Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট: পাকিস্তানী নৃশংসতার ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি

১৯৭১ সালে রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় সেনাবাহিনী আর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ১৬ ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণ এবং ১৮ তারিখ ভারতের সাথে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পরে, অনেক না বলা ব্যর্থতার দায়ভার কাধে নিয়ে ২০ ডিসেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ইয়াহিয়া খান।1

জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ইয়াহিয়া খান; Source: dailyasianage.com

পূর্ব পাকিস্তানে এই বিশাল পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিরা ততক্ষণে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। আত্মসমর্পণের দশ দিনের মাথায় ২৬ ডিসেম্বর, পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিশন গঠন করেন। এই দলের বাকি দুই সদস্য পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এস আনোয়ারুল হক ও বেলুচিস্তানের প্রধান বিচারপতি তোফায়েল আলী আবদুর রহমান।

উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এই কমিশনকে, পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি সংগ্রামের মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি থেকে শুরু করে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর অসহায় আত্মসমর্পণ পর্যন্ত বিষয়গুলো তদারক করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া খান থেকে শুরু করে নৌ, সেনা, বিমান বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রী, আমলা আর বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাসহ ২১৩ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদনের প্রথম অংশ তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনের প্রথম অংশ ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে জমা দেওয়া হয় ভুট্টোর কাছে। ভারতের কারাগার থেকে ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর মুক্তির পরে ১৯৭৪ সালে এই কমিশন আবার কাজ শুরু করে। দ্বিতীয় ধাপে উচ্চপদস্থ কূটনীতিক এবং মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রে সরাসরি যুক্ত থাকা সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৩ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়।

১৯৭৪ সালের নভেম্বরে প্রথম রিপোর্টের সম্পূরক রিপোর্ট হিসেবে এই রিপোর্ট হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করে হামুদুর রহমান কমিশন। ৬৭৫ পৃষ্ঠার এই বিশাল প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে ভারতের কাছে যুদ্ধবন্দী হিসেবে থাকা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, কমান্ডার জেনারেল জামশেদ খান, রিয়াল এডমিরাল শরীফ এবং কমান্ডার এনামের জবানবন্দী।

হামুদুর রহমানের সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টো; Source: commons.wikimedia.org

দীর্ঘ এই প্রতিবেদনকে মূলত পাঁচটি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে । প্রথম অংশে এই প্রতিবেদন তৈরির প্রেক্ষাপট, দ্বিতীয় অংশে পাকিস্তান আমল এবং সেই সময়ের নানা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তৃতীয় অংশে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, চতুর্থ অংশে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক কৌশল, পঞ্চম অংশে আছে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় পর্যন্ত পাকিস্তানী প্রেসিডেন্টসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের নৈতিক অধঃপতনের বিবরণ। পাশাপাশি এই অংশে মুক্তিযুদ্ধে নৈতিক অধঃপতনের এবং বিশাল সামরিক পরাজয়ের জন্য পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের শাস্তির সুপারিশও করা হয়েছিল।

কিন্তু হামুদুর রহমান কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে ভালো দৃষ্টিতে দেখেনি পাকিস্তান সরকার। এই প্রতিবেদনে যেহেতু যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে তাই সেটিকে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছিল পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনেরা। কড়া নিরাপত্তায় হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট তালাবন্দী করা হয় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ক্যাবিনেট ব্লকে। দীর্ঘদিন পর জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক সরকার ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই রিপোর্টের অংশবিশেষ প্রকাশ করে। ভারতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এই প্রতিবেদনের কিছু চাঞ্চল্যকর সম্পূরক অধ্যায় প্রকাশ করে দেয়। ফলে পাকিস্তানজুড়ে এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে তৈরি হয় তীব্র কৌতুহল। শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদনের স্পর্শকাতর অংশ কাটছাঁট করে বাকী অংশ অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রকাশ করতে হয়েছিল পারভেজ মোশাররফ।2

