বাহাই ধর্মের ইতিবৃত্ত

ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম মূল সুর ছিলো ইহজাগতিকতাবাদ। চার্চের অনাচার এবং ব্যক্তিজীবনে ধর্মগুরুর হস্তক্ষেপে অতিষ্ঠরা এই সুযোগে ছুড়ে ফেলে দেয় ধর্মকে। সেই ধারণায় প্রভাবিত হয় পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র। প্রচণ্ড ধার্মিকও ভাবতে থাকে নতুন করে। সত্যিই কি ফুরিয়ে গেছে ধর্মের প্রয়োজন? উত্তর দেবার জন্যই যেন আগমন ঘটলো নতুন এক বিশ্বাসের, বাহাই ধর্ম। পৃথিবীর অন্যতম কনিষ্ঠ স্বাধীন বিশ্বাস ব্যবস্থা। ঈশ্বরের একত্ববাদের পাশাপাশি যেখানে প্রাধান্য পেয়েছে মানবজাতির একত্ব ও ধর্মের সামঞ্জস্য। বাহাউল্লাহ বলেছেন-

সকল মানুষ এবং সকল জাতি একটা মাত্র পরিবার। এক পিতার সন্তান। তাদের সেভাবেই থাকা উচিত, যেভাবে ভাইবোনেরা একে অপরের সাথে থাকে।

বাহাই মতবাদ সকল ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রচারকদের বৈধতা দেয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আগমন কেবল মানুষের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের প্রগতিশীলতাই প্রমাণ করে। উনবিংশ শতকের ইরানে মির্জা হুসাইন আলী নুরীর মুখে যে দুঃসাহসিক কথা উচ্চারিত হয়, তার বিস্তার ঘটে বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে । যেমনটা ঘটেছিলো তিন হাজার বছর আগের জরাথুস্ত্রের সময়। 

মানুষ ও স্রষ্টার সম্পর্ক প্রতীকায়িত করে রিংস্টোন সিম্বল © the-symbols.net

প্রেক্ষাপট

বাহাই ধর্মের জন্ম ‘বাব’ মতবাদের উপর ভিত্তি করে। আরবী বাব শব্দের অর্থ দরজা। শিয়াদের মধ্যে বাবের ধারণা অনেক পুরনো। দশম শতকের দিকে দ্বাদশ ও শেষ ইমাম আত্মগোপনে যান। তার অনুপস্থিতিতে ইমানদারদের দিক নির্দেশনার জন্য কাউকে নিযুক্ত করা হতো। তিনি বাব নামে পরিচিতি পেতেন। তাৎপর্যগতভাবে বাব-এর অর্থ ইমানদার ও গুপ্ত ইমামের মধ্যকার যোগযোগের দুয়ার। যা-ই হোক, পর পর চারজন বাব আসার পর এই ধারণার বিলুপ্তি ঘটে। ১৮৪৪ সালে পারস্যে শিরাজের এক তরুণ ব্যবসায়ী সৈয়দ আলী মুহম্মদ আচমকা নিজেকে ‘বাব’ দাবি করে বসলেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, তার পরে নাকি আরো সম্মানিত একজন আসছেন।

হাইফাতে বাবের সমাধি © Bahai.org

তাকে গ্রেফতার করে আজারবাইজানের পার্বত্য দুর্গে রাখা হলো। সেখানকার গভর্নরসহ অনেককেই নিজের অনুসারী করে ফেললেন তিনি। তার লেখা ‘বায়ান’ পবিত্র গ্রন্থের মর্যাদা পায় অনুসারীদের মাঝে। তারপরেও দ্রুতই রোষানলে পড়তে হলো সবাইকে। ১৮৫০ সালে নিজেই নিহত হলেন। প্রধান প্রধান অনুসারীদের নির্বাসনে দেয়া হলো ইরাকে। এদের মধ্যে ছিলেন মির্জা হুসাইন আলী নুরী বা বাহাউল্লাহ এবং তার সৎ ভাই মির্জা ইয়াহিয়া নুরী বা সুবহ-ই আজল। ১৮৬৪ সালে বাহাউল্লাহ নিজেকে প্রতিশ্রুত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করলে দুটি ধারার জন্ম হয়। সুবহ-ই আজলের অনুসারীরা বাব মতবাদের উপর স্থির থেকে আজালি নামে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে বাহাউল্লাহর অনুসারীরা পরিচিতি পায় বাহাই নামে।

