২০১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থার অ্যাশকিন, কানাডার ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড এবং ফ্রান্সের জেরার্ড মরো। লেজার প্রযুক্তিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাদেরকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়। তাদের অবদান পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিকে কাজে লাগছে। বিশেষ করে লেজার ট্রিটমেন্ট ও চোখে লেজার সার্জারি করা সম্ভব হচ্ছে তাদেরই অবদানের কারণে।
এদের মধ্যে ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের নোবেল অর্জনের একটু আলাদা গুরুত্ব আছে। তার আগে দীর্ঘ ৫৫ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেনি কোনো নারী। আর ১৯০১ সাল থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল অর্জন করেছে মাত্র তিনজন নারী। একজন হলেন মেরি কুরি (১৯০৩) এবং অপরজন হলেন মারিয়া গোপার্ট-মায়ার (১৯৬৩)।
নোবেল পুরষ্কার ঘোষণার পর নোবেল কর্তৃপক্ষ টেলিফোনে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সেখানে উঠে আসে তার সম্পর্কে অনেক কিছু। সেখানে তিনি জানান, যে কাজের জন্য তিনি নোবেল পেয়েছেন সে কাজটি করার সময় তার জীবনের সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছিলেন। এখানে পুরো সাক্ষাৎকারটি বাংলায় তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নোবেল মিডিয়ার চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার অ্যাডাম স্মিথ।
ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড: হ্যালো।
অ্যাডাম স্মিথ: হ্যালো, আপনি কি ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড?
হ্যাঁ আমিই।
আমি অ্যাডাম স্মিথ বলছি, স্টকহোমের নোবেল পুরষ্কার কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট নোবেল প্রাইজ ডট ওআরজি (nobelprize.org) থেকে।
আচ্ছা।
প্রথমেই বলে নিতে চাই, নোবেল পুরষ্কার অর্জনের জন্য আপনাকে অভিনন্দন।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
পুরষ্কারের খবর জানার পর আপনার সে সময়ের অনুভূতি কেমন ছিল?
প্রথমে ভেবেছিলাম কেউ মজা করে এটা বলেছে কি না। আমি জানতাম এই দিনেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের ঘোষণা দেয়, তাই এই দিনে কেউ মজা করে এমন কিছু বললে সেটা খুবই কষ্টদায়ক হবে- এমনটা ভাবছিলাম।
যখন ফোন এসেছিল তখন কি আপনি ঘুমে ছিলেন?
হ্যাঁ, তখন ভোর পাঁচটা।
আপনার নোবেল অর্জনের দারুণ একটা দিক আছে। আমি জানি না আপনার মতো আর কেউ কখনো জীবনের প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের জন্য নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছে কি না। এটা খুব বিস্ময়কর।
আমিও এই ব্যাপারে কিছু জানি না। [হাসি] আমার মনে হচ্ছে আমার ভাগ্য বেশ ভালো। স্বীকার করতেই হবে পুরো বিষয়টিতে আমার ভাগ্য ভালো ছিল।
আপনি বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করেন। এ ধরনের এক্সপেরিমেন্টে এরকম আগ্রহ আপনার মাঝে কীভাবে এসেছে বলে মনে করেন?
