
গত ১৫–১৭ ফেব্রুয়ারি ভারত মহাসাগরের উত্তরাংশে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে যৌথ নৌ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহড়াটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ইরান–রাশিয়া মেরিটাইম সিকিউরিটি বেল্ট ২০২১’। উত্তর ভারত মহাসাগরের প্রায় ১৭,০০০ বর্গ কি.মি. বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। রুশ নৌবাহিনী এবং ইরানের দুই নৌবাহিনী এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইরানের দুইটি নৌবাহিনী রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নৌবাহিনী’ এবং অপরটি হচ্ছে ‘ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌবাহিনী’। ইরানি সশস্ত্রবাহিনী দুইটি ধারায় বিভক্ত। এদের মধ্যে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সেনাবাহিনী’র দায়িত্ব ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা, আর ‘ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী’র দায়িত্ব ইরানের ‘ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক’ শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা। ইরানের দুই নৌবাহিনী যথাক্রমে এই দুইটি বাহিনীর শাখা।
এই মহড়াটিতে অংশগ্রহণকারী ইউনিটগুলোর মধ্যে সিংহভাগই ইরানি। রুশ নৌবাহিনীর ১টি ডেস্ট্রয়ার, ১টি লজিস্টিক্স সাপোর্ট শিপ এবং ১টি হেলিকপ্টার এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ইরানি প্রচারমাধ্যমের ভাষ্যমতে, এই মহড়াটিতে চীন ও ভারতের অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কোনো কারণে চীন বা ভারত কেউই শেষ পর্যন্ত এতে অংশগ্রহণ করেনি। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ইরান, রাশিয়া ও চীন ভারত মহাসাগর ও ওমান উপসাগরে চার দিনব্যাপী অনুরূপ একটি যৌথ নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল।
স্বভাবতই সদ্য সমাপ্ত রুশ–ইরানি যৌথ মহড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর ‘কেন্দ্রীয় কমান্ড’ (Central Command, ‘Centcom’) কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব্য অনুযায়ী, এই মহড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।
এই বক্তব্যের আলোকে উল্লেখ করা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নৌবাহিনীটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সেই তুলনায় রুশ নৌবাহিনী অনেক ক্ষুদ্র (বস্তুত মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের বিপরীতে রুশ নৌবাহিনীতে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার রয়েছে মাত্র ১টি)। এবং ইরানি নৌবহর মূলত একটি ‘ব্রাউন ওয়াটার নেভি’ (brown water navy), অর্থাৎ তাদের কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। খোলা সমুদ্রে বড়মাত্রার নৌযুদ্ধে রুশ বা ইরানি নৌবাহিনীর মার্কিন নৌবাহিনীর বিপক্ষে টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু তাহলে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুশ–ইরানি যৌথ মহড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন? প্রকৃতপক্ষে, এই মহড়াটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়, কিন্তু পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
প্রথমত, ভৌগোলিক ও তথ্যগত দিক থেকে এই মহড়াটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। রুশ ও ইরানি নৌবাহিনীর মধ্যে এ ধরনের মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে উভয় পক্ষ একে অপরের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করছে। রুশরা নিয়মিতভাবে পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরসহ বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে থাকে। ইরানিদের এ ধরনের নজরদারি করার সামর্থ্য রুশদের তুলনায় অনেক কম। এক্ষেত্রে রুশরা যদি মার্কিন নৌবহরের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত ইরানিদেরকে জানাতে শুরু করে, সেক্ষেত্রে ইরান বিশেষ একটি সুবিধা লাভ করবে, কারণ এক্ষেত্রে মার্কিনিরা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো নৌ কার্যক্রম পরিচালনার সময় ‘এলিমেন্ট অফ সারপ্রাইজ’ থেকে বঞ্চিত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশ ও চীনা নৌবাহিনীর প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকবার ইরান সফর করেছেন, যেটি ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ সহযোগিতারই নিদর্শন। সুতরাং, এই মহড়াকে পেন্টাগন রুশ–চীনা অক্ষ কর্তৃক বিশ্বব্যাপী মার্কিন নৌ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে।

দ্বিতীয়ত, এই মহড়াটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের (এবং একই সঙ্গে রাশিয়ারও) সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা চলছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইরানিরা ‘পরিবেশ দূষণে’র অভিযোগে একটি দক্ষিণ কোরীয় ট্যাঙ্কারকে আটক করেছিল, যদিও পরবর্তীতে তারা সেটিকে ছেড়ে দিয়েছে। জাহাজটি আটকের পেছনে পরিবেশগত উদ্বেগের যুক্তি দেখালেও বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রকৃত কারণ ভিন্ন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া ইরানের জ্বালানি বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৭০০ কোটি (বা ৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ইরানকে না দিয়ে আটকে রেখেছে, এর শোধ নিতে ইরান এই কাজ করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এর সপ্তাহখানেক পরে ইন্দোনেশিয়া ইরানি ও চীনা মালিকানাধীন দুইটি জাহাজ আটক করেছে। ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের মতে, জাহাজ দুইটির একটি থেকে অপরটিতে অবৈধভাবে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছিল, তাই তাদেরকে আটক করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এই ঘটনার সঙ্গে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাষ্ট্র, এবং এজন্য ইরানি সরকারের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতেই ইন্দোনেশিয়া এই কাজ করেছে। এর ফলে ইরানি–মার্কিন সম্পর্কে তিক্ততার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে ইরানও তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করেছে। গত জানুয়ারিতে ইরানি নৌবাহিনী আকস্মিকভাবে ওমান উপসাগরে মহড়া করেছে, এবং লোহিত সাগরে নতুন করে টহল দেয়া আরম্ভ করেছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী দক্ষিণ–পশ্চিম ইরানে ইরাকি সীমান্তের কাছে বড় আকারের একটি মহড়া করেছে, এবং এই মহড়ায় ড্রোন, হেলিকপ্টার ও ট্যাঙ্ক ব্যবহার করেছে।
ইরাকের অভ্যন্তরেও ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ সম্প্রতি ইরাকে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি–সমর্থিত একটি ইরাকি মিলিশিয়ার রকেট হামলায় মার্কিন সৈন্যরা হতাহত হয়েছে। অনুরূপভাবে, সিরিয়াতেও ইরানি–মার্কিন উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ কিছুদিন আগেই সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলায় একটি ইরানি–সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর কমপক্ষে ১২ সদস্য নিহত হয়েছে।
যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এরকম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখনই মার্কিনিদের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী (রাশিয়া)-র সঙ্গে ইরানিদের যৌথ মহড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অলিখিত বার্তা হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি রুশ বিরোধী দলীয় নেতা আলেক্সেই নাভালনির কারাদণ্ড এবং ‘নর্ডস্ট্রিম–২’ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে, এবং এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের (পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল) কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্রভাবে শত্রুভাবাপন্ন একটি রাষ্ট্রের (ইরান) সঙ্গে যৌথ নৌ মহড়া করে রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা প্রদান করেছে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

তৃতীয়ত, তেহরান ও মস্কো উভয়েই ইঙ্গিত প্রদান করেছে যে, সদ্য সমাপ্ত মহড়াটির মতো রুশ–ইরানি যৌথ মহড়া ভবিষ্যতে একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিজনক, কারণ এর ফলে ইরানি নৌবাহিনীর গুণগত মানের উন্নতি ঘটবে ও তথ্য সংক্রান্ত ঘাটতি পূরণ হবে। তদুপরি, ইরানের বিতর্কিত পরমাণু প্রকল্পের কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (রাশিয়া ও চীনসহ) ইরানের ওপর যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, সেটি গত বছরে তুলে নেয়া হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের পথে ইরানের জন্য তাত্ত্বিকভাবে আর কোনো বাধা নেই। এর ফলে বিশেষত রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান নিজস্ব নৌবাহিনীর মানোন্নয়ন ঘটাতে পারবে।
ইরানি নৌবাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর তুলনায় অনেক দুর্বল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বে খোলা সমুদ্রে আর কোনো পূর্ণমাত্রার নৌযুদ্ধ হয়নি। সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে মার্কিন নৌবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদেরকে আর কোনো বড় ধরনের নৌযুদ্ধে অংশ নিতে হয়নি। এজন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নতুন রণকৌশল ও সামরিক সরঞ্জাম সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে একটি পূর্ণমাত্রার নৌযুদ্ধ কেমন রূপ ধারণ করতে পারে, সেটি কেবল আন্দাজ করা যায়, কিন্তু সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি নৌবাহিনীর বড় বড় যুদ্ধজাহাজগুলো কার্যত মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য তেমন কোনো হুমকি নয়। কিন্তু ইরানি নৌবাহিনীর ‘অপ্রতিসম যুদ্ধে’র (asymmetrical warfare) কৌশল মার্কিন নৌবহরের জন্য বড় একটি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইরানি নৌবাহিনীর, বিশেষত ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌবাহিনীর একটি স্ট্যান্ডার্ড রণকৌশল হচ্ছে শত্রু জাহাজের বিরুদ্ধে অসংখ্য ক্ষুদ্র কিন্তু দ্রুতগতিসম্পন্ন সশস্ত্র স্পিডবোট লেলিয়ে দেয়া। এই কৌশলটিকে ‘swarming’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একটি ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ারের প্রচুর ফায়ারপাওয়ার থাকতে পারে, কিন্তু যদি কয়েক ডজন স্পিডবোট বিভিন্ন দিক থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বড় জাহাজটির ওপর আক্রমণ পরিচালনা আরম্ভ করে, সেক্ষেত্রে বড় জাহাজটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে এতগুলো লক্ষ্যবস্তুর মোকাবেলা করতে সক্ষম নাও হতে পারে।

