প্রো-রেসলিং আসল না নকল?

কখনো কি ভেবে দেখেছেন কোনো রেসলার হঠাৎ করে কেন ভাল থেকে খারাপ হয়ে যান? কিংবা কোনো রেসলার উপর থেকে লাফ দিলে প্রতিপক্ষ সরে না গিয়ে এক জায়গায় কেন দাঁড়িয়ে থাকে? ‘দ্য আন্ডারটেকার’ কি আসলেই মৃত? প্রো-রেসলিং-এর অন্তরালের এরকম সব গল্প দিয়েই সাজানো আজকের এই পর্ব।

স্ক্রিপ্ট

রেসলিং শব্দটা শুনলে প্রথমেই সবার মাথায় আসে এটা আসল না নকল? উত্তরটা হল রিং-এর মারামারিটা আসল, কিন্তু ম্যাচের ফলাফল কিংবা কে কখন কোন মুভটা ব্যবহার করবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, অর্থাৎ যাকে বলা হয় স্ক্রিপ্টেড। ম্যাচের মধ্যে বাইরে থেকে কেউ বাধা দিবে কিনা তাও আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়। মারামারিটা আসল হলেও তার আঘাতের প্রভাবটা যেন খুব কম হয় সেদিকে খেয়াল রেখেই প্রতিটা রেসলারকে তার মুভ ব্যবহার করতে হয়। এ জন্য রেসলাররা বিভিন্ন রকম টেকনিক ব্যবহার করেন।

একটা উদাহরণ দেখা যাক। প্রায় সময়ই রেসলাররা সরাসরি প্রতিপক্ষের মুখে লাথি মেরে বসেন। দর্শকরা ভেবে বসে সত্যিই অনেক আঘাত লেগেছে, আসলেই কি তাই? রেসলাররা শুধু পা তুলে দেন, কোনোরকম শক্তি প্রয়োগ করেন না। প্রতিপক্ষ ঠিক আগের মুহূর্তে মুখের সামনে হাত নিয়ে এসে আঘাতটা হাতের উপর দিয়ে চালিয়ে দেন, একইসাথে নিজের মুখটিকেও রক্ষা করেন। বাকিটুকু অভিনয়ের খেলা, রেসলারদের অভিনয়ে মনে হয় যেন প্রতিপক্ষ সত্যিই দারুণ আঘাত পেয়েছেন।

‘সেল্টিক ওয়ারিয়র’ শিমাস-এর ‘ব্রোগ কিক’ হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দিচ্ছেন মার্ক হেনরি

হিল-বেবিফেস

প্রো-রেসলিং-এর স্ক্রিপ্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিল-বেবিফেস। সহজ ভাষায় রেসলাররা কোন ভূমিকায় থাকবে। বেবিফেস বলা হয় তাদেরকেই যারা ভাল হিসেবে অভিনয় করে। যেমন- দর্শকদেরকে প্রশংসা করা, কোনো রকম অবৈধ আক্রমণ ছাড়াই ম্যাচ জেতা, প্রতিপক্ষকে প্রশংসা করা। বেবিফেসের উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ড্যানিয়েল ব্রায়ান বা জন সিনার নাম। WWE কোম্পানির টপ বেবিফেস হিসেবে থাকায় তারা সবসময়ই দর্শকদের চিয়ার পায়।

আর যারা খারাপ হিসেবে অভিনয় করে তাদেরকে বলা হয় হিল রেসলার। উদাহরণ? র‍্যান্ডি অর্টন কিংবা কেভিন ওয়েন্স। এদের কাজ হলো দর্শকদেরকে বিদ্রুপ করা, রেসলারদেরকে অবৈধভাবে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করা, ম্যাচের মধ্যে অবৈধভাবে মুভ ব্যবহার করা। অর্থাৎ মুভি-সিনেমার ভিলেন যাকে বলা হয়। ফলাফল দর্শকদের কাছে বু পাওয়া।

তবে মাঝেমধ্যেই হঠাৎ করে দেখা যায়, কোনো একজন হিল রেসলার বেবিফেসে অবতীর্ণ হয়েছেন কিংবা বেবিফেস তার সহযোগীকে আক্রমণ করে হিলের ভূমিকা পালন করছেন। তবে আসল কথা হলো, এসব আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। আর এসবের উপর রেসলারদের খুব একটা হাত থাকে না। দর্শকদের বিনোদনের মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলার জন্যই করা হয় এসব।

হিল টার্ন করার পর সেথ রোলিন্স

হিল-বেবিফেস ছাড়াও আরও এক ধরনের রেসলার রয়েছে যাদের বলা হয় অ্যান্টি হিরো। এখন অ্যান্টি হিরো কারা? এদেরকে বলা যায় বেবিফেস আর হিল রেসলারদের সংমিশ্রণ। ডিন অ্যাম্ব্রোসকে দেখেছেন বোধহয়। ডিন অ্যাম্ব্রোসকে আদর্শ অ্যান্টি হিরো বলা যায়। এরা মার খাওয়ার পর চুপচাপ বসে থাকে না, তার একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখায়। বেবিফেস রেসলারদের মতো প্রতিপক্ষের উপর উদারতা দেখায় না, আবার হিল রেসলারদের মতো অবৈধ মুভও ব্যবহার করে না।