সেরকম নিশ্চিত করে তো জানি না। তবে এরকম কাজ করে আনন্দ পেতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এদের পেছনে লেগে থাকলেও ক্লান্তি আসতো না, বরং ভালো লাগতো। লেজার নিয়ে কাজ করার সময়টা মনে হয় সারা জীবনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমের ছিল। তবে পরিশ্রমের হলেও শর্ট-পাল্স লেজার নিয়ে কাজ করে খুব আনন্দ পেতাম। যে গবেষণা দলের সাথে কাজ করতাম সে দলটিও ছিল চমৎকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিক চলে যেতো। সে সময়গুলোর বেশিরভাগই আনন্দের ছিল, উপভোগের ছিল।
এক্সপেরিমেন্টাল পদার্থবিদরা সবসময়ই এরকম হয়। গবেষণাগারে বসে বসে বিভিন্ন সমস্যার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো।
তা ঠিক।
গত ৫৫ বছরের মাঝে আপনি প্রথম নারী নোবেল লরেট (পদার্থবিজ্ঞানে)।
হ্যাঁ, শেষবার পেয়েছিলেন গোপার্ট-মায়ার। তার আগে মেরি কুরি, যার নাম সকলেই জানে। আমি এমনকি তার সাহায্যও নিয়েছি। আমার থিসিস পেপারে সাইটেশন হিসেবে তার কাজ উল্লেখ করেছি।
এর মাধ্যমে আপনারা এক সুতোয় বাঁধা হয়ে গেছেন।
হ্যাঁ।
নারী হিসেবে নোবেল পাওয়ার এই বিষয়টি সকলকে কী বার্তা দেয় বলে আপনি মনে করেন?
ঠিক জানি না এর উত্তর কীভাবে দেবো। কারণ আমি এমন নারী নই যে কিনা নোবেল পুরষ্কার অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে আছে এবং ভাবছে ‘নারীরা কেন এখানে নোবেল পাচ্ছে না?’ আমি আসলে সেভাবে ভাবিনি। তবে এমন অনেককে চিনি যারা সেভাবে ভেবেছে এবং নোবেল পুরষ্কারের জন্য আকাঙ্ক্ষা করেছে। মারিয়া গোপার্ট-মায়ারের জীবন কাহিনী এখানে বলতে হবে, আমি ভাগ্যবান যে আমার জীবন তার মতো কষ্টের ছিল না। আমি আনন্দিত যে তিনি এবং মেরি কুরির মতো নারী পদার্থবিদ এই দিকটিকে আলোকিত করে গেছেন।
মারিয়া বেতন পাননি তার জীবনের বেশিরভাগ সময়। তিনি এমনকি বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতিও পাননি একটা সময় পর্যন্ত। অথচ পদার্থবিজ্ঞানে চমৎকার কিছু কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। আমার যতদূর মনে পড়ে ৫০ এর দশকে তিনি নোবেল পুরষ্কার পান…
তিনি ১৯৬৩ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।
আচ্ছা, ১৯৬৩। মাল্টি-ফোটন আয়োনাইজেশনের পুরো ক্ষেত্রটির জন্মই হয়েছিল তার মাধ্যমে। আমার থিসিসের জন্য যে লেজার ব্যবহার করা হয়েছিল তা মূলত এটি থেকেই তৈরি। আর এত উঁচু দরের কাজ তিনি করেছিলেন সেই ১৯৩৯ সালে। এই কাজের জন্য অবশ্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পাননি কিন্তু জগতে কী করা সম্ভব আর কী করা সম্ভব নয় এই ধারণাতেই আমূল পরিবর্তন চলে আসে এর মাধ্যমে।
আপনি শুধু একটু ভেবে দেখুন, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কীভাবে স্বীকৃতিহীন কাজ করে যাবেন? নোবেল পুরষ্কার তো দূরের কথা বিজ্ঞানী হিসেবেও বিবেচিত হননি। সে তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আর আমি মনে করি ভবিষ্যতেও আরো পরিবর্তন আসবে।
হ্যাঁ। আর আমি মনে করি আপনার চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে, অনেকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে। এ ব্যাপারে আপনার কেমন অনুভূতি?
আমি কিছুটা শঙ্কায় আছি অবশ্য! কয়েক বছর আগে একজন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলেছিলাম, তিনি আমাকে বলেছেন কীভাবে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করতে হয়। আর এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা তো (অর্থের অভাবে) ফার্স্ট ক্লাস বিমানে চড়তে পারে না, তাই বলা যায় নোবেল পেলে আরো বাড়তি কষ্ট যোগ হয়! [হাসি] এক বছরের ভেতর এত এত ভ্রমণ করতে হয় যা আসলেই অনেক চাপের।
তো ফার্স্ট ক্লাসে করে যেতে চাইলে আপনার চাহিদার কথা আগে আগেই জানিয়ে রাখবেন।
এরকম কিছু করলে মনে হয় না ব্যাপারটা একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তির সাথে মানাবে।
আমি মনে করি এরকম কিছু করলে নোবেলজয়ী ব্যক্তির সাথে একদম খাপে খাপে মানাবে। … তো যে অবদানের জন্য আপনার নোবেল পুরষ্কার, আলট্রা-ফাস্ট লেজার সম্পর্কে প্রশ্ন করি, এটি দিয়ে যা যা করা সম্ভব তার মধ্য থেকে কোন জিনসটার কথা আপনি সবার আগে বলবেন?
