২০০৬ সালে জোহানেসবার্গের নিউ ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে যখন অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রানের জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৩৮ রান করে, তখন তোলপাড় শুরু হয়ে যায় গোটা বিশ্বব্যাপী। কেননা, তখন পর্যন্ত সেটিই যে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড।
তবে অনেকেই হয়তো জানেন না, ৪৩৮ সংখ্যাটির এক অসামান্য গল্প জড়িয়ে আছে ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত সংস্করণ টেস্টের সাথেও। কেননা, এখানেও একটি দল যদি ৪৩৮ রান করতে পারত, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটি নিজেদের করে নিতে পারত তারা, এবং সেই রেকর্ডটি অক্ষুণ্ণ থাকত আজকের দিন অবধি। সেটা আড়ালে রয়ে গেছে, কেননা বিজয়ভাষ্য লেখে ইতিহাস।
বলছি ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্য ওভালে ভারতের সেই টেস্ট ম্যাচটির কথা, যেখানে ইতিহাস প্রায় নিজেদের হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছিল ভারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা রয়ে গিয়েছিল অধরা। তাই তো আজ ৪১ বছর পর ফিরে তাকালে সেই ম্যাচটিকে চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস উৎপাদনকারী বলেই মনে হয় অনেকের কাছে।
আদতে ভারতের জন্য ওই পুরো সফরটিই ছিল হতাশার। একের পর এক সবকিছুই যেন তাদের বিপক্ষে যাচ্ছিল। সফরটি তারা শুরু করেছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সংস্করণ দিয়ে। কিন্তু সেখানে তারা গ্রুপপর্বের তিনটি ম্যাচই হেরে বসে। এমনকি অপ্রত্যাশিত হার মানতে হয় প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার কাছেও, যারা তখন পর্যন্ত নিছকই আইসিসির সহযোগী সদস্য।
বিশ্বকাপে তো ভরাডুবি হয়েছিলই, কিন্তু তারপরও ভারতকে রয়ে যেতে হয় ব্রিটেনে। কারণ এরপর ইংল্যান্ডের সাথে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ অপেক্ষা করে ছিল তাদের জন্য। সেই সিরিজের শুরুটাও হয় চরম বাজেভাবে। বার্মিংহামে প্রথম টেস্টটিই তারা হেরে বসে ইনিংস ও ৮৩ রানে; ম্যাচটি শেষ হয় চার দিনের মধ্যে।
লর্ডসের দ্বিতীয় টেস্টে সম্মুখীন হতে হয় আরো বড় লজ্জার। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৬ রানেই গুটিয়ে যায় তারা। ফলে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করতে হয় ৩২৩ রানে পিছিয়ে থেকে। অবশ্য দ্বিতীয় দফায় ব্যাট করতে নেমে বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় তারা। একদিকে ছিল বৃষ্টির আশীর্বাদ, অন্যদিকে তৃতীয় উইকেটে দিলীপ ভেংসরকার ও গুণ্ডাপ্পা বিশ্বনাথের ২১০ রানের জুটি। শতরান আসে দু’জনের ব্যাট থেকেই। ফলস্বরূপ, ওই ম্যাচটি সম্মানজনক ড্রয়েই শেষ হয়।
তৃতীয় ম্যাচটিতে আবহাওয়া আরো বাজেভাবে হানা দেয়ায় ড্র-ই ছিল একমাত্র সম্ভাব্য ফলাফল। তাই দ্য ওভালে সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টেস্টটিই ছিল ভারতের জন্য শেষ সুযোগ অন্তত একটি ইতিবাচক ফল বের করে আনার।
চতুর্থ টেস্টের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে নেওয়া দরকার আরেকজন মানুষের ব্যাপারে। তিনি সুনীল মনোহর গাভাস্কার। আমাদের এই গল্পের নায়ক। ভারতের মতোই লিটল মাস্টারের জন্যও ওই ব্রিটেন সফরটি তেমন সুবিধার যাচ্ছিল না। বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি অর্ধশতকসহ সাকুল্যে করেছিলেন ৮৯ রান। অর্থাৎ দলের মতো তিনিও ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ।