প্রোমো কাট

“Promotional Interview” বা “প্রচারণামূলক সাক্ষাৎকার”-কে সংক্ষেপে ডাকা হয় প্রোমো হিসেবে। প্রোমো জিনিসটার সাথে বলা যায় আমরা সবাই পরিচিত। স্টোরিলাইন অনুযায়ী এক রেসলার যখন অন্য কোনো রেসলারকে বিদ্রুপ করার জন্য বা তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য অথবা তাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কোনো কথা বলেন, সেটাই হল প্রোমো কাট। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রয়্যাল রাম্বলের আগে WWE চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের জন্য এজে স্টাইলসকে জন সিনার চ্যালেঞ্জ।

একজন ভাল রেসলারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো ভাল প্রোমো কাট করতে পারা। এ জন্য প্রয়োজন ভাল মাইক স্কিল। রিং স্কিল মোটামুটি হলেও একজন ভাল রেসলার ভাল প্রোমো কাট করার মাধ্যমে তা পুষিয়ে দিতে পারেন। প্রোমো কাটার ফলে দর্শকদেরকে স্টোরিলাইন বোঝানো সহজ হয়, দর্শকদের মধ্যে সহজেই উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়। সাথে ম্যাচের জন্য ভাল একটা কাহিনীও দাঁড় করানো হয়ে যায়। সিএম পাংক, জন সিনা, এজে স্টাইলস, দ্য রক, স্টিভ অস্টিন, ক্রিস জেরিকোসহ আরও অনেক রেসলারই ভাল প্রোমো কাটতে পারেন।

রেসলিং ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রোমো কাট “পাইপবোম্ব”-এর সময় মাইক হাতে সিএম পাংক

Kayfabe

Kayfabe হলো রেসলারদেরকে দর্শকদের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন মনে হয় রিং-এর হিল-বেবিফেসরা বাস্তবেও একই রকম। অর্থাৎ রিং এর বাইরের জগতেও হিল রেসলাররা নিজেদেরকে খারাপ হিসেবে উপস্থাপন করবে, বেবিফেসরা ভাল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় “ডেডম্যান” খ্যাত আন্ডারটেকারের নাম।

তার এই আন্ডারটেকার গিমিক (দর্শকদের আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহৃত চরিত্র)-এর কারণে দর্শকদের সামনে নিজেকে ভীতিকর হিসেবে তুলে ধরতেন। কিন্তু আন্ডারটেকার নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মার্ক ক্যালাওয়ে মোটেই গোরখোদক নয়! বাইরের দুনিয়ায় তিনি অন্যান্য সবার মতোই সাধারণ। সংসার আছে, বাচ্চাকাচ্চাও আছে, এমনকি তার আচরণও অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ। আশির দশক থেকে ইন্টারনেট সাধারণ মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত Kayfabe অনেক কার্যকরী ছিল, কিন্তু ইন্টারনেটের যুগ শুরু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের কাছে Kayfabe এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা রেসলারদের আসল রূপ সম্পর্কে ধারণা হয়ে যায়। ফলাফল হিল রেসলারদের সাথে গলায় গলা মিলিয়ে সেলফি তোলা!

স্ত্রী মিশেল ম্যাককুল-এর সাথে ‘ডেডম্যান’ আন্ডারটেকার

স্ক্রিপ্ট অথবা কোনো স্টোরিলাইন ছাড়া প্রো রেসলিং বলা যায় অচল। কিন্তু এগুলো লেখে কারা? অ্যাটিচিউড এরা (১৯৯৭-২০০১)-র সময় চেয়ারম্যান ভিন্স ম্যাকমোহন, জেরাল্ড ব্রিস্কো আর প্যাট প্যাটারসন মিলে ম্যাচের কয়েকদিন আগেই কিভাবে স্টোরিলাইন সাজানো যায় তা নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে, সাথে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুই। বর্তমানে প্রতিটা রেসলারের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা স্টোরি রাইটার। কোনো ফিউড (একাধিক ব্যক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব, শত্রুতা গড়ে ওঠার গল্প) শুরু হওয়ার ৩-৪ মাস আগে থেকেই তা নিয়ে স্টোরি নির্ধারণ করে ফেলা হয়। তবে এগুলোও চেয়ারম্যানের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। একজন রেসলারের ক্যারিয়ার তাই অনেকাংশেই স্টোরি রাইটারদের উপর নির্ভর করে, বাকিটা নির্ভর করে সে কতটা ভালভাবে দর্শকদের সামনে তা উপস্থাপন করতে পারে।

“মানডে নাইট র”-এর ১১১০ তম পর্বের স্ক্রিপ্ট!

