
সিআইএ’র মস্কো স্টেশনের ফিল্ড এজেন্ট মার্থা পিটারসন যখন স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলেন, ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হাতঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি। এখনও ঘণ্টা তিনেক সময় আছে। রাত দশটার মধ্যেই তাকে প্যাকেজটা ডেলিভারি দিতে হবে। কিন্তু তার আগে পেছন থেকে অন্য কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে এত বেশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যে, তাতেই কয়েক ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যাবে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রথমে নিজের বাসায় গেলেন মার্থা। পোশাক পাল্টে পরে নিলেন গ্রে কালারের একটি শার্ট এবং স্কার্ট, সেই সাথে মাথায় দিলেন রাশিয়ানদের মতো একটি হ্যাট। তবে তার আগে শার্টের ভেতরে, ব্রা’র একপাশে বেল্ট দিয়ে আটকানো প্লাস্টিক হোল্ডারের সাথে বেঁধে নিলেন সিআইএর দেওয়া SRR-100 সার্ভেইল্যান্স রিসিভারটি।

সেখান থেকে বেরিয়ে আসা তার দুটোকে শার্টের কলারের পেছন দিয়ে বের করে আনলেন। এরপর চুল এবং হ্যাটের আড়ালে ঢেকে ইয়ারপিস দুটোকে কানে গুঁজে নিলেন। সবশেষে ঢোলা শার্টের আড়ালে স্কার্টের পাশে কোমরে গুঁজে নিলেন ছোটো একটি গাছের গুঁড়ি। এটাই হচ্ছে সেই প্যাকেজ, যা তাকে ডেলিভারি দিতে হবে মস্কোর ফরেন মিনিস্ট্রিতে কর্মরত সিআইএর এজেন্ট ট্রাইগনের (TRIGON) কাছে।
বাসা থেকে বেরিয়ে ধীরেসুস্থে নিজের গাড়ি উঠলেন মার্থা। শোনার চেষ্টা করলেন SRR-100 সার্ভেইল্যান্স রিসিভারটিতে কোনো শব্দ হয় কি না। সিগারেটের প্যাকেটের সমান আকারের রিসিভারটি মূলত একধরনের রেডিও, যা আশেপাশে থাকা কেজিবির এজেন্টদের নিজস্ব ফ্রিকোয়েন্সি ধরতে পারে। মার্থার উপর যদি একাধিক কেজিবি এজেন্ট নজর রেখে থাকে, তাহলে তিনি বের হওয়ামাত্রই তারা একে অন্যকে সেটা রিপোর্ট করার কথা। আর সাথে সাথেই সিআইএর দেওয়া মার্থার রিসিভারে তা ধরা পড়ার কথা। কিন্তু রিসিভারটি সম্পূর্ণ নিশ্চুপ – কেউ মার্থাকে অনুসরণ করছে না।
তারপরেও আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে ঘণ্টাখানেক মস্কো শহরজুড়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়ালেন মার্থা। প্রচণ্ড গতিতে যেতে যেতে হঠাৎ করেই বাঁক নিয়ে পাশের রাস্তায় ঢুকে পড়লেন কয়েকবার। বেশ কয়েকবার ঢুকে পড়লেন প্রায় সম্পূর্ণ নির্জন কানাগলির ভেতরেও। কিন্তু না, একবারও মনে হলো না কেউ তাকে অনুসরণ করছে। তারপরেও নির্ধারিত স্থানে নিজের গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার মতো সাহস করলেন না তিনি। ট্রেন স্টেশনের সামনে গাড়ি পার্ক করে পরপর দুবার ট্রেন বদল করে এরপর এসে উপস্থিত হলেন পূর্বনির্ধারিত স্থানে – মস্কোর একটি নির্জন পার্কে। এখানেই তার প্যাকেজটা ডেড ড্রপ করার কথা।

ডেড ড্রপ হচ্ছে গুপ্তচরদের মধ্যে পারস্পরিক সাক্ষাৎ ছাড়াই তথ্য বা জিনিসপত্র আদান-প্রদানের পদ্ধতির নাম। যখন কোনো স্পাই কারো সাথে সরাসরি দেখা করে তার হাতে কোনো তথ্য বা প্যাকেজ তুলে দেয়, তখন সেটাকে বলা হয় লাইভ ড্রপ। কিন্তু এতে যেকোনো একজনের উপর নজরদারি থাকলেই অপরজনেরও ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে লাইভ ড্রপের পরিবর্তে ডেড ড্রপই এসপিওনাজ জগতে বেশি জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে প্রথমে একজন স্পাই সবার অলক্ষ্যে পূর্বে থেকে নির্ধারিত কোনো স্থানে প্যাকেজটি রেখে আসে, এরপর অন্যজন সুবিধামতো সময়ে গিয়ে সেটি উদ্ধার করে আনে।
ডেড ড্রপ পদ্ধতিতে ফেলে আসা প্যাকেজটি যেন রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে, সেজন্য প্রায় সময়ই সেটিকে বিভিন্ন ছদ্মবেশ দেওয়া হয়। এই বিশেষ দিনে মার্থার হাতে যে প্যাকেজটি ছিল, সেটিকে দেওয়া হয়েছিল শুকনো গাছের গুঁড়ির ছদ্মবেশ। সিআইএ’র টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট হুবহু গাছের গুঁড়ির মতো দেখতে একটি ফাঁপা খোলস করেছিল। তার ভেতরেই মার্থা ভরে নিয়েছিলেন তাদের এজেন্ট ট্রাইগনের কাছে হস্তান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র – একটি ছোটো নোটবুকে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি; একটি বিশেষ কলম, যার ভেতরে লুকানো ছিল একটি মিনিয়েচার ক্যামেরা; ক্যামেরার সাথে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাইক্রো ফিল্ম এবং ক্যাসেট; এবং অদৃশ্য কালিতে লেখার জন্য বিশেষ ধরনের কার্বন পেপার।

পার্কের ভেতরে প্রবেশ করে মার্থা গুণে গুণে হেঁটে গেলেন নির্দিষ্ট একটি ল্যাম্পপোস্টের কাছে। রাত তখন প্রায় পৌনে দশটা। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। তারপরেও সাবধানতার জন্য মার্থা একটু থেমে নাক ঝাড়ার ভঙ্গি করলেন। এরপর টিস্যু পেপার বের করার সময় এক সুযোগে চট করে কোমরের পাশ থেকে বের করে নিলেন গাছের গুঁড়িটা। এরপর টিস্যু ফেলে দিয়ে জুতার ফিতা বাঁধার ভঙ্গি করে নিচু হয়ে বসে আস্তে করে গুঁড়িটা গড়িয়ে দিলেন রাস্তার পাশের নির্দিষ্ট ল্যাম্পপোস্টটির গোঁড়ার দিকে। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মস্কোর কনকনে শীতের মধ্য দিয়ে সেদিন রাতে মার্থা পিটারসন আরো ঘণ্টা দেড়েকের মতো হাঁটাহাঁটি করেছিলেন। এরপর এগারোটার দিকে আবার ফিরে এসেছিলেন সেই একই স্থানে। ল্যাম্পপোস্টের গোঁড়ার দিকে তাকিয়ে তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল। গাছের গুঁড়িটি সেখানে নেই। তার পরিবর্তে পড়ে আছে দুমড়ে-মুচড়ে থাকা ছোটো একটি দুধের প্যাকেট। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যেই ট্রাইগন এসে গাছের গুঁড়িটি নিয়ে গেছে। আর দুধের প্যাকেটের ভেতরে করে তার জন্য রেখে গেছে নতুন একটি প্যাকেজ, যার ভেতরে হয়তো আছে মস্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোপন কোনো ডকুমেন্ট, গোপন কোনো পরিকল্পনা।
প্যাকেটটি আস্তে করে তুলে পার্সের ভেতরে ভরে নিলেন মার্থা। এরপর ফিরে এলেন বাসায়। তার আজকের মিশন সফলভাবেই শেষ হয়েছে।
*** *** ***

মার্থা পিটারসনের গুপ্তচরবৃত্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এসপিওনাজ জগতে তিনি প্রবেশ করেছিলেন অনেকটা বাধ্য হয়ে, স্বামীর মৃত্যুর পর যখন তিনি দু’চোখে অন্ধকার দেখছিলেন, তখন। কিন্তু এর আগে সারা জীবন এসপিওনাজ জগত সম্পর্কে তিনি এতটাই উদাসীন ছিলেন যে, ১৯৬৯ সালে বিয়ের পর তার স্বামী জন পিটারসন যখন তাকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি সিআইএ-তে যোগ দিতে যাচ্ছেন, মার্থা তখন তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সিআইএ জিনিসটা কী? তারা কী করে?
জনের সাথে মার্থার পরিচয় হয়েছিল ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষে। ফিজিক্সের ছাত্র হলেও জনের সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি ভিয়েতনামে চলে যান যুদ্ধ করতে। ওদিকে মার্থা তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে তিনি শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। জন ভিয়েতনাম থেকে ফিরে আসার পর ১৯৬৯ সালে তারা বিয়ে করেন। পরের বছরই জন সিআইএ-তে যোগ দেন একজন প্যারামিলিটারি অফিসার হিসেবে।
সিআইএর অফিসার হিসেবে ১৯৭১ সালে জনের পোস্টিং হয় লাওসে। তার সাথে সেখানে গিয়ে ওঠেন মার্থাও। লাওস হচ্ছে ভিয়েতনামের পাশে অবস্থিত ছোট একটি রাষ্ট্র, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত-সমর্থিত কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গোপন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। জনের কাজ ছিল গোপনে লাওশিয়ান যুবকদেরকে টাকা দিয়ে রিক্রুট করা এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে, অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে নর্থ ভিয়েতনামিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো।

সময় কাটানোর জন্য মার্থা নিজেও সিআইএ’র স্থানীয় স্টেশনে ক্লার্ক হিসেবে চাকরি করতে শুরু করেন। কিন্তু তার জীবন থমকে দাঁড়ায়, যখন যুদ্ধের একপর্যায়ে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধক্ষেত্র তদারকি করতে গিয়ে জনের হেলিকপ্টার নর্থ ভিয়েতনামিজ সৈন্যদের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাদের একে-৪৭ রাইফেলের গুলিতে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয় এবং এতে আগুন ধরে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন জন।
মার্থা পিটারসনের বয়স তখন মাত্র ২৭ বছর। সদ্য বিধবা হয়ে যখন তিনি দু’চোখে অন্ধকার দেখছিলেন, তখন জনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে পরামর্শ দেয়, তার উচিত সিআইএ’র ক্ল্যান্ডেস্টাইন বিভাগে চাকরির জন্য আবেদন করা। তিনি তিনটা ভাষা জানতেন, স্বামীর কল্যাণে তার সিআইএর কার্যক্রম সম্পর্কে টুকটাক ধারণা ছিল, তিনি লাওসের মতো জায়গায় কঠিন পরিবেশে জীবন যাপন করেছেন, এবং তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং বুদ্ধিমতী- কাজেই তার চাকরি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
পরামর্শ অনুযায়ী মার্থা সিআইএর চাকরির জন্য আবেদন করেন। এবং যথাযথ ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের পর সিআইএ তাকে গ্রহণ করে। ১৯৭৩ সালের জুলাইর ৩ তারিখে, তার স্বামী জনের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন তিনি সিআইএতে যোগদান করেন। সে সময় সিআইএর অভ্যন্তরে নারী কেস অফিসার বলতে গেলে ছিলই না। যে অল্প কয়েকজন নারী সিআইএতে চাকরি করত, তাদের অধিকাংশেরই কাজ ছিল অফিসভিত্তিক রুটিন কাজ- নথিপত্র দেখাশোনা করা, বড়জোর তথ্য বিশ্লেষণ করা। কিন্তু মার্থা পিটারসন গোঁ ধরে ছিলেন – তিনি ফিল্ড এজেন্ট হিসেবেই চাকরি করবেন। তার বিশ্বাস, সেই যোগ্যতা তার আছে।

ট্রেনিংয়ের জন্য সিআইএ মার্থাকে ভার্জিনিয়ার “ফার্মে” পাঠায়। সেখানে তাকে এসপিওনাজ জগতের যাবতীয় কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফিল্ড এজেন্টদের প্রধান কাজ হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ করা। এবং সেজন্য তাদেরকে এমনসব মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, যারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে, যাদের হাতের নাগালে বিপুল পরিমাণ তথ্য আছে। মার্থার ট্রেনিংয়ের অন্যতম অংশ ছিল একদল লোকের মধ্য থেকে এ ধরনের সম্ভাব্য লোকদেরকে খুঁজে বের করা, তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সম্ভব হলে তাদেরকে রিক্রুট করার চেষ্টা করা।
ট্রেনিং শেষে শুরু হয় নতুন সমস্যা। সিআইএ মার্থাকে যেসব জায়গায় পোস্টিংয়ে পাঠাতে চাইছিল, মার্থা সেসব জায়গায় যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি পরপর জাতিসংঘে এবং বার্মায় পোস্টিংয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। কারণ তার মতে সেসব জায়গায় দায়িত্বগুলো ছিল খুবই মেয়েলি ধরনের, সেগুলোতে কোনো রকমের অ্যাডভেঞ্চার ছিল না। তিনি আগ্রহী ছিলেন পুরুষদের মতো ফিল্ডে গিয়ে কাজ করতে। ঠিক এরকম সময় একদিন তাকে ডেকে পাঠান সিআইএ’র মস্কো স্টেশন চীফ।
সত্তরের দশকে মস্কো ছিল সিআইএর জন্য সবচেয়ে কঠিন স্থান। মস্কোর রাস্তাঘাটে তখন কেজিবির এজেন্টরা গিজগিজ করত। যেকোনো আমেরিকান রাশিয়ায় পা দেওয়ামাত্রই কেজিবির গোয়েন্দারা তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত। প্রতিটা আমেরিকানই ছিল তাদের দৃষ্টিতে একেকজন সন্দেহভাজন। এরকম পরিস্থিতিতে সিআইএর মস্কো স্টেশন চীফ মার্থার মতো একজনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন। তিনি আশা করেন, যেহেতু কেজিবি জানে সিআইএ কোনো নারীকে ফিল্ড এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করে না, এবং যেহেতু মার্থারও অতীতে গুপ্তচরবৃত্তির কোনো ইতিহাস নেই, তাই তিনি হয়তো খুব সহজেই কেজিবির চোখ এড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে পারবেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পোস্টিংয়ের জন্য শুরু মার্থার নতুন ট্রেনিং। এবার তাকে শেখানো হয় বিভিন্ন স্পাইক্র্যাফ্ট বা স্পাইদের জন্য উপযোগী যন্ত্রপাতির ব্যবহার – কীভাবে চলন্ত গাড়ি থেকে মিনিয়েচার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে হয়, কীভাবে ডেড ড্রপ ফেলে আসতে বা উদ্ধার করতে হয়, কীভাবে গোপন তথ্য আদান-প্রদান করতে হয়। সেই সাথে শুরু হয় তার রাশিয়ান ভাষার কোর্স। দিনে আট ঘণ্টা করে দীর্ঘ দশ মাস ধরে তিনি রাশিয়ান ভাষা শেখেন। একইসাথে তিনি তাই-কোয়ান-দু নামে এক ধরনের ক্যারাটেও শেখেন, নিতান্তই শখের বশে।
অবশেষে সকল প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে মার্থা পিটারসন মস্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শুরু হয় তার নতুন অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ দ্বৈত জীবন। তার কভার পরিচয় হয় দূতাবাসের একজন ক্লার্ক হিসেবে। সকাল বেলা তার কাজ ছিল আমেরিকায় যেতে ইচ্ছুক রাশিয়ানদের সাক্ষাৎকার নেওয়া, তাদের কাগজপত্র প্রস্তুত করা। কিন্তু বিকেল বেলা তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। সে সময় তার কাজ মস্কোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এবং সম্ভাব্য ডেড ড্রপের উপযুক্ত লোকেশন বাছাই করা, যেখানে অনুসরণকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই সিআইএর এজেন্টরা তথ্য বিনিময় করতে পারবে।
মস্কোতে নামার পরপরই অবশ্য মার্থার সিআইএর জীবন শুরু হয়নি। প্রথম কয়েকমাস তার কাজ ছিল খুবই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা, যেরকমটা একজন দূতাবাসের ক্লার্কের করার কথা। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার, সোনালি চুলবিশিষ্ট মার্থা ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী। ৩০ বছর বয়সী একজন সুন্দরী তরুণীর বিদেশে গিয়ে যা করার কথা, মার্থা তাই করতে শুরু করেন। তিনি একটা সোভিয়েত গাড়ি কেনেন এবং অফিসের পর বিকেলে নিয়মিত বিভিন্ন পার্টিতে গিয়ে উচ্ছল সময় কাটাতে শুরু করেন। মার্থার ডাক নাম ছিল মার্টি। অত্যন্ত পার্টি-প্রিয় হওয়ার কারণে দূতাবাসের ভেতরে তার নাম হয়ে যায় পার্টি মার্টি।

কয়েকমাস এভাবে যাওয়ার পর যখন সিআইএর কর্মকর্তাদের মোটামুটি ধারণা হয় যে, মার্থা হয়তো তার কেজিবির অনুসরণকারীদেরকে সফলভাবে ধোঁকা দিতে পেরেছেন, তখন তাকে প্রথমবারের মতো ফিল্ডে নামানো হয়। এক সন্ধেবেলা মার্থা পরীক্ষামূলকভাবে SRR-100 সার্ভেইল্যান্স রিসিভারটি পরে দূতাবাস থেকে বের হন। প্রথমে যখন তার পাশে সিআইএর আরেকজন কেস অফিসার ছিল, তখন তিনি ইয়ার পিসের মধ্য দিয়ে শুনতে পাচ্ছিলেন রাশিয়ানরা বলাবলি করছে, “টার্গেট বেরিয়ে এসেছে, টার্গেট এখন ডানদিকে যাচ্ছে …“। কিন্তু যখনই মার্থা তাকে ছেড়ে রাস্তার অন্যদিকে মোড় নিয়ে একা হাঁটতে শুরু করেন, তখনই রিসিভার সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়। মার্থা বুঝতে পারেন, কেজিবির কাছে তিনি আর গুরুত্বপূর্ণ না। তারা তাকে দূতাবাসের সাধারণ একজন ক্লার্ক হিসেবেই বিশ্বাস করেছে।
সেদিন ফিরে এসে রিপোর্ট করার পরেই নতুন দায়িত্ব এসে পড়ে মার্থার উপর। তাকে এখন থেকে নিয়মিত মস্কোতে অবস্থিত সিআইএ এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, ডেড ড্রপ ফেলে তাদেরকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে হবে, এবং তাদের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে স্টেশনে এনে পৌঁছাতে হবে। এবং এদের মধ্যে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট হবে ট্রাইগন – সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করা সেই কর্মকর্তা, যে ছিল সে সময় মস্কোর অভ্যন্তরে সিআইএর সবচেয়ে মূল্যবান এজেন্ট।
*** *** ***

এজেন্ট ট্রাইগনের প্রকৃত নাম আলেক্সান্ডার দিমিত্রিভিচ ওগোরডনিক। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। ১৯৭০ সালে যখন কলম্বিয়ার সোভিয়েত দূতাবাসে সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে তার পোস্টিং হয়, তখন তিনি প্রথম সিআইএর নজরে পড়েন।
ওগোরডনিক আর দশজন সাধারণ সোভিয়েত কর্মকর্তার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন পশ্চিমের বিলাসবহুল জীবনের প্রতি আকৃষ্ট। তিনি দুই হাতে অর্থ ব্যয় করতেন, পার্টিতে যেতেন এবং অবাধে মেয়েদের সাথে মিশতেন। দেশে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বোগোটাতে তিনি দূতাবাসেরই আরেক কর্মচারীর স্ত্রী ওগলা সেরোভোর সাথে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রেম এবং পার্টির পেছনে দেদারসে টাকা উড়ানোর কারণে তার অর্থসংকট দেখা দিতে শুরু করলে তিনি কৌশলে দূতাবাসের একটি গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকা মেরে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সিআইএ সব সময়ই এ ধরনের দুর্নীতিবাজ এবং দুশ্চরিত্রের কর্মকর্তাদের সন্ধানে থাকে, যেন তাদেরকে ব্ল্যাকমেইল করে বিভিন্ন তথ্য আদায় করা যায়। ফলে তারা বোগোটার হিলটন হোটেলে ওগোরডনিকের সাথে একটি মিটিংয়ের আয়োজন করে এবং তাকে সিআইএর হয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। ওগোরডনিক তখন অর্থসংকটে ছিলেন, ফলে তিনি সহজেই রাজি হয়ে যান। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে তিনি সিআইএর হয়ে কাজ করতে শুরু করেন। সিআইএর অভ্যন্তরে তার কোড নেম হয় সিকে ট্রাইগন, যেখানে সিকে অংশটি হচ্ছে সোভিয়েত এজেন্টদের জন্য নির্ধারিত কোড।

সিআইএ ওগোরডনিককে গোপন নথিপত্রের ছবি তোলা, সাংকেতিক ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর ওগোরডনিক সিআইএর কাছে দূতাবাসের গোপন নথিপত্রের ছবি তুলে পাঠাতে শুরু করেন। কলম্বিয়ায় নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সাথে কলম্বিয়ান সরকারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও এসব নথিপত্রের মধ্যে ছিল অন্যান্য দক্ষিণ আমেরিকান রাষ্ট্রে সোভিয়েত কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত আলোচনা। তার দেওয়া তথ্যগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একবার মন্তব্য করেছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এরকম গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য আর দেখেননি।
১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ওগোরডনিককে মস্কোতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তার চাকরি হয় সোভিয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বিভাগে। এবং এরফলে শুধু দক্ষিণ আমেরিকা না, পুরো দুনিয়ার সবগুলো দেশের সোভিয়েত দূতাবাসের সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদান-প্রদানকৃত বার্তা, তাদের পরিকল্পনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদন চলে আসে ওগোরডনিকের হাতের মুঠোয়। তিনি হয়ে ওঠেন সোভিয়েত ইউনিয়নে সিআইএর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পাই।
ঠিক এরকম সময়ে মার্থা পিটারসনের পোস্টিং হয় সিআইএ’র মস্কো স্টেশনে। দায়িত্ব পেয়েই তিনি ওগোরডনিকের কাছে বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। ঠিক কবে, কোথায়, কীভাবে ডেড ড্রপ আদান-প্রদান করা হবে, সে সম্পর্কিত নির্দেশাবলি একটি কাগজে লিখে, সেটি একটি গাড়ির সিগারেট লাইটারের ভেতরে ভরে তিনি আস্তে করে ওগোরডনিকের গাড়ির গ্লাসের ফাঁক দিয়ে ফেলে দিয়ে আসেন। এরপর শিডিউল অনুযায়ী নিয়মিত তার সাথে তথ্য এবং প্যাকেজ আদান-প্রদান করতে থাকেন।

মার্থার সরবরাহ করা কলমের ভেতরে লুকানো মিনিয়েচার ক্যামেরা ব্যবহার করে ওগোরডনিক অফিসে বসেই সবার সামনে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের ছবি তুলে ফেলতেন। ফাইলগুলো টেবিলের উপর খুলে রেখে কলমটা হাতের মুঠোয় ধরে উপর থেকে পৃষ্ঠা বরাবর তাক করে কলমের ক্যাপের উপর চাপ দিলেই ছবি উঠে যেত। প্রতিটি ফিল্ম ৮০ পৃষ্ঠা করে ছবি ধারণ করতে পারত। ওগোরডনিক ফাইলগুলো পড়ার ভঙ্গি করে একের পর পৃষ্ঠা উল্টে যেতেন আর ক্যাপ চেপে চেপে ছবি তুলে ফিল্মে সংরক্ষণ করে রাখতেন। পরে নির্ধারিত দিন ডেড ড্রপের মাধ্যমে সেগুলো ফেলে আসতেন মার্থার জন্য।
১৯৭৫ সালের শুরু থেকে ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মার্থা পিটারসন এরকম ১২টি প্যাকেজ বিনিময় করেছিলেন এজেন্ট ট্রাইগনের সাথে। কিন্তু ১৯৭৭ সালের শুরুর দিক থেকে তার পাঠানো তথ্যের মান নিয়ে সিআইএ’র সন্দেহ হতে শুরু করে। এবং এরপর জুনের ২৬ তারিখে মার্থা যখন ডেড ড্রপ ফেলে এক ঘণ্টা পর ফিরে আসেন, তখন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। গভীর রাত, প্রচণ্ড বৃষ্টি, এর মধ্যেই মার্থা দেখতে পান, পার্কের বাইরে একটা সাদা রংয়ের ভ্যান পার্ক করা আছে। ভ্যানের ভেতরে হালকা বাতি জ্বলছে।
আতঙ্কে মার্থার সারা শরীর অবশ হয়ে আসে। এরা কি কেজিবির এজেন্ট? তার উপর নজরদারি করছে? দ্রুত পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়েন তিনি। এবং সেখানে হঠাৎ করেই অন্ধকার ফুঁড়ে তার সামনে উদিত হয় টর্চ হাতে, রেইনকোট গায়ে দেওয়া বিশালদেহী এক ছায়ামূর্তি। দুজন দুজনের দিকে এক মুহূর্তে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তারা। এরপরই দুজন দুজনকে পাশ কাটিয়ে চলে যান। পার্কের ভেতরে একটু আড়ালে গিয়েই একটা বেঞ্চের উপর বসে পড়েন মার্থা। তার শরীরের সব শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। একেকটা মিনিট যেন তার কাছে একেকটা ঘণ্টা বলে মনে হচ্ছিল।

অবশেষে মিনিট বিশেক পর সাহস সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ান তিনি। অন্যদিক দিয়ে ঘুরে উঁকি দেন ভ্যানটার দিকে। না, কোথাও কিছু নেই। চলে গেছে ভ্যানটা। রহস্যময় সেই লোকটাও কোথাও নেই। ফিরে গিয়ে নির্ধারিত ল্যাম্প পোস্টের নিচে উঁকি মারেন মার্থা। এবং দেখতে পান তার ফেলে যাওয়া কাঠের গুঁড়িটি তখনও পড়ে আছে আগের জায়গাতেই। দীর্ঘদিনের মধ্যে এই প্রথম ট্রাইগন তার শিডিউল মিস করেছেন। তবে কি আসলেই কোনো বিপদে পড়েছেন তিনি? কেজিবির নজরে পড়ে গেছেন?
মার্থা স্টেশনে ফিরে আসার পর সিআইএ সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ট্রাইগনকে নতুন আরেকটি ডেড ড্রপের তারিখ দেবে। ট্রাইগনের সাথে যোগাযোগ করার জন্য সিআইএর আরেকটি মাধ্যম ছিল। যদি সরল, একমুখী কোনো নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হতো, তাহলে সিআইএ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পশ্চিম জার্মানির একটি রেডিও স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট একটি ফ্রিকোয়েন্সি থেকে কতগুলো নাম্বার পড়ে শোনাত। ট্রাইগন ঐ নাম্বারগুলো টুকে নিতেন এবং এরপর পূর্ব নির্ধারিত কোড দিয়ে ডিসাইফার করে তার অর্থ উদ্ধার করতেন।
রেডিও স্টেশন থেকে সিআইএ ট্রাইগনকে নির্দেশ দিলো, জুলাইয়ের ১৫ তারিখ নতুন প্যাকেজ বিনিময়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি যদি প্রস্তুত থাকেন, তাহলে যেন সেদিন সকালে রাস্তার পাশের একটি নির্দিষ্ট সাইনবোর্ডের গায়ে একটি লাল রংয়ের বৃত্ত এঁকে দেন। ১৫ তারিখ সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার সময় মার্থা উঁকি মেরে দেখলেন, ঠিকই সাইনবোর্ডটিতে একটি লাল রংয়ের বৃত্ত এঁকে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সেদিন রাতে ট্রাইগন ডেড ড্রপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছেন। যদিও নিখুঁত গোল করে কোনো কিছুর ছাঁচে ফেলে আঁকা বৃত্তটি দেখে মার্থার মনে একবার সন্দেহ উঁকি দিয়েছিল যে, ট্রাইগন কেন এতটা নিখুঁত করে দাগ দেবেন; কিন্তু শেষপর্যন্ত ভাবনাটাকে খুব একটা পাত্তা দিলেন না তিনি। প্রস্তুতি নিতে লাগলেন সন্ধ্যার অভিযানের জন্য।
*** *** ***

১৫ জুলাই, ১৯৭৭। মার্থা পিটারসন হাজির হয়েছেন লেনিন সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামের নিকটে মস্কো নদীর উপরে অবস্থিত ক্রাসনোলুজস্কি ব্রিজের সামনে। এটাই আজ তার ডেড ড্রপ লোকেশন। সম্ভাব্য অনুসরণকারীকে খসানোর জন্য অন্যান্যবারের মতো আজও তিনি এখানে এসেছেন বিস্তর পথ ঘুরে। এবং ব্রিজে ওঠার আগেও তিনি আশেপাশে ভালো করে খুঁজে দেখেছেন, কানে লাগানো ট্রান্সমিটার রিসিভারে ভালো করে শোনার চেষ্টা করেছেন, না কোথাও কেউ নেই।
মার্থার সাথে তার পার্সের ভেতরে আছে ট্রাইগনের উদ্দেশ্যে ফেলে যাওয়ার জন্য একটি প্যাকেজ। তবে অন্যান্যবারের মতো এটি দেখতে গাছের গুঁড়ির মতোও না, সিগারেটের প্যাকেটের মতোও না। এবারের প্যাকেজটি নিরেট একখণ্ড কনক্রিটের মতো। বিষমাকৃতির কনক্রিটের টুকরোটির গায়ে চারটি স্ক্রু লাগানো আছে, যা খুব ভালো করে লক্ষ্য না করলে কারো চোখে পড়বে না। কিন্তু চোখে পড়লেও অনেকেই স্ক্রুগুলো প্রথম চেষ্টায় খুলতে পারবে না। কারণ সাধারণ স্ক্রু যেখানে খুলতে হয় ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে, সেখানে এই স্ক্রুগুলো খুলতে হবে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরিয়ে। আর স্ক্রুগুলো খুললেই ফাঁপা কনক্রিটের বক্সের ভেতরে পাওয়া যাবে ট্রাইগনের জন্য সিআইএর সরবরাহ করা জিনিসগুলো।
রাত সাড়ে দশটার সময় মার্থা ব্রিজের একটি নির্দিষ্ট পিলারের খুপরির ভেতরে আস্তে করে কনক্রিটের টুকরোটি রেখে দিলেন। এরপর ব্রিজ থেকে নেমে আসতে লাগলেন। ব্রিজ থেকে রাস্তায় এসে নামতে যখন আর মাত্র চারটি সিঁড়ি বাকি, ঠিক তখন হঠাৎ তার সামনে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ালো তিনজন দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ রাশিয়ান পুরুষ। তাদের একজন চিৎকার করে উঠল, “ধর ওকে, কোনোভাবে যেন পালাতে না পারে।“

মার্থার পালানোর উপায় ছিল না। তিনজন শক্ত সমর্থিত পুরুষ তাকে ধরে রেখেছিল। কিন্তু তারপরেও তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট, আমাকে তোমরা আটক করতে পার না।” তার চিৎকার করার অন্য একটা উদ্দেশ্যও ছিল। ট্রাইগন যদি প্যাকেজ নেওয়ার জন্য আশেপাশে উপস্থিত হয়ে থাকেন, তাহলে যেন চিৎকার শুনেই সাবধান হয়ে যেতে পারেন।
লোকগুলো মার্থার চিৎকার অগ্রাহ্য করে তার হাত থেকে পার্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পার্স রক্ষা করার জন্য মার্থা যখন তার হাত ঝাড়া দেন, তখন তার বাহু ধরে রাখা একজনের হাত সরে গিয়ে তার বুকের পাশে রাখা ট্রান্সমিটারে গিয়ে ঠেকে। লোকগুলোর ধারণা হয়, সেখানে হয়তো পিস্তল বা অন্য কোনো অস্ত্র রাখা আছে। তারা তার বুকের ভেতরে হাত দিয়ে ট্রান্সমিটারটা বের করার চেষ্টা করতে থাকে।
এতে মার্থা আরো ক্ষেপে যান। তিনি তার ক্যারাটের বিদ্যা প্রয়োগ করে একাই তিনজনের সাথে মারামারি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু একপর্যায়ে তাদের সামনে একটি ভ্যান এসে থামে। সেখান থেকে আরো আরো কয়েকজন নেমে এসে যোগ দিলে মার্থাকে হার মানতে হয়। তারা তার বুকের পাশ থেকে ট্রান্সমিটারটা বের করে নেয়। কিন্তু ধরা পড়ার আগে তিনি প্রায় সবাইকে কম-বেশি জখম করতে সক্ষম হন। তার লাথি খেয়ে কেজিবির এক এজেন্টকে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

সেদিন গভীর রাতে কেজিবি সদস্যরা মার্থাকে নিয়ে হাজির হয় মস্কোর কুখ্যাত লুবিয়াঙ্কা প্রিজনে। কেজিবির একজন ইন্টারোগেটর মার্থাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে থাকেন। কিন্তু মার্থা কিছুই স্বীকার করেননি। তিনি জানতেন, ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট থাকার কারণে তারা তাকে আটক করেও রাখতে পারবে না, নির্যাতন করেও তার কাছ থেকে কোনো তথ্য বের করার চেষ্টা করতে পারবে। সকালের আগেই তাকে ছেড়ে দিতে হবে।
কেজিবির এজেন্টরা ঘটনাস্থল থেকে কনক্রিটের প্যাকেজটিও উদ্ধার করে এনেছিল। প্রশ্নকর্তা মার্থার সামনেই প্যাকেজটি খুলে এক এক করে ভেতরের জিনিসগুলো বের করতে শুরু করেন। অন্যান্য জিনিসের সাথে সেখানে একটি কলমও ছিল, যার ভেতরে ছিল আরেকটি উন্নত মডেলের মিনিয়েচার ক্যামেরা। কলমটি দেখামাত্রই প্রশ্নকর্তা সেটিকে একপাশে সরিয়ে রাখেন এবং সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “খবরদার, কেউ এটা ধরবে না।“
তার মুখ থেকে এই কথা শোনামাত্র মুষড়ে পড়েন মার্থা পিটারসন। তিনি বুঝতে পারেন, ট্রাইগন সম্ভবত ধরা পড়ে গেছে। কারণ কেজিবির হাতে ধরা পড়লে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে ট্রাইগন সিআইএর কাছে আত্মহত্যার জন্য এল-পিল তথা লিথাল পিল বা বিষাক্ত ট্যাবলেট চেয়েছিলেন। তার অনুরোধের প্রেক্ষিতে মার্থা নিজেই সেই ট্যাবলেট সরবরাহ করেছিলেন। এবং সেটি ছিল হুবহু এরকমই একটা কলমের ভেতর। ট্রাইগন যদি ধরা না পড়ে থাকে, তাহলে কেজিবির কলমটাকে সন্দেহ করার কথা ছিল না।

মার্থা ধরা পড়েছিলেন রাত সাড়ে দশটার সময়। রাত দুটোর দিকেই কেজিবি তাকে ছেড়ে দেয়। পরদিন সকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্থাকে পার্সোনা নন গ্র্যাটা তথা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়। ফলে মাত্র দুই বছরের গুপ্তচরবৃত্তির জীবনের সমাপ্তি টেনে দেশে ফিরে আসেন মার্থা।
এজেন্ট ট্রাইগন তথা আলেক্সান্ডার ওগোরডনিকের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছিল, সেটা দীর্ঘদিন পর্যন্ত সিআইএর কাছে অজানা রয়ে যায়। বহু বছর পর তারা জানতে পারে, সিআইএ’র এক সাবেক কর্মকর্তাই ট্রাইগনের পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছিল কেজিবির কাছে। কয়েকমাস নজরদারি করার পর কেজিবি ট্রাইগনের বাসায় অভিযান চালায়। বাধা দিয়ে লাভ নেই, তাই ট্রাইগন সহজেই আত্মসমর্পণ করেন।
তিনি কেজিবিকে বলেন, তাকে কিছু কাগজ আর তার কলমটা দিলে তিনি তার সকল অপরাধের লিখিত স্বীকারোক্তি দিবেন। কেজিবি যখন কাগজ এবং তার ফাউন্টেইন পেনটা তার হাতে তুলে দেয়, তখন তিনি তা দাঁতের নিচে নিয়ে কামড় বসিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে সিআইএর দেওয়া সেই বিষাক্ত ট্যাবলেট-যুক্ত কলমটা থেকে বিষ বেরিয়ে তার মুখ থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে আলেক্সান্ডার ওগোরডনিকের।
দিনটি ছিল ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন, যেদিন মার্থার ফেলে যাওয়া ডেড ড্রপ মিস করেছিলেন তিনি।
এই আর্টিকেলটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে “অত্রিক” নামক চ্যারিটি ম্যাগাজিনে, যেখানে স্থান পেয়েছে দেশের জনপ্রিয় ৮৩ জন লেখকের লেখা। ৩৮৭ পৃষ্ঠার বিশাল এই ম্যাগাজিনটির পিডিএফ আগামী ৩ জুন পর্যন্ত আপনি ডাউনলোড করতে পারবেন শুভেচ্ছা মূল্য ৫০ টাকা দিয়ে। ম্যাগাজিন থেকে অর্জিত সকল টাকা ব্যয় করা হবে করোনায় আক্রান্তদের পেছনে।
ম্যাগাজিনটি সংগ্রহ করতে ইনবক্স করুন দাতব্য সংস্থা লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেজে। অথবা সরাসরি ক্লিক করুন লাইটারের ওয়েবসাইটে।