
৭ মে, ১৮২৪। ভিয়েনার বিখ্যাত কারিন্থিয়ান থিয়েটার।
লুডভিগ ফান বিটোফেন বারো বছর বাদে দর্শকদের সামনে পারফর্ম করতে আসছেন। প্রায় এক যুগ আগে যখন তিনি তার সেরা কাজগুলো করেছেন তখন থেকেই তার শ্রবণশক্তি কমতে শুরু করছিল। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিলেন তারপর থেকে। এখন তিনি প্রায় বধির।
প্রায় দুই বছর সময় দিয়ে বিটোফেন তার নতুন সিম্ফোনির কাজ শেষ করেছেন। খুব সাহস করে এই প্রথম কোনো সিম্ফোনিতে যান্ত্রিক সুরের পাশাপাশি কণ্ঠ জুড়ে দিয়েছেন তিনি। ফ্রেডরিখ শিলারের কবিতা ‘আন দি ফ্রয়েডে’ এর কথার সাথে কিছু অংশ যোগ করেছেন নিজেই। আগের সবগুলো কাজের যেখানে মিনিট ত্রিশেক ব্যাপ্তি ছিল, এটি সেখানে এক ঘণ্টারও বেশি সময় বিস্তৃত। দর্শকের ধৈর্য থাকবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা আছে। এটি তার নবম সিম্ফোনি। বৃদ্ধ বয়সের কাজ। সর্বশেষ অষ্টম সিম্ফোনির সুর করবার সময়েও তিনি কিছুটা সুস্থ ছিলেন, সে-ও প্রায় দশ বছর আগের কথা। সব মিলিয়ে নিজের কাজ নিয়ে আগের মতন দৃঢ় আত্মবিশ্বাস অনুভব করতে পারছেন না তিনি।

সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এই কাজটি প্রথম প্রদর্শন করতে চাইলেন নিজের মাতৃভূমি জার্মানির বার্লিনে। সেই কোন তারুণ্যে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে এসেছেন তিনি! তখন তার বয়স ছিল মাত্র একুশ। অস্ট্রিয়ার মানুষের ভালোবাসার মায়ায় আটকে আর ফিরে যাওয়া হয়ে উঠেনি। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে, আর কোনো নতুন কাজ করা হবে কি না তিনি নিশ্চিত নন। তাই এবার তিনি ফিরতে চান।
ভিয়েনার অনুরাগী ভক্তকূল কেন তা মানবেন? বিটোফেন তার জীবনের স্বর্ণযুগ কাটিয়েছেন এখানে। জীবনের সেরা কাজগুলো সব এখানে বসেই করা। তাদের অধিকার কীভাবে অস্বীকার করেন তিনি! রাজনৈতিকভাবেও তখন চারদিকে উত্তাল অবস্থা। কিছুকাল আগেই নতুন করে জার্মান কনফেডারেশন তৈরি করা হয়েছে অস্ট্রিয়ান রাজ্যের অধীনে। অন্যদিকে লন্ডন থেকেও হারমোনিক সোস্যাইটির পক্ষ থেকে বিটোফেনকে অগ্রীম সম্মানী পাঠিয়ে দিয়েছে তাদের শহরে প্রথম প্রদর্শনী করবার জন্য। অন্যদিকে অর্থবিত্ত নয়, ভিয়েনার মানুষ চিঠি পাঠালেন বিটোফেনকে। স্তুতিবাক্যে ভরপুর সেই চিঠিতে মন গলে গেল সুরকারের। শেষ পর্যন্ত ভিয়েনাতেই আয়োজন করা হলো প্রদর্শনীর।
মাত্র দুবার রিহার্সেল করা হয়েছে থিয়েটারে আসবার আগে। বিরাট দল, এত বড় অর্কেস্ট্রা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। হেনরিয়েট জোনটাগ আর ক্যারোলিন উঙ্গার- এই দুই তরুণীকে বিটোফেন নিজে ডেকে এনেছেন। তারা গাইলেন দুটি অংশ। পরবর্তী জীবনে এই কনসার্টে অংশগ্রহণের কল্যাণেই ক্যারোলিন উঙ্গার ইতালি এবং প্যারিসে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

