উদারিং হাইটস: মানবীয় আবেগের এক আখ্যান

সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে প্রথমবার শুধুমাত্র পরীক্ষা পাসের জন্যই এই ক্লাসিক উপন্যাসটি পড়া হয়েছিল। পরে অবসর সময়ে কেন জানি বইটি আবার নেড়েচেড়ে দেখলাম, যার ফলাফল এই রিভিউ। হালকাভাবে দেখলে অনেকের কাছে এটা নিছক প্রেম-ভালোবাসা এবং প্রতিশোধের গল্প বলে মনে হবে, কিন্তু গভীরভাবে অনুধাবন করা গেলেই বোঝা যায় এমিলি ব্রোন্ট কী অসাধারণভাবে মানবচরিত্রের রহস্যময়তা, জটিলতাকে তুলে ধরেছেন।

পুরো গল্পে আলো-অন্ধকারের সংমিশ্রণ থাকার পরও লেখক শেষ পর্যন্ত কাউকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি, সম্ভবত পড়া শেষে কেউই সে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না। এজন্য পরিণত পাঠকগণই সফলভাবে এর রস আস্বাদন করতে পারবেন বলে মনে হয়েছে।

উদারিং হাইটস; Image Source: Amazon

প্রেম-ভালোবাসা, ভাগ্য, ঘৃণা, প্রতিশোধ, শ্রেণিভেদ সবকিছু নিয়েই এই উপন্যাস। মানবচরিত্রের নানা উত্থান-পতন খুব ভালোভাবেই বিশ্লেষিত হয়েছে এখানে। এই গল্পে তিনি দু’টি প্রজন্মকে তুলে ধরেছেন। প্রথম প্রজন্মের ক্যাথরিন আর্নশ-হীথক্লিফের বিচ্ছেদকে দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্যাথরিন লিনটন-হেয়ারটনের বিয়ের মাধ্যমে একধরনের পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও সবকিছু ছাপিয়ে ক্যাথরিন আর্নশ-হীথক্লিফের রসায়নই পুরো কাহিনী জুড়ে রাজত্ব করেছে। তাদের পরস্পরের প্রতি টান, মায়া-মমতা, ভালোবাসা, আবার একইসাথে হীথক্লিফের তীব্র প্রতিশোধপরায়ণতা, এবং এই স্পৃহা তাকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যায়, তা জানতে হলে পাঠককে ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে হবে।

হীথক্লিফের দুরবস্থার জন্য একসময় হয়তো ক্যাথরিনই দায়ী বলে মনে হবে, কিন্তু গল্পের বিভিন্ন জায়গায় হীথক্লিফের প্রতি তার গভীর আবেগের সহজ-সরল স্বীকারোক্তির কাছে পাঠকের হার মানার সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে ক্যাথরিনের প্রতি এডগারের সরল, নির্মল ভালবাসার চেয়েও হীথক্লিফের বুনো, একরোখা অধিকার ফলানো অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। প্রধান ও অন্যতম চরিত্র ক্যাথরিন আর্নশের মৃত্যুুর পরেও হীথক্লিফের জীবনে তার একছত্র আধিপত্য কাহিনীর ছন্দপতন ঘটায়নি।

লেখক ঊনবিংশ শতাব্দীর সে সময়কে অনেকাংশেই ফুটিয়ে তুলেছেন পুরো গল্পে। ভালোভাবে উপলব্ধি করলে দেখা যায়, গল্পের নারী চরিত্রগুলোকে কতটা দুর্বলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ক্যাথরিন আর্নশকে প্রথমদিকে শক্তিশালী চরিত্র মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তাকেও বাস্তবতার কাছে হার মানতে দেখা যায়। অন্যদিকে ক্যাথরিন লিনটনকে তার বাঁধাধরা নিয়মে আটকে রাখতে প্রায় অনেকটাই সফল হয় হীথক্লিফ। ইসাবেলার পুরো জীবনটাই ধ্বংস হয় হীথক্লিফের প্রতিশোধপরায়ণতার কারণে। চারিত্রিকভাবে তারা উচ্ছল, দুরন্ত হলেও প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে দমিত হয়েছে পুরুষ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে।

তবে একইভাবে দেখতে পাই, জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে এই নারী চরিত্রের অনুপস্থিতি, মায়া-মমতার অভাবেই আজকের হীথক্লিফের জন্ম। উপন্যাসের পরের অংশেও হেয়ারটনকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে দেখা যায় ক্যাথরিন লিনটনকে।

জীবনের বিশেষ কিছু সময়ে আত্মার বন্ধনই অনেক বেশি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে হয়তো ক্যাথরিন এটা অনুভব করে। শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল ক্যাথরিন তার মনের গভীরে লুক্কায়িত হাহাকার প্রকাশ করে। এ সময়ে দুজনের বাক্যবিনিময় লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই ভঙ্গুর মুহূর্তে ক্যাথরিন তার স্বরূপে ফিরে আসে, হীথক্লিফের প্রতি তার অনুভূতি প্রকাশ পায়, যা  কালের আবর্তনেও হারিয়ে যায়নি। অন্যদিকে, ইহকালীন বিচ্ছেদকে কোনোভাবে সামাল দিলেও ক্যাথরিনের চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে যাওয়াকে হীথক্লিফ মেনে নিতে পারে না। এক পর্যায়ে হীথক্লিফ বলে উঠে, “আমার আত্মা ছাড়া আমি বাঁচবো কী করে?”। আবার বলা যায়, এ বিচ্ছেদই হীথক্লিফকে পরবর্তী সময়ে আরো ভয়ংকর করে তোলে।