টেস্ট সিরিজের চিত্র অবশ্য ছিল খানিকটা ভিন্ন। এখানে একেবারে ছন্নছাড়া না হলেও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারছিলেন না তিনি। প্রায় প্রতিটি ইনিংসেই সম্ভাবনাময় সূচনার পরও সেগুলোকে কোনো পরিণত রূপ দিতে হচ্ছিলেন ব্যর্থ। বার্মিংহামে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের দুই ইনিংসে করেছিলেন ৬১ ও ৬৮। লর্ডসেও প্রথম ইনিংসে দলের ৯৬ রানের মধ্যে তার একারই ছিল ৪২, এবং পরের ইনিংসেও ৫৯। তারপর হেডিংলিতে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ভারতের একমাত্র ইনিংসে ৭৮। অর্থাৎ সুন্দর শুরুর পর সেগুলোকে বড় কোনো শতকে রূপান্তরিত করতে পারছিলেন না তিনি, ঠিক যেমন ভারতও বারবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টার পরও, শেষমেশ ঠিকই নুইয়ে পড়ছিল।
সুতরাং দ্য ওভালে সিরিজের শেষ টেস্টটি ভারতের মতো গাভাস্কারের জন্যও ছিল একটি অ্যাসিড টেস্ট, নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ। তবে সেক্ষেত্রে প্রথম দফায় ডাহা ফেলই যেন মারেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৩০৫ রানের জবাবে ভারতীয় ড্রেসিংরুম যখন তাকিয়ে তার ব্যাটের দিকে, আশা করে আছে যে তিনি উদ্ধার করবেন অন্ধকারে পথ খুঁজতে থাকা একটি দলকে, তখন তিনি প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মাত্র ১৩ রান করে। ফলাফল: ভারত গুটিয়ে যায় ২০২ রানে।
স্যার জিওফ বয়কটের শতকের সুবাদে ইংল্যান্ড তাদের দ্বিতীয় ইনিংসেও চমৎকারভাবে এগোতে থাকে। ইতঃমধ্যেই সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় মাইক ব্রিয়ারলির কোনো প্রয়োজনই ছিল না ঝুঁকি নেবার। কিন্তু তবু তিনি নিলেন সেই ঝুঁকি। চতুর্থ দিন বিকেলে দলীয় সংগ্রহ আট উইকেটে ৩৩৪ থাকতে ইনিংস ঘোষণা করলেন। ফলে ভারতের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়াল আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ৪৩৮ রান। নিশ্চিতভাবেই তিনি ভাবলেন, ভারতের পক্ষে ইতিহাস গড়ে জেতা তো সম্ভব হবেই না, বরং বব উইলিস, ইয়ান বোথাম, মাইক হেনড্রিক, ফিল এডমন্ডস, পিটার উইলিদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হলে ম্যাচটি বের করে আনতে পারবেন তারা।
ইংল্যান্ড জয়ের স্বপ্নে বিভোর থাকলেও চেতন চৌহানকে নিয়ে চতুর্থ দিনের বিকেলটা নির্বিঘ্নেই শেষ করলেন গাভাস্কার। রানের খাতায় ৭৬ রান জমা হওয়ার চেয়েও বড় কথা, উইকেট পড়েনি একটিও। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, শেষ দিনের ভাঙা উইকেটে তাদেরকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে ৩৬২ রান করতে হবে জয়ের জন্য। অর্থাৎ যদি তারা অন্তত একটি জয় নিয়ে সেই বিভীষিকাময় ইংলিশ মৌসুম শেষ করতে চায়, তাহলে শেষ দিনের প্রতি মিনিটে একটি করে রান তুলতে হবে তাদের।
পঞ্চম দিনের সকালবেলাই ঘটল এক মজার ঘটনা। স্যার ইয়ান বোথাম গাভাস্কারকে জানালেন, গত রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন, ম্যাচের শেষ দিনে গাভাস্কার নাকি দ্বিশতক হাঁকাতে চলেছেন। বলাই বাহুল্য, বোথামের সেই কথাকে খুব একটা আমলে নিলেন না সানি। তখনও কি আর জানতেন, দিনের বাকি সময়টা কত নাটকীয়তাই না বাকি রয়েছে!
