ইতিহাসের সেরা দশ ধনী ব্যক্তি

কে বেশি টাকার মালিক ছিলো- জন ডি. রকফেলার নাকি চেঙ্গিস খান? প্রশ্নটি অনেক সহজ, কিন্তু এর উত্তর বের করা অনেক কঠিন। ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রতি বছর ধনীদের যে তালিকা তৈরি করে সেটি পাহাড়সম তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়। কিন্তু ভিন্ন সময়ের দুজন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ হিসেব করা সহজ নয়। এটি শুধুমাত্র মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করার বিষয় নয়; মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়েছে আরও অনেক পরে। তার আগের সম্পদ কীভাবে হিসেব করা সম্ভব? তখন মুদ্রার প্রচলন ছিলো না, জিনিসের দাম ছিলো সেই জিনিসের ব্যবহার উপযোগিতার উপর ভর করে। তাছাড়া সম্পদ হিসেবের ক্ষেত্রেও অনেক ভিন্নতা এসেছে। এখন অনেক দেশে একনায়ক থাকলেও, তাদের দেশের সম্পদকে তাদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু আগের দিনে রাজাদের অধীনে যেসব জমি বা স্বর্ণ থাকতো, সব সম্পদই রাজার সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো। যা-ই হোক, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন টাইম ইতিহাস বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতি প্রফেসরদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টার সাক্ষাতকারের পর সর্বকালের সেরা দশ ধনী মানুষের নিম্নোক্ত তালিকাটি তৈরি করেছে।

১০. চেঙ্গিস খান

চেঙ্গিস খান; Source: Pixabay.com

জীবনকাল: ১১৬২- ১২২৭
দেশ: মোঙ্গল সাম্রাজ্য
সম্পদের পরিমাণ: একরের পর একর জমি, হিসেব নেই

পৃথিবীর ইতিহাসে চেঙ্গিস খানকে সর্বকালের অন্যতম সেরা সামরিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিলো সুদূর চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। এত বড় সাম্রাজ্যের মালিক হলেও, অনেক ইতিহাসবিদদের মতে চেঙ্গিস খানের সম্পদের পরিমাণ সে তুলনায় কম ছিলো। এটির একটি কারণ হচ্ছে, চেঙ্গিস খান তার লুটপাটের মাল সৈন্যসামন্ত এবং অন্যদের সাথে ভাগ বাটোয়ারা করতেন।

এই বিষয়ে কানি কুইন্স কলেজের প্রফেসর মরিস রোসাব্বি বলেন,

“চেঙ্গিস খানের সাফল্যের একটি রহস্য ছিলো, তিনি তার লুটকৃত মালামাল সৈন্য এবং কমান্ডারদের সাথে ভাগাভাগি করতেন”।

Gengis Khan and Making the modern world বইয়ের লেখক জ্যাক ওয়েদার ফোর্ড বলেন,

“আধুনিক যুগের আগের অন্য সৈন্যদের মতো চেঙ্গিস খানের সৈন্যদলের ব্যক্তিগতভাবে লুট নেয়ার কোনো অনুমতি ছিলো না। বরং কোনো জায়গা দখলের পর তারা সমস্ত লুট সরকারি কোষাগারে জমা দিতো এবং পরবর্তীতে সবার মাঝে ভাগ করে দেয়া হতো।”

চেঙ্গিস খানও এই লুটের ভাগ পেতো, কিন্তু যেটুকু পেতো সেটি তাকে অনেক ধনীতে পরিণত করেনি, বরং তিনি খুবই সাধারণ ছিলেন। তিনি নিজের জন্য বা তার পরিবারের জন্য কোনো প্রাসাদ বানাননি, বানাননি কোনো মন্দির অথবা রাজকীয় কবর। জ্যাক ওয়েদার ফোর্ড আরও বলেন, তিনি তাঁবুতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং মারাও গেছেন সেই তাঁবুতেই, একজন সাধারণ মানুষের মতোই।

৯. বিল গেটস

বিল গেটস; Source: cdn.vox-cdn.com

জীবনকাল: ১৯৫৫- বর্তমান
দেশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
সম্পদের পরিমাণ: ৭৮.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

আধুনিক যুগের মানুষ হওয়ার কারণে বিল গেটসের সম্পদের পরিমাণ মাপা অনেকটাই সহজ। ফোর্বসের মতে, বর্তমান দুনিয়ার সেরা ধনী মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, যার সম্পদ দ্বিতীয় ধনী আমানসিও ওর্তেগার চেয়ে ৮ বিলিয়ন বেশি। বিল গেটস স্থান করে নিয়েছেন এই তালিকার নয় নাম্বারে।

৮. অ্যালান রুফুস (অ্যালান দ্য রেড)

