দেশ মাতানোর সুযোগ না পেয়ে বিশ্ব মাতানো ক্রিকেটারদের গল্প

প্রত্যেক ক্রিকেটারের স্বপ্ন থাকে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার। নিজ দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠেছেন বলেই সফলতা পেয়েছেন বিশ্বের নামীদামী ক্রিকেটাররা। এমন অনেক ক্রিকেটারও আছেন যাদের প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার ততোটা সমৃদ্ধ না। এর মধ্যে কেউ কেউ নিজের ভাগ্যকে পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়াকে কারণ হিসাবে দাঁড় করাতে পারেন।

সাউথ আফ্রিকার অ্যালবি মরকেল এমনি একজন ক্রিকেটার যার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য অর্জনের সামর্থ্য ছিলো। কিন্তু যখন সুযোগ পেলন তখন ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি, আর যখন ভালো ফর্মে ছিলেন তখন দলে তার জায়গা হয়নি।

ল্যান্স ক্লুজনারের অবসরের পর তারই মতো একজন অলরাউন্ডারের সন্ধানে ছিলো ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা। কার্যকরী বোলিং সেই সাথে শেষদিকে ব্যাটে ঝড় তোলার সামর্থ্য থাকাতে সাউথ আফ্রিকার মূল একাদশে ২০০৪ সালে ক্লুজনার সুযোগ পান। এরপর আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন অ্যালবি মরকেল। শেষ ওডিয়াই ম্যাচ খেলেছিলেন ২০১২ সালে, এরপর তার জায়গায় হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান হিসাবে সুযোগ পান ডেভিড মিলার। আর তাতেই বিগ মরকেলের ওডিয়াই ক্যারিয়ার থেমে যায়, দেশের হয়ে ৫৮টি ওডিয়াইতে ২৩.৬৯ ব্যাটিং গড়ে এবং ১০০.২৫ স্ট্রাইক রেইটে ৭৮২ রানের পাশাপাশি ৫০টি উইকেট শিকার করেচিলেন অ্যালবি মরকেল।

টেস্ট ক্রিকেটে এবং টি-টুয়েন্টিতে সুযোগ না পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা আফসোস করতেই পারেন অ্যালবি। টেস্ট ক্রিকেটে নিজের অভিষেক ৭১ বলে ৫৮ রানের ইনিংস খেলা সত্ত্বেও আর কখনো টেস্ট দলে ডাক পাননি তিনি। আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে নিজের শেষ ম্যাচে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতার পরেও তাকে আর দলে ডাকা হয়নি। টি-টুয়েন্টিতে ব্যাট হাতে ১৪২.২৮ স্ট্রাইক রেইটে ৫৭২ রান করার পাশাপাশি ২৬ টি উইকেট শিকার করেছিলেন অ্যালবি মরকেল।

জাতীয় দলে সুযোগ না পেলেও বিভিন্ন দেশে ঘরোয়া টি-টুয়েন্টি লীগে কিছুটা হলেও তার প্রতিভার জানান দিয়েছেন দর্শকদের। আইপিএলের কল্যাণে ক্রিকেটবিশ্ব তার হাটু গেড়ে লম্বা লম্বা ছয়ের মারগুলো দেখেছে। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে বিদেশী কোঠায় সবসময় তাকে খেলতে দেখা যেতো, ৬ বছর চেন্নাইয়ের হয়ে খেলার পর গত তিন মৌসুমে তিনটি ভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন অ্যালবি মরকেল।

সব ধরনের টি-টুয়েন্টিতে অ্যালবি মরকেল এখন পর্যন্ত ১৩ টি ভিন্ন দলের হয়ে ২৯৮ টি ম্যাচ খেলেছেন। এই ২৯৮ ম্যাচে ব্যাটে বলে দুই বিভাগেই সফলতা পেয়েছেন মরকেল। ব্যাট হাতে ১৩৭.৯৪ স্ট্রাইক রেইটে ৩৯৫২ রান করার পাশাপাশি শিকার করেছেন ২৪০ টি উইকেট।

q1

.

অ্যালবি মরকেলে মতো এমন যাযাবর ক্রিকেটারের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে অভাগা ক্রিকেটারের তালিকা প্রকাশ করতে গেলে উপরের দিকেই থাকবেন ব্রাড হজ। খুব সম্ভবত ভুল সময়ে ভুল জন্মেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাননি তিনি।

ভিক্টোরিয়ার এই ব্যাটসম্যান ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। সে সময়ে ভিক্টোরিয়ার সেরা ব্যাটসম্যানদের নাম উচ্চারণের সময় তার নাম উচ্চারিত হতো। ধারাবাহিক ভালো খেলার পুরস্কাররূপ ২০০৫ সালে অজি দলে ডাক পান হজ, কিন্তু পুরো সিরিজের একটি ম্যাচও তাকে মূল দলে রাখা হয়নি।

ঐ বছরেই “ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ” পান হজ, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বেশি সময়ও নেননি। মাত্র ৫ম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০৩* রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন। তবুও তার টেস্ট ক্যারিয়ার ছিলো মাত্র ৬ টেস্টের, ঐ ৬ টেস্টে ৫৫.৮৮ ব্যাটিং গড়ে ৫০৩ রান করার পরেও আর সুযোগ পাননি হজ।

q2

.