অবশ্য সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌবহরের জাহাজগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য জাহাজগুলোর ডেকে বসানো কামানগুলোকে উন্নত করেছে এবং জাহাজগুলোর ‘ক্লোজ-ইন-ওয়েপন্স সিস্টেম’–এর (Close-in-Weapons System, ‘CIWS’) উন্নতি ঘটিয়েছে। এগুলোর পাল্লা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যাতে এগুলো সম্ভাব্য বিমান হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে কয়েক শত রকেট/ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পারে।
অবশ্য মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য ইরানি বিমানবাহিনীর তুলনায় ইরানি নৌবাহিনীকে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এজন্য বর্তমানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে ‘১বি সিআইডব্লিউএস’ স্থাপন করা হচ্ছে, যেগুলো ইরানি স্পিডবোটের ‘swarm’ আক্রমণের হাত থেকে জাহাজগুলোকে রক্ষা করবে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানি নৌবাহিনীর যেকোনো ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করবে। সেজন্য স্বভাবতই রুশ–ইরানি যৌথ নৌ মহড়া এবং সামগ্রিক রুশ–ইরানি সামরিক সহযোগিতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সর্বোপরি, এই সময়ে রুশ–ইরানি যৌথ নৌ মহড়ার আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইরান নিজস্ব ‘কৌশলগত সার্বভৌমত্বে’র চর্চা করেছে এবং ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ নবায়ন সংক্রান্ত আলোচনায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাচ্ছে। ২০১৫ সালে ৬টি বৃহৎ শক্তি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন), ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইরানের মধ্যে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত থাকার জন্য সম্মত হয়, এবং বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়, এবং ইরানের উপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি জোসেফ বাইডেন এই চুক্তিতে প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী, কিন্তু তার প্রশাসন শর্ত প্রদান করেছে, চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে হবে। তদুপরি, এই চুক্তির মাধ্যমে বাইডেন প্রশাসন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের আঞ্চলিক নীতির পরিবর্তনে আগ্রহী। কিন্তু ইরান চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে। তদুপরি, তারা এই চুক্তির সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প এবং আঞ্চলিক নীতিকে সম্পর্কিত করতে মোটেই ইচ্ছুক নয়।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া ইরানি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে, এবং ইরানও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝাতে চাচ্ছে, তারা মার্কিনিদের তৈরি নিয়ম মেনে চলতে ইচ্ছুক নয়। এক্ষেত্রে এই মহড়াটির তাৎপর্য মূলত প্রতীকী।
রুশ–ইরানি যৌথ মহড়াটির ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। রাশিয়া ও ইরান চাইলেই পারস্য উপসাগরে এই মহড়ার আয়োজন করতে পারত, কিন্তু সেটি না করে তারা উত্তর ভারত মহাসাগরে এই আয়োজন করেছে। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুব বেশি উস্কানি প্রদান না করা। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, এবং এই অঞ্চলটিকে যুক্তরাষ্ট্র ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
এটি ভুলে গেল চলবে না যে, ১৯৭৯ সালে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণের ঘটনাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এত বেশি নেতিবাচকভাবে নেয়ার কারণ ছিল, আফগানিস্তান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক নৈকট্য। অর্থাৎ, এই অঞ্চলের খুব কাছে সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য ছিল না। একই কথা বর্তমানে রাশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তদুপরি, সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে, এবং এতদঞ্চলে রুশ–ইরানি মহড়া এই উত্তেজনাকে আরো উস্কে দিতে পারত। এই মহড়াটির আয়োজনের পিছনে মস্কো ও তেহরানের একটি উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অলিখিত বার্তা প্রদান করা, কিন্তু তাদেরকে উস্কে দেয়ার ইচ্ছে তাদে কারোর নেই। অবশ্য সেন্টকমের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে বলা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা পৌঁছে দেয়ার রুশ ও ইরানি লক্ষ্য বেশ ভালোভাবেই সফল হয়েছে।