একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারাটাই ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। অতীতের এক অধিনায়ক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ‘অংশগ্রহণই মূল কথা’ বলেছেন, এমন নজিরও আছে। ভালো খবর এই যে, বাংলাদেশের অবস্থান বদলেছে। রঙিন পোশাকের ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন রীতিমতো এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে তাক লাগানো বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা পায় নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে।
চার বছর পেরিয়ে আবারও ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছে ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ক্রিকেটারদের চাহিদা-আশা বদলেছে, বেড়েছে আত্মবিশ্বাস। এখন আর অংশ্রগ্রহণ নয়, বরং জয়ের জন্যই মাঠে নামে ক্রিকেটাররা। সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ নিয়ে দারুণ আশাবাদী বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। তার মতে, এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অন্ততপক্ষে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেবে। গেল কয়েক বছরে এই ফরম্যাটে দারুণ ফর্মে থাকা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বাস্তবতা বুঝেই মুশফিক এমন মন্তব্য করছেন, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মে মাসের ৩০ তারিখ থেকে শুরু হওয়া আসর শেষ হবে জুলাইয়ের ১৪ তারিখে। ইংলিশ কন্ডিশনে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ থাকবে বটে, সেগুলোকে জয় করেই ভালো কিছু করার স্বপ্নে বিভোর লাল-সবুজ জার্সিধারীরা।
মুশফিক বলেন,
‘অংশগ্রহণ নয়, জিততে যাচ্ছি। এই বিশ্বাসটা নিয়েই আমরা বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি। এটা আমাদের বিশ্বাস, আমাদের সবার বিশ্বাস। আশা করি, আপনারাও সবাই এই বিশ্বাসটা মনেপ্রাণে ধারণ করবেন।’
তিনি আরও বলেন,
‘আমি মনে করি, নকআউট পর্বে জায়গা পাওয়ার মতো সব ধরণের সামর্থ্য আমাদের আছে। আর নকআউট পর্বে যেকোনো কিছু হতে পারে। বিশ্বকাপে আমি কোনো সহজ ম্যাচের আশা করছি না। এই ধরণের টুর্নামেন্টে সব দলই শক্ত প্রতিপক্ষ। একই সাথে আমি এটাও মনে করি যে, এবারের আসরে বাংলাদেশ শক্তিশালী দল হিসেবে অংশ নিতে যাচ্ছে। গেল কয়েক বছরে আমরা বেশ কিছু ফাইনাল ম্যাচে হেরেছি। হয়তো মহান আল্লাহতালাহ আমাদেরকে বিশ্বকাপে কোনো বড় পুরস্কার দেওয়ার অপেক্ষায় রেখেছেন।’
২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মাঠে নেমে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল বাংলাদেশ দল। এই মুহূর্তে একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ নম্বরে। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ওয়ানডেতে দারুণ ধারাবাহিক ছিল বাংলাদেশ। তাই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলতে যাচ্ছে অভিজ্ঞ একটি দল হিসেবে। বিশেষ করে মুশফিকসহ মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল এবং মাহমুদউল্লাহ; এই পাঁচ ক্রিকেটার দলের প্রয়োজনে যেকোনো পরিস্থিতিতেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে প্রতিপক্ষের জন্যেও হুঁশিয়ারি এই বাংলাদেশ দল।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ একটা ব্যাপার বটে। কিন্তু বিশ্বকাপের আসর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। মুশফিক তাই দেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান এবং সম্মানিত মনে করছেন।
বলেছেন,
‘আমি সবসময় অনুভব করি, বিশ্বকাপের মতো আসরে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা অনেক গর্বের এবং সম্মানের। আমাদের উপর সবার একটা প্রত্যাশা আছে। আমরা যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারি, তাহলে আমরাই সবচেয়ে বেশি খুশি হবো।’
দলের পাঁচ জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারের কথা উল্লেখ করে মুশফিক জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে পাঁচ ক্রিকেটার হয়তো এবারই শেষবার মাঠে নামবে। তাই নিজেদের মধ্যেও প্রত্যাশার পারদ বেড়ে চলেছে। স্বপ্ন, মনে রাখার মতো কিছু করে যাওয়ার।
মুশফিকের ভাষায়,
