১
চার্লি ম্যাকলিওড নামটি ক্রিকেট ইতিহাসে খুব একটা পরিচিত না। হওয়ার কথাও নয়, কারণ এই ভদ্রলোক ১৭ টেস্টে করেছেন মাত্র ৫৭৩ রান, সেঞ্চুরির সংখ্যা মাত্র ১টি। বোলিং করে নিয়েছেন মাত্র ৩৩ উইকেট। ১৪১ বছরের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে তার দিকে আলাদাভাবে চোখ পড়ার কোনো কারণই নেই।
কিন্তু এমন কিছু সময় আসে, যখন সাধারণ কোনো ক্রিকেটারের নামও খোদাই হয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। ম্যাকলিওডের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। বধির ছিলেন এই অলরাউন্ডার, কানে শুনতে পেতেন না। কিন্তু শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করেই ক্রিকেট খেলতেন তিনি, এবং ভালোই খেলতেন। বেশ শক্তিশালী ছিল সে সময়ের অস্ট্রেলিয়া দল, তারপরেও দলে জায়গা করে নিতে সমস্যা হয়নি তার।
৫ টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজ খেলতে ১৮৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়া গেল ইংল্যান্ড দল, সেই সিরিজের প্রথম টেস্টে এক ঘটনা ঘটলো। গল্পের শুরু হলো এখান থেকেই।
২.
ইংল্যান্ড দল যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখে, তখন তাদের ক্যাপ্টেনের নাম ছিল অ্যান্ড্রু স্টডার্ট। কিন্তু টেস্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগে মারা যান স্টডার্টের মা, দেশে ফিরে যান ইংলিশ অধিনায়ক। তার স্থলাভিষিক্ত হন আর্চি ম্যাকলারেন।
সিডনিতে হওয়া প্রথম টেস্টে টসে জিতলেন ম্যাকলারেন, জিতে ব্যাটিং নিলেন তিনি। নিজে করলেন সেঞ্চুরি, জর্জ হার্স্ট আর টম হেওয়ার্ড করলেন হাফ সেঞ্চুরি। তবে সব আলো কেড়ে নিলেন ভারতের কুমার রণজিৎসিংজী। ৫৫১ রানের পাহাড়ে উঠে গেল ইংল্যান্ড, দশম ও শেষ উইকেট হিসেবে রণজিৎসিংজী যখন ফিরছেন, তখন তার নামের পাশে ঝকঝক করছে ১৭৫ রান। মাত্র ২২৩ মিনিটে, মানে ৪ ঘণ্টারও কম সময়ে এই রান করেছেন তিনি। ম্যাকলিওড নিলেন ৩ উইকেট।
ব্যাটিংয়ে নামলো অস্ট্রেলিয়া, নেমেই খেই হারালো। টম রিচার্ডসনের হাতে শুরু হলো অস্ট্রেলিয়া নিধন, একটু পরেই সেই দায়িত্ব নিলেন জ্যাক হিয়ার্ন। একপর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ালো ১৩৮/৭।
এবার বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন দুই টেলএন্ডার হিউ ট্রাম্বল আর চার্লি ম্যাকলিওড। দুজন মিলে গড়লেন ৯০ রানের জুটি, ট্রাম্বল করলেন ৭০, ম্যাকলিওড করলেন অপরাজিত ৫০। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না, ২৩৭ রানে অলআউট হয়ে ফলোঅনে পড়লো অস্ট্রেলিয়া।
৩১৪ রানে পিছিয়ে থেকে আবার ব্যাটিংয়ে নামলো স্বাগতিকরা। এবার চমৎকার খেলতে লাগলো তারা। দলীয় ৩৭ রানে ওপেনার ফ্রাঙ্ক আয়ারডেল আউট হয়ে গেলে ওয়ান ডাউনে পাঠানো হলো আগের ইনিংসের হাফ সেঞ্চুরিয়ান ম্যাকলিওডকে। দিনের খেলা শেষ হওয়ার আগে আরেক ওপেনার জো ডার্লিংয়ের সাথে মিলে যোগ করলেন ৮৯ রান, দলকে নিয়ে গেলেন ১২৬ রান পর্যন্ত। ইনিংস পরাজয় এড়াতে তখনও ১৮৮ রান লাগে বটে, তবে এই দুজন যেভাবে খেলছেন তাতে সেটা একদমই অসম্ভব মনে হচ্ছে না।
৩.