গ্রীষ্মের ছুটির কারণে সাধারণ শৌখিন দর্শকেরা প্রায় কেউই ভিয়েনায় ছিলেন না। কিন্তু তারপরও থিয়েটার ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। বিটোফেন বেশ উত্তেজিত। একসময় উঠে এলেন মঞ্চে, এবার নিজেই শিল্পীদের নির্দেশনা দেবেন নিজের সৃষ্টির উপর। শুনতে পারছেন না কিছুই, কিন্তু পরম মমতায় আর চরম উৎসাহে হাত নেড়ে যাচ্ছেন সর্বশক্তিতে।
মূল বেদীতে বিটোফেন দাঁড়িয়ে থাকলেও নির্দেশনার মূল কাজ করলেন অবশ্য পাশে দাঁড়ানো মাইকেল উমলাউফ- তিনি বিটোফেনের বন্ধু, নিজেই একজন বিখ্যাত নির্দেশক। বছর দুয়েক আগে বিটোফেনের একমাত্র অপেরার রিহার্সেলে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। শ্রবণশক্তির দুর্বলতার জন্যে বিটোফেন নির্দেশনায় তালগোল পাকিয়ে ফেলছিলেন, ভয়াবহ পরিণতি হয়েছিল সুরের। প্রদর্শনীর আগে যখন বিটোফেন নিজেই নির্দেশকের ভূমিকায় কাজ করতে চাইলেন তখন আয়োজকরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। এত এত দর্শকের সামনে ভরাডুবি হবার ভয় থেকে আয়োজকরা শিল্পীকে অনুরোধ করলেন মাইকেলকেও মঞ্চে তার সাথে থাকবার সুযোগ দেয়ার জন্য। কথা দিলেন, মাইকেল তেমন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, স্রেফ সহায়তার উদ্দেশ্যে উপস্থিত থাকবেন। কী ভেবে যেন তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আয়োজকরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। মাইকেল আগে থেকেই যন্ত্রশিল্পীদের বলে রেখেছিলেন, বিটোফেন মঞ্চে থাকলেও কেউ যেন তার হাতের দিকে খেয়াল না করে। সুতরাং এ যাত্রায় আর বিড়ম্বনার সৃষ্টি হলো না।
দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন অশ্রুতপূর্ব এক সুর। সব মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বের আহ্বান ছিল সেই সুরে, “Alle Menschen werden Brüder / Wo dein sanfter Flügel weilt…” অর্থাৎ, “All men become brothers under the sway of thy gentle wings“। বিশ্বভ্রাতৃত্ব আর শান্তির বাণী শুনতে শুনতে কখন প্রায় সত্তর মিনিট সময় কেটে গেল কেউ টের পেল না, বিটোফেন নিজেও না। মিউজিক শেষ হয়ে যাবার পর পুরো থিয়েটার যখন মুহুর্মুহু করতালিতে ফেটে পড়ছে তখনও তিনি পেছন ফিরে চোখ বুজে, হাত নেড়ে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল এভাবেই। বিটোফেন মুগ্ধ দশর্কের পাগলের মতো হাততালির ভীষণ শব্দও শুনতে পারছেন না। ক্যারোলিন হেঁটে এলেন মঞ্চের মাঝে, প্রচণ্ড মায়ায় কাঁধে ধরে বিটোফেনকে দর্শকের দিকে মুখ ফেরালেন।
থিয়েটারের বাতাসে উড়ছিল শত শত রুমাল, টুপি, ফুল। সবাই চাইছিল প্রিয় শিল্পী তাদের আবেগ শুনতে না পেলেও শ্রদ্ধার সবটুকু যেন দেখে বুঝতে পারেন। দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর রীতিটা তখনও সেভাবে প্রচলিত হয়ে ওঠেনি। শুধু রাজকীয় কোনো অতিথির উপস্থিতিতে সর্বোচ্চ তিনবার উঠে দাঁড়াবার নিয়ম ছিল। অথচ এদিন দর্শক বিটোফেনের সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন, একবার-দুবার নয়, গুণে গুণে পাঁচবার। রাজকীয় পুলিশ সদস্যদের শেষ পর্যন্ত গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল সহস্রাধিক আবেগে উন্মুখ নারী-পুরুষকে।

জার্মানি থেকে আসা নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষ, যিনি কেবল সুরের জাল তৈরি করা শেখবার জন্য নিজ দেশ ছেড়ে এসে প্রায় পুরোটা জীবন বাস করেছেন এই ভিয়েনায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে সৃষ্টি করে গিয়েছেন একের পর এক সুরের মুর্ছনা, যিনি কোনো রাজপরিবারের সদস্য বা রাজকীয় কর্মকর্তা নন, তিনি পেলেন এক অনন্য শ্রদ্ধার প্রদর্শন যা রাজকীয় সম্মানকেও ছাপিয়ে যায় বহুগুণে। এমন নজিরবিহীন সম্মাননা সম্ভবত আর কোনো শিল্পী এর আগে বা পরে কখনো পাননি।