অ্যালান রুফুস; Source: loveincorporated.blob.core.windows.net

জীবনকাল: ১০৪০-১০৯৩
দেশ: ইংল্যান্ড
সম্পদের পরিমাণ: ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

অ্যালান রুফুস ছিলেন উইলিয়াম দ্য কনকোয়ারারের ভাতিজা। খুব অল্প বয়সেই তিনি তার চাচার সাথে বিশ্বজয়ে যোগ দেন। ‘The Richest of the Rich’ বইয়ের লেখক ফিলিপ বেরেসফোর্ড এবং বিল রুবেনস্টেইনের মতে, মারা যাওয়ার সময়ে রুফুস ১১ হাজার পাউন্ডের মালিক ছিলেন, যেটি সেসময়ে পুরো ইংল্যান্ডের মোট জিডিপির প্রায় ৭% ছিলো। ২০১৪ সালের ডলার মূল্যে রূপান্তর করলে যেটির মূল্যমান দাঁড়ায় ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

৭. জন ডি. রকফেলার

জন ডি রকফেলার; Source:fthmb.tqn.com

জীবনকাল: ১৮৩৯-১৯৩৭
দেশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
সম্পদের পরিমাণ: ৩৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

জন ডি. রকফেলার আমেরিকাতে তেল ব্যবসা শুরু করেন ১৮৬৩ সালে এবং ১৮৮০ সালের মাঝে তার কোম্পানি আমেরিকার প্রায় ৯০% তেল উত্তোলনের সাথে জড়িত ছিলো। টাইমস ম্যাগাজিনের মতে, ১৯১৮ সালে রকফেলারের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিলো তৎকালীন ১.৮ বিলিয়ন ডলার, যেটি ছিলো আমেরিকার মোট জিডিপির ২%। ২০১৪ সালের অর্থনীতির হিসেবে যেটির মূল্যমান প্রায় ৩৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

৬. অ্যান্ড্রু কার্নেগি

অ্যান্ড্রু কার্নেগী; Source: vredespaleis.nl

জীবনকাল: ১৮৩৫-১৯১৯
দেশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
সম্পদের পরিমাণ: ৩৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

মিডিয়াতে রকফেলার সুপরিচিত হলেও, অ্যান্ড্রু কার্নেগি ছিলেন রকফেলারের চেয়েও বেশি বিত্তবান এবং আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম ধনী। ১৯০১ সালে এই স্কটিশ আমেরিকান ইমিগ্র্যান্ট তার কোম্পানি ইউএস স্টিল জে পি মর্গানের কাছে বিক্রি করেছিলো ৪৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। যেটি সে সময়ে আমেরিকার মোট জিডিপির ২.১% সমমান ছিলো এবং ২০১৪ সালে যার মূল্যমান দাঁড়ায় ৩৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

৫. জোসেফ স্ট্যালিন

জোসেফ স্ট্যালিন; Source: favobooks.com

জীবনকাল: ১৮৭৮-১৯৫৩
দেশ: সোভিয়েত ইউনিয়ন
সম্পদের পরিমাণ: বিশ্ব জিডিপির ৯.৬% সম্পদশালী একটি জাতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

আধুনিক অর্থনীতির যুগে স্ট্যালিন একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ; পরম ক্ষমতাসম্পন্ন একজন স্বৈরশাসক, যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি সমৃদ্ধ একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদ থেকে স্ট্যালিনের সম্পদ ভাগ করা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু তার অনন্য অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ একাধিক অর্থনীতিবিদকে তাকে সর্বকালের সেরা ধনীদের কাতারে রাখার জন্য প্ররোচিত করেছে।

তাদের যুক্তি সহজেই বোঝা সম্ভব। Develpoment Center of Organization (OECD) এর তথ্যমতে, ১৯৫০ সালে স্ট্যালিনের মৃত্যুর ৩ বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের জিডিপি ছিলো সারা বিশ্বের ৯.৫%। ২০১৪ সালে যেটির মূল্যমান দাঁড়ায় ৭.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদ সরাসরি স্ট্যালিনের ছিলো না কিন্তু তার ছিলো অফুরন্ত ক্ষমতা। তিনি চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদকে তার পছন্দমতো ব্যবহার করতে পারতেন। অনেকের মতে, এই সম্পদ স্ট্যালিনের সরাসরি ছিলো না, তাই স্ট্যালিনকে এই তালিকায় রাখা অযৌক্তিক।

৪. সম্রাট আকবর

সম্রাট আকবর; Source: scoopwhoop.com

সময়কাল: ১৫৪২-১৬০৫
দেশ: ভারতীয় উপমহাদেশ
সম্পদের পরিমাণ: বিশ্ব জিডিপির ২৫% অর্থ সম্বলিত একটি দেশের একচ্ছত্র শাসক

মোঘল শাসক সম্রাট আকবর এমন একটি সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন, যারা সারা দুনিয়ার ৪ ভাগের একভাগ জিডিপি নিয়ন্ত্রণ করতো। ফরচুন ম্যাগাজিনের ক্রিস ম্যাথিউস প্রাচীন অর্থনীতিবিদ আংগুস ম্যাডিসনের সূত্র টেনে বলেন,

“সম্রাট আকবরের শাসনামলকে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের শাসনামলের সাথে তুলনা করা যায়। কিন্তু আকবরের আমলে শাসক শ্রেণীর জীবনধারা ইউরোপিয়ানদের তুলনায় অনেক বেশি অযৌক্তিক ছিলো।”

৩. রাজা শেংজং

রাজা শেংজং; Source: Wikimedia.org

সময়কাল: ১০৪৮-১০৮৫
দেশ: চীন
সম্পদের পরিমাণ: বিশ্ব জিডিপির ২৫%-৩০% সম্বলিত একটি দেশের শাসক

পৃথিবীর ইতিহাসে চীনের সং রাজবংশের শাসনামল (৯৬০-১২৭৯) ছিলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর মাঝে একটি। তামকাং বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ইতিহাসের প্রফেসর রোনাল্ড এডওয়ার্ডের মতে, সে সময়ে তাবৎ দুনিয়ার ২৫%-৩৫% জিডিপির উৎপাদন ছিলো চীনে। সং সাম্রাজ্যের সম্পদ আসতো তাদের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ট্যাক্স সংগ্রহ থেকে। এডওয়ার্ডের মতে, চীনারা সে সময়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ইউরোপিয়ানদের থেকে ১০০ বছর এগিয়ে ছিলো। প্রফেসর আরও বলেন, শাসনব্যবস্থা ছিলো অত্যন্ত সরকারকেন্দ্রীক, তাই রাজার হাতে ছিলো বিপুল ক্ষমতা।

২. অগাস্টাস সিজার

অগাস্টাস সিজারের স্বর্নমুদ্রা; Source: cnn.com

জীবনকাল: খ্রিস্টপূর্ব ৬৩-১৫ খ্রিস্টাব্দ
দেশ: রোম
সম্পদের পরিমাণ: ৪.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার

সিজার শুধু বিশ্ব জিডিপির ২৫%-৩০% জিডিপি সম্পন্ন একটি দেশের শাসকই ছিলেন না। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইয়ান মরিসের মতে, তার পুরো সাম্রাজ্যের ৫ ভাগের ১ ভাগের মালিক ছিলেন সিজার। একটি সময়ে পুরো মিসরের মালিকই ছিলেন এই রোম শাসক। তার সম্পদের পরিমাণ ২০১৪ সালের মার্কিন ডলারে মূল্যমান দাঁড়ায় ৪.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে!

১. মানসা মুসা

মানসা মুসা; Source: Wikimedia Commons

জীবনকাল: ১২৮০-১৩৩৭
দেশ: মালি
সম্পদের পরিমাণ: অবর্ণনীয় ধনী

মানসা মুসাকে প্রায় সবাই এক বাক্যে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বলে মেনে নেন। ফেরাম কলেজের প্রফেসর রিচার্ড স্মিথের মতে, পশ্চিম আফ্রিকায় মুসার রাজ্য সে সময়ে ছিলো বিশ্বের এক নম্বর সোনা উৎপাদনকারী দেশ এবং সেসময় সোনার চাহিদা ছিলো আকাশচুম্বী।

কত ধনী ছিলো মুসা? প্রয়োজনীয় দলিল দস্তাবেজের অভাবে এটি অংকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমসাময়িক কিছু তথ্যমতে, বর্তমানে মুসার সমান সম্পদ অর্জন করা একজন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। মুসা সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত আছে যে, মক্কা যাওয়ার পথে তিনি এত বেশি খরচ করেছিলেন যে, মিসরে মুদ্রা সংকট দেখা দিয়েছিলো। তার বহরে ছিলো কয়েক ডজন উট, যাদের কাজ ছিলো সোনা বহন করা। রিচার্ড স্মিথ বলেন, সে সময়ে এক বছরে মালি প্রায় এক টন সোনা উৎপাদন করেছিলো। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী প্রফেসর রুডলফ ওয়ার বলেন, মুসা এতটাই ধনী ছিলো মানুষ সেটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারতো না। মুসাকে একটি ছবিতে সোনার সিংহাসনে একটি সোনার লাঠি নিয়ে সোনার তৈরি কাপ নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়।

ফিচার ইমেজ- Time.com

Related Articles

Exit mobile version