
শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার ফলাফল সবসময়ই সুদুরপ্রসারী হয়ে থাকে। বিভিন্ন খেলাধুলার সময় একপক্ষ যে নিজের দল সম্পর্কে নানা ভীতিকর কথা বলে এবং অপরপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, সেটিও এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। একই কথা বলা যায় যুদ্ধ-বিগ্রহের বেলাতেও। যুদ্ধের সময়ও একটি বাহিনীর নেতারা এমন সব কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেন যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া যায়। ফলে চেতনাশক্তিতে দুর্বল সেই প্রতিপক্ষকে তখন যুদ্ধের ময়দানে হারানোটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায় তাদের জন্য। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে এমনই কিছু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল তুলে এনেই সাজানো হয়েছে আজকের লেখাটি।
পেলুসিয়ামের যুদ্ধ
৫২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পার্সিয়ান সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন মিশরের মাঝে পেলুসিয়ামের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের ফলে শাসনক্ষমতা তৎকালীন ফারাওদের হস্তচ্যুত হয় এবং সিংহাসনে বসেন পার্সিয়ান রাজা দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসেস। এ যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে এ লেখাটা লিখছি না। বরং কীভাবে সূক্ষ্ম এক চালের সাহায্যে পুরো মিশরীয় বাহিনীকে প্রথমে মানসিক ও পরে শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত করেছিলো পার্সিয়ানরা, সেটা বলতেই এ লেখা।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা পেলুসিয়ামের যুদ্ধ; Image Source: World History Archive
প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিলো বেশ সমাদৃত এক প্রাণী। বর্তমানে আমাদের কাছে ‘কিউট’, ‘সো সুইট’, ‘এত্তগুলা সুন্দর’ বিড়ালের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয়ের এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করতো মিশরীয়দের মাঝে। এটা জানতো আক্রমণকারী পার্সিয়ান বাহিনী। সত্যি কথা বলতে, এটা ছিলো মিশরীয়দের এক ধরনের দুর্বলতা। আর এ দুর্বলতার সুযোগ পুরোপুরিই কাজে লাগিয়েছিলো তারা।

বাস্টেট; Image Source: Wikimedia/Gunawan Kartapranata
পার্সিয়ান বাহিনী তাদের ঢালগুলোতে বিড়ালের ছবি এঁকে নিয়েছিলো। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, পার্সিয়ান বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষার জন্য একেবারে আসল বিড়ালই ব্যবহার করেছিলো। মিশরীয়রা তখন ‘বাস্টেট’ নামে এক দেবীর পূজা করতো যার দেহাবয়ব ছিলো বিড়ালের মতোই। তাকে তারা বিড়াল, নিরাপত্তা, আনন্দ, নৃত্য, সঙ্গীত, পরিবার ও ভালোবাসার দেবী মনে করতো। তাই বাস্টেটের প্রতীকে আক্রমণ করতে অস্বীকৃতি জানায় মিশরীয় সৈন্যরা। দ্বিতীয় শতাব্দীর মেসিডোনিয়ান লেখক পলীনাসের মতে, পার্সিয়ান বাহিনীর সম্মুখভাগ সাজানো হয়েছিলো কুকুর, বিড়াল, ভেড়া ও আইবিস পাখির মাধ্যমে। এদের সবগুলোই মিশরীয়দের কাছে বেশ পবিত্র ছিলো। ফলে সেসবে আক্রমণ করতে অনীহাই তাদের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রীক ঐতিহাসিক টেসিয়াসের মতে, এ যুদ্ধে মিশরীয়রা প্রায় ৫০,০০০ ও পার্সিয়ানরা প্রায় ৭,০০০ সেনা হারায়।
অবশ্য এ যুদ্ধের কারণটাও ছিলো বেশ অদ্ভুত, বলা যায় হৃদয়ের লেনদেন বিষয়ক। গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের মতে, ক্যাম্বাইসেস তৎকালীন মিশরের ফারাও দ্বিতীয় অ্যামাসিসের মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যামাসিস ভেবেছিলেন যে, তার মেয়ে হয়তো প্রকৃত রাণীর মর্যাদা পাবে না। বরং তাকে রাখা হবে উপপত্নী হিসেবে। এটা ভেবে তিনি তার আগের ফারাওয়ের মেয়েকেই নিজের মেয়ে হিসেবে ছদ্মবেশে বিয়ে দিতে পাঠান ক্যাম্বাইসেসের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য অ্যামাসিসের, কারণ ক্যাম্বাইসেস এ কৌশলটি ধরে ফেলেন। এতেই মারাত্মক ক্ষেপে গিয়ে তিনি মিশর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর কী হলো তা তো শুরুতেই বলেছি।
মেসিডনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ
৩৫৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে শুরু করে গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হওয়ার আগে ৩৩৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন গ্রীক রাজ্য মেসিডনের রাজা ছিলেন দ্বিতীয় ফিলিপ। তাকে যদি চিনতে কষ্ট হয়, তবে জেনে নিন তিনিই বিশ্বখ্যাত আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বাবা।

