।

ভক্তদের পাঠানো ক্রিসমাস কার্ডের সাথে ব্র্যাডলি। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

ফুটবলে ব্র্যাডলির স্বীকৃতি এবং জার্মেইন ডিফো

ব্র্যাডলির প্রিয় ক্লাব সান্ডারল্যান্ড তাদের ম্যাসকট হিসেবে নির্বাচিত করে তাকে। তাদের অনেকগুলো ম্যাচে ম্যাসকট হিসেবে কাজ করে ব্র্যাডলি, পাশাপাশি ক্লাবটির স্ট্রাইকার জার্মেইন ডিফোর সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। ডিফোর মতে, দেখা হবার সময় ব্র্যাডলির হাসি এবং প্রাণশক্তি ডিফোর নজর কেড়েছিল। জার্মেইন ডিফোর সাথে প্রগাঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দরুন ব্র্যাডলি দর্শকমহলে আরো পরিচিতি পায়। সান্ডারল্যান্ডের ম্যাচগুলোতে ভক্তরা প্রায়শই তার নামোচ্চারণ করে এবং “Cancer has no colours” সূচক ব্যানার নিয়ে ব্র্যাডলিকে স্মরণ করে গেছে। সতীর্থ খেলোয়াড়দের সাথে নিয়ে ডিফো নিজে প্রায়ই হাসপাতালে এসে ব্র্যাডলির সাথে দেখা করতেন। ব্র্যাডলির চিকিৎসার জন্য দুই লাখ পাউন্ড দেয়া ক্লাব ‘এভারটন’ এর সাথে তার পিতামাতার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। এই সুবাদে এভারটনেরও ম্যাসকট হয় সে। এছাড়াও মার্সিসাইড ক্লাবটিরও ম্যাসকট ছিল ব্র্যাডলি।

জার্মেইন ডিফোর সঙ্গে ছোট্ট ব্র্যাডলি। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

ডিসেম্বরে ইংল্যান্ড দলের ম্যানেজার গ্যারেথ সাউথগেট এবং ম্যাচ অফ দ্য ডে বিশেষজ্ঞ গ্যারি লিনেকারের সাথে বার্মিংহামে ‘বিবিসি স্পোর্টস পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ার’ অনুষ্ঠানে দেখা হয় ব্র্যাডলির। সান্ডারল্যান্ডের সাথে চেলসির ম্যাচের ওয়ার্মআপ চলাকালীন সান্ডারল্যান্ডের পক্ষ থেকে তার পেনাল্টি থেকে করা গোলের জন্য সেই অনুষ্ঠানে ‘ডিসেম্বর গোল অফ দ্য মান্থ’ পুরষ্কার পায় সে।

বিবিসি স্পোর্টস পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ার অনুষ্ঠানে ব্র্যাডলি। ছবিসূত্র- bbc.com

ব্র্যাডলির ছোট্ট জীবনে এরপর আসে তার অন্যতম প্রিয় অধ্যায় যখন দেশটির ফুটবল সংস্থা লিথুয়ানিয়ার বিপক্ষে আসন্ন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচে ইংল্যান্ড দলের ম্যাসকট হিসেবে তাকে আহ্বান করে। ২৬শে মার্চ ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত হওয়া সেই ম্যাচটির জন্য দলে ডাক পান জার্মেইন ডিফোও। সেই ম্যাচে তিনি একটি গোলও করেন যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পালে বাতাস যোগায়। চার বছর পর পাওয়া তার এ গোলটি ছোট্ট ব্র্যাডলি স্টেডিয়ামে থেকে প্রত্যক্ষ করে।

ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড দলের মাস্কট হিসেবে ব্র্যাডলি। সঙ্গে রয়েছেন জার্মেইন ডিফো। ছবিসূত্র- YouTube.com

ম্যাচের আগে যখন ডিফো ব্র্যাডলির হাত ধরে মাঠে প্রবেশ করে হেঁটে যান, প্রায় ৭৮,০০০ দর্শকের হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। উত্‍ফুল্ল দর্শকের অভিবাদনের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে কানে হাত দিতে বাধ্য হয় ছোট্ট ব্র্যাডলি। পরে সে জানায়, “আজকের দিনটি আমার জন্য চমৎকার ছিল এবং আমি জার্মেইনকে কখনো ভুলবো না, কেননা আমি তাকে প্রচন্ড ভালবাসি।” এর ২৪ ঘণ্টা পরই ব্র্যাডলিকে হাসপাতালে ফিরে যেতে হয় উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তার আয়ু আরেকটু বাড়ানোর প্রচেষ্টায়।

