হারাল্ড ব্লুটুথ: ব্লুটুথ প্রযুক্তির নামকরণ যে ভাইকিংয়ের নামে

বর্তমানে ব্লুটুথ শব্দটির সাথে পরিচিত নয় এমন কাউকে হয়তো আমদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সস্তা মোবাইল থেকে শুরু করে নামীদামী কোম্পানির মোবাইল, টেলিভিশন, ল্যাপটপ, হেডফোন সহ কয়েকশত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ব্লুটুথ টেকনোলজি। তবে সবাই এই ব্লুটুথ টেকনোলজির সাথে পরিচিত হলেও এই ব্লুটুথ টেকনোলজির নাম কেন ব্লুটুথ বা নীল দাঁত রাখা হয়েছে তা আমরা অনেকেই জানি না।

ব্লুটুথ টেকনোলোজির নামকরণ হয়েছিল এক ভাইকিং রাজার নামে; Source: logok.org

ব্লুটুথ টেকনোলজির নামকরণ করা হয় দশম শতাব্দীর এক ভাইকিং রাজার নামানুসারে। এই নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি মজার ঘটনা। তবে তা জানার আগে চলুন আমরা জেনে নিই কে ছিলেন সেই ভাইকিং রাজা।

হারাল্ড ব্লুটুথের পরিচয়

হারাল্ড ব্লাটান্ড গোর্মসন হলেন সেই ভাইকিং রাজা যার নামানুসারে ব্লুটুথ টেকনোলজির নামকরণ করা হয়। ব্লাটান্ড (Blåtand) শব্দের অর্থ ব্লুটুথ বা নীল দাঁত। জানা যায়, এই রাজার মুখের একটি দাঁত ছিল নষ্ট। নষ্ট এই দাঁতটি দেখতে ছিল নীল রঙের। সে জন্যই এই রাজা ‘হ্যারল্ড ব্লুটুথ’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও রাজার এই নামের পেছনে আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। সেটি হলো, রাজা হারাল্ডের প্রিয় ফল ছিল ব্লুবেরি। তিনি সবসময় এই ব্লুবেরি খেতে ভালোবাসতেন। ফলে রাজার দাঁতের রং নাকি নীল বর্ণের হয়ে গিয়েছিল। আর সেই জন্যই নাকি রাজাকে ব্লুটুথ নামে ডাকা হতো।

রাজা হারাল্ড ব্লুটুথ; Source: ancientpages.com

সে যা-ই হোক, রাজা ব্লুটুথ ছিলেন ডেনমার্কের অন্যতম বিখ্যাত একজন রাজা। তিনি ছিলেন একজন ভাইকিং। তার জন্মের সঠিক সময় জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় ৯২০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হারাল্ড ব্লুটুথের পিতা ছিলেন গোর্ম দি ওল্ড, যিনি হলেন ইতিহাস স্বীকৃত ডেনমার্কের সর্বপ্রথম রাজা। ৯৩৬-৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল এই গোর্ম দি ওল্ডের রাজত্বকাল। হারাল্ডের মা ছিলেন রানী থাইরা।

পুত্রের মৃত্যু সংবাদ পেলেন রাজা গোর্ম; Source: ancient-origins.net

৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রাজা গোর্ম দি ওল্ডের প্রিয় পুত্র ও হারাল্ডের ভাই আয়ারল্যান্ডের একটি আক্রমণে ইংল্যান্ডে নিহত হন। ফলে ভাইয়ের মৃত্যুর পর ডেনমার্কের রাজা হন হারাল্ড ব্লুটুথ। তিনি ৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে প্রায় ৩০ বছর ডেনমার্কে রাজত্ব করেন। তৎকালীন সময়ে ডেনমার্কে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্র ছিল। এসব গোত্রের ভিতর লেগে থাকতো নানা ধরনের কলহ।

রাজা গর্ম দি ওল্ড সর্বপ্রথম এই ক্ষুদ্র গোত্রগুলোকে একত্র করার চেষ্টা করেন। গর্মের মৃত্যুর পর ব্লুটুথ সিংহাসনে বসে এই গোত্রগুলোকে আবার একত্রিত করার কাজ শুরু করেন এবং শেষমেশ সবাইকে একত্রিত করতে সমর্থ হন। এ সময় তিনি ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বহু উন্নয়ন সাধন করেন। পুরনো দুর্গগুলো মেরামতের পাশাপাশি নতুন অনেক দুর্গ গড়ে তোলেন তিনি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এসব উন্নয়নের ফলে পরবর্তীতে নরওয়ে ও জার্মানদের বহু আক্রমণ থেকে তিনি তার দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

নিজ রাজ্যে শান্তি স্থাপনের পর ব্লুটুথ অন্য রাজ্যের দিকে নজর দেন। ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ের সাবেক রাজা এরিক ব্লাডএক্স একটি যুদ্ধে ইংল্যান্ডের নর্থ উম্ব্যারল্যান্ডে নিহত হন। ফলে এরিকের স্ত্রী ও ব্লুটুথের বোন গানহিল্ড তার পাঁচ পুত্রকে নিয়ে নরওয়েতে পালিয়ে যান। তৎকালীন সময়ে নরওয়ের রাজা ছিল হাকোন দি গুড। ব্লুটুথ ঠিক করেন তিনি তার ভাগ্নেদের নিজেদের রাজ্য হাকোনের হাত থেকে ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করবেন। ব্লুটুথের সাহায্যের ফলে পতন ঘটে রাজা হাকোনের এবং নরওয়ের রাজা হন এরিক দি ব্লাডএক্সের এক পুত্র দ্বিতীয় হারাল্ড গ্রেক্লোক। পরবর্তীতে দ্বিতীয় হারাল্ড আততায়ীর হাতে নিহত হলে ব্লুটুথ নরওয়ে নিজের দখলে নিয়ে নেন এবং কয়েক বছর নরওয়ে শাসন করেন।

লাল অংশ দিয়ে রাজা ব্লুটুথের রাজত্ব দেখানো হয়েছে; Source: wikimedia.org

ঠিক এই সময়ে ডেনমার্কে ধীরে ধীরে খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার ঘটছিল। শুধু যোগ্য শাসক হিসাবেই নয় হারাল্ড ব্লুটুথ ডেনমার্কে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারক হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন। ব্লুটুথের বাবা গোর্ম ছিলেন নর্ডিক দেবতাদের একনিষ্ঠ পূজারি। কিন্তু ব্লুটুথের মা থাইরার ছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অসীম আগ্রহ, যা পরবর্তীতে ব্লুটুথের মধ্যেও বিকাশ লাভ করে। ফলে ব্লুটুথ খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি ডেনমার্ক থেকে পুরনো বহু পৌত্তলিক রীতিনীতি দূর করে খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার ঘটান। তার সময় ডেনমার্কের বেশিরভাগ মানুষ খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণ করে।

সৈন্যদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা দিচ্ছেন রাজা ব্লুটুথ; Source: ancientpages.com

৯৮৫ মতান্তরে ৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা ব্লুটুথের বিরুদ্ধে তার ছেলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ বিদ্রোহের সময় একটি যুদ্ধে এক তীরের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন রাজা হারাল্ড ব্লুটুথ।

রাজা ব্লুটুথের ইতিহাস তো জানা হলো। এবার চলুন কিভাবে ব্লুটুথ টেকনোলোজির নামকরণ করা হয়েছিল তা জেনে নিই।

ব্লুটুথের নামকরণের ইতিহাস

বর্তমানে আমরা যে ব্লুটুথ টেকনোলজি দেখছি তার নাম ব্লুটুথ হওয়ার কথা ছিল না। ১৯৯৬ সালে ইন্টেল, এরিকসন, নোকিয়া ও আইবিএমের একটি মিলিত সংগঠন ঠিক করে তারা নতুন এক তারবিহীন প্রযুক্তির সূচনা করবে। এ সময় প্রত্যেক কোম্পানিই তাদের নিজেদের স্বল্পদৈর্ঘ্য বেতার প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছিল। কিন্তু কেউই এই প্রযুক্তির উপযুক্ত কোনো নাম খুঁজে পাচ্ছিল না।

