Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The business has since evolved into Obsidian, an integrated creative studio focused on delivering insight driven campaigns, brand work, and creative production for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Obsidian website, click here.

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা: আর্জেন্টিনার শেষ শিরোপা সম্রাট, প্রিয় বাতিগোল

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আর্জেন্টিনার এক পেশাদার ফুটবলার, ভক্ত সমর্থকদের কাছে যিনি বাতিগোল নামেই বেশি পরিচিত। এই তো গত বছর তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মেসির কাছে পিছিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনার মতো দলের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গোলদাতা ছিলেন তিনি। এখনও বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে গোলের হ্যাটট্রিক রয়েছে তার, যে কৃতিত্ব আর কারো নেই। এখন যে আর্জেন্টিনা প্রায় ২৪ বছর ধরে সিনিয়র ন্যাশনাল টিমে আন্তর্জাতিক শিরোপাহীন, সেই আর্জেন্টিনাকে মাত্র ২ বছরের মাঝে ৪টি আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতিয়েছিলেন এই বাতিস্তুতা। যে কারণে ভক্তদের হৃদয়ের মনিকোঠায় তার নাম হয়ে থাকবে চির স্মরণীয়। আজ আমরা সেই গোল মেশিন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার খেলোয়াড়ি জীবন নিয়েই জানবো।

প্রিয় বাতিগোল; Image: footballwhispers.com

বাতিস্তুতার জন্ম এবং প্রাথমিক জীবন

১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯; আর্জেন্টিনার সান্টা ফে’র আভেল্লানেডা শহরে এক কসাইখানার কর্মীর ঘরে জন্ম নেন বাতিস্তুতা। তবে তার বেড়ে ওঠা রেকোনকুয়িস্তাতে।

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা এবং তার স্ত্রী ইরিনা ফার্নান্দেজ; Image: lifebogger.com

বাতিস্তুতা ছিলেন একজন রোমান ক্যাথলিক। ১৯৯০ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি ইরিনা ফার্নান্দেজ নামে এক নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে খুব ভালো খেলার কারণে খুব দ্রুতই বাতিস্তুতা সম্মান এবং খ্যাতির শিখরে পৌঁছে যান। বিভিন্ন টিভি শোতে তার ডাক পড়তে থাকে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও তিনি কাজ করেন। কিন্তু এত কিছুর পরও বাতিগোল বেশ সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তাকে দেখলে কখনই কেউ বুঝতে পারত না যে তিনি একজন সেলেব্রিটি।

ফুটবলার হয়ে ওঠার কাহিনী

ছোটবেলা থেকেই বাতিস্তুতা খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। ফুটবল পছন্দ করলেও তিনি প্রথমদিকে বাস্কেটবল খেলতেন। এর অন্যতম কারণ তার পাহাড়সম উচ্চতা। তবে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মত ফিফা বিশ্বকাপ জিতে যায়। সেই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট এবং গোল্ডেন বল বিজয়ী ম্যারিও কেম্পেসের নৈপুণ্য বাতিস্তুতাকে মুগ্ধ করে। তার খেলায় বাতিস্তুতা এতটাই প্রভাবিত হলেন যে ফুটবলার হওয়ার দিকে মনোনিবেশ করলেন তিনি।

ম্যারিও কেম্পেস, যার খেলা বাতিস্তুতাকে ফুটবলে নিয়ে আসে; Image: footyfair.com

আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য রেকোনকুয়িস্তা টিমে সুযোগ পেলেন বাতিস্তুতা। তখন তার বয়স ১৯ বছর। নিউওয়েলস ওল্ড বয়েসকে হারিয়ে বাতিস্তুতার দল চ্যাম্পিয়ন হলো। বাতিস্তুতার দুটি গোল বিপক্ষ টিম নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের নজর কারে। ১৯৮৮ সালেই তারা তাকে তাদের দলের সাথে চুক্তি করিয়ে নেয়।

