গণিত নিয়ে যারা কম-বেশি কাজ করেন, তাদের কাছে ইয়ান স্টুয়ার্টের নামটি অজানা নয়। খুব কম সংখ্যক মানুষই গণিতকে সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে প্রকাশ করতে পারেন, যাতে গণিতের ভয় কেটে যায়। ইয়ান স্টুয়ার্ট তেমনি একজন মানুষ যিনি তার লেখনীর মাধ্যমে গণিতের রহস্যময় জগতকে সহজ, সরল ও প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন। Fourier Equation, Laplace Transformation এর সমীকরণগুলোর ভৌতগত মান এবং ব্যবহার জানার জন্য তার বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। জীববিজ্ঞানের গাণিতিক রুপ খুঁজে বের করতে, ডিজিটাল ফটোগ্রাফিতে, পুরনো বা ক্ষয়ে যাওয়া কোনো রেকর্ডিং পুনরুদ্ধার করতে Fourier Equation ব্যবহার করা হয়। এমনকি ভূমিকম্পের গবেষণায়, রোড সেন্সর বেসড ডাটা এনালাইসিসে Fourier Concept ব্যবহার করা হয়। বাস্তব জীবনে কোন গাণিতিক সমীকরণ কোথায় ব্যবহার হবে এটা যদি সমীকরণটি পড়ার আগে জানা যায়, তাহলে বিষয়টা খুব মনোযোগ দিয়ে এবং মজা নিয়ে গভীরভাবে পড়া যায়।
ইয়ান স্টুয়ার্ট বর্তমানে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমিরেটাস অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাকে Catastrophe Theory এর অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও গণিতকে কীভাবে উদ্ভাবনী পর্যায়ে ব্যবহার করা যায় এই বিষয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি অধিক সুপরিচিত। Manifold, Scientific American এ ১৯৯১-২০০১ পর্যন্ত তিনি লেখালেখি করেন। তার গবেষণা নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০০১ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি এর ফেলো নির্বাচিত হন। তার জনপ্রিয় কিছু বই নিয়ে আজ আলোচনা করা হবে।
১. Game, Set and Math – Enigma and Conundrum
গাণিতিক হেঁয়ালিতে ভরা বই ১২টি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে গণিত নিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে কথোপকথন দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সম্ভাব্যতার র্যান্ডম অবস্থা, ফার্মার উপপাদ্য, কনিসবার্গ ব্রিজ (গ্রাফ থিওরিতে ব্যবহার করা হয়), মবিয়াস ব্যান্ড ইত্যাদি বিষয় গল্পের ছলে, সংলাপ আকারে বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে। বইটি যেকোনো বয়সী পাঠকের জন্য উপযোগী।
২. From here to Infinity
আগের বইটির তুলনায় এ বইটি টেকনিক্যালি এডভান্স লেভেলের। বিখ্যাত সব গাণিতিক সমস্যার সমাধান এবং প্রমাণ নিজের মতো করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- The Four Color Problem এর কথা বলা যায়। এছাড়া গণিত কী, গণিত কেন, কখন আমাদের নতুন গণিতের প্রয়োজন হয়- এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে এই বইটিতে [২]।
৩. Natures’ Number
প্রকৃতিতেও গাণিতিক প্যাটার্ন দেখা যায়। যেমন- সূর্যমুখী ফুলের বীজে ফিবনাচ্চি নম্বর, বিভিন্ন ধরনের গাঠনিক প্যাটার্ন যেমন- তুষারকণা। এরকম অবাক করা অনেক প্রাকৃতিক গাণিতিক নকশা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে এই বইটিতে। প্রতিসাম্যতা, আংশিক সাম্যতা বা অসাম্যতা নিয়ে আলাদা আলদাভাবে আলোচনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পুকুরের উপরিতলের পানির মধ্যে সাম্যতা দেখা যায়। যখন পানিতে ঢিল ছুড়ি তখন সাম্যতা ভেঙ্গে যায়, আবার যেখানে ঢিল পড়ল সেই বিন্দু থেকে আবার এককেন্দ্রিক বৃত্তাকার (Concentric circle) আকার তৈরি হয়ে যায় যা আবার আংশিক সাম্যতায় ফিরে আসে। স্টিওয়ারটের অন্যান্য বইয়ের মতো এখানেও গাণিতিক হেঁয়ালি প্রদর্শন করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর সাথে আগের বইগুলোর হেঁয়ালির তেমন কোনো মিল নেই [৩]।
