চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) বা ‘ড্রোন’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের বিরুদ্ধে বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ড্রোন ব্যবহার করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আনম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল (ইউসিএভি), আনম্যানড সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড রিকনিস্যান্স এরিয়াল ভেহিকল এবং কামিকাজি/আত্মঘাতী ড্রোন। সম্প্রতি রুশদের দ্বারা ব্যবহৃত কামিকাজি ড্রোনগুলো (বিশেষত ইরানি–নির্মিত শাহেদ–১৩৬/গেরান–২) ইউক্রেনীয়দের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে এবং এজন্য এই জাতীয় ড্রোনগুলো অতি আলোচিত বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
‘কামিকাজি’ একটি জাপানি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে ‘পবিত্র বায়ু’। ১২৭৪ ও ১২৮১ সালে চীনকেন্দ্রিক মোঙ্গল–শাসিত ‘ইখ ইউয়ান উলস’ বা ‘মহান ইউয়ান রাষ্ট্র’ জাপানের ওপর আক্রমণ চালায়, কিন্তু প্রতিবারই ইউয়ান নৌবহর টাইফুনের কারণে পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। জাপানিরা এই টাইফুনকে ‘কামিকাজি’ হিসেবে অভিহিত করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে জাপানি বৈমানিকরা মিত্রশক্তির যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নিজেদের যুদ্ধবিমান নিয়ে সেগুলোর ওপর আত্মঘাতী আক্রমণ চালাতো। এই ধরনের আক্রমণকে ‘কামিকাজি’ আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানি কামিকাজি আক্রমণের ফলে মিত্রশক্তির অন্তত ৭,০০০ নৌসেনা নিহত হয়।
কামিকাজি ড্রোনগুলোয় বিস্ফোরক বা ওয়ারহেড অঙ্গীভূত থাকে। এগুলো অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্যবস্তুর ওপরে অবস্থান করতে পারে এবং অপারেটরের কাছ থেকে নির্দেশনা লাভের পর বা অভ্যন্তরীণ অ্যালগরিদম অনুসারে লক্ষ্যবস্তুর ওপর ক্ষিপ্রগতিতে আক্রমণ চালাতে পারে। কামিকাজি ড্রোনগুলো লক্ষ্যবস্তুর সংস্পর্শে আসার পর বিস্ফোরিত হয় এবং লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ, একটি কামিকাজি ড্রোন কেবল একবারই ব্যবহার করা সম্ভব। বস্তুত একটি কামিকাজি ড্রোনকে একটি ড্রোন ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকের সংমিশ্রণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কামিকাজি ড্রোনগুলো সাধারণত সস্তা, সহজে উৎপাদনযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কার্যকরী।
রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করছে। রুশরা প্রধানত নিজেদের তৈরি ও ইরান কর্তৃক সরবরাহকৃত কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয়রা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহকৃত এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের তৈরি কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করছে। বিগত সেপ্টেম্বর থেকে রুশরা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বিশেষ সাফল্যের সঙ্গে ইরানি–নির্মিত ‘শাহেদ–১৩৬’ কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করছে এবং এর ফলে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে কামিকাজি ড্রোনের ব্যবহারের বিষয়টি প্রচারমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধে রুশ ও ইউক্রেনীয়দের দ্বারা ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য কামিকাজি ড্রোনগুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
ইউক্রেনীয়দের দ্বারা ব্যবহৃত কামিকাজি ড্রোন
(১) সুইচব্লেড–৩০০/সুইচব্লেড–৬০০
‘সুইচব্লেড–৩০০’ ও ‘সুইচব্লেড–৬০০’ মার্কিন ড্রোন নির্মাণকারী কোম্পানি ‘অ্যারোভায়রনমেন্ট’ কর্তৃক নির্মিত কামিকাজি ড্রোন। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর সুইচব্লেড–৩০০ ড্রোনটির ভর ২.৫ কিলোগ্রাম, দৈর্ঘ্য ৪৯.৫ সেন্টিমিটার, ব্যাস ৭৬ মিলিমিটার এবং পাল্লা ১০ কিলোমিটার। অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর সুইচব্লেড–৬০০ ড্রোনটির ওজন ভর ৫৪.৪ কিলোগ্রাম, দৈর্ঘ্য ১৩০ সেন্টিমিটার, ব্যাস ১৫০ মিলিমিটার এবং পাল্লা ৪০ কিলোমিটার। সুইচব্লেড–৬০০ কার্যত সুইচব্লেড–৩০০ ড্রোনের একটি বৃহত্তর অ্যান্টি–আর্মার সংস্করণ।
রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অন্তত ১,০০০টি সুইচব্লেড–৩০০ ও সুইচব্লেড–৬০০ কামিকাজি ড্রোন সরবরাহ করেছে। অবশ্য সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এগুলোর মধ্যে সুইচব্লেড–৬০০ ড্রোনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র উক্ত ড্রোনগুলো ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনীয় সৈন্যদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে ইউক্রেনীয়রা খারকভ/খারকিভ প্রদেশে প্রথম বারের মতো রুশদের বিরুদ্ধে সুইচব্লেড–৩০০ ড্রোন ব্যবহার করে। এরপর থেকে তারা ব্যাপকভাবে রুশদের বিরুদ্ধে সুইচব্লেড ড্রোন ব্যবহার করেছে। যখন ইউক্রেনকে এই ড্রোনগুলো সরবরাহ করা হয়েছিল, তখন ইউক্রেন–সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দাবি করেছিল যে, এই ড্রোনগুলো রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে এবং রুশদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করবে।
কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলো রুশদের বিরুদ্ধে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ইউক্রেনীয়রা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় এবং রুশ সামরিক সরঞ্জামের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের আক্রমণগুলোর ভিডিও ফুটেজ তারা প্রায়ই ইন্টারনেটে প্রকাশ করে। কিন্তু তারা সুইচব্লেড–৩০০/সুইচব্লেড–৬০০ ড্রোন কর্তৃক রুশ সরঞ্জাম ধ্বংসের ভিডিও ফুটেজ খুব কমই প্রকাশ করেছে। কার্যত তারা উক্ত ড্রোন কর্তৃক পরিচালিত যেসব আক্রমণের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে, সেগুলোর কোনোটিতেই রুশদের বিশেষ কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
২৭ জুলাই ইউক্রেনীয়রা সুইচব্লেড–৩০০ ড্রোনের সাহায্যে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক প্রদেশের ত্রোয়েবর্তনোয়ে ক্রসিংয়ে (ইউক্রেনীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে) একটি মোটরগাড়ির ওপর আক্রমণ চালায়। ইউক্রেনীয়রা দাবি করে যে, গাড়িটিতে রুশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফএসবি’র সদস্যরা অবস্থান করছিল। কিন্তু কার্যত গাড়িটিতে অবস্থানরত ব্যক্তিরা ছিল মলদোভার নাগরিক এবং উক্ত আক্রমণের ফলে তাদের একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল ইউক্রেন কর্তৃক মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনার প্রথম ঘটনা।
(২) ফিনিক্স ঘোস্ট
‘ফিনিক্স ঘোস্ট’ মার্কিন অস্ত্র নির্মাণকারী কোম্পানি ‘এইভেক্স অ্যারোস্পেস’ কর্তৃক নির্মিত একটি কামিকাজি ড্রোন। এটির বৈশিষ্ট্য বহুলাংশে সুইচব্লেড–৩০০ ড্রোনের অনুরূপ। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর আগে এই ড্রোনটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশিত হয়নি। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে ১২০টি ফিনিক্স ঘোস্ট ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং পরবর্তীতে আরো ৫৮০টি ফিনিক্স ঘোস্ট ড্রোন সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অবশ্য প্রতিশ্রুত ড্রোনগুলো এখনো ইউক্রেনে পৌঁছেছে কিনা, সেটি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ফিনিক্স ঘোস্ট ড্রোনগুলো ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনীয় সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সুইচব্লেড ড্রোনগুলোর মতো ফিনিক্স ঘোস্ট ড্রোনগুলো নিয়েও ইউক্রেন–সমর্থকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ–উদ্দীপনা ছিল। যুদ্ধের প্রথম পর্যায় থেকেই ইউক্রেনীয়রা রুশদের বিরুদ্ধে উক্ত ড্রোনগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, এই কামিকাজি ড্রোনগুলোও রুশদের বিরুদ্ধে তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ইউক্রেনীয়রা এখন পর্যন্ত ফিনিক্স ঘোস্ট ড্রোন কর্তৃক রুশ সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেনি বললেই চলে।
(৩) ওয়ারমেট