বাহাউল্লাহ এবং তার যুগ

বাহাউল্লাহর জন্ম তেহরানের সমৃদ্ধ পরিবারে। খুব অল্প সময়েই বাব মতবাদ গ্রহণ করলেও বাবের সাথে তার সরাসরি দেখা হয়নি। ১৮৫২ সালে তাকে তেহরানের কারাগারে বন্দী করা হয়। এই সময়েই তিনি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং পরবর্তী মিশন সম্পর্কে সচেতন হন। ১৮৫৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করলেও সপরিবারে বাগদাদে নির্বাসিত হন। সেখানে নিজের ভাই সুবহ-ই আজলসহ অনেক বাব মতাবলম্বীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে।

নির্বাসন আর কারাভোগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে বাহাইদের ইতিহাস © Bahaiteachings.org

১৮৫৪ সালে কুর্দিস্তানে যান এবং দুই বছর দরবেশি জীবন যাপন করেন। বাগদাদ ফেরার পর তার প্রভাব সকলের উপর এতটা প্রবলভাবে পড়ছিলো যে, কর্তৃপক্ষ ভয় পেয়ে গেলো। ২১শে এপ্রিল, ১৮৬৩ সালে বাগদাদে নাজিব পাশার বাগানে তিনি নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত এবং বাব কর্তৃক প্রতিশ্রুত সেই ব্যাক্তি বলে ঘোষণা দেন। ইস্তাম্বুলে কিছুদিন থাকার পর তাকে নির্বাসন দেয়া হয় এড্রিনে। সেখান থেকে খোলাখুলিভাবে নিজের মত প্রচার করতে থাকেন। পোপ চতুর্দশ পায়াসসহ অনেককে পত্র প্রেরণ করেন। বেশিরভাগ বাবপন্থীই এই মতবাদ গ্রহণ করলো। অটোম্যান সুলতান তাকে পরেরবার ফিলিস্তিনে নির্বাসন দিলে ১৮৬৮ সালে তিনি সেখানে পৌঁছান। এ কারণেই ফিলিস্তিন বাহাইদের কাছে পবিত্র স্থান। প্রায় নয় বছর তাকে আক্রার দুর্গে অবরুদ্ধ থাকতে হয়। ১৮৭৭-৮৪ সালের মধ্যে তার জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখা “কিতাবুল আকদাস” রচনায় ব্যাপৃত থাকেন। ১৮৮০ সালের দিকে তাকে অনুমতি দেয়া হয় হাইফা গমনের। এর ঠিক বারো বছর পর ১৮৯২ সালে কিছুদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে মৃত্যুবরণ করেন। 

আক্রাতে বাহাউল্লাহর সমাধি © Bahai.org

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

বাহাউল্লাহর পর তার ইচ্ছাতেই দায়িত্ব পান বড় ছেলে আব্বাস এফেন্দি (১৮৪৪-১৯২১) । পিতার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রমাণ রাখার দোষে তাকে নির্বাসনে যেতে হয়। করতে হয় কারাবরণ। আবদুল বাহা নামে পরিচিতি পান তিনি। ১৯০৮ সালে তুরস্কে ‘ইয়ং টার্কস’ সরকারের সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি লাভ করেন।