এ সময় একদিন ইন্টেলের এক প্রকৌশলী জিম কারদাক ও এরিকসনের এক প্রকৌশলী সেভেন ম্যাটিসন একটি প্রতিযোগিতায় হেরে যাবার পর একসাথে একটি বারে মদ পান করতে যান। মদ পান করার ফাঁকে ফাঁকে তাদের মধ্যে ইতিহাস নিয়ে গল্প হতে থাকে।ম্যাটিসন কয়েকদিন আগেই দি লংশিপ নামে একটি বই পড়েছিলেন। সেই বইয়ে রাজা হারাল্ড ব্লুটুথের একটি কাহিনী উল্লেখ ছিল। ম্যাটিসন সেটি জিমকে গল্পের ফাঁকে বলেন। পরে ইতিহাস প্রেমী জিম বাসায় ফিরে দি ভাইকিংস নামে একটি বই পড়েন। সেখানে তিনি রাজা ব্লুটুথের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন যা পরবর্তীতে তারবিহীন এই প্রযুক্তির নামকরণের সময় তার মাথায় আসে। এক লেখায় জিম বলেন, হারাল্ড ডেনমার্কের বিভিন্ন গোত্রকে একত্রিত করেছিল ও তাদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার করেছিল। আমার মনে হয়েছিল এ কারণেই নতুন এই তারবিহীন প্রযুক্তিটির নাম ব্লুটুথ রাখা যেতে পারে। কারণ এ প্রযুক্তি অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ডিভাইসকে একত্রিত করবে।

জিমের আঁকা শিলা চিত্র; Source: businessinsider.co

জিম পরবর্তীতে তার নামকরণটি সবার কাছে উপস্থাপনের জন্য পাওয়ার পয়েন্টে একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করেন। এ সময় তিনি হারাল্ড ব্লুটুথের এক হাতে একটি মোবাইল ফোন ও অন্য হাতে একটি ল্যাপটপ যুক্ত একটি নকল শিলা চিত্রও তৈরি করেন। কিন্তু এর পরও আইবিএমের প্রস্তাবিত নাম PAN (Personal Area Networking) কে নির্বাচিত করা হয়। তবে পরে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের (SEO) সময় কিছু সমস্যার কারণে এটি বাতিল করা হয়। ফলে শেষমেশ এই প্রযুক্তির নাম অফিসিয়ালভাবেই ব্লুটুথ রাখা হয়, যা পরবর্তীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ব্লুটুথের লোগো আসলে দুটি নর্ডিক অক্ষরের সমন্বয়; Source: ancient-origins.com

নামকরণের পাশাপাশি ব্লুটুথ টেকনোলোজির লোগোটিরও কিন্তু রয়েছে একটি বিশেষত্ব। এতদিন ধরে হয়তো ব্লুটুথ লোগোটি দেখে আপনি মনে করেছিলেন এমনি কয়েকটি সরলরেখাকে বিশেষভাবে সাজিয়ে এখানে একটি B তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। লোগোর এই B টি আসলে নর্ডিক ভাষার H ও B এর মিলনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, যা আসলে Harald Bluetooth এর নামের আদ্যক্ষর। এই দুটি অক্ষরকে একত্র করার ফলে তা একটি B অক্ষরের রূপ নিয়েছে এবং পরিণত হয়েছে আমাদের বর্তমানের বহুল প্রচলিত ব্লুটুথের লোগোতে। আজ থেকে ১,০০০ বছর আগে সেই ভাইকিং রাজা মারা গেলেও এখনো তার নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের পকেটে পকেটে!

ফিচার ইমেজ – youtube.com

Related Articles

Exit mobile version