৪. Does GOD Play Dice
বইটি কৌশলগত খুঁটিনাটি গাণিতিক সমীকরণে ভরপুর। যারা ডাইনামিক সিস্টেম, Chaos নিয়ে আগ্রহী এই বইটি তাদের জন্যে। কারণ এ বইয়ে ডাইনামিক সিস্টেম নিয়ে প্রচুর রিয়েল লাইফ উদাহরণ আছে। যারা অঙ্কের কচকচানি পছন্দ করে না, শুধু বই পড়তে চায় (Layperson), তাদের উপযোগী করে বইটি লেখা। নিউটনিয়ান মহাবিশ্ব, লাপ্লাসের নীতি, সম্ভাব্যতা, পয়েনকেয়ার থ্রী বডি সমস্যা, আধুনিক গতিবিদ্যা এবং গতি প্রক্রিয়া, রৈখিক এবং বক্র গতি- এসব নিয়ে বিস্তর ব্যবহারিক আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া গাণিতিক মডেল কীভাবে বানানো যায়, যেমন- জনসংখ্যা নীতি, বিভিন্ন রোগের মডেল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মৌলিক বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও প্রকৌশলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বইটা বেশ উপকারী। বিশেষত যারা Dynamic Control System নিয়ে কাজ করতে চায় [৪]।
৫. Letters to Young Mathematician
এই বইটি অনেকটা জি.এইচ.হার্ডির A Mathematicans’ Apology এর মতো। স্টুয়ার্টের এই বইটি হাই স্কুল, কলেজ এবং অনার্সে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য। যারা গণিতকে ভালোবাসে, ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে নিতে চায়- এই বইটি তাদের জন্য। বইটি চিঠি আকারে তরুণ গণিতবিদদের জন্য লেখা। এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক ‘কেন আমরা গণিত ব্যাবহার করবো?’, ‘দৈনন্দিন জীবনের কোথায় কোথায় গণিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত?’- এসবের প্রতি আলোকপাত করেছেন। বিমানের টিকিট থেকে শুরু করে বাজারে সবজির দোকান, ফোনের তারে যে পাখিগুলো বসে থাকে তাদের মধ্যেকার দূরত্ব থেকে শুরু করে ধাতুর ল্যাটিস পর্যন্ত, রাস্তায় কুকুরের দৌড় থেকে শুরু করে রবোটিক্স পর্যন্ত– সব কিছুতে গণিত গণিত আর গণিত। এই বইটি সবার জন্য [৫]।
৬. Professor Stewarts’ Casebook of Mathematical Mysteries
এই বইটি লিখে ইয়ান স্টুয়ার্ট নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। গাণিতিক সমস্যা তৈরি, সমস্যা তৈরির কারণ, এবং সমস্যার সমাধানও যে শিল্পের (Art) পর্যায়ে পড়ে, তা এই বইটি না পড়লে বোঝা যাবে না। এই বই দিয়ে ইয়ান স্টুয়ার্ট প্রমাণ করেছেন যে তিনি এদিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। উদাহরণ দিয়ে এই বইটি আপনি কেন পড়বেন সেটা ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন- আর্কটিক অঞ্চলে কেন পাই এর মান ৩। বইটি পড়ে আপনি অপারেটর থিওরী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এই বইয়ের মতো স্টুয়ার্টের আরও দুটি বই আছে। Cabinet of Mathematical Curiosities এবং Professor Stewarts’ Hoard of Mathematical Treasures- এই বই দুটিতে প্রচুর কেস আছে। কিন্তু সেগুলো কম বেশি আগেও অন্যান্য বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এই বইটিতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু গাণিতিক সমস্যা পাওয়া যায় [৬]।
৭. In Pursuit of Unknown: 17 Equations that Changed the World