‘ওয়ারমেট’ পোলিশ অস্ত্র নির্মাণকারী কোম্পানি ‘ডব্লিউবি ইলেক্ট্রনিক্স’ কর্তৃক নির্মিত একটি কামিকাজি ড্রোন। ড্রোনটির ভর ৪ কিলোগ্রাম, দৈর্ঘ্য ১.১ মিটার এবং পাল্লা ৩০ কিলোমিটার। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধের আগে থেকেই ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনী উক্ত ড্রোনগুলো ব্যবহার করছিল। যুদ্ধ শুরুর পর পোল্যান্ড উক্ত ড্রোনটির নতুন সংস্করণ ইউক্রেনকে সরবরাহ করে। অবশ্য পোল্যান্ড এখন পর্যন্ত মোট কয়টি ওয়ারমেট ড্রোন ইউক্রেনকে সরবরাহ করেছে, সেটি স্পষ্ট নয়। পোলিশ সরকারের পাশাপাশি পোলিশ জনসাধারণও ইউক্রেনকে উক্ত ড্রোন সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ করেছে।
যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ইউক্রেনীয়রা উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলো রুশদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। বিশেষত বিগত এপ্রিল ও জুলাইয়ে ইউক্রেনীয়রা ওয়ারমেট ড্রোন ব্যবহার করে জাপোরোঝিয়ে প্রদেশের এনেরগোদার শহরে অবস্থিত জাপোরোঝিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। উক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই এটি রুশ নিয়ন্ত্রণাধীনে রয়েছে। ইউক্রেনীয়দের ভাষ্য অনুসারে, তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ওপর নয়, বরং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আশেপাশে মোতায়েনকৃত রুশ সৈন্যদের ওপর ওয়ারমেট ড্রোন ব্যবহার করে আক্রমণ চালিয়েছিল। ২০ জুলাইয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ওপর ওয়ারমেট ড্রোন কর্তৃক পরিচালিত আক্রমণের ফলে একটি রুশ ‘বিএম–২১ গ্রাদ’ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম (এমএলআরএস) ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কতিপয় রুশ সৈন্য হতাহত হয়।
অবশ্য এই দুইটি ঘটনার বাইরে ওয়ারমেট ড্রোন কর্তৃক রুশ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অর্জিত সাফল্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। এখন পর্যন্ত ইউক্রেনীয়রা ওয়ারমেট ড্রোন কর্তৃক রুশ সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের খুব কম সংখ্যক ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে। সুতরাং এই কামিকাজি ড্রোনটিকেও যুদ্ধের ‘মোড় পরিবর্তনকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।
রুশদের দ্বারা ব্যবহৃত কামিকাজি ড্রোন
(১) কুব
‘কুব’ রুশ ড্রোন নির্মাণকারী কোম্পানি ‘জালা অ্যারো গ্রুপ’ কর্তৃক নির্মিত একটি কামিকাজি ড্রোন। ড্রোনটি ৩ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে, ৩০ মিনিট আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় থাকতে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর আগে রুশরা সিরিয়ার ইদলিবে অবস্থানরত মিলিট্যান্টদের বিরুদ্ধে কুব ড্রোনটি সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছিল। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর রুশরা উক্ত কামিকাজি ড্রোন ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, কিন্তু এটি ব্যবহারের মাত্রা কতটা ব্যাপক, সেটি স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, ইউক্রেনীয়দের তুলনায় রুশরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কম সক্রিয় এবং তারা ইউক্রেনীয় সামরিক সরঞ্জামের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের আক্রমণগুলোর ভিডিও ফুটেজ খুব কমই প্রকাশ করে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমতি ব্যতিরেকে যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করার বিষয়ে রুশ সৈন্যদেরকে সতর্ক করেছে এবং এর ফলে রুশদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের খুব কম সংখ্যক ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়। তদুপরি, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো অতোটা নিপুণ নয়।
অবশ্য তা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুব ড্রোন কর্তৃক ইউক্রেনীয় সরঞ্জামের ওপর পরিচালিত আক্রমণের কিছু ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে। মে মাসে প্রকাশিত এরকম একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে, কুব ড্রোন ইউক্রেনীয় সৈন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি ব্রিটিশ–নির্মিত ‘এম৭৭৭’ আর্টিলারি পিসের ওপর আক্রমণ চালায়, কিন্তু সেটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। এটি ব্যতীত কুব ড্রোন কর্তৃক ইউক্রেনীয় সৈন্য ও সরঞ্জাম ধ্বংসের বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