দ্বিতীয় ফিলিপের ভাষ্কর্য; Image Courtesy: Ny Carlsberg Glyptotek
ফিলিপ যখন মেসিডনের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নিলেন, তখন সেটি বলার মতো কিছুই ছিলো না। বরং বারবার বহিঃশক্তির আক্রমণে পঙ্গু অবস্থায় ছিলো রাজ্যটি। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার মাত্র বছরখানেকের মাঝেই তিনি সকল অন্তর্কলহ কঠোর হস্তে দমন করলেন এবং মেসিডনকে এক শক্তিশালী রাজ্য বানানোর দিকে এগিয়ে নিতে থাকলেন।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশলে বেশ নিপুণ এক খেলোয়াড় ছিলেন দ্বিতীয় ফিলিপ। চালসিডিয়ান লীগের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি স্টাগিরাস শহরটি একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দেন। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতে, ফিলিপ শহরটি এমনভাবেই ধ্বংস করেছিলেন যে, একজন আগন্তুক যদি কোনো কারণে সেখানে আসতো, তবে সেখানে যে এককালে জনবসতি ছিলো এ কথাটি তাকে বিশ্বাস করাতেও কষ্ট হতো। ফিলিপের এমন কর্মকান্ডে মারাত্মক ভয় পেয়ে অন্যান্য চালসিডিয়ান শহরগুলো বিনা প্রতিরোধে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

শিল্পীর তুলিতে যুদ্ধরত দ্বিতীয় ফিলিপ; Image Source: weaponsandwarfare.com
৩৩৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কীরোনিয়ার যুদ্ধের সময়ও তিনি চমৎকার কৌশল খাটান। এথেন্স ও থীবসের বিদ্রোহীদের রোদ্রের প্রখর তাপের মাঝে দাঁড় করিয়ে রেখে প্রথমে ক্লান্ত করে ছাড়েন তিনি। পরবর্তীতে তাদের তিনি একটি আক্রমণ করেন যা আসলে মূল আক্রমণ ছিলো না। এ আক্রমণের ফলে বিদ্রোহীরা তার বাহিনীকে ধাওয়া করে এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু ওদিকে ফিলিপের সৈন্যরা আগে থেকেই এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলো। তাই তারা চারদিক থেকে তখন সেই বিদ্রোহীদের ঘিরে ফেললে তারাই ফাঁদের মাঝে পড়ে যায়। শুরুতে রোদে পুড়ে ক্লান্ত হওয়া সৈন্যরা যখন পরে এভাবে ফাঁদে পা রাখে, তখন তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং
তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ বছর ছিলো তার রাজত্ব। আজকের দিনের তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ (কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত) তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৪০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মারা যান সুপরিচিত এ বিজেতা।

তৈমুর লং-এর ভাষ্কর্য; Image Source: wikimedia.org
ঐতিহাসিকদের মতে, তৈমুরের বাহিনীর হাতে প্রায় ১,৭০,০০,০০০ লোক নিহত হয়েছিলো, যা ছিলো তৎকালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ ভাগ। তার হাতে পরাজিতদের ভাগ্য হতো বেশ করুণ। পরাজিতদের খুলি দিয়ে পিরামিড বানানোর কুখ্যাতি আছে তার নামে। আর শত্রুর নামে যদি এমন কিছু প্রচলিত থাকে, তাহলে যে তার প্রতিপক্ষের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যাবে, তা তো না বললেও চলে।