‘সম্ভবত আমাদের পাঁচজনের (মুশফিক, মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মাহমুদউল্লাহ) এবারই শেষ একসাথে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া। তাই আমরা অন্যান্য আসরের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মাশরাফি ভাইয়ের জন্য এটা শেষ বিশ্বকাপ। আমরা সবাই চাইবো ভালো কিছু করতে, যেন তাকে দারুণ একটা বিদায় উপহার দিতে পারি। মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য হলেও এবারের বিশ্বকাপ আমরা মনে রাখার মতো করতে চাই। তাই আমি মনে করি, মাশরাফি ভাইয়ের জন্য কিছু করতে চাওয়া আমাদেরকে এবারের আসরে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে।’
জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটাররা নিজেদের পথ করে নিয়েছেন। তাদের ভিশন ও মিশন পানির মতোই স্বচ্ছ। সেক্ষেত্রে তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য কী ভাবনা? মুশফিক জোর দিচ্ছেন উপভোগে। কারণ, তাদের অবসরের পর দলের হাল ধরতে হবে এসব তরুণদেরকেই। মুশফিকের ভাবনা, তরুণরা যদি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট উপভোগ করতে পারে, তাহলে পারফর্ম করতেও সুবিধা হবে। কারণ, এ ধরনের টুর্নামেন্টে কাঁধের উপর পাহাড় সমান চাপ থাকে, যেগুলো ভুলে থাকতে উপভোগের চেয়ে বড় টোটকা আর হয় না।
মুশফিক-মাশরাফিদের ‘ফ্যাভ ফাইভের’ সঙ্গে স্কোয়াডে আছেন লিটন কুমার দাস, মোহাম্মদ মিঠুন, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মেহেদী হাসান মিরাজ, মুস্তাফিজুর রহমান এবং আবু জায়েদ রাহী। প্রত্যেকের জন্যই এটা প্রথম বিশ্বকাপ।
বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক মুশফিক তাদের প্রসঙ্গে বলেছেন,
‘আবু জায়েদ রাহী ছাড়া যারা বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে, তারা সবাই অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে। বিশ্বকাপে তাদের সেই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লাগবে। তাদেরকে এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করতে পারতে হবে। মানসিকভাবে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, এটা কেবলই একটা ক্রিকেট, যেখানে তারা নিজেদের ১০০ ভাগ উজাড় করে দেবে।’
পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশের দুর্বলতা আর শক্তির জায়গা দুটোই আছে। বড় চাপ থাকবে ব্যাটিং ইউনিটের উপর। কারণ, দলের বোলিং ইউনিট ঠিক ব্যাটিংয়ের মতো শক্তিশালী নয়। তাই বড় কাজটা করতে হবে তামিম-মুশফিকদেরই। আবার বোলারদের উপরও ভরসা রাখতে হবে। কারণ, ইংলিশ কন্ডিশনে পাঁচজন পেসারের স্কোয়াড যেকোনো কিছু করতে পারে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিবোলিংও করতে পারে দারুণ কিছু।
মুশফিকের ভাষায়,
‘আপনি যদি আমাদের ব্যাটিং ইউনিট দেখেন, পুরোটাই অভিজ্ঞতায় ভরা। কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে কিছু হবে না। পারফরম্যান্স দিয়ে এই অভিজ্ঞতার বাস্তবায়নও প্রয়োজন। আমার মনে হয়, বিশ্বকাপের আসরে ব্যাটিংয়ে স্ট্রাইকরেট খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কত রান করলেন, আপনার গড় কত, তার চেয়েও স্ট্রাইকরেট গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ৩২০ রান করেও হেরেছি। অর্থাৎ, আমাদেরকে ৩৫০-৬০ রান করার তাড়া থাকতে হবে। টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের এই ভাবনাগুলো মাথায় রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন,
‘আমরা যদি কেউ সেঞ্চুরি করি, তাহলে সেই ইনিংসকে খুব কম সময়ের মধ্যে ১৩০-১৫০ পর্যন্ত টানতে হবে। বেশি বাউন্ডারি থাকতে হবে। হ্যাঁ, যারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে, তাদের জন্য আলাদা কথা। তবে আমি বিশ্বাস করি, তারাও সামর্থ্য রাখে। শেষ ২-৩ সিরিজে তার প্রমাণও পাওয়া গেছে।’
সিনিয়র ক্রিকেটাররা দায়িত্ব বোঝেন। কিন্তু বড় আসরে গিয়ে তরুণরা যেন খেই হারিয়ে না ফেলেন, সেই দুশ্চিন্তা থাকছে সবার মনেই। যে কারণে মুশফিকের পরামর্শ, মুস্তাফিজ-মিরাজরা যদি আগে থেকেই টুর্নামেন্টজুড়ে নিজেদের ব্যক্তিগত কিছু চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে সেসব বাস্তবায়নে তাদের ও দলের দু’পক্ষের জন্যই ভালো হবে।
তাছাড়া ক’দিন আগেও বলা হতো, বাংলাদেশ কেবলই ঘরের মাঠে সুবিধা করতে পারে। কিন্তু দিন বদলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশের মাটিতেও বেশ ধারাবাহিক এশিয়ার এই দলটি। এখন শুধুই অপেক্ষা, প্রত্যাশার বাস্তবায়নের।