এইনট্রি রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত ‘গ্র্যান্ড ন্যাশনাল’ এ ঘোড়ার জকি হিসেবে ব্র্যাডলি; ছবিসূত্র- bbci.co.uk

এপ্রিল মাসে এইনট্রি রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত ‘গ্র্যান্ড ন্যাশনাল’ রেসে তাকে সম্মানজনকভাবে ৪১তম অবস্থান দেয়া হয়। মে মাসে নিজের ৬ষ্ঠ জন্মদিনটি ব্র্যাডলি পালন করে স্থানীয় একটি ক্রিকেট মাঠের আনন্দমেলা এবং ফায়ার ইটারদের সাহচর্যে। তবে তার জন্মদিনের ঠিক আগের দিন ‘প্রাইড অফ নর্থ-ইস্ট অ্যাওয়ার্ডস’ (Pride of North East Awards) এ তাকে ‘চাইল্ড অফ কারেজ’ (Child of Courage) বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ সময় এখানে ডিফোসহ আরো ২৫০ জন শুভানুধ্যায়ী উপস্থিত ছিলেন।

বিদায় ছোট্ট সুপারহিরো!

ব্র্যাডলিকে ‘রয়্যাল ভিক্টোরিয়া ইনফার্মারি’তে ‘টিউমার শ্রিংকিং ট্রিটমেন্ট’ (Tumor-shrinking treatment) দেয়া হয়। মে মাসের ২৪ তারিখ ব্র্যাডলির মা মিসেস জেমা লাউরি জানান ব্র্যাডলি হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে ব্যথা প্রশমন চিকিৎসার (Palliative Care) জন্য আছে। তার শরীরে আরো টিউমার পাওয়া গেছে এবং আরো রেডিওথেরাপির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল তার জন্য। জুন মাসের ২৮ তারিখ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়:

ব্র্যাডলির অবস্থার ক্রমশ দ্রুত অবনতি ঘটছে, তার শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি, শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত এবং তার অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে।

টি-সেল ট্রিটমেন্ট এর পর ব্র্যাডলি ভাল বোধ করছিল। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

“কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে সজাগ থাকা ছাড়া সে বেশিরভাগ সময়েই ঘুমোচ্ছিল। আমরা জানতাম এমনটা ঘটতে চলেছে, কিন্তু আমরা ভাষাতীতভাবে মর্মাহত।” ১লা জুলাই ব্র্যাডলির পরিবার ডিফোর সাথে তোলা তার একটা ছবি পোস্ট করেন। সান্ডারল্যান্ড থেকে বর্নমাউথে বদলি কার্যক্রম শেষ করে ডিফো যখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্র্যাডলিকে দেখতেই ফিরে আসেন, তখন ছবিটি তোলা হয়। নিষ্পাপ ছোট্ট ব্র্যাডলি তখন বিছানায় শুয়ে বেড-পার্টির মাধ্যমে সকলকে বিদায় জানাচ্ছিল। জুলাই এর ৫ তারিখ এক ফেইসবুক পোস্টে জানা যায় ব্র্যাডলি মারা যাবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। মৃত্যুর আগের দিন তথা ৬ই জুলাই বৃহষ্পতিবার তার বাবা-মা জানান ব্র্যাডলি সাড়াহীন হয়ে পড়েছে। যদিও তখনো তাদের কথা সে শুনতে পারছিল। সেদিনই আগে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ব্র্যাডলির কথা জিজ্ঞাসা করা হলে কান্নায় ভেঙে পড়া জার্মেইন ডিফো বলেন, “তার শুধুমাত্র কয়েকদিন আছে, কিন্তু আমার সারাজীবন সে আমার হৃদয়ে থাকবে।” তিনি আরো বলেন:

এটা বেশ কঠিন, কেননা আমি এটা অনেকদিন ধরেই বয়ে চলেছি, তার এবং নিজের পরিবারের সামনে শক্ত হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি আসলেই ঠিক জানি না আমি যা অনুভব করছি তা কীভাবে ভাষায় প্রকাশ করা যায়। ব্র্যাডের সাথে সেই সম্পর্কটা একটা বিশেষ ক্ষণ হয়ে থাকবে। আমি প্রতিদিন পরিবারটির সাথে কথা বলি, কিছুদিন আগে আমি তাদের সাথে ছিলাম এবং তাকে ওভাবে কষ্ট পেতে দেখাটা কঠিন ছিল।” “আমি ভেবেছিলাম আমার বাবার সাথে যা হয়েছে তারপর আমি এটার জন্য তৈরি কিন্ত এই বয়সের একটা বাচ্চাকে অনেকদিন ধরে এর ভেতর দিয়ে যেতে দেখাটা কঠিন এবং সে এমন একটা অবস্থায় আছে যেখানে তাকে অবশ্যই লড়ে যেতে হচ্ছে।

ব্র্যাডলির শেষ দিনগুলোর সমসাময়িক এক সংবাদ সম্মেলনে ডিফো বলেন: “এমন একটি দিনও যায় না যেদিন আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার মোবাইল চেক করি না বা ছোট্ট ব্র্যাডলির কথা ভাবি না কেননা তার ভালবাসাটা খাঁটি এবং তার চোখে আমি সেটা দেখতে পাই। এটা বিশেষ কিছু। আমি আমার বাকি জীবন তাকে হৃদয়ে গেঁথে রাখবো।” মাঠে ব্র্যাডলির হাত ধরে প্রবেশ করাটা ডিফোর কাছে সেরা প্রিয় মুহূর্ত ছিল।

ব্র্যাডলির কথা জিজ্ঞেস করা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন জার্মেইন ডিফো। ছবিসূত্র- liverpoolecho.co.uk

২০১৭ সালের ৭ই জুলাই সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমায় ব্র্যাডলি লাউরি। তার মৃত্যুর খবর ফেইসবুক পেজে জানানো হয়। তার মা জেমা লেখেন তার ‘সাহসী ছেলে’ এবং ‘ছোট্ট সুপারহিরো’ এখন দেবদূতদের কাছে এবং “পরিবার পরিবেষ্টিত অবস্থায় মা-বাবার কোলে সে প্রাণত্যাগ করে।” তিনি আরো যোগ করেন: “সে ছিল আমাদের ছোট্ট সুপারহিরো এবং সবচেয়ে বড় লড়াইটাই লড়েছিল কিন্তু হয়তো অন্য কোথাও তার দরকারটা ছিল নিহিত। আমরা কতটা ব্যথিত তা প্রকাশ করার কোনো ভাষা নেই। “ভালমতো ঘুমোও আর দেবদূতদের সাথে ভেসে চল।”

ব্র্যাডলির মৃত্যুসংবাদ দিতে গিয়ে তার মার করা পোস্ট। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

ব্র্যাডলির মৃত্যুতে ফুটবলবিশ্ব

খবরটি পাবার পর ফুটবল বিশ্বের থেকে পাঠানো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাসিক্ত বার্তায় ছেয়ে ছেয়ে গেছে চতুর্দিক। সান্ডারল্যান্ড এএফসি তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ছেলেটিকে একটি প্রেরণা’ আখ্যা দিয়ে সম্মানিত করেছে যে কিনা “ক্লাবের সকলের মন ও হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে।” তাদের বিবৃতিতে আরো বলা হয়:

“আমাদের প্রার্থনা ও ভাবাবেগ ব্র্যাডলির পিতা-মাতা জেমা ও কার্ল, তার ভাই কিয়েরান এবং তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আছে। আমরা আমাদের ভালবাসা এবং সহযোগিতার হাত তাদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছি, এখন এবং সবসময়ের জন্য।” “ব্র্যাডলি তার অদম্য উদ্যম, প্রচন্ড সাহস এবং সুন্দর হাসির মাধ্যমে আমাদের ক্লাবের সকলের হৃদয় ও মন জয় করে নিয়েছে, যেগুলো এমনকি সবচেয়ে আঁধারঘন সময়েও আলো ফোটাতে সক্ষম। ব্র্যাডলির কাহিনী শুধু আমাদের ক্লাব এবং ক্লাবটির ভক্তদেরই ছুঁয়ে যায়নি বরং ছুঁয়েছে বৃহত্তর ফুটবলগোষ্ঠীকেও।”