পুরো কাহিনী জুড়ে হীথক্লিফ এমন এক ভালোবাসার পেছনে ছুটে চলেছে, যা তার পুরো জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে আবার একইসাথে তা আত্মিক এবং স্বর্গীয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে হীথক্লিফের ভালোবাসা বড় বেশি স্বার্থপর রূপে ফুটে উঠেছে। ভালোবাসার যে বিশালতা, ঐশ্বরিক ক্ষমতা, সেটিকে হীথক্লিফ ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। এবং এটার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে ইসাবেলার উপর। এ নেতিবাচকতা উপন্যাসের প্রায় সব চরিত্রের উপর এক অন্ধকার ছায়ারূপে বিরাজমান ছিলো।

উপন্যাসের বর্ণনাকারী হিসেবে লকউড এবং নেলী নামের চরিত্র দু’টির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। নেলীকে কাহিনীর বর্ণনাকারী হিসেবে পরিচয় করানো হলেও তার চরিত্রায়ন খুবই শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার বেশ জোরালো একটা প্রভাব আছে। এছাড়া প্রধান চরিত্রগুলোর জীবনে নেলী কখনো সাহায্যকারী, কখনো পরামর্শদাতা, কখনো সমালোচক, কখনো একমাত্র অবলম্বন হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। কিছু কিছু মুহূর্তে আমরা নেলীকে অভিভাবক হিসেবেও পেয়েছি। আবার বহু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং পর্যবেক্ষক হিসেবে নেলীর ভূমিকা অতুলনীয়। সেক্ষেত্রে মূল প্রেক্ষাপটে লকউডের তেমন একটা উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

লেখক এমিলি ব্রোন্ট; Image Source: The Day

উপন্যাসের বাকি সব চরিত্রে খুব বেশি বৈচিত্র্য আনা হয়নি। আবার দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধান চরিত্র এবং ক্যাথরিন আর্নশের মেয়ে হিসেবে ক্যাথরিন লিনটনের প্রতি প্রত্যাশা বেশি ছিল, যার যথার্থতা উপন্যাসে পরিলক্ষিত হয়নি। এছাড়া কিছু চরিত্রের নামকরণ এবং যোগসূত্র সাময়িকভাবে সংশয় সৃষ্টি করেছে। উপন্যাসের কিছু জায়গায় অতিপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা হীথক্লিফ চরিত্রের মতোই তাড়নাদায়ক। তবে তা গল্পের প্রয়োজনেই আনা হয়েছে এবং উদারিং হাইটসের রহস্যময় পরিবেশের সাথে মোটেও অযাচিত নয়।

সিন্ধান্তহীনতায় ভোগা একজন মানুষ হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে পছন্দের অংশটি ছিল যেখানে ক্যাথরিন আর্নশ তার প্রিয় দু’জন মানুষের প্রতি নিজের একান্ত অনুভূতির তুলনা করেছে। এরকম কঠিন একটা সময় খুব সম্ভবত প্রায় সবার জীবনেই আসে। উপন্যাসের মূল ভাষায় ক্যাথরিনের লাইনগুলো ছিল এরকম,

“My love for Linton is like the foliage in the woods: time will change it, I’m well aware, as winter changes the trees. My love for Heathcliff resembles the eternal rocks beneath; a source of little visible delight, but necessary.”

এডগার এবং লিনটনের মধ্যকার পার্থক্য ভালভাবেই জানা আছে ক্যাথরিনের। তাই এডগারকে বিয়ে করার সিদ্দান্তটি ঝোঁকের বশে নেওয়া হয়েছে ভেবে ভুল করার অবকাশ নেই। এছাড়া লেখক উপন্যাসের ভাবমূর্তির সাথে পরিবেশের এক অভিনব যোগসূত্র সৃষ্টি করেছেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, পুরো কাহিনী জুড়ে হীথক্লিফের অন্ধকার দিকগুলো একচেটিয়াভাবে প্রকাশিত হলেও কিছু আলোকছটা এমনভাবে বেরিয়ে এসেছে, যা বাকি সবকিছু ম্লান করে দেয়। এটাই বোধহয় সাহিত্যের সার্থকতা। এভাবেই পৃথিবীতে আলো-অন্ধকার, শুভ-অশুভ, সাদা-কালো একসাথে মিশে থাকে। এই নেতিবাচক দিকগুলোর কারণেই ইতিবাচকতা এখনো আমাদের এতটা আকর্ষণ করে। 

বইয়ের নাম: উদারিং হাইটস || লেখক: এমিলি ব্রোন্ট

প্রকাশক: পেঙ্গুইন পাবলিশিং লিমিটেড || অনলাইন প্রাপ্তিস্থান: রকমারি.কম

This article is in Bangla. This is a review of 'Wuthering Heights' by Emily Bronte.

Featured Image: Literary Hub

RB/AC

Related Articles

Exit mobile version