প্রবীণ আবদুল বাহা এবং অক্সফোর্ড পড়া শোগি এফেন্দি © Bahai.org

স্বীয় ভাইয়ের শত্রুতা সত্ত্বেও ঈর্ষনীয় সাফল্য আসে। যে দেশে ভ্রমণ করতেন, প্রতিষ্ঠা করে আসতেন বাহাইদের সংগঠন। ব্রিটিশ সরকার নাইট উপাধি দেয় ১৯২০ সালে। এর কিছুদিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করলে বাহাইদের নেতৃত্ব নেন শোগি এফেন্দি রাব্বানী (১৮৯৯-১৯৫৭)। অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষা লাভ করে ১৯২৩ সালে তিনি হাইফাতে ফেরত আসেন এবং একে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কাউকে মনোনীত করে না যাবার কারণে তার মৃত্যুর পর প্রশাসনিক কাজের জন্য ১৯৬২ সালে গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস। সেই থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বাহাই বিশ্বাস

অন্যান্য ধর্মের মতো বাহাই বিশ্বাসীরা ধর্মীয় সত্যকে অপরিবর্তনীয় হিসেবে মনে করে না। বরং ধর্ম তাদের কাছে আপেক্ষিক সত্য। স্রষ্টা এক এবং অবিনশ্বর। মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও চিন্তা তাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে স্রষ্টা তার বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আ), কৃষ্ণ, জরাথুস্ত্র, হযরত মুসা (আ), বুদ্ধ, যীশুখ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আ) এবং হযরত মুহম্মদ (সা) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।হযরত ইবরাহীম (আ) একটি গোত্রকে একত্রিত করেছেন। হযরত মুসা (আ) করেছেন একটি সম্প্রদায়কে। নবী মুহম্মদ (সা) করেছেন একটি জাতিকে। যীশুখ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আ) কাজ ছিলো ব্যক্তিজীবনের পবিত্রতা। কিন্তু এটিই শেষ কথা নয়। গোটা মানবজাতির জন্য পবিত্রতা প্রয়োজন। মানবজাতির আধ্যাত্মিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য আধুনিক যুগে প্রেরণ করা হয়েছে ‘বাব’ এবং বাহাইকে।

বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোকে একত্রিত করেছে ‘বাহাই স্টার’  © minorityrights.org

সভ্যতার ক্রম অগ্রসরতার সাথে সাথে ধর্মও প্রাগ্রসর হয়েছে। সভ্যতা তার শৈশব অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে দিন দিন পরিণত হচ্ছে। নতুন যুগে তার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই অন্যরকম হতে হবে। আবদুল বাহা বলেছেন,

আদিম মানুষের প্রয়োজন যা দিয়ে পূরণ করা যেত, তা বর্তমান মানুষের জন্য যথেষ্ট না। এই যুগের জন্য নতুনত্ব ও পরিপূর্ণতা প্রয়োজন। এখন তাকে নতুন গুণাবলি ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে অগ্রগতি ঘটেছে ধর্মের © Bahaiteachings.org

গোটা মানবজাতি প্রকৃতপক্ষে একটি শরীরের মতো। প্রকৃতিকে বাহাইরা স্রষ্টার গুণাবলির প্রকাশক হিসেবে দেখে। যদিও প্রকৃতির তাৎপর্য আছে. কিন্তু তা কোনোভাবেই প্রকৃতিপূজার দিকে টানে না। বলা হয়,

যতক্ষণ মানুষ পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির খাঁচায় আবদ্ধ, ততক্ষণ সে হিংস্র পশু। কেননা অস্তিত্বের জন্য ‍যুদ্ধ-বিগ্রহ করা বস্তুজগতের বৈশিষ্ট্য।

আত্মাকে বাহাউল্লাহ সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন। আত্মার কারণেই দেহ অস্তিত্বশীল হয় এবং স্থিতিশীলতা পায়। মানুষ নিজেও স্বর্গীয় গুণাবলি অর্জন করতে সক্ষম। এজন্য তাকে উপাসনা করতে হবে এবং পবিত্র গ্রন্থাবলি পাঠ করতে হবে, নানা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে এবং মানবতার জন্য কাজ করতে হবে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আত্মা শরীর থেকে মুক্ত হয়ে আরো পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়।