খেলার ধরণ

বাতিস্তুতা ছিলেন খুবই দ্রুতগতির শক্তিশালী এক খেলোয়াড়। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এবং পরিশ্রম করেই খেলতে ভালোবাসতেন। তার গোল করার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তিনি তার সময়ের অন্যতম পরিপূর্ণ, সেরা এবং ভয়ঙ্কর এক স্ট্রাইকার ছিলেন। তার টেকনিক, অফ দ্য বল অফেনসিভ মুভমেন্ট, লাফ দেয়ার ক্ষমতা, শক্তিশালী এবং নিখুঁত ফিনিশিং তাকে অনন্য করে তুলেছিল। তিনি সাধারণভাবে ডান পায়ের ফুটবলার হলেও উভয় পায়েই সমান দক্ষ ছিলেন। ভলি এবং বাইসাইকেল কিকেও তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। তার ফ্রি কিক ছিল প্রচন্ড ভয়ঙ্কর এবং অত্যন্ত বেশি গতির।

Image: fourfourtwo.com

যদিও তিনি পেনাল্টিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, কিন্তু হতাশাজনকভাবে তার পেনাল্টিকে গোলে পরিণত করার হার অন্যদের চেয়ে কম ছিল। ভালো গোল স্কোরারের পাশাপাশি সুস্থ বা ফেয়ার প্লের জন্য বাতিস্তুতা প্রশংসিত ছিলেন। ফুটবল মাঠে অভিনয় বা ফাউল কোনোটাই তাকে তেমন করতে দেখা যেত না। মাঠে তার নেতৃত্বগুণও বেশ প্রশংসনীয় ছিল। ডিয়েগো ম্যারাডোনা বাতিস্তুতা সম্বন্ধে বলেছিলেন, তার দেখা সেরা স্ট্রাইকার হলেন বাতিস্তুতা।

নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ

নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে বাতিস্তুতা যখন যোগ দেন, তখন সেই দলের ম্যানেজার ছিলেন মার্সেলো বিয়েসলা। মার্সেলো বিয়েসলাকে আধুনিক কোচিং জগতের মাস্টারমাইন্ড হিসেবেই দেখা হয়। পেপ গার্দিওলা, আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচ সাম্পাওলি, সিমিওনে মার্সেলো বিয়েসলাকে প্রকাশ্যেই তাদের গুরু বলে স্বীকার করে থাকেন। পরবর্তীতে বিয়েসলা বাতিস্তুতার জাতীয় দলেরও কোচ ছিলেন। পেশাদারী ফুটবলের ১ম বছর অবশ্য বাতিস্তুতার জন্য সহজ ছিল না। পারিবারিক অবস্থা আগে থেকেই ভালো ছিল না তার।

এছাড়াও নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে এসে তাকে বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হল। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায়  তার পরিবার এবং তার বান্ধবীকে (পরবর্তীতে স্ত্রী) স্টেডিয়ামের একটি রুমে ঘুমাতে হত। এছাড়াও তার ওজনও তখন বেশি ছিল, যা তার ক্যারিয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ এই খেলোয়াড়কে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয় এবং লোনে অনেক ছোট দল দেপোর্তিভো ইটালিয়ানোতে পাঠিয়ে দেয়। এই দলের হয়ে বাতিস্তুতা একটু একটু করে নিজেকে খুঁজে পেতে থাকেন। ইটালির কার্নেভালে কাপে খেলে তিন গোল নিয়ে এই প্রতিযোগীতার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি।