ব্র্যাডলির মৃত্যুতে সান্ডারল্যান্ডের করা একটি পোস্ট। ছবিসূত্র- dailymail.co.uk

অফিশিয়াল ফিফা ডট কম একাউন্টে পোস্ট করা হয়: “আজ এই ফুটবল বিশ্ব তার সাহসীতম ভক্তদের একজনকে হারালো। শান্তিতে ঘুমিয়ে থাক ব্র্যাডলি লাউরি।” গ্যারি লিনেকারের মতে “প্রচন্ড দুঃখিত হলাম ব্র্যাডলি লাউরি চলে গেছে এটা শুনে। একজন যোদ্ধা এবং শেষপর্যন্ত থাকা অনুপ্রেরণা। শান্তিতে ঘুমাও ব্র্যাডলি।” আরেকজন গোল-কিংবদন্তী এলান শিয়ারের পোস্টে দেখা যায়: “ছোট্ট ব্র্যাডলির মৃত্যুতে অত্যন্ত দুঃখিত। একটি অনুপ্রেরণামূলক জীবন যার ব্যপ্তি খুব কম পড়ে গেল। তার চমৎকার পরিবার এবং বন্ধুদের জন্য শুভকামনা রইল। শান্তিতে ঘুমোও।” অফিশিয়াল ইংল্যান্ড ফুটবল টিম একাউন্ট থেকে টুইট করা হয়: “ব্র্যাডলি লাউরি একটিই ছিল।”

ইংল্যান্ড দলের আনুষ্ঠানিক একাউন্টে ব্র্যাডলিকে নিয়ে করা পোস্ট। ছবিসূত্র- dailymail.co.uk

এভারটনের চেয়ারম্যান বিল কেনরাইট বলেন: “আমরা সৌভাগ্যবান তার সাথে পরিচিত হতে পেরে… এবং সর্বদাই গর্ববোধ করবো সে আমাদের তার দ্বিতীয় ক্লাব হিসেবে বাছাই করেছিল বলে।” লিভারপুল এফসি এর টুইটে বলা হয়: “ব্র্যাডলি ছিল সকলের জন্য এক অনুপ্রেরণা।”

ব্র্যাডলি যখন এভারটনের মাস্কট। ছবিসূত্র- bbci.co.uk

গত মৌসুমে সান্ডারল্যান্ডে খেলা খেলোয়াড় জর্দান পিকফোর্ড তার ইনস্টাগ্রাম একাউন্টে পোস্ট করেন: “শান্তিতে ঘুমোও ব্র্যাডলি লাউরি, আমাদের জন্য এমনই এক অনুপ্রেরণা যা একটিই ছিল।” আর্সেনাল এবং ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট লাউরি পরিবারের প্রশংসা করে বলেন: “ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন, তোমরা তোমাদের ছেলের এই কষ্টের মধ্যেও রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা এনে মহত্‍ কাজ করেছ। সে যেন শান্তিনিদ্রায় শায়িত থাকে।” শ্রমিক নেতা জেরেমি করবিন টুইট করেন, “এটা শুনতে হৃদয়বিদারক যে ব্র্যাডলি লাউরি মারা গেছে। সান্ডারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মাস্কট থাকাকালীন তোলা ব্র্যাডলি ও ডিফোর ছবিগুলো আমি কখনোই ভুলব না।”

নিউরোব্লাস্টোমা: কীভাবে ব্র্যাডলি লড়ে যাচ্ছিল ক্যান্সারটির সঙ্গে?

