সম্পর্কের প্রতারণা বিষয়ে যে তথ্যগুলো আপনার জানা দরকার!

প্রতারণা মানে কী? কতদূর একজন মানুষ যাওয়ার পর, কতটা আচরণের ত্রুটি-বিচ্যুতির পর কোনো একজন মানুষকে ‘প্রতারক’ বলা ঠিক হবে? প্রশ্নের উত্তরগুলো একেকজনের কাছে একেক রকম। সম্পর্কভেদে এই উত্তর ভিন্ন হয়। তবে সম্পর্ক, সেটি যেমনই হোক না কেন, প্রতারণা কিছু ক্ষেত্রে কেবল প্রতারণাই থেকে যায়। আর থেকে যায় অনেক বেশি নেতিবাচক কোনো একটি ব্যাপার হিসেবে। অনেকের কাছে এই বিষয়টি অবান্তর বলে মনে হতে পারে। বাস্তবেও সবার জীবনে প্রতারক হয়ে ভালোবাসার মানুষটি আসে না। হয়তো আপনি আপনার সঙ্গীকে নিয়ে অসম্ভব খুশি আছেন। আরো অনেকের মতো আপনার জীবনেও হয়তো প্রতারণা করবে এমন কেউ এখনো আসেইনি। তবে আপনি এই দুই দলের যে দলেই থাকুন না কেন, প্রতারণা সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে রাখা উচিত আপনারও।

প্রতারণা; Source: Return Of Kings

অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা প্রতারণার দিকে ঠেকে দেয়

কোনো সম্পর্কে একজনের প্রতি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়লে প্রতারণার আশঙ্কাও অনেক বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে করা একটি গবেষণায় উঠে আসে এই তথ্য। জানা যায়, একটি সম্পর্কে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কারো বেশি থাকলে, সেই নির্ভরশীল ব্যক্তির মধ্যেই প্রতারণা করার পরিমাণ বেশি দেখা যায়। তবে এই ব্যাপারটি বেশি দেখা যায় নির্ভরশীল পুরুষদের ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিকভাবে নারীর উপরে নির্ভরশীল পুরুষদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ পুরুষ প্রতারণা করে থাকেন। অন্যদিকে, এই সংখ্যা নারীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ।

মজার ব্যাপার হলো, গবেষণায় আরো পাওয়া যায় যে, পুরুষেরা যত বেশি আয় করেন তাদের সঙ্গীর চাইতে, তাদের মধ্যে প্রতারণার প্রবণতা কমে যায়। তবে এই আয় যদি পুরো সংসারের আয়ের ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তাহলেই আবার পুরুষদের মধ্যে প্রতারণা করার প্রবণতা বেড়ে যায়। নারীদের ক্ষেত্রেও বেশি আয় করার সাথে সাথে প্রতারণার পরিমাণ কমে আসে। তবে পুরুষদের মতো ঘরের মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ বহন করলে বা নির্দিষ্ট আয়ের চাইতে বেশি আয় করলে তাদের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না।

পুরুষ বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকেন সম্পর্কের প্রতি

সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ- দুজনেই চেষ্টা করেন। কিন্তু জেনে কিংবা অজান্তে, পুরুষেরা নিজেদের সম্পর্ককে নিয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকেন। ২০০৮ সালে পাওয়া একটি গবেষণার তথ্যানুসারে, সম্পর্কে থাকাকালীন কোনো পুরুষ তার সামনে আকর্ষণীয় নারীকে দেখতে পেলে ভয় পান এবং রেগে যান। তার মনে তখন সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় কাজ করে এবং এর জন্য সামনের নারীকেই দায়ী বলে মনে হয়। ফলে অন্য কোনো নারীর সাথে ঠাট্টা করেও খানিকটা প্রশংসা করে ফেললে কিংবা তাকে ভালো লাগলে অস্থির হয়ে পড়েন তারা।

সঙ্গীর প্রতি আচরণে পরিবর্তন আসে। আর এই পরিবর্তন ইতিবাচক নয়, নেতিবাচকভাবে আসে। পুরুষ সঙ্গীদের ক্ষেত্রে এই সময়ে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। মনে হতে থাকে যে, হয়তো তার সঙ্গিনীও এমন কিছু করতে পারেন। ক্ষেত্রভেদে এই ব্যাপারটি সন্দেহ না হয়ে রূপ নেয় অনুতাপে। মনে ভয় প্রবেশ করে যে, সামনের মানুষটি হয়তো তার এই আচরণ সম্পর্কে আঁচ করে ফেলবেন। ফলে মানসিক সমস্যা শুরু হয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় বাজে আচরণ, উঁচু গলায় কথা বলা ইত্যাদি ব্যাপারগুলোর। যদিও এটি সবসময় ঘটে না। অন্যদিকে, নারীরা ঠিক একই কাজ করার পর নিজের পুরুষটিকে আরো বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি একটা সময় সত্যিই সম্পর্কের প্রতি নিষ্ঠাবান পুরুষেরা তাদের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে খুব কার্যকরী কিছু কৌশল বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