রিভার প্লেট

১৯৮৯ এর মধ্যভাগ, বাতিস্তুতার ক্যারিয়ার নতুন করে মোড় নিল। আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় ক্লাব রিভার প্লেটে যোগ দিলেন তিনি। রিভার প্লেটে তিনি ১৭টি গোল করেন, কিন্তু নতুন ম্যানেজার ড্যানিয়েল পাসারেল্লা তাকে দল থেকে বের করে দেন। পাসারেল্লা সর্বকালের অন্যতম সেরা একজন ডিফেন্ডার। তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন এবং আর্জেন্টিনা ন্যাশনাল টিমের কোচও ছিলেন। পাসারেল্লা সেই সময় বলেছিলেন, “যখন বাতিস্তুতা এমন কোনো দল খুঁজে পাবে যে দল তার মতো করে বা তাকে কেন্দ্র করে খেলবে, তখন সে মারাত্মক হয়ে উঠবে।” অবশ্য তাকে দল থেকে বাদ দেয়ার সঠিক কারণ জানা যায় নি।

বোকা জুনিয়র্স

১৯৯০ সালে বাতিস্তুতা রিভার প্লেট ছেড়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার আরেকটি বড় ক্লাব এবং রিভার প্লেটেরই জাত শত্রু বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে বাতিস্তুতা বোকা জুনিয়র্সে নিজের পছন্দমত স্থানে খেলতে পারতেন না। তাই তিনি তার সেরা খেলাটা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে অস্কার তাবারেজ (বর্তমান উরুগুয়ের কোচ) বোকা জুনিয়র্সের নতুন ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেয়ার পর তাকে তার পছন্দের জায়গা সেন্টার অব অ্যাটাক ফিরিয়ে দিলেন। ফলটাও হাতেনাতে পাওয়া গেল। বোকা জুনিয়র্স সেবার চ্যাম্পিয়নশিপ জিতল আর বাতিস্তুতা সিজন শেষ করলেন লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে।

ফিওরেন্টিনা

বাতিস্তুতা ততদিনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে তো আর চাইলেই অগ্রাহ্য করা যায় না। ১৯৯১ সালে সরাসরি কোপা আমেরিকায় খেলার জন্য ডাক পেলেন বাতিস্তুতা। আর্জেন্টিনায় খেলার সময়ই ফিওরেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট বাতিস্তুতার দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন আর তাকে তাদের দলে সাইন করান।

Image: automobileartandentertainment.blogspot.com

১ম সিজনেই সিরি আ-তে বাতিগোল করে বসলেন ১৩ গোল। যদিও পরের সিজনে ফিওরেন্টিনা রেলিগেশান যুদ্ধে হার মানে এবং বাতিস্তুতার ১৬ গোলের পরেও সিরি বি-তে নেমে যায়। যদিও পরের সিজনেই বাতিস্তুতার ১৬ গোলের উপর ভর করে এবং ক্লদিও রানিয়েরির (হ্যাঁ, ইনি সেই ক্লদিও রানিয়েরি যিনি লেস্টার সিটিকে নিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে রুপকথা তৈরি করেছেন) ম্যানেজমেন্টে ফিওরেন্টিনা সিরি বি থেকে সিরি আ-তে উঠে আসে। সাথে তো সিরি বি’র লীগ টাইটেল জয় আছেই।

সিরি আ-তে ফিরে এসে পরের সিজন চমৎকার কাটালেন বাতিস্তুতা; করলেন একের পর এক গোল, আর ভাঙ্গলেন রেকর্ড। ১৯৯৪-৯৫ সিজনে ২৬ গোল করে লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন তিনি। সিজনের ১ম ১১ ম্যাচেই গোল করে ভাঙ্গলেন এজিও পাসকুট্টির রেকর্ড।

Image: planetfootball.com

পরের সিজনে বাতিস্তুতার দুর্দান্ত খেলায় ফিওরেন্টিনা টানা ১৫ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। সিজন শেষে টেবিলের ৪ নম্বরে থেকে তারা সিজন শেষ করল, যা ফিওরেন্টিনার জন্য এক বিশেষ অর্জন ছিল। এছাড়াও এই সিজনে ফিওরেন্টিনা এসি মিলানকে হারিয়ে কোপা ইটালিয়া এবং সুপার কোপা ইটালিয়ানা জয় করে নেয়। ফিওরেন্টিনায় বাতিস্তুতার অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৯৬ সালে ফিওরেন্টিনার স্টেডিয়ামের বাইরে তার একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়।