জেনারেল পারভেজ মোশাররফ; Source: commons.wikimedia.org

তবে এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে অনেকটাই নিস্পৃহ মন্তব্য পাওয়া গেছে তার কাছ থেকে। ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে পারভেজ মোশাররফ ব্যাখ্যা দিয়েছেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক এবং সামরিক বিপর্যয় রূপেই। তদন্ত প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা, লুটপাট কিংবা সামরিক কর্মকর্তাদের নৈতিক অধঃপতনের প্রমাণ দেখিয়ে, দোষী সেনা কর্মকর্তাদের শাস্তি যে সুপারিশ করা হয়েছে কিংবা এ ধরনের অপরাধের কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার যে যৌক্তিক দাবী ইদানীং উঠে এসেছে, সেই ব্যপারটিকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন তিনি।3

তদন্ত শুরু

মুক্তিযুদ্ধের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িতদের সাক্ষ্য নেওয়ার মাধ্যমেই তদন্ত কাজ শুরু করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের শহর রাওয়ালপিন্ডিতে কমিশনের প্রথম বৈঠক বসে। সেখানে প্রথম দিনেই সাক্ষ্য জমা পড়ে প্রায় তিন শতাধিক। তবে শুরু থেকেই এই কমিশনের উপরে নির্দেশ ছিল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণের ব্যাপারে।

হামুদুর রহমান কমিশনকে তার কাজ শুরুর ৯০ দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রায় ২১৩ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মহাযজ্ঞ, যাচাই বাছাই শেষ হয় সাড়ে ছয় মাসে।4

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অপকর্মের তদন্ত দলিল

এই রিপোর্টে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে আনা কিছু অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করে এর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন, ২৫ এবং ২৬ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘সামরিক অভিযান’ চালানোর সময় অতিমাত্রায় সৈন্যবল এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষকসহ নানা পেশার মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা এবং গণকবরের ব্যাপারেও অনেক যুদ্ধফেরত তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই রিপোর্টে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা এবং আক্রমণ, পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিশোধ এবং নির্যাতনের অস্ত্র হিসেবে নারী ধর্ষণের ব্যাপারটি নিয়েও তদন্ত করা হয়েছে।5

লে. জেনারেল নিয়াজি এসব অপকর্মের বেশিরভাগের দায়দায়িত্ব তার পূর্ববর্তী সামরিক অফিসার লে. জেনারেল টিক্কা খানের উপরই চাপিয়ে দিয়েছেন। জেনারেল নিয়াজি তার জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে শক্তি প্রয়োগ করেই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। আর এই শক্তি প্রয়োগের ফলাফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার কোনো ধারণাই ছিলো না পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের। জায়গায় জায়গায় স্থানীয় মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপরে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজের দেশের নিরস্ত্র মানুষের কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। নিরস্ত্র মানুষ যখনই প্রতিরোধের চেষ্টা করেছে ততটাই নির্মম হয়েছে জেনারেল টিক্কা খান।

‘পূর্ব পাকিস্তানের কসাই’ জেনারেল টিক্কা খান; Source: commons.wikimedia.org

এ কারণেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার কপালে উপাধি জুটেছিলো ‘পূর্ব পাকিস্তানের কসাই’। পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের প্রথম থেকেই বিদেশী সাংবাদিকদের বহিষ্কার বর্হিবিশ্বকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গতিবিধি নিয়ে সন্দিহান করে তোলে।6

টিক্কা খানকে সরিয়ে ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়ভার দেওয়া হয় জেনারেল নিয়াজির কাঁধে। তার দাবী অনুযায়ী কমান্ড গ্রহণের পরেই তিনি লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে জোর দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত সেনাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছিলেন নিয়াজি। তার দেওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরে জানতে পারেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে লুট করা ফ্রিজ, গাড়ি, এয়ার কন্ডিশনারসহ মূল্যবান দ্রব্যাদি পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে। তবে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হিন্দু নিধনের যে অভিযোগ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে সেটি নিয়াজি অস্বীকার করেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারটিও তিনি অস্বীকার করেন।7

পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজি; Source: commons.wikimedia.org

তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তার জবানবন্দী থেকে এটি স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচার গণহত্যা চলেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল মনুসুরুল হকের জবানবন্দী থেকে জানা যায়, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ বা মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত না করেই এবং বিচার বিভাগের আদেশ ছাড়াই ‘বাংলাদেশে’ পাঠানো হতো!

