
আপনাকে একটি দায়িত্ব দেয়া হলো। দায়িত্বটি হলো, আপনার পরিবার ও বন্ধুদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মেরে ফেলতে হবে। গ্যাস চেম্বারে হত্যার পর তাদের লাশগুলো থেকে দাঁত ও কাপড় খুলে ফেলতে হবে। চুল ছেঁটে ফেলতে হবে। এরপর লাশগুলো আবার ক্রিমেটোরিয়া নামক মেশিনে পোড়াতে হবে।
পারবেন দায়িত্ব পালন করতে? পারবেন না। আসলে মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষে এরকম বীভৎস দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না। আপনি না পারলেও ঠিক এরকমই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সোন্ডারকমান্ডোদেরকে। সোন্ডারকমান্ডোরাও কিন্তু আপনার মতো মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ ছিল। তাদেরও পরিবার ছিল, প্রিয়জন ছিল, দুই চোখে স্বপ্ন ছিল।

সোন্ডারকমান্ডো অর্থ হচ্ছে বিশেষ কমান্ডো ইউনিট। সোন্ডারকমান্ডো বলতে আদতে বোঝানো হয় একদল বন্দীকে, যাদের ক্যাম্পের অন্যান্য বন্দীদের গ্যাস চেম্বারে নিয়ে হত্যায় সাহায্য করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এরপর হতভাগা সাধারণ বন্দীদের লাশগুলো থেকে চুল, দাঁত, কাপড় আলাদা করে ক্রিমেটোরিয়া মেশিনে ঢুকিয়ে পোড়াতে হতো। সোন্ডারকমান্ডোরা শারীরিকভাবে অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী হওয়ায় তাদের এমন দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বললে ভুল হবে। আসলে এমনটা করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
“কাজ তোমাকে মুক্তি দেবে।”
অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মূল গেটে এই কুখ্যাত বাক্যটি লেখা ছিল। লেখাটি আসলে সত্য নয়। কাজ করলেও এখান থেকে মুক্তি পাওয়া ছিল বিরল ঘটনা। আর কাজের আড়ালে যে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো, তা সহ্য করতে না পেরেই অনেকে মৃত্যুবরণ করতো। তার উপর থাকার পরিবেশ ছিল খুবই নোংরা। একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপর দিকে অমানুষিক পরিশ্রম আর তার সাথে যুক্ত হয়েছিল অপর্যাপ্ত খাবার– সবকিছু মিলিয়ে এখানে বন্দীদের মৃত্যুর সকল ধরনের আয়োজন করা হয়েছিল। আর এগুলো ছাড়াও কারণে-অকারণে গ্যাস চেম্বারে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠিয়ে যমদূতের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা তো ছিলই!
১৯৪০ সালে পোলান্ডে সবচেয়ে বড় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প খোলা হয়। এটি মূলত রাজনৈতিক বন্দী শিবির হিসেবে খোলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল অনেকগুলো ক্যাম্পের একটি নেটওয়ার্ক। এই ক্যাম্পগুলোতে ইহুদি ও নাৎসি জার্মানির রাজনৈতিক শত্রুদের গণহারে হত্যা করা হতো।

অসউইজ ক্যাম্পে যে শুধু ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াড কিংবা গ্যাস চেম্বারের মাধ্যমে বন্দীদের মেরে ফেলা হতো তা কিন্তু নয়। অনেক সময় বন্দীদের উপর নির্মম ‘মেডিকেল এক্সপেরিমেন্ট’ চালানো হতো। আর বেঁচে থাকা বন্দীদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো।
১৯৪৩ সালে অসউইজ ক্যাম্পের প্রধান ডাক্তার হিসেবে নিয়োগ পান ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেল। ক্যাম্পে যেসব নতুন বন্দী আসতো, তাদেরকে তিনি পরীক্ষা করতেন। পরীক্ষায় যদি বন্দীর ক্যাম্পের পরিশ্রম সহ্য করার মতো শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণিত না হতো, তবে জোসেফ মেঙ্গেল তৎক্ষণাৎ বন্দীকে গ্যাস চেম্বারে পাঠানোর আদেশ দিতেন।
পেট্রোল থেকে শুরু করে ক্লোরোফর্ম পর্যন্ত সমস্ত তরল রাসায়নিক পদার্থ ইহুদি বন্দীদের শরীরে প্রবেশ করানো হতো। এরপর বন্দীদের প্রতিক্রিয়া, ক্যামিকেলের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হতো। জমজ শিশুদের উপর আরও নির্মম পরীক্ষা চালানো হতো। এমনও বলা হয়, দুটো জমজ শিশুর হৃদপিণ্ডে ক্লোরোফর্ম প্রবেশ করিয়ে শিশুগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখা হতো। শিশুগুলো অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে কিছুক্ষণ পরেই মারা যেত।