ওডিয়াইতেও তাকে অল্পতেই ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মাত্র ২১ ইনিংস ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছিলেন, এই ২১ ইনিংসে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি সহ ৩০.২৬ ব্যাটিং গড়ে ৫৭৫ রান করেছিলেন হজ। নিয়তি মেনে নিয়ে ২০০৯ সালে প্রথমশ্রেণীর ক্রিকেটে অবসরের ঘোষণা দেন হজ। ততদিনে তার নামের পাশে ৫১ টি ফার্স্টক্লাস সেঞ্চুরি। ব্রাড হজ ২২৩ টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে সর্বোচ্চ ৩০২* রানের ইনিংস এবং ৫১ টি সেঞ্চুরি ও ৬৪ টি হাফ-সেঞ্চুরির মাধ্যমে ৪৮.৮১ ব্যাটিং গড়ে ১৭০৮৪ রান করেছেন।

এর মধ্যে ক্রিকেটের আদি পরিসরের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে হজ। বিশ্বের আনাচে কানাচে সব দেশের ঘরোয়া লীগে তাকে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত ১৯ টা ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন হজ, সফলতাও আকাশচুম্বী। ২৬৩ টি টি-টুয়েন্টি ম্যাচে ৩৬.৮৬ ব্যাটিং গড়ে ৭০৭৯ রান, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে ক্রিস গেইলের পর সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হজ। আইপিএলের এই মৌসুমে গুজরাটের কোচ হিসাবে তাকে দেখা গিয়েছে, এখন আবার বিগ ব্যাশে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকারসের অধিনায়কের ভূমিকা পালন করছেন। যখন যেভাবে পারছেন ক্রিকেটের সাথেই পড়ে আছেন ব্রাড হজ।

q3

.

নেদারল্যান্ডসের রায়ান টেন ডোসেটের গল্পটা এদের মতো না হলেও পরিণতি একই। আইসিসির সহযোগী দেশে জন্মগ্রহণ করার ফলে নিজের ক্রিকেটীয় প্রতিভা দেখাতে আশ্রয় নিতে হয় কাউন্টি এবং বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া আসরে। নেদারল্যান্ডসের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললেও তার জন্ম সাউথ আফ্রিকার পোর্ট এলিজাবেথে। নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলা ৩৩ টি ওডিয়াইতে ৬৭.০০ ব্যাটিং গড়ে ১৫২১ রান করেছেন। এখন পর্যন্ত একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং গড়ও তার দখলে।

শুধুমাত্র ব্যাট হাতে না, বল হাতেও সমভাবে সফল ডোসেট। ৩৩ ম্যাচে শিকার করেছেন ৫৫ উইকেট। নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলা ৯ টি টি-টুয়েন্টিতে ৪২.৮০ ব্যাটিং গড়ে ২১৪ রান করার পাশাপাশি ১২ উইকেট আছে তার ঝুলিতে। আইসিসি বর্ষসেরা সহযোগী দলের ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন ২০০৮, ২০১০ এবং ২০১১ সালে।

q4

.

২০১১ বিশ্বকাপে দুটি শতক হাঁকানোর পরেও যখন শুনতে হলো তার দলের আর ওডিয়াই স্ট্যাটাস নেই তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান টেন্ডু। বর্তমানে কাউন্টি ক্লাব এসেক্সের অধিনায়ক তিনি। রাবি বোপারা এসেক্সের হয়ে গত বছর লিমিটেড ওভারের ক্রিকেটে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিছুদিন আগে অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এখন টেন্ডু এসেক্সের তিন ফরম্যাটেরই অধিনায়ক। শুধুমাত্র ইংল্যান্ডেই না, বিশ্বের অনেক প্রান্তেই তাকে টি-টুয়েন্টি লীগ খেলতে দেখা যায়।

q5

.