বইটি পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবে- যেকোনো প্রকৌশলের কারিগরি দিক সমাধানের পেছনে পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতের অবদান সবচেয়ে বেশি। যে ১৭টি সমীকরণের জন্য আমাদের জীবন একদম বদলে গেছে সেসব সমীকরণের কথা বলা হয়েছে। যেমন- পিথাগোরাসের উপপাদ্য দিয়ে লেখক শুরু করেছেন। এই অধ্যায়েই ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে লগারিদম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কীভাবে মহাকাশবিদ্যায় এটির ব্যবহার করা হয়, কীভাবে লগারিদম দিয়ে তেজস্ক্রিয়তা বোঝা যায় (ফুকুশিমা ঘটনার সাথে মিলিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে)। এরপরের অধ্যায়ে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার থেকে শুরু করে এর ব্যবহারের দিক নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এভাবে নিউটনের মহাকর্ষ, জটিল সংখ্যা, টপোলজি, গাউস কার্ভ (Normal Distribution) ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তার পরের অধ্যায়গুলো পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। তরঙ্গ সমীকরণ, ফুরিয়ার সমীকরণ, তাপগতিবিদ্যার সমীকরণ, নেভিয়ার- স্টোক্স সমীকরণ, ম্যাক্সওয়েল সমীকরণ, এনট্রপি থিওরি, রিলেটিভিটি সমীকরণ, কোয়ান্টাম থিওরি [৭] ইত্যাদি আছে সেখানে।
ইয়ান স্টুয়ার্টের আরও কিছু বই আছে যেগুলো গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন: The Galois Theory, Catastrophe Theory, Singularities and Groups of Bifurcation Theory, The Foundation of Mathematics, Complex Analysis ইত্যাদি।
এখন কথা হচ্ছে এত কিছু লেখার কারণ কী? কারণটা হলো যারা গণিত নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসে, কাজ করতে চায় বা যারা কেবল চিন্তা করছে যে কীভাবে গণিতের রহস্যময় জগতে পা রাখা যায়, কীভাবে তারা শুরু করবে- এই বিষয়গুলোই আমি জানাতে চেয়েছিলাম। এটা ঠিক যে এই বইগুলো পড়লে অনেক কিছু জানা যাবে। কিন্তু বইগুলো পড়ার সময় এমন কিছু কনসেপ্ট সামনে আসবে যার জন্য অন্য কোনো বইয়ের সাহায্য নিতে হবে। আরেকটা জিনিস সবাই খেয়াল করবেন যে, স্কুলে যে বিষয়গুলো বাদ দেয়া হয় বা যে বিষয়গুলো আমরা সচরাচর পড়ি না বা মনে রাখি না ঐ বিষয়গুলোই আমাদের বেশী কাজে লাগছে। এমনও হতে পারে বইগুলোতে এমন কিছু টার্ম নিয়ে কথা বলা হচ্ছে যেগুলো আমাদের পাঠ্য বইতেও আছে। তখন জিনিসগুলো সহজে আমরা আয়ত্তে আনতে পারবো। এতে যেটা হবে, সবার মধ্যে কোনো কিছু উদ্ভাবনের বা খুঁজে বের করার অভ্যাস তৈরি হবে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে জনপ্রিয় গণিত বইগুলোর বাংলায় অনুবাদ। এতে যারা ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না তারাও বইগুলো পড়তে পারে। এতে মানসিক বিকাশের পথ তৈরি করা সহজ হবে।
[১] Stewart, I. (1991). Game , Set, and Math. Penguin Publishers
[২] Stewart, I. (1996). From here to Infinity, Oxford University Press
[৩] Stewart, I. (1996). Nature’s Number, Science Masters Series, Weidenfeld and Nicolson, London.
[৪] Stewart, I. (2004). Does God Play Dice (Second Edition). Penguin Publisher, Harmondsworth
[৫] Stewart, I. (2006). Letters to Young Mathematician. Basic Books, New York
[৬] Stewart, I. (2014). Professor Stewart’s Casebook of Mathematical Mysteries, Profile, London.
[৭] Stewart, I. (2012) In Pursuit of Unknown: 17 Equations that Changed the World, Basic Books.
ফিচার ইমেজ: alchetron.com