পরের সিজনগুলো বাতিস্তুতার জন্য মোটামুটি ছিল। তারা ১৯৯৬-৯৭ উয়েফা কাপ উইনার’স কাপের সেমিফাইনাল খেলেছিল। কিন্তু বাতিস্তুতা ইটালিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে চাচ্ছিলেন। ফিওরেন্টিনা এই কাপ জেতার জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল ছিল। তাই বাতিস্তুতা বড় কোনো ক্লাবে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছিলেন। কিন্তু বাতিস্তুতাকে দলে রাখার জন্য ফিওরেন্টিনা উঠে পড়ে লাগে এবং তাকে কথা দেয় তারা লীগ জেতার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করবে। তারা জিওভান্নি ট্রাপাট্টনিকে কোচ নিযুক্ত করে। জিওভান্নি ট্রাপাট্টনিকে সিরি আ’র ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Image: planetfootball.com

এবার সিজনের শুরুটাও হয় দুর্দান্ত। কিন্তু বাতিস্তুতা হঠাৎ ইঞ্জুরিতে পড়লে খেই হারিয়ে ফেলে ফিওরেন্টিনা। টেবিলের শীর্ষ থেকে নিচে নেমে যায় তারা। টেবিলের ৩ নম্বরে থেকে সিজন শেষ হয় তাদের। যদিও এই ফলাফল তাদের পরের সিজনে চ্যাম্পিয়নস লীগ খেলার সুযোগ করে দেয়। বাতিস্তুতা তার অতিমানবীয় খেলার জন্য সিরি আ ফরেন ফুটবলার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন।

পরের সিজন অর্থাৎ ১৯৯৯-২০০০ সিজনেও বাতিস্তুতা সিরি আ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লীগ দুটোই জেতার আশায় ফিওরেন্টিনাতেই থেকে যান। কিন্তু দুই প্রতিযোগীতাতে খুব ভালো শুরুর পরও লীগে সাত নম্বর স্থান এবং চ্যাম্পিয়নস লীগে ২য় রাউন্ডেই তারা বাদ হয়ে যায়।

রোমা

পরের সিজনেই বাতিস্তুতা প্রায় ৩৬ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রোমাতে ট্রান্সফার হয়ে যান এবং ৩ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বাতিস্তুতার জন্য যে ফি রোমা দিয়েছিল তা এখনো পর্যন্ত ৩০ বছর পেরোনো যেকোনো ফুটবলারের জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

রোমার জার্সি গায়ে বাতিস্তুতা; Image: metro.co.uk

অবশেষে ২০০০-০১ সিজনে বাতিস্তুতার স্বপ্ন পূরণ হল। রোমাকে নিয়ে বাতিস্তুতা সিরি-আ চ্যাম্পিয়ান হল। রোমাও বাতিস্তুতাকে নিয়ে ১৮ বছর পর সিরি আ জয়ের স্বাদ পেল। এই সিজনে বাতিস্তুতা ২০ গোল করেছিলেন। তাই তিনি পরের সিজনে নিজের জার্সি নাম্বার ১৮ থেকে ২০ এ রুপান্তর করলেন। তার পরের সিজনেই তিনি আবার তার জার্সি নাম্বার পরিবর্তন করেন এবং নিজের বয়স ৩৩ এর সাথে মিল রেখে ৩৩ নম্বর জার্সি বেছে নিলেন।