তবে স্ক্রিপ্ট লেখার সময়েও অনেক কথা মাথায় রাখতে হয়। হঠাৎ কোনো রেসলার অনাকাঙ্ক্ষিত ইঞ্জুরিতে পড়লে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়ে আবার নতুন করে স্টোরি লিখতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, “লীগ অফ নেশনস”-এর সৃষ্টি হয়েছিল সেথ রলিন্সের ইঞ্জুরির কারণে! অনেক সময় এক বছর আগেও স্ক্রিপ্ট লেখা হয়ে থাকে। যেমন- রেসলম্যানিয়া ২৯ এ জন সিনা এবং দ্য রক এর চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের স্টোরি তার আগের রেসলম্যনিয়াতেই লিখে ফেলা হয়েছিল।

জন সিনা ও ব্রে ওয়ায়েট-এর প্রোমো কাটের স্ক্রিপ্ট!

মুভ ব্যবহার

প্রথমেই বলা হয়েছে কোনো মুভ যেন প্রতিপক্ষের উপর খুব একটা প্রভাব ফেলতে না পারে সে কারণে রেসলাররা বিভিন্ন ধরণের টেকনিক ব্যবহার করেন। কোনো মুভ ব্যবহার করার আগে রেসলার ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে এমনকি কথোপকথনের মধ্যেও প্রতিপক্ষকে বলে দেন যে এরপর এই মুভটি ব্যবহার করা হবে এবং সেই মুভ অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে নেয়। এভাবে শলাপরামর্শের মাধ্যমে রেসলাররা ম্যাচে মোমেন্টাম সৃষ্টি করেন, দর্শকদের উত্তেজিত করেন এবং একইসাথে নিজেদেরকে বড় ধরণের আঘাত থেকে রক্ষা করেন। এ কারণে প্রতি ম্যাচেই দেখা যায় রিংসাইডে থাকা রেসলার সরে না গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে যেন প্রতিপক্ষ রিং থেকে লাফ দিয়ে তার গায়ের উপর পড়তে পারে এবং প্রতিপক্ষের আঘাত কম লাগে।

সেথ রলিন্স যেন সরাসরি রিং এ আছড়ে না পড়েন সে কারণে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রুসেভ ও কেভিন ওয়েন্স

কোনো ম্যাচের বেশিরভাগ কথাবার্তাগুলো একজন রেসলারই বলেন, অর্থাৎ এরপর সে কোন মুভ ব্যবহার করতে যাবে বা প্রতিপক্ষ তার উপর কোন মুভ ব্যবহার করবে তা বলে দেন। এ ব্যাপারে মাঝেমধ্যে রেফারিও সাহায্য করেন। অনেক সময় পে-পার-ভিউ-এর ম্যাচের আগে রেসলাররা শো শুরু হওয়ার আগেই ম্যাচে কিভাবে কোন সময় কোন মুভটি ব্যবহার করবে তা রিহার্সাল করে নেয়! সাবেক WWE রেসলার আলবার্তো ডেল রিও কোম্পানি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, জন সিনা বা অন্যান্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাই সাধারণত ম্যাচ কল করেন, অর্থাৎ মুভের ব্যবহার বলে দেন। যে যত বেশি ম্যাচ খেলবে, ম্যাচ কল করা তার জন্য ততটাই সহজ হবে। এই কল করার উপরেই ম্যাচের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। সামান্য ভুল কলেই যেকোন রেসলার ইঞ্জুরিতে পড়তে পারেন।

বচ

সবধরণের সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও অনেক সময়ই রেসলাররা ভুল করে বসেন। একেই বচ (Botch) করা বলে যার শাব্দিক অর্থ হল “কলংকচিহ্ন”। রেসলারদের শারীরিক অদক্ষতা অন্য যে কোনো কারণে মুভ ঠিকমত প্রতিপক্ষের উপর প্রয়োগ না করতে পারাটাই হল বচ। বচ করার ফলে মারাত্মক ইঞ্জুরি হয় এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় স্টিভ অস্টিন এবং ওয়েন হার্টের কথা। বচের কারণে স্টিভ অস্টিন অবসর নিতে বাধ্য হন আর ওয়েন হার্টতো রিং-এই মারা যান!

এতো গেল স্ক্রিপ্টের কাজকারবার। পরবর্তী পর্বে থাকবে ম্যাচে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র, রেসলিং রিং, রেফারি আর টিভি টেলিকাস্টের পিছনের গোপন সব গল্পের সমাহার।

পরবর্তী পর্ব: প্রো-রেসলিং এর অন্তরালের গল্প

 

This article is in Bangla language. It's an article about some unknown facts of WWE. 

Featured Image: Youtube

Related Articles

Exit mobile version