(২) লান্তসেৎ–১/লান্তসেৎ–৩
‘লান্তসেৎ–১’ ও ‘লান্তসেৎ–৩’ রুশ ড্রোন নির্মাণকারী কোম্পানি ‘জালা অ্যারো গ্রুপ’ কর্তৃক নির্মিত কামিকাজি ড্রোন। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর লান্তসেৎ–১ ড্রোনটি ১ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক বহন করতে এবং অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর লান্তসেৎ–৩ ড্রোনটি ৩ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। ড্রোনগুলোর পাল্লা পরিস্থিতি মোতাবেক ৪০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এগুলো মূলত একই কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত ‘কুব’ কামিকাজি ড্রোনেরই উন্নততর সংস্করণ।
রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর রুশরা লান্তসেৎ–১ ও লান্তসেৎ–৩ ড্রোনগুলোকে ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে ব্যবহার করছে এবং উক্ত ড্রোনগুলো ইউক্রেনীয়দের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। লান্তসেৎ ড্রোনের সাহায্যে রুশরা ইউক্রেনীয়দের যেসব সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: ট্রাক, মার্কিন–নির্মিত ‘এম১০৯এ৩’ সেল্ফ–প্রোপেল্ড হাউইটজার, তুর্কি–নির্মিত ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ ড্রোনের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন, ‘টি–৬৪ বিভি’ ট্যাঙ্ক, ‘বিএমপি’ ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল, ‘৯কে৩৭এম১ বুক–এম১’, ‘৯কে৩৩ ওসা’ ও ‘এস–৩০০পিএস’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ‘৩৫ডি৬এম’, ‘৩৬ডি৬’ ও ‘পি–১৮’ এয়ার সার্ভেইল্যান্স রাডার। তদুপরি, ইউক্রেনীয় সৈন্যদের অবস্থানের ওপর আক্রমণ পরিচালনার উদ্দেশ্যেও রুশরা উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলোকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করছে।
সামগ্রিকভাবে, এই যুদ্ধে লান্তসেৎ ড্রোন রুশদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, যুদ্ধ শুরুর আগে রুশরা উক্ত ড্রোনগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করেনি। এর ফলে যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লান্তসেৎ ড্রোনগুলোর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু জুলাই থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লান্তসেৎ–১/লান্তসেৎ–৩ ড্রোনগুলো কর্তৃক ইউক্রেনীয় সরঞ্জাম ধ্বংসের বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে এবং এর থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে, রুশরা উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলোর উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করেছে।
(৩) শাহেদ–১৩৬/গেরান–২
‘শাহেদ–১৩৬’ ইরানি বিমান নির্মাণকারী কোম্পানি ‘ইরান এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন’ কর্তৃক নির্মিত একটি কামিকাজি ড্রোন। ড্রোনটির ভর ২০০ কিলোগ্রাম, দৈর্ঘ্য ৩.৫ মিটার এবং পাল্লা ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার। ড্রোনটি ৫০ থেকে ৬০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। ইয়েমেনি গৃহযুদ্ধে ইরানি–সমর্থিত ‘আনসার আল্লাহ’ (‘হুতি’) সৈন্যরা উক্ত ড্রোনটি ব্যবহার করছে। ধারণা করা হয়, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানিরা/ইরানি–সমর্থিত ইয়েমেনিরা উক্ত কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের তেলসংক্রান্ত অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। উল্লেখ্য, উক্ত আক্রমণের ফলে সৌদি আরবের তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা সাময়িকভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে রুশদের কমব্যাট ড্রোন সক্ষমতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় রুশরা নিজস্ব কামিকাজি ড্রোন উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং ইরানের কাছ থেকে ড্রোন সংগ্রহ করতে