পুরুষেরা সম্পর্কের প্রতি বেশি আবেগী হয়ে থাকেন; Source: Scary Mommy

সবাই নিজের সঙ্গীকে সৎ বলে মনে করেন

খুব সহজ ব্যাপার যে, সবাই নিজের সঙ্গীকে বিশ্বাস করবেন এবং সে যে কখনো প্রতারণা করতে পারে না সেটা মেনে নেবেন। তবে কথাটি কেবল এখানেই শেষ নয়। নিজের সঙ্গীকে শুধু দুধে ধোয়া তুলসী পাতাই ভাবেন না সবাই সম্পর্কে থাকাকালীন সময়ে। সেই সাথে বাকী সবাইকেই প্রতারণা করতে পারেন বলে ধারণা থাকে তাদের মধ্যে। ২০১৫ সালে করা একটি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ ভাবেন, তাদের বিপরীত লিঙ্গের মানুষটি প্রতারক হতে পারেন। তবে নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি কমে চলে আসে ৫ শতাংশতে। এদের কেউই বিশ্বাস করেন না যে, তাদের সঙ্গী তাদের সাথে প্রতারণা করে থাকতে পারে। আর নিজেদের সঙ্গীর সাথে প্রতারণা করার সম্ভাবনাকে ৮ শতাংশ বলে ভাবেন তারা।

নারীরা প্রাধান্য দিয়ে থাকেন ভালোবাসায়; Source: Daily Mirror

প্রতারণা বারবার করার মতো ব্যাপার

২০১৭ সালে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতারণা যারা আগে করেছেন তাদের মধ্যে সেটি আবার করার প্রবণতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে নানা বয়স এবং সব লিঙ্গের মানুষকেই পরীক্ষা করা হয়। আর সেখান থেকেই সিদ্ধান্তে আসেন গবেষকেরা যে, যে ব্যক্তি তার প্রথম সম্পর্কে প্রতারণা করেছেন, তার মধ্যে দ্বিতীয় সম্পর্কতেও প্রতারণা করার প্রবণতা তিনগুণ বেশি দেখা যায়।

প্রতারক বারবার প্রতারণা করে থাকে; Source: Plagiarism Today

প্রতারণা না করার কারণ

একেকজন মানুষের ক্ষেত্রে প্রতারণা করা এবং না করার কারণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রায় ৪০০ জন মানুষের উপরে এই পরীক্ষা করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সবাই ছিলেন ২৪-৬০ বছর বয়সী এবং তাদের সবার অন্তত একটি সন্তান ছিল। পরীক্ষায় উঠে আসে যে, মোট চারটি ব্যাপারকে প্রতারণা না করার কারণ হিসেবে দেখেছেন সবাই। আর সেগুলো হলো নৈতিকতা, একা হওয়ার ভয়, সন্তানের উপরে বাজে প্রভাব এবং বিশ্বস্ত থাকা। ধর্মীয় মানসিকতার বেশিরভাব মানুষ জোর দিয়েছেন নৈতিকতার দিকে। অন্যদিকে, নিরপেক্ষ মানুষেরা জোর দিয়েছেন একা থাকার ভয়ের উপর।

প্রতারণা কেবল পুরুষেরাই নন, নারীরাও করেন

ব্যাপারটি অবশ্য এভাবে বলার মতো কিছু নয়। প্রতারণা নারী এবং পুরুষ যে কেউই করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে শারীরিক গঠন এবং জিন অনেক বেশি নির্ভর করে। অনেকে জিনগত কারণেই অন্যদের চাইতে অনেক বেশি অবিশ্বস্ত হয়ে থাকেন। নারীরা এর আগে এদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকলেও বর্তমান সময়ে পুরুষ এবং নারী উভয় লিঙ্গই প্রতারণার দিকে বেশি এগিয়ে যাচ্ছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ২৩ শতাংশ হলে, নারীদের ক্ষেত্রে সেটি ১৯ শতাংশ।

নারীরা মানসিক সম্পর্কে বেশি জড়ান; Source: catania.liveuniversity.it

মানসিক সম্পর্কে নারীরা বেশি জড়ান

না, সম্পর্ক কিংবা প্রতারণা যে কেবল শারীরিক কারণেই হয় তা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। নারীরা বেশিরভাগ সময় মানসিকভাবে ভেঙ্গে গিয়ে, মানসিক সাহায্যের কারণেই সঙ্গীর প্রতি প্রতারণা করে অন্য সম্পর্কে জড়ান। আবেগীয় কোনো সম্পর্ককে ভাষায় প্রকাশ করাটা অত্যন্ত কষ্টকর ব্যাপার। অনেকে হয়তো ঠিক করে বুঝতেই পারেন না যে, তিনি কারো সাথে মানসিক সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন এবং সঙ্গীকে প্রতারণা করছেন। কারণ বেশিরভাগ মানুষের কাছেই প্রতারণা মানে সেটা শারীরিক কোনো ব্যাপার। প্রতারণা মানসিক দিক দিয়েও হয়ে থাকে। আর অনেকটা না বুঝেই মানসিক এই প্রতারণায় জড়িয়ে যান অনেকেই।

ফিচার ইমেজ: PsychicOz Blog

Related Articles

Exit mobile version