সোন্ডারকমান্ডোরাও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী হিসেবেই আসতো। শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করার পর তাদের সোন্ডারকমান্ডো ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। সোন্ডারকমান্ডোদের দায়িত্ব সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতো। কিন্তু তাদের কিছুই করার ছিল না।
সোন্ডারকমান্ডোরা কিছু আলাদা সুবিধা পেতো। যেমন- তাদের সাধারণ বন্দীদের চাইতে একটু ভালো মানের খাবার দেয়া হতো। তাদের থাকার জায়গা সাধারণ বন্দীদের চাইতে একটু উন্নত ছিল। এছাড়াও তাদের সিগারেট খাওয়া ও ওষুধ নেয়ার অনুমতি ছিল।
এসব আলাদা সুবিধা থাকার পরও তারা কিন্তু নাৎসিদের হাতে মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারতো না। তাদের দায়িত্ব পালনের কারণে তাদের মৃত্যু একটু বিলম্বিত হতো, হুটহাট মৃত্যুর আদেশ পাওয়া থেকে বাঁচত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদেরকেও গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হতো।

একজন সোন্ডারকমান্ডো, যিনি গণহত্যার কবল থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন, ফিলিপ মুলার স্মৃতিচারণ করেছেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের দিনগুলোর। স্বজাতি বন্দীদের যখন তিনি গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যেতেন, তখন দুঃসহ অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরত। কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না। একবার বন্দীদের গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার সময় দন্ডপ্রাপ্ত একটি মেয়ে তাকে বলেছিল,
আমাদের অবশ্যই মরতে হবে। কিন্তু তোমার এখনও সুযোগ রয়েছে নিজের প্রাণ বাঁচানোর। তুমি ক্যাম্পে ফিরে যাও এবং সবাইকে আমাদের শেষ সময়গুলো সম্পর্কে জানাও। তাদের লড়ে যেতে বলো। এটি অবশ্যই এখানে অসহায়ভাবে মৃত্যুর চেয়ে ভাল হবে।
১৯৪৪ সালের গ্রীষ্মে প্রায় সাড়ে চার লাখ হাঙ্গেরিয়ান ইহুদিকে অসউইজ ক্যাম্পে আনা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য আরও বেশ কিছু সোন্ডারকমান্ডো নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা নাৎসি গার্ডদের মনে হলো সোন্ডারকমান্ডোদের সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছে। তাই সোন্ডারকমান্ডোদের সংখ্যা কমিয়ে আনা দরকার বলে তারা মনস্থির করলো।
এদিকে আবার প্রতিনিয়ত খবর আসছিল, সোভিয়েত সৈন্যরা পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে আসছে। তাই সোন্ডারকমান্ডোসহ সব ধরনের বন্দীদের সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনা নাৎসিদের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সোন্ডারকমান্ডোরাও বুঝতে পেরেছিল, তাদের সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেহেতু মরতেই হবে, তাই তারা লড়াই করেই মরবে।
সোন্ডারকমান্ডোদের নেতারা চারজন নারী বন্দীর সাথে যোগাযোগ করলো। এই নারীরা ক্যাম্পের পাশেই যুদ্ধোপকরণ তৈরির একটি কারখানায় কাজ করতো।