মূলত ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার একটি সাংকেতিক নাম। আর এই ঘটনার সংখ্যা যত বাড়তে থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থাকা বাঙ্গালী সদস্যদের মধ্যেও তত বেশি চঞ্চলতা বাড়তে থাকে। এই ব্যাপারগুলোও চোখ এড়িয়ে যায়নি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের। ১৯৭১ সালের ২৭-২৮ মার্চে কুমিল্লা সেনাছাউনিতে ঘটে যায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা। লে. জেনারেল ইয়াকুব মালিকের নির্দেশে সতেরোজন বাঙ্গালী অফিসার এবং অন্য ৯১৫ জনকে হত্যা করা হয়।8

২৯ পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস. এস. এইচ. বোখারি তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রংপুরে দুজন বাঙ্গালী অফিসার এবং ত্রিশজন সৈনিককে বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়। অন্য এক সাক্ষাৎকারে লে. কর্নেল এস. এস. নঈম স্বীকার করেন, ঢাকার বাইরে সামরিক অভিযানের সময় বিপুল সংখ্যক নিরস্ত্র মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।আরেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আজিজ আহমদ খানের বিবৃতি থেকে জানা যায় যে, জেনারেল নিয়াজি তার অধীনে থাকা বগুড়া-ঠাকুরগাও ইউনিট পরিদর্শনে এসে কতজন হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে তা জানতে চান। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করার জন্যে মে মাসে বিগ্রেডিয়ার আবদুল্লাহ মালিকের তার কাছে লিখিত নির্দেশ আসে বলেও স্বীকার করেন তিনি।10

বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত

মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে জেনারেল রাও ফরমান আলীর নাম বারবার এসেছে। তবে তার বক্তব্য তিনি এই এই ব্যাপারটির সাথে জড়িত ছিলেন না। ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখে পিলখানায় জেনারেল জামশেদ তাকে কিছু সংখ্যক চিহ্নিত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এবং নিয়াজি সে প্রস্তাবে সমর্থন দেননি বলেই তিনি দাবী করেছেন। জেনারেল নিয়াজিও তার বক্তব্যে জানিয়েছিলেন সেই তালিকায় কোনো বুদ্ধিজীবী বা গণ্যমান্য ব্যক্তির নাম ছিল না। বরং মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য এবং বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীর নাম ছিল এই তালিকায়।

তবে জেনারেল জামশেদের দেওয়া বক্তব্য থেকে জানা যায়, ঐ তালিকা সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ এবং গোয়েন্দাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তালিকায় ছিল দুই থেকে তিন হাজার ব্যক্তির নাম।11 তবে জামশেদও তার সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেছেন যে সেই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের গ্রেফতার কিংবা হত্যা করার আগেই মুক্তিযুদ্ধ চুড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। তবে পুরো ব্যাপারটির সাথে জড়িত তিন সেনা কর্মকর্তার বক্তব্যই আলাদা আলাদা। তবে যেহেতু সেই খসড়া তালিকা পরবর্তীতে কোথাও পাওয়া যায়নি, তাই এই ব্যাপারে কমিশন নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

নিয়াজির বিরুদ্ধে অভিযোগ

যুদ্ধকালীন সময়ে জেনারেল নিয়াজির বিরুদ্ধে তার নেতৃত্বে অদূরদর্শিতার অভিযোগ উঠে। এই অভিযোগের তদন্ত করার জন্য কমিশন তার এবং তার অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের বিশেষ সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে উঠে আসে যুদ্ধবন্দী হিসেবে ভারতের জব্বলপুরে থাকাকালীন সময়ে নিয়াজি তার অধীনস্থ ডিভিশনাল ও ব্রিগেড কমান্ডারদের হুমকি দিয়েছিলেন সত্য গোপন করার জন্য। তদন্ত কমিটি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের ব্রিফিং কমিটির সামনে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নিয়াজি তাদের প্রভাবান্বিত করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে নিয়াজি যুদ্ধকালীন সময়ে অনৈতিক যৌনকর্মে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে পণ্য চোরাচালানের সাথেও জড়িত ছিলেন।12