ইন্টারমিলানের জার্সি হাতে বাতিস্তুতা; Image: gettyimages.in

৩৩ বছর বয়সে এসে ফর্ম হারিয়ে ফেলেন বাতিস্তুতা। তাকে রোমা ইন্টার মিলানের কাছে লোনে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি ১২ ম্যাচে ২ গোল করেন। গোল কম করলেও অনেকগুলো অ্যাসিস্ট করেছিলেন বাতিস্তুতা। এরপর তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে ২০০৩ সালে ৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কাতারের আল-আরাবিতে যোগদান করেন। সেখানে তিনি এক সিজনে ২৫ গোল করেন, যা ছিল কাতারী লীগের এক সিজনে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এ রেকর্ড করতে গিয়ে তিনি কাতারি লিজেন্ড মানসুর মুফতাহর গোলের রেকর্ড ভঙ্গ করেন।

আর্জেন্টিনার বাতিস্তুতা

১৯৯১ সাল, বাতিস্তুতা আর্জেন্টাইন লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন। ডাক এলো আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে। চিলিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকা খেলার সুযোগ পেলেন তিনি। সেই টুর্নামেন্টে করলেন একের পর এক গোল। ৬ গোল করে হলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। তার কাঁধে ভর করে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা হল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ান।

কোপা আমেরিকা ট্রফি হাতে বাতিস্তুতা এবং সাথে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল; Image: elliberal.com

১৯৯২ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে আর্জেন্টিনা গেল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। সেখানেও দেখা গেল বাতিস্তুতা ম্যাজিক। আর্জেন্টিনা জিতে নিল আরেকটি শিরোপা। বাতিস্তুতা হলেন সর্বোচ্চ গোল স্কোরার।

কনফেডারেশান্স কাপ হাতে বাতিস্তুতা; Image: soccernostalgia.blogspot.com

১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনা বাতিস্তুতাকে নিয়ে আরেকটি শিরোপা জেতে। শিরোপাটির নাম আর্তেমিও ফ্রেঞ্ছি ট্রফি। এই টুর্নামেন্ট এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি খেলা হত সাউথ আমেরিকা এবং ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন দুটি দলের মধ্যে।

১৯৯৩ সালেই বাতিস্তুতা তার ২য় কোপা আমেরিকা খেললেন আর্জেন্টিনার হয়ে। এবারের কোপা আমেরিকার আসর বসল ইকুয়েডরে। এবারও আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং কোপা আমেরিকার ২য় সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন বাতিস্তুতা। আর্জেন্টিনা জিতল তাদের ইতিহাসের শেষ কোপা আমেরিকা। সিনিয়র পর্যায়ে জাতীয় দলের হয়ে শেষ আন্তর্জাতিক শিরোপাও এটি। এরপর আর্জেন্টিনা আর কোনো কোপা আমেরিকা জিততে পারেনি। ফাইনালে মেক্সিকোকে ২-১ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। দুই গোলের দুটিই আসে এই আর্জেন্টাইন বিস্ময়ের পা থেকে।

Image: alchetron.com

এরপর এল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। এটিই আর্জেন্টিনার হয়ে বাতিস্তুতার ১ম বিশ্বকাপ। খুব ভালো শুরুর পরও রাউন্ড অভ সিক্সটিনে রোমানিয়ার কাছে বাদ পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপেই মূলত ম্যারাডোনা ডোপিং কেলেঙ্কারির জন্য নিষিদ্ধ হন। আর তার পরপরই দলের মনোবল একদম ভেঙ্গে পরে। এই বিশ্বকাপে বাতিস্তুতা একটি হ্যাটট্রিকসহ মোট ৪ গোল করেন।

Image: joe.ie

১৯৯৫ সালের কোপা আমেরিকাতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ান হতে না পারলেও বাতিস্তুতা সেই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ এ ফিফা একাদশে জায়গা পান তিনি। এরপর ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে বাদ পড়ে যায়। বাতিস্তুতা আবারো একটি হ্যাটট্রিক করেন। এবারের আসরে তিনি মোট ৫ গোল করেন। তিনি চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে দুটি হ্যাটট্রিক করেন এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র তিনিই ভিন্ন ভিন্ন দুটি বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের আসরে তিনি ৫ গোল করে সিলভার বুট জিতে নেন। এই সালেই বাতিগোল আর্জেন্টিনার প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন।

আর্জেন্টিনায় বাতিস্তুতার মূর্তির সামনে এক ভক্ত; Image: footballwhispers.com

১৯৯৯ সালে গত বছর বিশ্বকাপে সিলভার বুট জয়ী বাতিস্তুতা ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারে ব্রোঞ্জ অ্যাওয়ার্ড বা ৩য় সেরার পুরস্কার গ্রহণ করেন।

Image: footylive.com

২০০২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা টিম খুব শক্তিশালী ছিল। বাছাইপর্বে দাপট দেখিয়ে তারা বিশ্বকাপে উঠেছিল। মার্সেলো বিয়েসলার অধীনে তখন আর্জেন্টিনা টিম। সবাই আর্জেন্টিনাকে টপ ফেভারিটের তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো নাইজেরিয়া, ইংল্যান্ড আর সুইডেনকে নিয়ে গড়া গ্রুপ অভ ডেথে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে যায় আর্জেন্টিনা। গোটা টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা করে মাত্র ২টি গোল, যার একটি আসে বাতিগোলের পা থেকে।

ইনজুরি সমস্যা এবং রিটায়ারমেন্ট

বাতিস্তুতা তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে মাঝে মাঝেই ভুগেছেন ইনজুরি সমস্যায়। তিনি অত্যন্ত শক্তি দিয়ে খেলতেন এবং নিজের সামর্থের চেয়ে বেশি করার চেষ্টা করতেন। এটিই ছিল মূলত তার ইনজুরি সমস্যার মূল কারণ। এর ফলে ম্যাচে তার প্লেয়িং টাইম কমে যেতে থাকে। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে এই সমস্যাগুলো তাকে বেশি ভুগিয়েছে এবং ফলাফলস্বরুপ তিনি তার খেলোয়াড়ি জীবন থেকে বেশ আগেই অবসর নিতে বাধ্য হন। তিনি ২০০৫ সালের মার্চ মাসে ফুটবল খেলা থেকে পরিপূর্ণভাবে অবসর নেন। ২০০৬ ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপের সময় একটি টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন বাতিস্তুতা। বর্তমানে তিনি নিজের একটি কনস্ট্রাকশান কোম্পানি চালাচ্ছেন।

Image: thebubble.com

২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বাতিস্তুতা বলেন, ২০০৫ সালে অবসরের পর তার গোড়ালিতে এত প্রচন্ড ব্যথা ছিল যে, কয়েক ধাপ দূরে টয়লেট থাকলেও এই স্ট্রাইকার বাধ্য হয়ে বিছানাতেই প্রস্রাব করতেন। তিনি একদমই নড়াচড়া করতে পারতেন না। পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাকে তিনি বলেছিলেন, তিনি যাতে তার পা কেটে ফেলে দেন! কিন্তু ডাক্তার তার অনুরোধ রাখেন নি। যদিও এরপর বাতিস্তুতা কার্টিলেজ এবং টেন্ডনের উপড় চাপ কমানোর জন্য একটি সার্জারি করান, যা তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি করে। ২০১৭ সালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বাতিস্তুতা বলেন, হাঁটতে তার এখনো বেশ কষ্ট হয়।

Image: thefamouspeople.com

Image: goal.com

গোল মেশিন বাতিস্তুতা হয়ত তার খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মনের মাঝে তার প্রতি যে ভালোবাসা তা থেকে পালিয়ে যাওয়ার তো উপায় নেই। বাতিস্তুতা থাকবেন ফুটবল যতদিন থাকবে; ফুটবলপ্রেমীদের, বিশেষ করে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে এক গোলের ফেরীওয়ালা হয়ে, যে ফেরীওয়ালার অভাব আজও পূরণ হয়নি।

ফিচার ইমেজ- footballwhispers.com

Related Articles