এই চারজন নারীর মাধ্যমে গান পাউডার সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় সোন্ডারকমান্ডোরা। নারীরা খুব অল্প পরিমাণ গান পাউডার সরবরাহ করতো সোন্ডারকমান্ডোদের। কাপড়ের ভাঁজে করে কারখানা থেকে এনে গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে খাওয়ার ট্রেতে করে সোন্ডারকমান্ডোদের হাতে পৌঁছে দিত। বেশ কিছুদিন এভাবে গান পাউডার পাচার করার পর সোন্ডারকমান্ডোরা কিছু গ্রেনেড ও স্বল্পমাত্রার বোমা তৈরি করে ফেলেছিলো। গানপাউডার ছাড়াও হাতুড়ি, ছুড়ি ও কুড়ালের মতো ধারালো অস্ত্র সেই নারীরা সোন্ডারকমান্ডোদের সরবরাহ করেছিলো।
কয়েক মাস ধরে সোন্ডারকমান্ডোরা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেয়। অবশেষে ৭ই অক্টোবর, ১৯৪৪ সালে চার নম্বর ক্রিমেটোরিয়ামের সোন্ডারকমান্ডোরা বিদ্রোহে গর্জে ওঠে।
চেইম নিউহফ, একজন বন্দী, ‘হুররে’ (বিদ্রোহ শুরুর সংকেত) বলে নাৎসি গার্ডের মাথায় আঘাত করে। এই ঘটনার পরেই ক্যাম্পের বাকি সোন্ডারকমান্ডোরা হাতুড়ি, কুড়াল নিয়ে গার্ডদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় নাৎসি গার্ডরা ভড়কে যায়। কী করতে হবে তারা বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তারা বন্দীদের চেয়ে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল।
সোন্ডারকমান্ডোরা তাদের কাছে থাকা বিস্ফোরক দিয়েই চার নম্বর ক্রিমেটোরিয়াম সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। ক্যাম্পের কাঁটাতার কেটে অনেক বন্দী পালিয়ে যায়। একজন নাৎসি গার্ড, যিনি তার নির্মমতার জন্য ক্যাম্পের সব বন্দীর কাছে ঘৃণার পাত্র ছিলেন, ক্ষুদ্ধ সোন্ডারকমান্ডোরা তাকে জীবন্ত অবস্থায় ক্রিমেটোরিয়ার ফার্নেসে ফেলে দেয়। পুড়ে মারা যায় সেই নাৎসি গার্ড।
বিদ্রোহ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। প্রথমদিকে গার্ডরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে তারা ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়। অ্যালার্ম শুনে খুব দ্রুত বাকি নাৎসি গার্ডরা অস্ত্রসহ হাজির হয়।
পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের নাৎসি গার্ডরা ধাওয়া করে। তাদেরকে গার্ডরা গুলি করে হত্যা করে। কোনো কোনো বন্দী আবার খড়ের গাদায় লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
বারোজন বন্দী ভিস্তুলা নদীর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলো। কিন্তু নাৎসি গার্ডরা প্রশিক্ষিত কুকুরের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে ফেলে। তারপর এই বারোজনকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনজন নাৎসি গার্ড এই বিদ্রোহে নিহত হয়। আহত হয় দশজনেরও বেশি গার্ড।
এই ঘটনার পর ক্যাম্পের ২০০ জন সোন্ডারকমান্ডোকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। আর যে চারজন নারী গান পাউডার সরবরাহে নিযুক্ত ছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়।
অসউইজ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার বারোদিন আগে, ৬ই জানুয়ারি, ১৯৪৫ তারিখে সন্ধ্যায় সেই চারজন নারীরও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
এই বিদ্রোহ হয়তো বন্দীদের মুক্ত করতে পারেনি, কিন্তু তা নাৎসিদের চরম মানসিক আঘাত করে। এছাড়াও বিদ্রোহের পর বন্দীরা মানসিক প্রশান্তি নিয়ে মৃত্যুবরণ করে। তারা মৃত্যুর পূর্বে জেনে গিয়েছিলেন যে, তারা দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে তারপর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন।
রোর বাংলা থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমা হামলার অভিজ্ঞতা নিয়ে পড়তে পারেন এই বইটি: