কার্বন নিজেই যখন দূষণ রোধের সমাধান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারিগর

কার্বন মজুদকরণ নিয়ে আগের একটি লেখায় বলা হয়েছিলো যে কার্বন ডাই অক্সাইড তরল করে মাটির নিচে মজুদ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাটির নিচে কার্বন গ্যাসকে মজুদ করে রাখা হবে এবং এর ফলে গ্যাসটি আর পরিবেশে বের হতে পারবে না। পরে গিয়ে এই মজুদকৃত গ্যাসকে মানব সমাজের জন্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হবে। এই গ্যাসকে কীভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ব্যবহার করা যায় সেটা নিয়েও এখন গবেষণা চলছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, আমরা যদি একবার নিঃশ্বাস নেই তাহলে ০.৬ গ্রাম বাতাস আমাদের শরীরের ভিতর যায়। বাতাসের একটি উপাদান হিসেবে ০.৪ মিলিগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইডও কিন্তু আমরা নিঃশ্বাস নেই। ষোড়শ শতকে এর পরিমাণ ছিল ০.৩ মিলিগ্রাম। প্রথম দেখায় এই সংখ্যাটির সাথে আগের সংখ্যার খুব বেশী পার্থক্য না দেখা গেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশে এই ০.১ মিলিগ্রাম কার্বন বেড়ে যাওয়ার কারণেই বিশ্ব উষ্ণায়ন এখন সবার জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ। প্রতি বছর যে পরিমাণে গরম বেড়ে যাচ্ছে এবং যেভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে পৃথিবীতে মানব সমাজের টিকে থাকা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।

কার্বন মজুদ করার প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প- দুটিই অত্যন্ত জনকল্যাণকর। এটি মানব সমাজের জন্য একটি সুফল বয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এরকম প্রকল্প কিন্তু অনেক খরচ সাপেক্ষ। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয় শুধু একটিমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে। তাই উন্নয়নশীল কিংবা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য এরকম প্রকল্প হাতে নেয়াটা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের শিল্প কারখানার বিকশিত হওয়ার কারণে যে কার্বন তৈরি হচ্ছে তার মূল্য দিতে হচ্ছে অনুন্নত দেশগুলোকে। এখান থেকে বের হওয়ার উপায় কি? কার্বনকে কীভাবে অর্থনীতির কারিগর হিসেবে ব্যবহার করা যায় সেটাই আজকে আলোচনা করা হবে।

কানাডাতে Boundary Dam Coal-fired Power Plant নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সাল থেকেই কার্বন ডাই অক্সাইড মাটির নিচে মজুদ করা শুরু করে দিয়েছে; Source: SaskPower

কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান কিন্তু কার্বন মজুদকরণ শুরু করে দিয়েছে এবং তারা সুফলও পাচ্ছে। যেমন, কানাডাতে Boundary Dam Coal-fired Power Plant নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সাল থেকেই কার্বন ডাই অক্সাইড মাটির নিচে মজুদ করা শুরু করে দিয়েছে। যদিও ১৯৭০ সাল থেকেই এই কার্বন মজুদকরণের জন্য ছোট ছোট উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এটা এখনকার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।

কিন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ খরচ করে শুধু কার্বনকে মাটিতে পুঁতে দেয়াই হচ্ছে। এর ফলে কিন্তু কোনো অর্থনৈতিক লাভ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের লাভ হচ্ছে। কিন্তু একটি দেশ কেন কোনো প্রকার লাভ ছাড়াই এত অর্থ খরচ করবে? এর থেকে কিছু লাভ কি করা যায় না? তখন এটা নিয়ে গবেষণা শুরু হলো যেটা অনুন্নত দেশগুলো নিজেদের দেশে কার্বন কমানোর উপায় হিসেবে অবলম্বন করতে পারে। এই কার্বনকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে কার্বনকে একটি উপকারী পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা তা নিয়ে গবেষণা শুরু করা হয় এবং কিছু গবেষণা করার পর দেখা যায় যে কার্বন ব্যবহার করে প্লাস্টিক, তেল এবং দালানকোঠা বানানোর উপাদান কংক্রিট বানানো যায়।

শিল্পকারখানা থেকে বেরিয়ে আসা দূষক এবং দূষিত মাটির সাথে কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশিয়ে বিভিন্ন দালানকোঠা নির্মাণের জন্য কংক্রিট তৈরি করা হচ্ছে; Source: The green optimistic

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করলেন যে কার্বন শুধু একটি পরিবেশ দূষক নয়, এর থেকে অনেক উপকারও পাওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কার্বন মজুদকরণের মাধ্যমে এবং শুধু কার্বন দিয়ে কোটি কোটি অর্থ উপার্জনও সম্ভব। কার্বন মজুদ করার সময় মাটির নিচে একে ঠেলে পাঠাতে হয়। এই ঠেলে পাঠানোর জন্য যে চাপ পড়ে, সেই চাপ ব্যবহার করে মাটির নিচ থেকে তেল তুলে আনা হয় এবং সেই জায়গা কার্বন দিয়ে ভরাট করা হয়। কার্বন মজুদ করার জন্য যে প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে এখন মাটি থেকে তেল উত্তোলন অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। খুব দ্রুত এখন তেল উত্তোলন করা সম্ভব। আবার বিভিন্ন কোমল পানীয় এবং তেলের খনিগুলোতে বুদ বুদ তৈরি করার জন্য এই কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন কার্বনকে অন্য কোনো উপকারী কিছুতে পরিণত করতে। যেমন, ইউরিয়া তৈরিতে কার্বন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা চাষাবাদে কৃষকদের কাজে লাগে। উনিশ এবং বিশ শতকে রসায়নবিদরা মিলে একটি ওষুধ তৈরি করেন যেটা কম-বেশী এখন আমরা সবাই সেবন করি, যার নাম এসপিরিন বা এসিটাইল সেলিসিলিক এসিড। ১৮৫৯ সালে হারমান কোলবে সোডিয়াম ফেনলেটের সাথে কার্বন ডাই অক্সাইডের বিক্রিয়া ঘটিয়ে এই এসিটাইল সেলিসিলিক এসিড তৈরি করেন, যেখান থেকে এসপিরিন তৈরি করা হয়।

কার্বন থেকে ফাইবার তৈরি করা হচ্ছে; Source: materialsforenginnering.co.uk

কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান কলকারখানাগুলো থেকে কার্বনের যে ধোঁয়া বের হয় সেটা বাতাসের সংস্পর্শে আসার আগেই সেখান থেকে সংগ্রহ করে নিচ্ছে এবং সেই কার্বন দিয়ে অন্যান্য পণ্য তৈরি করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কার্বনকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য তৈরি করছে উন্নত দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যেমন-

১) Carbon8Aggregates (UK) শিল্পকারখানা থেকে বেরিয়ে আসা দূষক এবং দূষিত মাটির সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশিয়ে বিভিন্ন দালানকোঠা নির্মাণ সামগ্রি তৈরি করছে।

২) CCm Research (UK) ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য উন্নত মানের সার তৈরি করছে এই কার্বন দিয়ে এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড দিয়ে কোট করা ফাইবার তৈরি করা হচ্ছে, যেটা প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

৩) Convestro (Germany) পলিইউরিথিন নামক প্লাস্টিক তৈরি করছে এই কার্বন ব্যবহার করে, যা ফোমে ব্যবহার করা হয়।

8) Sunfire (Germany) একধরনের সিনথেটিক ফুয়েল তৈরি করছে, যা মজুদকৃত কার্বনের সাহায্যেও তৈরি করার প্রস্তুতি চলছে। এই প্রজেক্টটি অডি (Audi) প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশিদারিত্বে করা হচ্ছে।

৫) Oberon Fuels (California) সিনথেটিক ডিজেল তৈরি করছে যেটা থেকে কোনো সালফার নিঃসরণ হবে না এবং খুব কম দূষিত পদার্থ বের হবে। এই প্রজেক্টটির সাথে ভলভো, ফোর্ড এবং ম্যাক নামের একটি আমেরিকান ট্রাক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যুক্ত আছে।

৬) CarbonCure (Canada) এমন একটি প্রতিষ্ঠান যারা কংক্রিটের ভিতর কীভাবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ঢেলে মিশিয়ে দেয়া যায় সেই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে।

৭) Soldia Technologies (New Jersey) কংক্রিট তৈরি করে যারা দাবি করছে যে তাদের নির্মাণাধীন কংক্রিট কার্বনকে কংক্রিটের ভিতর বন্দি করে ফেলতে পারে।

কার্বন থেকে প্লাস্টিক তৈরি করা হচ্ছে; Source: Gigazine

এছাড়া কার্বন থেকে কৃত্রিম পেট্রোল তৈরির দিকে বিজ্ঞানীরা এখন ঝুঁকেছে। কারণ, প্রথমত ফসিল থেকে প্রাপ্ত শক্তি একদিন না একদিন শেষ হয়ে আসবেই। তাই ফসিলের উপর চাপ কমাতে কার্বনকে ব্যবহার করে পেট্রোল তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া কার্বন থেকে প্রাপ্ত তেলগুলোতে কার্বন নিরপেক্ষ ভাব বজায় রাখবে, তাই এর থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হওয়ার পরিমাণ প্রায় শূন্যের কাছাকছি হবে। বিজ্ঞানীদের চেষ্টা হচ্ছে এমনভাবে এই ধরনের তেল তৈরি করা হবে যাতে তেলগুলো পুড়ে যখন এর গ্যাস নিঃসরিত হবে তখন যেন সেটাকে মজুদ করে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলা যায়।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে পরিবেশে কার্বনের নিঃসরণ কমাতে কার্বন মজুদকরণের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে একে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা এবং কিছু প্রতিষ্ঠান লাভজনক ব্যবসাও করতে পারছে। এরকম হওয়ার আরও একটি ভালো দিক হচ্ছে কার্বনকে পরিবেশবান্ধব এবং মানব কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য যে দ্রব্যাদি তৈরি করা হচ্ছে তার জন্য নতুন নতুন আরও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, যে কারণে কর্মসংস্থানের যোগানও বেড়ে যাচ্ছে।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করা হচ্ছে; Source: Digital trends

তবে কার্বন নিয়ে আরও কিছু কাজ করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে কার্বন মজুদ করার জন্য এবং এই প্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত করার জন্য কার্বন নিয়ে মৌলিক কিছু গবেষণা করার প্রয়োজন। যেমন, কার্বন এবং অক্সিজেনের মধ্যেকার বন্ধন ভেঙ্গে ফেলা নিয়ে আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন। কার্বন কিন্তু মোটামুটি বিক্রিয়া স্বাধীন একটি পদার্থ আবার পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় কিন্তু নয়। বিক্রিয়া করার জন্য এর প্রভাবকের প্রয়োজন পড়ে। এই প্রভাবক বিক্রিয়ার জন্য যে পরিমাণ শক্তির দরকার হয় সেটা কমিয়ে দেয়। তাই কার্বন মজুদকরণের জন্য ঠিক কোন প্রভাবক ঠিক ঠিকভাবে কাজ করবে এবং তা খরচ সাপেক্ষ কিনা সেই দিকগুলো নিয়ে এখনও গবেষণা করার প্রয়োজন আছে।

ফিচার ইমেজ সোর্স: Science News

তথ্যসূত্র:

New Scientist (Weekly), March, 2018, pp- 34-37

Related Articles

Exit mobile version