শেষদিন সকালটা দেখেশুনে, সাবধানেই শুরু করলেন ভারতের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। তবে তারা তেমন একটা হাত খুলে খেলারও সুযোগ পেলেন না হেনড্রিকের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ফলে। তার ছয় ওভারের আগুনে স্পেলে গাভাস্কার-চৌহান তুলতে পারলেন মাত্র ১১ রান। কিন্তু এরপরই সফরকারীদের ভাগ্য খুলে গেল। কাঁধের পেশিতে টান লাগায় ম্যাচের বাকি অংশ থেকে ছিটকে গেলেন হেনড্রিক। ফলে ব্রিয়ারলি খানিকটা খেই হারিয়ে ফেললেন। অপরদিকে, ভারতও দিনের প্রথম তিন ঘণ্টা কোনো উইকেট না খুইয়েই পার করে দিল। স্কোরবোর্ডে ততক্ষণে নতুন করে যোগ হয়েছে ১৩৭ রান। বাকি তিন ঘণ্টায় সম্ভব যেকোনো কিছু।
তবে শেষ তিন ঘণ্টার নাটকীয়তার প্রথমাংশে হাসি ফুটল স্বাগতিকদের মুখেই। ভারতীয়দের উপর উইলিস অনেকক্ষণ ধরেই চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন। আট ওভারের বিধ্বংসী স্পেলে মাত্র দুই রান দিয়েছিলেন। এতে করে হতোদ্যম হয়ে পড়া চৌহানের ঘটল ধৈর্যচ্যুতি, একটি ভুল করে বসলেন তিনি – নিজের উইকেটটি বিলিয়ে দিলেন উইলিসকে। দলীয় ২১৩ রানে চৌহান (৮০) যখন বিদায় নিলেন, ভারতের তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন আর ২২৫ রান, হাতে আছে নয় উইকেট।
চৌহানের বিদায়ের পরই গাভাস্কার সিদ্ধান্ত নিলেন, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এবার তিনি তুলে নেবেন পুরোপুরি নিজের হাতে। দিলীপ ভেংসরকারের কাছ থেকে যোগ্য সঙ্গ পেয়ে, চড়াও হলেন ইংলিশ বোলারদের উপর। স্বভাবে আক্রমণাত্মক অথচ ঝুঁকিহীন ব্যাটিং করতে লাগলেন। কভার ও মিড উইকেটের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বারবার ফাঁকা বের করে নিতে লাগলেন ড্রাইভের মাধ্যমে। তিনি যেন সেদিন পণ করেই মাঠে নেমেছেন, চার গ্রীষ্ম আগে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পুরো ৬০ ওভার ব্যাটিং করে, ১৭৪ বলে ৩৬ রান করে যে কলঙ্কের দাগ লাগিয়েছিলেন নিজের নামের পাশে, এবার তা ঘুচিয়ে ছাড়বেন।
উইলো হাতে লিটল মাস্টার যখন রূপকথার ব্যাটিং পসরা সাজিয়ে বসেছেন, তখন হঠাৎ করেই যেন ৪৩৮ রানের লক্ষ্যমাত্রাকে খুবই সহজ মনে হতে শুরু করল। রানগুলো আসতে লাগল সহজেই, এবং কোনো বিপদ ছাড়াই ভারত পার করে ফেলল ৩০০ রানের গণ্ডি। চা বিরতির সময় ভারত জয়ের বন্দর থেকে মাত্র ১৩৪ রান দূরে। ক্রিজে তখনো মজুদ আছেন গাভাস্কার ও ভেংসরকার।
ঠিক এই পর্যায়েই ইংলিশ অধিনায়ক ব্রিয়ারলি একটি নতুন ফন্দি আঁটলেন। কিংবা বলা ভালো, ‘অখেলোয়াড়সুলভ’ কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করলেন। আকস্মিকভাবে কমে গেল ইংলিশ বোলারদের ওভাররেট। শেষ সেশনের প্রথম ৩০ মিনিটে তারা করল মাত্র ছয়টি ওভার।
তবে সে যা-ই হোক, গাভাস্কার তখনও ক্রিজে রয়েছেন অসীম দৃঢ়তার সাথে। ভেংসরকারের সাথে দিব্যি স্ট্রাইক রোটেট করে চললেন, এবং এক পর্যায়ে তিনি পেরিয়ে গেলেন ব্যক্তিগত ২০০ রানের মাইলফলকও। সকল নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেঙে ভারতীয় সমর্থকরা ঢুকে পড়ল মাঠে। অভিনন্দন জানাতে লাগল তাদের মহানায়ককে। এর খানিকক্ষণের মধ্যেই গাভাস্কার পেরিয়ে গেলেন দেড় দশক আগে দিল্লিতে মনসুর আলি খান পতৌদির ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা ২০৩ রানের রেকর্ডও।
দিনের শেষ ১২ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ৭৩ রান। এমন সময় বোথাম একবার ফিল এডমন্ডসের বলে ভেংসরকারের একটি ক্যাচ ছাড়লেন। অবশ্য এক রান বাদে তিনি ঠিকই একই বোলারের ডেলিভারিতে একই ব্যাটসম্যানের উড়িয়ে মারা বলকে সফলভাবে তালুবন্দি করলেন। ভারতের স্কোর তখন ৩৬৬-২।
এই অবস্থায় ভারতীয় অধিনায়ক শ্রীনিবাসরাঘবন ভেঙ্কটরাঘবন একটু ভুল চাল চেলে ফেললেন। যেখানে তার উচিত ছিল ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যান বিশ্বনাথকে ক্রিজে পাঠানো, যিনি ইতঃমধ্যেই লর্ডসে একটি শতক হাঁকিয়েছেন এবং চলতি টেস্টের প্রথম ইনিংসেও দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৬২ রান করেছেন। কিন্তু তার বদলে ভেঙ্কট জুয়া খেললেন কপিল দেবকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে।
কপিল দেবকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি যে ভুল ছিল, তার হাতেনাতে প্রমাণ মিলল অচিরেই। উইলির পরের ওভারের ডাক মেরে বিদায় নিলেন তিনি। ভাবছেন এবার বুঝি ভেঙ্কট ব্যাটিংয়ে পাঠালেন বিশ্বনাথকে? না, এবারও তিনি বিশ্বনাথকে ধরে রাখলেন। বদলে গাভাস্কারকে সঙ্গ দিতে পাঠালেন অনভিজ্ঞ যশপাল শর্মাকে। অথচ আস্কিং রেট ততক্ষণে চোখ রাঙাচ্ছে সাতের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। ফলে গাভাস্কারকে একদিকে যেমন নজর রাখতে হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার দিকে, তেমনই ভুলে গেলে চলছে না সময় ফুরিয়ে আসার ব্যাপারটি। সবকিছুই সামলাতে হচ্ছে একা হাতে, কারণ নন-স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন তিনি পাচ্ছেন না।
এরপরও গাভাস্কার তার পূর্ববর্তী সেরা স্কোর ২২০-কে ছাপিয়ে গেলেন, ভেঙে দিলেন এক দিনে তার করা সর্বোচ্চ ১৭৭ রানের রেকর্ডকেও। কিন্তু কাঁধের উপর ক্রমশ বাড়তে থাকা চাপের কাছে এক পর্যায়ে তাকে মাথা নত করতেই হলো। শেষ আট ওভারে যখন ভারতের প্রয়োজন ৪৯ রান, ঠিক তখনই ব্রিয়ারলি আক্রমণে ফেরালেন বোথামকে, এবং বোথামের বলে সরাসরি মিড-অনে ডেভিড গাওয়ারের কাছে বল তুলে দিয়ে সাঙ্গ হলো গাভাস্কারের লড়াই। ৪৯০ মিনিট ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ক্রিজে পড়ে থেকে, ৪৪৩ বল মোকাবেলায় ২১টি চার হাঁকিয়ে তিনি তার মহাকাব্যিক ইনিংসটির পরিসমাপ্তি ঘটালেন ২২১ রানে।