আমি এখন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ল্যাবের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি। আমি অনুধাবনের চেষ্টা করছি কোন জিনিসটা দেখলে আমি খুব চমৎকৃত হই? আপনি হয়তো ভাবছেন নিশ্চয় বড় কিছু একটা হবে। কিন্তু এটা তেমন বড় কিছু নয়। সাদা রঙের আলো অনেকগুলো রঙে বিশ্লিষ্ট হয়ে যাবার দৃশ্য আমার কাছে খুব চমকপ্রদ লাগে। সাদা আলো পানি কিংবা স্বচ্ছ কোনোকিছুতে প্রবেশ করলে অপর দিক থেকে বেরিয়ে আসে রঙধনুর মতো অনেকগুলো রঙ। সেখানে বসে যদি এমন ভাবনা আসে ‘কী? এতগুলো রঙ কোথা থেকে আসলো?’ তখন এক অসাধারণ অনুভূতি হয়। এমন না যে এর পেছনের কারণ আমরা জানি না, ঘটনাটি দেখা এবং উপলব্ধি করা হলো মুগ্ধতার অভিজ্ঞতা।
নিউটন যদি আপনার অনুভূতির কথা জানতেন তাহলে খুব খুশি হতেন।
হ্যাঁ! তবে এটি নিউটনের রঙ দেখার মতো নয়। নিউটন বড় আকারের বস্তুতে অনেকগুলো রঙ একত্র করে সাদা রঙ দেখতে পেয়েছিলেন। আর আমরা খুব সরু একটি ব্যান্ডপ্রস্থে কাজ করছি এবং এতে নন-লিনিয়ার ক্রিয়ার মাধ্যমে সবগুলো রঙ তৈরি করছি।
দারুণ! একদম জাদুকরী ব্যাপার যেন।
জাদুকরীই বটে। পদার্থবিজ্ঞানের এই দিকটিতে আসলে কী আছে, কীভাবে একে কাজে লাগানো যাবে তা অনুধাবন করতেই বিজ্ঞানীদের অনেক বছর লেগে গিয়েছিল। বেশি বেশি অজানা মানে বেশি বেশি কৌতূহল, বেশি বেশি কৌতূহল মানে বেশি বেশি গবেষণা। অজানা থাকাটাও আসলে বিজ্ঞানীদের জন্য আনন্দের। এটার দরকার আছে। একটি আলো থেকে একগুচ্ছ আলো বের হওয়া এবং একগুচ্ছ আলো থেকে একটি আলো তৈরি হওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন জায়গায় কাজে লাগানো হয়।
আপনি যেভাবে বললেন, লেজার, আলো এবং বস্তুর মিথক্রিয়ার মাধ্যমে এবারের নোবেল পুরষ্কারের বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
তা ঠিক।
ডিসেম্বরে যখন যখন আপনি স্টকহোম আসবেন তখন এগুলো নিয়ে আসো বিস্তারিত জানবো। আপনার আগমনের জন্য আমরা আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছি।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনার সাথে কথা বলে খুবই পুলকিত হলাম। ডিসেম্বরে দেখা করার জন্য ক্ষণ গুনছি!
ধন্যবাদ। আমিও সেখানে যাবার জন্য আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছি। [হাসি]
আপনার সেই ব্যস্ততম দিনের জন্য শুভকামনা।
অনেক ধন্যবাদ।
বিদায়
বিদায়