তবে যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য নিয়াজী ছাড়াও এই তদন্ত রিপোর্টে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল রহিম খান সহ আরো চারজন জেনারেল পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তাকে। এর মধ্যে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা জেনারেল রাও ফরমান আলী খান।

মুক্তিযুদ্ধে রাও ফরমান আলীর ভূমিকার তদন্ত

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার বছর পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এম. এ. মালেকের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিয়াজিসহ সব পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে যে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তা বলাই বাহুল্য। তবে যুদ্ধের শেষের দিকে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী; Source: commons.wikimedia.org

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ৮-৯ তারিখ বিবিসি সংবাদ প্রচার করে, জেনারেল নিয়াজি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন এবং রাও ফরমান আলী তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। আর এই কারণেই  ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল মানেকশ রাও ফরমান আলীকে উদ্দেশ্য করে প্রচারপত্র পাঠিয়েছিলেন বলে দাবী করা হয়।

তবে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জেনারেল নিয়াজি ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। জেনারেল নিয়াজি কমিশনের কাছে তার জবানবন্দিতে ফরমান আলির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেন। মোটা অংকের অর্থ পাকিস্তানের বাইরে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ করেন তার বিরুদ্ধে। ফরমান আলীও তার সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন। তবে যুদ্ধকালীন সময়ে গণহত্যার উসকানি দেওয়া থেকে শুরু করে তার অনেক কাজই বিতর্কিত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে কমিশনের রিপোর্টে। 13

সামগ্রিক বিশ্লেষণ

হামুদুর রহমান কমিশন যে দীর্ঘ প্রতিবেদটি কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছিল তার একটা বড় অংশই আলোর মুখ দেখেনি। তবে যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় এই কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে এই বিপুল পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করা। আর সেটি খুঁজতেই নানা সময় পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন, বিনা বিচারে বাঙ্গালী সামরিক কর্মকর্তাদের আটক এবং হত্যার মতো বিষয়গুলো। যুদ্ধ পরিচালনায় নিয়াজি এবং তার অধীনস্থদের অদক্ষতা এবং অদূরদর্শিতা প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৈতিক অবক্ষয়ের ব্যাপারটিও স্পষ্ট হয়েছে উঠে এসেছে এই রিপোর্টে।14

ইয়াহিয়া খানকেও দায়ী করা হয়েছে এই রিপোর্টে; Source: commons.wikimedia.org

তবে কমিশনের রিপোর্টে ইয়াহিয়াকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। পাকিস্তানকে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার পেছনে তার ঔদ্ধত্য এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতাকেও দায়ী করেছে কমিশন। পুরো পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ভুল পথে চালনা করা হচ্ছিল বলেই ইয়াহিয়া এবং সেনাপ্রধান হামিদ খানকেও দায়ী করেছেন সেনাবাহিনীর বাকী সদস্যরা। ১৯৯৩ সালে জেনারেল অরোরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে,

“যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর এতই অধঃপতন ঘটেছিল যে, স্বয়ং নেপোলিয়ন কবর থেকে উঠে এসে হাল ধরলেও পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধ করতে পারতো না।” 15

হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট থেকেই উঠে আসে পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধাকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়টি কত মারাত্মক। উদ্ভূত পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধান করলে পাকিস্তানের পরাজয়ের ঘানি টানতে হতো এমনটাই সুপারিশ করা হয়েছে এই রিপোর্টে। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর করা অত্যাচার নিপীড়নের জ্বালামুখ দিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তপ্ত লাভা উদগিরীত হচ্ছিল সেই ব্যাপারটি হয়তো হামুদুর রহমান কমিশনের দৃষ্টিসীমার বাইরেই থেকে গেছে।

তথ্যসূত্র

  1. হাসান, হুমায়ুন (২০১১), হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট (বাংলাদেশ অংশ), বাঁধন পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৮
  2. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯
  3. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯-১০
  4. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৫-১৬
  5. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২০-২৩
  6. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪
  7. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪-২৫
  8. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৬
  9. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৬
  10. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৭-২৮
  11. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৯
  12. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩১-৩৬
  13. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫০-৫২
  14. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৯
  15. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭৮

ফিচার ইমেজ: youtube.com

Related Articles