শুরু করে। ইরান রাশিয়াকে বিভিন্ন মডেলের ড্রোন (মোহাজের–৬, শাহেদ–১২৯, শাহেদ–১৩৬ প্রভৃতি) সরবরাহ করেছে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচারণা লাভ করেছে শাহেদ–১৩৬ ড্রোন। রুশরা উক্ত ড্রোনটিকে ‘গেরান–২’ নামকরণ করেছে। বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্যমতে, ইরানি ড্রোন বিশেষজ্ঞরা ইরানে ও রাশিয়ার ক্রিমিয়ায় ইরানি–নির্মিত ড্রোনগুলো ব্যবহারের জন্য রুশ ড্রোন অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিছু কিছু সূত্রের ভাষ্য অনুসারে, রাশিয়া নিজেও গেরান–২ ড্রোন উৎপাদন করতে শুরু করেছে।
বিগত সেপ্টেম্বরে প্রথম বারের মতো রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের বিরুদ্ধে শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। খারকভ/খারকিভ প্রদেশে মোতায়েনকৃত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ৯২তম মেকানাইজড ব্রিগেডের আর্টিলারি কমান্ডার কর্নেল রোদিয়োন কোলাগিন প্রচারমাধ্যমকে জানান যে, রুশরা শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোন ব্যবহার করে তার ইউনিটের দুইটি আর্মার্ড ভেহিকল, চারটি সেল্ফ–প্রোপেল্ড হাউইটজার ও একটি ব্রিটিশ–নির্মিত এম৭৭৭ আর্টিলারি পিস ধ্বংস করেছে। এরপর থেকে রুশরা উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলোকে ব্যাপক হারে ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোনের সাহায্যে রুশরা ইউক্রেনীয়দের যেসব সামরিক সরঞ্জাম ও লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘২এস৩ আক্তাসিয়া’ ও ‘২এস৭ পিয়োন’ সেল্ফ–প্রোপেল্ড গান, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশনাল কমান্ড সাউথ’–এর সদর দপ্তর, ইউক্রেনীয় সামরিক ঘাঁটি ও ব্যারাক, গোলাবারুদের ডিপো, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি টাগবোট। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের অবস্থান ধ্বংস করার জন্যেও রুশরা উক্ত কামিকাজি ড্রোনগুলো ব্যবহার করছে।
ইউক্রেনীয়দের জন্য শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোনগুলোর আক্রমণ প্রতিহত করা বেশ কঠিন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি একটি শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোনকে ভূপাতিত করতে গিয়ে একটি ইউক্রেনীয় মিগ–২৯ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে এবং এটি কোনো ড্রোন কর্তৃক কোনো যুদ্ধবিমান ধ্বংসের প্রথম ঘটনা। উক্ত কামিকাজি ড্রোনটি অত্যন্ত কার্যকরী, তুলনামূলকভাবে বেশ সস্তা এবং দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। এজন্য রুশরা বিভিন্ন ইউক্রেনীয় লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে উক্ত ড্রোনগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, একটি শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোনের মূল্য প্রায় ২০,০০০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, একটি মার্কিন–নির্মিত ‘এমকিউ–৯ রিপার’ ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার এবং একটি তুর্কি–নির্মিত বায়রাক্তার টিবি–২ ড্রোনের মূল্য প্রায় ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, একটি এমকিউ–৯ রিপার ড্রোনের মূল্য দিয়ে ১,৬০০টি এবং একটি বায়রাক্তার টিবি–২ ড্রোনের মূল্য দিয়ে ২৫০টি শাহেদ–১৩৬/গেরান–২ ড্রোন ক্রয় করা সম্ভব।
পরিশিষ্ট
রাশিয়া ও ইউক্রেন কর্তৃক কামিকাজি ড্রোনের ব্যবহার রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে একটি বিশেষ দিক সংযোজিত করেছে। সামগ্রিকভাবে, এখন পর্যন্ত ইউক্রেনীয়দের দ্বারা ব্যবহৃত মার্কিন–নির্মিত ও পোলিশ–নির্মিত কামিকাজি ড্রোনগুলোর তুলনায় রুশদের দ্বারা ব্যবহৃত তাদের নিজেদের তৈরি ও ইরানি–নির্মিত কামিকাজি ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে অধিক সংখ্যক ‘সুইচব্লেড–৬০০’ কামিকাজি ড্রোন ও ইসরায়েল ইউক্রেনকে ‘হারোপ’ কামিকাজি ড্রোন সরবরাহ করতে পারে। অনুরূপভাবে, ইরান রাশিয়াকে অধিকতর কার্যকরী ‘আরাশ–২’ কামিকাজি ড্রোন সরবরাহ করতে পারে। সুতরাং ভবিষ্যতে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে আরো নতুন নতুন কামিকাজি ড্রোনের কার্যকারিতা দেখা যেতে পারে।