রায়ান টেন ডোসেট এখন পর্যন্ত ১৪৫ টি প্রথমশ্রেণীর ম্যাচে ৪৯.২৪ ব্যাটিং গড়ে ২৫ টি শতক এবং ৪০ টি অর্ধশতকের মাধ্যমে ৮৮৬৪ রান করেছেন এবং মিডিয়াম পেসে শিকার করেছেন ২০৮ ব্যাটসম্যানকে। লিস্ট-এ ক্রিকেটে ১৯৪ ম্যাচে ৪৫.৭৮ ব্যাটিং গড়ে ৫২১৯ রান করার পাশাপাশি ১৬২ উইকেট আছে তার ঝুলিতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে চেনানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা না পেলেও বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লীগে তাকে নিয়মিত খেলতে দেখা যায়। আইপিএল, বিপিএল, পিএসএল সহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ১৩ টি দলের হয়ে ২৮৫ টি টি-টুয়েন্টি খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, ২৫০ ইনিংস ব্যাট করে ২৯.৩৮ ব্যাটিং গড়ে করেছেন ৫৬৪২ রান এবং ১৩০ ইনিংসে বল করে নিয়েছেন ১০৮ উইকেট।

.

.

এদের মতো আরো অনেক ক্রিকেটার আছে যারা ভুল সময়ে ভুল দেশে জন্মগ্রহণ করে সারাজীবন ঘরোয়ালীগ খেলেই কাটিয়ে দিচ্ছেন। ডোয়াইন ব্রাভো, ক্রিস গেইল, আন্দ্রে রাসেল, কাইরন পোলার্ড, লেন্ডল সিমন্স, ডোয়াইন স্মিথ, সামুয়েল বাদ্রে, সুনীল নারিন, ড্যারেন স্যামি, কেভিন কুপারদের ক্রিকেটের ফেরিওয়ালা বললে ভুল হবে না। নিজ দেশের হয়ে ক্রিকেট দুনিয়াকে ঠিক ততোটা মাতাতে না পারলেও বিভিন্ন দেশে তাদের পারফরমেন্স চোখে পড়ার মতো। ক্রিস গেইলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে গর্ব করার মতো বেশকিছু কীর্তি থাকলেও অন্যদের দুটা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ছাড়া তেমন কোনো আহামরি কীর্তি নেই। ক্রিকেটের আধুনিক ফরম্যাট টি-টুয়েন্টিতে বেশিরভাগ রেকর্ড এদের দখলে। বিশ্ব মাতানোর সুযোগ পেয়ে কাজটা ভালোভাবেই সেরে নিচ্ছেন ব্রাভো, গেইল, রাসেলরা। টি-টুয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি ৩৪২ টা ম্যাচ খেলেছেন ডোয়াইন ব্রাভো, সবচেয়ে বেশি ৩৬৫ টি উইকেট তার ঝুলিতে সংগ্রহ করার পাশাপাশি ৫২২৯ রান এবং ১৭৫ টি ক্যাচ লুফে নিয়েছেন।

টি-টুয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রহকারী ক্রিস গেইল, ২৭৭ ম্যাচে ৯৭৭৭ রান করে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন গেইল। শুধুমাত্র রানের দিক দিয়ে নয়, সবচেয়ে বেশি অর্ধশতক (৬০), শতক (১৮) , চার (৭১৭+) এবং ছয় (৭৪৯+) মারার রেকর্ডও তার দখলে।

কাইরন পোলার্ড সবচেয়ে ক্যাচ ধরা ফিল্ডারদের তালিকায় সবার উপরে, ৩৩৭ ম্যাচে ১৮৭ টি ক্যাচ ধরেছেন পোলার্ড। সে সাথে ব্যাট হাতে ১৫২.৩৮ স্ট্রাইক রেইটে ৬৫৫৭ রান করার পাশাপাশি ২২৮ উইকেট শিকার করেছেন পোলার্ড।

.

.

কমপক্ষে ১০০ উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে কম স্ট্রাইক রেইট (১৩.৮) ক্রিসমার সান্তোকির। সবচেয়ে কম ইকোনমিক রেইট স্যামুয়েল বাদ্রীর (৫.৬১) এবং সবচেয়ে কম বোলিং গড় ক্রিসমার সান্তোকির ১৫.৭৯। স্যামুয়েল বাদ্রী এবং সুনীল নারিন টি-টুয়েন্টিতে সের বোলাদের মধ্যে দুইজন, বাদ্রী ৫.৬১ ইকোনমিক রেইটে ১৪৬ উইকেট এবং নারিন ৫.৬৮ ইকোনমিক রেইটে ২৪১ টি উইকেট শিকার করেছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররা না থাকলে টি-টুয়েন্টির জমজমাট আসর কিছুটা হলেও তার জৌলুস হারাতো। ক্রিকেটের ফেরিওয়ালা হয়ে তারা হয়তো আরো অনেকদিন দর্শকদের বিনোদন দিয়ে যাবেন।

This article is in Bangla Language. Its about great cricketers who really rocked even though not being properly utilized by their own country..

References: 

1. http://stats.espncricinfo.com/icccont2007/engine/records/index.html?class=6

Featured Image: espncricinfo.com

 

Related Articles

Exit mobile version