নিউরোব্লাস্টোমা এক ধরণের ক্যান্সার যা শিশু ও ছোট বাচ্চাদের সাধারণত হয়ে থাকে। বিশেষ স্নায়ুকোষ নিউরোব্লাস্টে রোগটির উদ্ভব হয় যা মাতৃগর্ভে শিশুর বৃদ্ধির সময় থেকেই হয়ে থাকে। রোগের সূত্রপাত কিডনীর উপরে থাকা রোগীর এড্রেনাল গ্রন্থিতেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তবে ঘাড়, বুক, তলপেট বা পেলভিস দিয়ে যাওয়া স্নায়ুকলায়ও এর সূচনা হতে পারে। এই সাংঘাতিক অসুখটি এরপর অন্যান্য অঙ্গ যেমন- হাড়, অস্থিমজ্জা, লসিকা স্ফীতি এবং চামড়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাজ্যে বছরে প্রায় ১০০ শিশু নিউরোব্লাস্টোমায় আক্রান্ত হয়, যদিও রোগটির কারণ এখনো অজানা। রোগটির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ফুলে যাওয়া ব্যথাযুক্ত পেট, কখনো কখনো এর সাথে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মূত্রত্যাগে অসুবিধা হতে পারে।
  • অপর্যাপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং গিলতে সমস্যা হওয়া।
  • ঘাড়ে দলার সৃষ্টি হওয়া।
  • চামড়ায় নীলচে দলা এবং রক্তনালির আঘাতজনিত কালচে দাগ বিশেষ করে চোখের চারপাশে।
  • পায়ের দুর্বলতা এবং অস্বাভাবিক হাঁটাচলা, শরীরের নিম্নভাগ অনুভূতিশূন্য হয়ে যাওয়া।
  • ক্লান্তি, শক্তির অভাব, ফ্যাকাশে চামড়া, ক্ষুধামন্দা এবং ওজন হ্রাস পাওয়া।
  • হাড়ে ব্যথা, অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যাওয়া।
  • চোখ এবং মাংশপেশীর অস্বাভাবিক নড়াচড়া ও লাফানো।
  • একই পরিবারের একাধিক শিশুর মধ্যে নিউরোব্লাস্টোমা খুবই বিরল ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নিউরোব্লাস্টোমা কোনো বংশগত রোগ নয়।
  • হাড়ে ক্যান্সার ছড়িয়ে গেলে হাড় ও হাত-পায়ে ব্যথা এবং টিউমারের চাপে অন্যান্য অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
  • চোখের পেছনে ক্যান্সার চলে গেলে চোখ বড় হয়ে অক্ষিকোটরের বাইরে স্ফীত হতে পারে এবং চোখের নিচে কালি পড়বে।
  • কালচে চোখ, চোখের পাতার ঝুলে যাওয়া, সংকুচিত পিউপিল, দৃষ্টিজনিত অসুবিধা কিংবা আইরিশের রং পরিবর্তন।
  • বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং টানা কফ।
  • জ্বর এবং রক্তাল্পতা (রক্তের লোহিত কণিকা কম থাকায়)।
  • টিউমার নিঃসৃত হরমোনের কারণে ক্রমাগত ডায়রিয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ।
  • স্নায়ুরজ্জুতে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা পায়ের প্যারালাইসিস।

কী হয় নিউরোব্লাস্টোমা হলে? ছবিসূত্র- clinicalgate.com

যখন প্রথমবারের মতো ক্যান্সার আঘাত হানে তখন ব্র্যাডলির এত বড় টিউমার হয়েছিল যা তার কিছু মুখ্য অঙ্গ এবং ধমনীতে চাপ ফেলছিল। এটা তার বুক, ফুসফুস, লসিকাগ্রন্থি, হাড় এবং অস্থিমজ্জায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু একটি বড় অস্ত্রোপচার এবং উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপির পর সে ঠিক হয় এবং উন্নতির দিকে যেতে থাকে। কিন্তু ২০১৬ এর ডিসেম্বরে জানা যায় তার ক্যান্সারটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ২০১৭ এর ১০ই মে ব্র্যাডলির মা জেমা জানান একটি এমআরআই স্ক্যানে ধরা পড়ে কীভাবে তার অবস্থা অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে। তিনি বলেন “অবস্থার খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।” ঘাড়ে নতুন টিউমার পাওয়া যাওয়ায় তার ডিজনিল্যান্ড ভ্রমণ বাতিল করতে হয়।

তার ক্যান্সার দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং ফুসফুসেও টিউমার ধরা পড়ায় তাকে ‘Palliative Care’ (ব্যথার কারণ অনুসন্ধান বা চিকিৎসা না করে ব্যথানাশের চিকিৎসা) নিতে হচ্ছিল। তার মা জেমা ফেইসবুকে লেখেন: “আমি আপনাদের এটুকু দেখাতে চাই যে প্রচন্ড কষ্ট এবং কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সে এখনো সবচেয়ে সুন্দর হাসিটি দিতে পারে। আমার হিরো।” জুন মাসে তার বড় ভাইয়ের সাথে তোলা ব্র্যাডলির একটি ছবি পোস্ট করে তার মা জানান অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সে মাসেরই শেষে জানা যায় ব্র্যাডলির হাতে মাত্র কয়েকদিন আছে এবং তাই সে একটি ‘বেড-পার্টি’র মাধ্যমে প্রিয়জনদের বিদায় জানায়। এরপর জার্মেইন ডিফোর সাথে তার ছবিটি তোলা হয়। জুলাইয়ের ৫ তারিখে তার মুমূর্ষু দশার কথা এবং ৬ তারিখ তার অসাড় হয়ে যাবার খবর জানা যায়। এরপর ০৭/০৭/২০১৭ তারিখে স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩৫ এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় মিষ্টি ছোট্ট ব্র্যাডলি!