শিল্পীর কল্পনায় খাঁচায় বন্দী সুলতান প্রথম বায়েজিদ; Image Source: factinate.com
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে- ১৪০১ সালে তার বাহিনীর বাগদাদ আক্রমণে ৯০,০০০ এর মতো মানুষ মারা যায়। মৃতদের খুলি দিয়ে তখন ১২০টি পিরামিড বানানো হয়েছিলো। দিল্লী বিজয়ের পর তার গণহত্যা অনেকদিন ভারতের জনগণের কাছে দুঃস্বপ্নের নামান্তর হয়ে ছিলো। অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর তিনি বাইজান্টাইন গেট খুলে নিজের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। সেই সাথে খাঁচায় বন্দী করে তিনি নিয়ে এসেছিলেন সুলতান প্রথম বায়েজিদকেও যাকে তিনি তার বৈঠকখানায় প্রদর্শনের জন্য রেখে দিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে অবশ্য দ্বিমত পোষণ করেন তৈমুরের পক্ষের ঐতিহাসিকেরা। তাদের মতে, তৈমুর তার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। এমনকি তার মৃত্যুর পর তিনি শোকও প্রকাশ করেছিলেন।
মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্রাট চেঙ্গিস খান

চেঙ্গিস খান; Image Courtesy: National Palace Museum
বিশ্বখ্যাত মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্রাট চেঙ্গিস খানের নাম শোনে নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর তিনি রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তার সময়কালে অধিকাংশ ইউরাশিয়া মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া কারা খিতাই, ককেশাস ও খারেজমিয়ান সাম্রাজ্য এবং ওয়েস্টার্ন শিয়া ও জিন রাজপরিবারের বিরুদ্ধেও অস্ত্র হাতে নিয়েছিলো চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বাধীন মোঙ্গল বাহিনী। ঐতিহাসিকদের মতে, চেঙ্গিস খানের গোটা জীবনকাল ধরে চলা বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৪,০০,০০,০০০ লোক প্রাণ হারিয়েছিলেন। মধ্যযুগের বিভিন্ন আদমশুমারি থেকে জানা যায় যে, তার জীবনকালে চীনের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটির মতো হ্রাস পেয়েছিলো। ওদিকে ঐতিহাসিকদের মতে, খারেজমিয়ানদের সাথে তার যুদ্ধকালে আধুনিক ইরানের তিন-চতুর্থাংশ লোক প্রাণ হারায়! সব মিলিয়ে, মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণে তখন বিশ্বের প্রায় এগারো শতাংশ লোক প্রাণ হারিয়েছিলো।
যে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী এত ত্রাসের সঞ্চার করেছিলো গোটা বিশ্বজুড়ে, সেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশলকে খুব গুরুত্ব সহকারে দেখবেন, সেটা তো না বললেও চলে।

চলছে যুদ্ধ; Image Source: k.sina.com.cn
যুদ্ধের সময় তিনি ইচ্ছা করেই নিজের বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়ে বলতেন যাতে করে প্রতিপক্ষ সেটা জেনে শুরুতেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বেশি দেখাতে মাঝে মাঝেই তার বাহিনীর ঘোড়ার পিঠে ডামি চড়িয়ে দেয়া হতো। এছাড়া তার বিখ্যাত এক কৌশল ছিলো রাতের বেলায় ক্যাম্পফায়ার জ্বালানোর মাধ্যমে দৃষ্টিভ্রম তৈরি করা। চেঙ্গিসের বাহিনীর সৈন্যদের প্রতি নির্দেশ ছিলো যে, রাতের বেলায় তারা প্রত্যেকেই যাতে কিছুটা দূরে দূরে আগুন জ্বেলে রাখে। এভাবে যখন প্রতিটি সৈন্যই আগুন জ্বালাতো, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাতটা হয়ে উঠতো অনেক বেশি আলোকিত। দূর থেকে শত্রুপক্ষ তাদের দেখতে পেয়ে প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কে অনুমানে যেমন ব্যর্থ হতো, তেমনি সংখ্যাধিক্যের কথা চিন্তা করে ভড়কেও যেত।
মাঝে মাঝে চেঙ্গিস খানের মেকি পশ্চাদপসরণে শত্রু ভুল বুঝে তার বাহিনীকে তাড়া করে শেষ পর্যন্ত তার তীরন্দাজ বাহিনীর কাছেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে সবসময় বেশ ভালো জ্ঞান রাখতেন তিনি। পরবর্তীতে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে এ জ্ঞানকেই কাজে লাগাতেন তিনি। তার আরো একটি কৌশল ছিলো উটের গায়ে নাকাড়া লাগিয়ে সেগুলোকেও অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পাঠানো। এতে বাদ্যযন্ত্রের শব্দও প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন তুলে দিত।