ধর্মপালন ও পুণ্যচর্চা

বাহাউল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, এমন যে কেউই বাহাই সমাজের সদস্য। কোনোপ্রকার সংস্কার, অনুষ্ঠান কিংবা যাজক নেই এ ধর্মে। প্রত্যেক বাহাইকে প্রাত্যহিক আধ্যাত্মিক চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। শরাব, অ্যালকোহল কিংবা মনের উপর প্রভার ফেলে- এমন কিছু থেকে বিরত থাকার আদেশ দান, একক বিবাহের উপর জোর আরোপ ও বিয়েতে পিতামাতার সম্মতি গ্রহণে গুরুত্ব দেয়া হয়। বাহাই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি মাসের প্রথম দিন একত্রিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বলা বাহুল্য, বাব তার কিতাবুল বায়ানে নতুন ধরনের ক্যালেন্ডারের ধারণা দেন। এর বিশেষত্ব, ১৯ দিনে মাস এবং ১৯ মাসে বছর, যেখানে চার দিন অতিরিক্ত যোগ করা হয়। এই মতে, সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য শেষ মাস ১৯ দিনব্যাপী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখতে হবে। উনিশ ‍দিন ভোজ উৎসব মূলত বাহাই ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাহাই পঞ্জিকার উদ্ভাবক মূলত বাব নিজে © Bahaiteachings.org

খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের বিপরীতে তারা কেবল মৃতের জন্য ছাড়া বাকি ক্ষেত্রে একাকী উপাসনায় গুরুত্ব দেয়। এছাড়া কিতাবুল আকদাসে উত্তরাধিকার, ১৯% কর প্রদান এবং খুঁটিনাটি অনেক সমস্যা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। নারী আর পুরুষকে দেয়া হয়েছে সমান অধিকার। তালাক দেয়াকে বৈধ ঘোষণা করা হলেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রথমদিকে সামর্থ্যবানদের জন্য জীবনে একবার শিরাজে বাবের বাসভূমে এবং বাগদাদে বাহাইয়ের বাসভূমে পরিদর্শন করার নিয়ম ছিলো। পরে তা শিথিল হয়ে যায়। প্রাধান্য পায় আক্রা ও হাইফা। যদিও তা প্রতিবছর আগ্রহী ভ্রমণকারী বাহাইদের জন্য সাধারণ তীর্থস্থান হিসেবেই পরিগণিত হয়।  

সংগঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম

বাহাই সম্প্রদায় পরিচালনার জন্য মূলনীতি বাহাউল্লাহ নিজেই দিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে আবদুল বাহার মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা ও বিস্তার লাভ ঘটেছে। গঠনগতভাবে পিরামিডীয় দুই ধরনের পরিষদ গড়ে উঠেছে- প্রশাসনিক ও নির্দেশনামূলক। প্রশাসনিক পরিষদ বলতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের আধ্যাত্মিক সমাবেশ এবং সেই সাথে ‘ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস’কে বোঝায়। 

হাইফাতে ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস © Bahai.org

সার্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ৯ জনের পরিষদ গঠিত হবে। এই নির্বাচন পবিত্র কাজ হিসেবে গণ্য। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর রিজওয়ান উৎসবের ‍দিন (২১শে এপ্রিল – ২রা মে)। পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থানীয় পরিষদ গঠিত হলে তাদের নিয়ে ৯ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে। আবার প্রতি পাঁচ বছর পর পর জাতীয় পরিষদের সকল সদস্যকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হবে, যা ‘ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস’ নামে পরিচিত। ইসরায়েলের হাইফাতে অবস্থিত কেন্দ্র, যা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ধারণ করে, নতুন সমস্যার সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে নির্দেশনামূলক পরিষদের ধারণা আসে মনোনীত করার মাধ্যমে। বোর্ডের সদস্যরা তাদের সহকারী মনোনীত করেন। এই সদস্যরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পরিষদকে মেনে চলে।