ডিফোর সাথে বিছানায় তোলা সেই ছবিটি। ছবিসূত্র- mirror.co.uk

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো নীলরঙা হৃদয়াকৃতির ইমোজি দিয়ে ভরে যায় যা ব্র্যাডলির চলে যাবার খবরে দুঃখ প্রকাশ ও তার পাশে থাকার প্রতীক। নিউরোব্লাস্টোমা ইউকে এর সভাপতি ডক্টর গাই ব্ল্যাঙ্কার্ড বলেন: “নিউরোব্লাস্টোমা সংস্থাটির সকলেই ব্র্যাডলির মৃত্যুর কথা শুনলে ব্যথিত হবে। ব্র্যাডলির ঘটনাটি এমন একটি রোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতার সৃষ্টি করেছে যা ক্যান্সারে মারা যাওয়া প্রতি ছয়জন শিশুর একজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী।” “নিউরোব্লাস্টোমা রোগনির্ণয় ও এর চিকিৎসা উন্নয়নের জন্য নিউরোব্লাস্টোমা ইউকের অর্থায়নে বিশ্বমানের গবেষণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে আমরা নিউরোব্লাস্টোমা সারিয়ে তোলার উপায় খুঁজে বের করব।” ফেব্রুয়ারী মাসে টাইন টিস টিভির এক সাক্ষাৎকারে ব্র্যাডলির মা জেমা বলেছিলেন: “আমি মনে করি ব্র্যাডলির এই পৃথিবীতে খুব কম সময়ই বরাদ্দ ছিল। সে তার জীবনে এমন কিছু করেছে যা ৮০ বা ৯০ বছর বয়স্কদের অধিকাংশের থেকে বেশি। সে এত মানুষের মন ছুঁয়েছে এবং এমন বড় কিছু রেখে যাচ্ছে যেটা আমাদের সামনের পথচলায় এক বিশাল স্বস্তি হিসেবে কাজ করবে।”

বাবা-মার সঙ্গে ব্র্যাডলি। ছবিসূত্র- thesun.co.uk

তার ভালবাসার ক্লাব সান্ডারল্যান্ডও তাকে ভোলেনি। শুক্রবারে এফসি বুরির সাথে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ব্র্যাডলিকে উত্‍সর্গ করে ও সম্মান জানিয়ে এক মিনিটব্যাপী অভিবাদন জানানো হয়।

ব্র্যাডলির সম্মানে এক মিনিটব্যাপী করতালির মাধ্যমে অভিবাদন। ছবিসূত্র- dailymail.co.uk

৩০শে জুন প্রকাশ পাওয়া ব্র্যাডলিকে নিয়ে ‘লিভ এন জি’ এর বানানো গান ‘স্মাইল ফর ব্র্যাডলি’ একক গানের চার্টে ২৮ নম্বরে উঠে এসেছে। ব্র্যাডলির চিকিৎসার জন্য পাওয়া টাকা থেকে যা অবশিষ্ট রয়ে গেছে এবং এই গানটি থেকে যে অর্থ অর্জিত হবে তার পুরোটাই ব্র্যাডলির সম্মানে সংগঠিত ‘ব্র্যাডলি লাউরি ফাউন্ডেশন’ এ দেয়া হবে যা ব্র্যাডলির মতো রোগাক্রান্ত শিশুদের সহায়তার্থে নির্মিত। খুদে ব্র্যাডলি লাউরি যে কষ্ট ও লড়াই করে গেছে যা সত্যিই এক অনুপ্রেরণার নাম। ক্যান্সারের সাথে শেষ পর্যন্ত না জিততে পারলেও কঠিন জীবন ও বেদনাময় সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই খুদে জাদুকরের মুখের হাসি চির অম্লান হয়ে থাকবে সকলের হৃদয়ে। শান্তিতে ঘুমোও ছোট্ট লড়াকু বীর।

ব্র্যাডলি লাউরি।
ছবিসূত্র- foottheball.com

ফিচার ইমেজ: thesun.co.uk

Related Articles