অথচ আর দুইটি রান করতে পারলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলতেন জর্জ হেডলির গড়া চতুর্থ ইনিংসে ২২৩ রানের রেকর্ড। আর ১০টি রান তাকে সাহায্য করত ভিনু মানকড়ের করা ভারতীয় রেকর্ড ২৩১ রান (১৯৫৬ সালে চেন্নাইতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে) স্পর্শ করতে। কিংবা আরো বড় ব্যাপার, ভারতকে শেষ আট ওভারে ৪৯ রান এনে দিতে পারলে তিনি হয়ে যেতেন টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা জয়ের সফল নায়ক। কিন্তু তারপরও, ইতঃমধ্যেই তিনি যা করেছেন, সেটিই বা কম কী! তাই তো যখন তিনি প্যাভিলিয়নের পথ ধরেছেন, দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সেই যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে একটুও কার্পণ্য করল না ‘দ্য ওভাল’-এর দর্শকরা; দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল তারা গাভাস্কারকে, চতুর্দিক ফেটে পড়ল তুমুল করতালিতে।
দলীয় ৩৮৯ রানে গাভাস্কারের বিদায়ের পর অবশেষে ক্রিজে এলেন বিশ্বনাথ। এবং এসেই পরপর দুইটি চার মেরে প্রমাণ করলেন, আরো আগে আসতে পারলে কত ভালোই না হতো। অন্তত সব দায়ভার গাভাস্কারের একার কাঁধে অর্পিত হতো না। কিন্তু যখন তিনি এলেন, তখন তার নিজের কাঁধেই জেঁকে বসেছে পাহাড়সম চাপ। একজন ক্রিজে সদ্য আসা, সেট না হওয়া ব্যাটসম্যানের পক্ষে কি আর সেই চাপ সহ্য করা সম্ভব? তাই তো উইলির ডেলিভারিতে ব্রিয়ারলির হাতে বল তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। অবশ্য ব্রিয়ারলি ক্যাচটি কতটা স্বচ্ছভাবে তালুবন্দি করতে পেরেছিলেন, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।
দলের মূল ব্যাটসম্যানরা সবাই বিদায় নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত আর অসম্ভবকে সম্ভব করে ম্যাচটি জেতা হলো না ভারতের। বরং পরপর দুইটি উইকেট তুলে নিলেন বোথাম, এদিকে রানআউট হলেন ভারতীয় অধিনায়কও। সব মিলিয়ে বুকে বেশ ভালোই কাঁপন ধরল তাদের। সারাটা দিন জয়ের স্বপ্নে মত্ত থেকে শেষমেশ না হেরে বসতে হয়! তবে না, সেই চূড়ান্ত দুঃস্বপ্নময় ফলাফলের সাক্ষী হতে হলো না তাদেরকে। ভারতের সংগ্রহ যখন আট উইকেটে ৪২৯, তখন শেষ হলো শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি। দুই দলই দাবি করতে পারে, জয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল তারা। ভারতের দূরত্ব ছিল নয় রানের, আর ইংল্যান্ডের দুই উইকেটের। তবে অবশ্যই হতাশার মাপকাঠিতে এগিয়ে সফরকারী দলটিই। একে তো তারা জেতা ম্যাচটিও ড্র করেই সন্তুষ্ট থাকছে, তার উপর পুরো সফরটিই তাদের কাটল জয়হীনতার হাহাকারে।
এতক্ষণ আমরা এমনই একটি ম্যাচের কথা জানলাম, যেটির কথা স্মরণ হতে মিশ্র প্রতিক্রিয়াই জন্মাবে যেকোনো ভারত ভক্তের মনে। না পারবে তারা এই ম্যাচটিকে বুকভরা গর্বের সাথে স্মৃতির পাতায় অক্ষয় করে রাখতে, না পারবে ম্যাচটির কথা স্রেফ ভুলে গিয়ে কষ্ট লুকাতে। কেননা, এই ম্যাচটিতে বিশ্বরেকর্ড তারা গড়তে না পারলেও লিটল মাস্টার গাভাস্কার যে ঠিকই খেলেছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ইনিংসটি। ফলে এই ম্যাচটি চিরকাল অম্লমধুর আবেগেরই জোগান দিয়ে যাবে ভারতীয় ক্রিকেট সমর্থকদের মনে। আর নিরপেক্ষ যারা, মন থেকে ভালোবাসে খেলাটিকে, তাদের কারো কারো কাছে এই ম্যাচটিই হয়তো হয়ে থাকবে ক্রিকেট রোমান্টিসিজমের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।