Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

প্রাগের গথিক স্থাপত্য

প্রাগ, চেক রিপাব্লিকের রাজধানী। যা স্থাপত্যবৈচিত্র্যে ভরপুর এবং এ শহরের প্রতিটি অংশেই রয়েছে ক্লক টাওয়ার। পুরো প্রাগ শহরটিকেই একটি স্থাপত্য জাদুঘর বলা যায়। “ঘড়ি সংযোজন করে স্থাপত্যের দৃষ্টিনান্দনিকতা বৃদ্ধির চেষ্টা বহুকাল ধরেই চলে আসছে”– বলেন ডকটর জিরি পডলস্কি, চার্লস ইউনিভার্সিটি অব প্রাগ।

স্থাপত্যের ক্ষেত্রে প্রাগের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও একইসাথে উল্লেখযোগ্য সময় ছিল গথিক যুগ। গথিক ক্যাথেড্রালগুলো উচ্চতায় রোমানেস্ক বিল্ডিং ছাপিয়ে বহু উঁচু পর্যন্ত যায়। গথিক যুগ বলতে বর্তমান চেক রিপাবলিকে (পূর্ববর্তী বোহেমিয়া, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল কিংডম অব বোহেমিয়া এবং মারগ্রাভিএত অফ বোহেমিয়া) মধ্যযুগে বহুল প্রচলিত একটি স্থাপত্য যুগকে বুঝায়।

গথিক স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এর ভবনগুলোর তীক্ষ্ণ চূড়া এবং ঝুলন্ত বাটরেস। এছাড়াও আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল- দণ্ডাকার ভল্ট, যাতে থাকত তীক্ষ্ণ চূড়াযুক্ত আর্চ। আর্চগুলো জনপ্রিয় ছিল, কারণ এগুলো ছিল হাল্কা এবং রোমানেস্ক স্টাইলের তুলনায় বেশ বৈচিত্র্যময় এবং মজবুত। বেশিরভাগ স্থাপত্যই নির্মাণ হতো পাথর দিয়ে, মূলত স্যান্ডস্টোন।

এ গথিক স্টাইল চেকভূমিতে প্রথম উদ্ভব হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এবং এটি বেশ সমাদৃত হয়। সেইন্ট অ্যাগনেস অফ বহেমিয়া কনভেন্ট ছিল সর্বপ্রথম আর্লি গথিক কমপ্লেক্স, যা নির্মিত হয় ১২৩৩ থেকে ১২৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দির শেষার্ধে গথিক স্টাইলে কিছু পরিবর্তন আসে। এই গথিক স্থাপত্যের উন্নতির ধাপগুলোকে নামকরণ করা হয় সে সময়কার কোনো না কোনো বোহেমিয়ান শাসক গোষ্ঠীর ব্যক্তির নামে ।

*আর্লি গথিক (Early gothic)- প্রিমিস্লাইড গথিক (১৩শ শতক জুড়ে এবং ১৪শ শতকের শুরুতে)

*হাই গথিক (High Gothic)- লুক্সেমবার্গ গথিক (১৪শ শতক জুড়ে এবং ১৫শ শতকের শুরুতে)

*লেট গথিক (Late gothic)- জ্যাগিলনিয়ান গথিক (আনুমানিক ১৪৭১-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ )

চেকভূমিতে গথিক শৈলীতে কাজ করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থপতির মধ্যে দুজন ছিলেন পিটার পারকার এবং বেনেডিকট রেজত।

সেন্ট ভাইটাস ক্যাথেড্রাল

প্রাগের আকাশদর্শন হয়ত অনেকটা অপূর্ণই রয়ে যেত, যদি না সেইন্ট ভাইটাস ক্যাথেড্রাল সগর্বে মাথা উঠিয়ে আকাশচেরা অনুভূতি না দিত দর্শককে। এর স্থানীয় নাম Katedrála svatého Víta, Václava a Vojtěcha । এই গথিক মিরাকল তৈরি করা হয় ১৩৪৪ সনে। তিন প্যাসেজ বিশিষ্ট এই রোমান ক্যাথলিক ক্যাথেড্রালটিতে একইসাথে চ্যাপেলও থাকার কারণে এটি প্রাগের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং বিশেষ প্রসিদ্ধ স্থানে পরিণত হয়। যদিও এখন চ্যপেলটির প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত, তবে বাইরে থেকে এর চমৎকার সজ্জিত ভল্টটি দেখা যায়।

এছাড়া ক্যাথেড্রালটিতে রয়েছে একটি ক্রাউন চেম্বার, যেখানে সুরক্ষিত রয়েছে চেক রাষ্ট্রীয় ক্রাউন জুয়েল। অবশ্য তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। শুধুমাত্র বড় বড় উপলক্ষ এবং বিশেষ দিবসে, প্রায় পাঁচ বছর পরপর এগুলো প্রদর্শিত  হয়। কিন্তু শুধু ক্যাথেড্রালটির অসাধারণ সুন্দর স্থাপত্যশৈলী, বৃহৎ গোলাপ আঁকা এবং সোনালি চমৎকার মোজাইক ফ্লোর দেখে আসাও প্রতিটি ভ্রমণ এবং স্থাপত্যপ্রেমীর জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

সেন্ট ভাইটাস ক্যাথেড্রেল; Source: Prague Traveler

লেসার টাউন ব্রিজ টাওয়ার

গথিক আর্কিটেকচারের আরেকটি আশ্চর্য। ব্রিজ টাওয়ারটি মূলত একটি কাঠামো, যার দুটি টাওয়ার ভিন্ন রূপের এবং উচ্চতার। এ স্থাপত্যটি ভ্লতাভা নদীর তীরে অবস্থিত এবং একটি গথিক ডিজাইনের গেট দিয়ে সংযুক্ত। এ টাওয়ারগুলো লেসার শহরের প্রবেশদ্বার চিহ্নিত করে।

জুডিথ টাওয়ার আকারে ছোট। এটি তৈরি হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে এবং মূলত এটি তৈরি  হয়েছিল রোমানেস্ক স্টাইলে। এখনও এ স্থাপত্যের কিছু অংশে রেনেসাঁস স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে স্থাপত্যটির সামনের ম্যুরালগুলোতে স্পষ্ট রোমানেস্ক ধাঁচ লক্ষ করা যায়। এ টাওয়ারটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

অপর ব্রিজ টাওয়ারটি তৈরি হয় ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দে। এটি তৈরি করা হয়েছিল লেট গথিক স্টাইলে, (জ্যাগিলনিয়ান)। একসময়ের স্টোরেজ এবং অগ্নি নির্বাপণের জন্য ব্যবহৃত এ টাওয়ারের চূড়ায় উঠলে এখন দর্শনার্থীদের এক বাকরুদ্ধ অভিজ্ঞতা হয়, পুরো শহরের বার্ডস আই ভিউ দেখা যায়  টাওয়ারটি থেকে।

এই লেসার টাউন ব্রিজ টাওয়ারের স্থানীয় নাম Malostranská mostecká věž

লেসার টাউন ব্রিজ টাওয়ার; Source: Pinterset

ওল্ড নিউ সিনাগগ

ওল্ড নিউ সিনাগগ; Source: alamy.com

এটি ইহুদীদের একটি  উপাসনাগার, তৈরি হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এবং সবচেয়ে পুরনো সিনাগগ হওয়া সত্ত্বেও এটি এখনো ব্যবহার করা হয় উপাসনার জন্য। প্রাগের অন্যান্য সিনাগগের প্রায় সবগুলোকেই বর্তমানে ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত করা হয়েছে, ওল্ড নিউ সিনাগগের ক্ষেত্রে তা হয়নি। প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো এই স্থাপত্য এখনও উপাসনার কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রাগ ক্যারোলিনাম

এটি কয়েকটি স্থাপত্যের সমষ্টি, ১৩৪৮ সালে চার্লস দ্যা ফোর্থ তৈরি করেন । বর্তমানে এটি চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এরও নির্মাণশৈলী গথিক স্টাইলের দ্বারাই অনুপ্রাণিত।

প্রাগ ক্যারোলিনাম; Source: alamy.com

প্রাগ অ্যাসট্রোনমিক্যাল ক্লক

গথিক স্থাপত্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কৌতূহল উদ্রেককারী সৃষ্টি এটি। অনেক পর্যটক বা স্থাপত্যপ্রেমিকের জন্য প্রাগে যাওয়ার প্রথম কারণই থাকে এই ঐতিহাসিক ঘড়ি দর্শন। অরলজ নামের এই ঘড়িটি অবস্থিত ওল্ড টাউন স্কয়ারে ওল্ড টাউন হলের দক্ষিণ দেয়ালের সাথে সংযুক্ত অবস্থায়। ঘড়িটির মূল তিনটি যন্ত্রাংশ- অ্যাসট্রোনমিকাল ডায়াল, যা চাঁদ এবং সূর্যের অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে এব জোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যাদি বহন করে। বিভিন্ন ক্যাথলিক সেইন্টের মূর্তি ঘড়িটির উভয় পাশে দণ্ডায়মান। ঘড়িটির ডানপাশে একটি মৃত্যুরূপক কংকাল রয়েছে, এবং একটি ক্যালেন্ডার ডায়াল দেখায় মাসের হিসাব।

ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘The Walk Of Apostles’ নামে একটি যন্ত্রচালিত প্রদর্শনী হয় ,যাতে দেখানো হয় অ্যাপোস্টলস এবং অন্য মূর্তিগুলোর একটি বিশেষ ছন্দে ঘূর্ণন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যদি ঘড়িটির সুষ্ঠু পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণ অনিয়মিত হয় এবং কোনো কারণে তাতে ঘড়িটির কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে,তবে সম্পূর্ণ শহরে নেমে আসবে ভয়াবহ বিপদ। সে ঘড়িতেই অবস্থানকৃত এক অশরীরী মাথা নেড়ে এই সতর্কবাণী জানিয়ে গিয়েছে বলে বলা হয়। এমন বিপদে নববর্ষে জন্ম নেয়া কোনো বালকই পারবে এর মোকাবিলা করতে, লোকমুখে এ কথা প্রচলিত রয়ে গেছে।

অরলজের প্রাচীনতম অংশ, যান্ত্রিক ঘড়িটি এবং অ্যাসট্রোনমিকাল ডায়াল, তৈরি হয় ১৪১০ সালে। তখন এটি নির্মাণ করেছিলেন ঘড়িনির্মাতা মিকুলাস অব কাদান এবং জ্যান সিন্দেল, পরবর্তীতে চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অব ম্যাথম্যাটিকস অ্যান্ড অ্যাসট্রোনমি তাতে কিছু বাড়তি সংযোজন করেন। প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রদর্শন ঘটে ৯ অক্টোবর, ১৯৮০ সালে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের দিকে ক্যালেন্ডার ডায়ালটি যুক্ত করা হয় এবং সম্মুখটি গথিক ভাস্কর্য দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়।

প্রাগ অ্যাসট্রোনমিক্যাল ক্লক; Source: dreamstime.com

পরবর্তীতে এই ঘড়ি বেশ কয়েকবার মেরামত করা হয়। ঘড়িটি ১৫৫২ সালের পর কয়েকবার বিকল হয় এবং মেরামতের প্রয়োজন হয় এবং ১৮৬৫-১৮৬৬ সালে একটি সোনালি রঙের মোরগের মূর্তি সংযোজন করা হয়। ৯ অক্টোবর, ২০১০ এ দ্য অরলজের ৬০০তম বার্ষিকী উদযাপিত হয়।

আরেকটি টাওয়ার হলো ওল্ড টাউন ব্রিজ টাওয়ার, যা চার্লস ব্রিজের একপাশ সুরক্ষিত রাখে। ওল্ড টাউন স্কয়ারের কাছাকাছি আরেকটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য হলো ‘আওয়ার লেডি বিফোর টিন’, যার টাওয়ারগুলোর উচ্চতা আকাশচুম্বী ৮০ মিটার, নির্মাণ করেছিলেন পিটার পার্কার (১৪শ শতাব্দীতে)। এছাড়াও সেইন্ট নিকোলাস চার্চ অব ওল্ড টাউন এবং সেইন্ট নিকলাস চার্চ ইন দ্যা লেসার টাউন- সবগুলোর নির্মাণশৈলীতেই রয়েছে গথিক ধাঁচ। অবশ্য এগুলো পরবর্তীতে  পুনর্নির্মিত হয়েছিল।

পাউডার টাওয়ার নামে রিপাবলিক স্কয়ারের কাছেই রয়েছে একটি আকর্ষণীয় গথিক টাওয়ার, এখানে ১৭শ শতাব্দীতে বারুদ সঞ্চিত রাখা হত। এ টাওয়ারটি বর্তমানে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। ১৮৬টি সিঁড়ি পার হওয়ার পর বার্ডস আই ভিউতে সম্পূর্ণ শহরটির একটি মনোরম চিত্র দেখা যায়।

পরবর্তীতে ইতালিতে ষোড়শ শতাব্দীতে ক্যাথলিক চার্চের ধাঁচ অনুকরণ করে স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হয়। একে বলা হয় বারোক স্থাপত্য। কিন্তু আজও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে গথিক স্থাপত্যের নির্মাণশৈলীই অধিক আকর্ষণীয় এবং এখনও এ ধরনের বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়।

ফিচার ইমেজ- The Spaces

Related Articles