কিতাব ও দলিলাদি

বাহাউল্লাহর লেখা ও নির্দেশনাগুলো বাহাইদের কাছে পবিত্র এবং অনুসরণীয় বলে গণ্য হয়। বাহাউল্লাহর লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে ‘কিতাবুল আকদাস’, কিতাব আল ইকান এবং জাওয়াহিরুল আসরার।

কিতাবুল আকদাসের মতো অন্যান্য গ্রন্থগুলোও দলিল হিসাবে গৃহীত হয় © manybooks.net

এছাড়া আছে The Call of the Divine Beloved, Days of Remembrance, Epistle to the Son of the Wolf, The Hidden Works, Gleanings from the Writings of Bahaullah, Prayers and Meditations by Bahaullah ইত্যাদি। বাবের লেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বায়ান’ ও ‘কিতাবুল আসমা’। আবদুল বাহা, শোগি এফেন্দি এবং হাউস অব জাস্টিসের সিদ্ধান্তও দলিল হিসাবে বাহাইরা গ্রহণ করে।  

উপসনালয়

যদিও বাহাই মতবাদে আনুষ্ঠানিক উপাসনা নেই। তথাপি কিতাবুল আকদাসে বাহাউল্লাহ ‘মাশরিকুল আজকার’ নামক উপসনাগৃহ নির্মাণের কথা বলেছেন। এটি নয় পাচিল বিশিষ্ট ভবন, যার উপরে আছে নয়ভাগে বিভক্ত গম্বুজ। গৃহটি সকল বিশ্বাসের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ১৯২০ সালে ইশাকাবাদে তৎকালীন তুর্কিস্তানে এ ধরনের উপসনালয় প্রথম নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে তা ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

স্থাপত্য কাজে বাহাইদের অনন্যতার নিদর্শন একেকটি উপাসনাগৃহ © Bahaullah.org

একুশ শতকের দিকে নয়টি বাহাই উপাসনাগৃহ নির্মিত হয়েছে। এগুলো আছে অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, চিলি, জার্মানি, ভারত, পানামা, যুক্তরাষ্ট্র, উগান্ডা এবং সামোয়াতে।

পরিশিষ্ট

বাহাই কোনো স্বাধীন ধর্ম বলে স্বীকৃতি না পাবার কারণে প্রায়ই এর অনুসারীদের উপর আসতো অত্যাচার ও নিপীড়ন। বিশেষত ইরান এবং মিশরে বেশ কয়েকবার তাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কম আর বেশি বিপাকে পড়তে হয়েছে আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে। তারপরও বর্তমান বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী ধর্ম হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে বাহাই মতবাদ। সাম্প্রতিক তথ্য মতে, পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৬ মিলিয়ন বাহাই এবং তাদের জন্য ১৬৫টি জাতীয় পরিষদ আছে। স্থানীয় আধ্যাত্মিক পরিষদের সংখ্যা ২০,০০০। ৮০২টি ভিন্ন ভাষা এবং ২,১১২টি ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এর সাথে সংশ্লিষ্ট। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম থেকে প্রভাবিত হলেও বাহাই ধর্ম প্রমাণ করেছে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব। স্রষ্টার একত্ববাদের পাশিপাশি গীত হয়েছে মানবজাতির ঐক্যের গান। যেমনটা বলা হয়,

বাহাউল্লাহর মূল শিক্ষা হলো সকলকিছুকে বরণ করার ভালোবাসা। কেননা কেবল ভালোবাসাই মানবজাতির প্রতিটি মহৎ গুণকে একত্রে ধারণ করতে পারে। ফলে প্রতিটা আত্মা সামনে এগিয়ে যায়। একটা আরেকটাকে উত্তরাধিকার অর্পনের মাধ্যমে অমরত্ব দেয়। খুব শীঘ্রই তোমরা দেখতে পাবে, প্রতিপালকের স্বর্গীয় শিক্ষা কীভাবে পৃথিবীর আকাশকে আলোকিত করে। (Abdul Baha, Selections from the Writings of Abdul Baha, Page- 66) 

হাইফাতে বাহাই গার্ডেন © nesmobile.com

 

Related Articles

Exit mobile version