পরদিন সকালে খেলা শুরু হলো আবার। আগের দিন শেষ করেছিলেন ২০ রানে, খেলা শুরু হওয়ার পরে আরও ৬ রান যোগ করলেন তিনি। এমন সময় ঘটলো সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
বল করছিলেন টম রিচার্ডসন, একটি ফুলটস দিলেন তিনি। ঠিকমতো খেলতে পারলেন না ম্যাকলিওড, উইকেট ছত্রখান করে দিল বল। উল্লসিত হয়ে উঠলো ইংলিশ ক্রিকেটাররা, কিন্তু তাদেরকে হতাশ করে নো বল ঘোষণা করলেন আম্পায়ার চার্লস ব্যানারম্যান। ইতিহাসের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান, সেই চার্লস ব্যানারম্যান।
এদিকে আউট হয়ে গেছেন ভেবে ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এলেন ম্যাকলিওড, কানের সমস্যার কারণে আম্পায়ারের কথা কানে যায়নি তার। নন স্ট্রাইকে থাকা জো ডার্লিং চিৎকার করে ফিরে যেতে বললেন তাকে। সেটাও শুনতে পেলেন না তিনি। স্ট্যাম্প ভেঙে দেয়ার পরে বল গড়িয়ে স্লিপে চলে গেল, সেখান থেকে কুড়িয়ে নিলেন উইকেট কিপার বিল স্টোরার। বল হাতে এগিয়ে এসে ভাঙা উইকেট আরেক দফা ভেঙে দিলেন। এবার বুঝতে পারলেন ম্যাকলিওড। কিন্তু হায়, তর্জনী তুলে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না লেগ আম্পায়ার জিম ফিলিপসের।
নিরুপায় ম্যাকলিওডের একটাই কাজ করার ছিল, সেটাই করলেন। ব্যানারম্যানের দিকে এগিয়ে গিয়ে আবেদন জানালেন। ব্যানারম্যান জানিয়ে দিলেন, এ বিষয়ে কিছু বলার নেই তার।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মাঠ ছেড়ে গেলেন ম্যাকলিওড, গ্যালারিতে তখন প্রচণ্ড হট্টগোল। সেদিন বিকেলে খেলা শেষ হওয়ার পরে বিষয়টা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলো। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, আউটটা আইনত বৈধই ছিল, ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ম্যাকলিওড। কিন্তু সেটা তো আউট হয়ে গেছেন ভেবে, রান নেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। ক্রিকেট তো ‘জেন্টলম্যান’স গেম’, নাকি? এরকম আউট কোনো জেন্টলম্যান কীভাবে করতে পারে?
এবার যার হাতে ম্যাকলিওড আউট হয়েছিলেন, সেই স্টোরার হাত ধুয়ে ফেললেন। বললেন, “এরকম আউট করায় তিনি খুব অনুতপ্ত, কিন্তু তারও আসলে কিছু করার ছিল না। নির্দেশ ছিল তার উপর।” ইঙ্গিতটা যে ম্যাকলারেনের দিকে, তা পরিষ্কার।
ম্যাকলিওড যখন আউট হন, তখন দলের স্কোর ছিল ১৩৫/২। ১৭৯ রান তখনও লাগে ইনিংস পরাজয় এড়াতে। আউট না হলে কী হতে পারতো, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার আর কোনো উপায় নেই। তবে ক্লেম হিল রুখে দাঁড়ালেন এবার। করলেন মহামূল্যবান ৯৬ রান, ডার্লিং আর সিড গ্রেগরির সাথে ৫৬ আর ৭৮ রানের দুটো পার্টনারশিপ গড়লেন, দলকে নিয়ে গেলেন ৩২১ পর্যন্ত। তারপর সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়ে গেলেন।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হলো ৪০৮ রানে। লিড ৯৪ রানের, ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ৯৫ রান মাত্র। ১ উইকেট হারিয়েই জয়ের বন্দরে পৌঁছে গেল তারা। সিরিজে এগিয়ে গেল ১-০ তে।
৪.
ওদিকে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল ম্যাকলিওডের বুকের মধ্যে। মেলবোর্নে, পরের টেস্টেই সেই আগুন নেভানোর সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। আর কী দারুণভাবেই না করলেন সেটা! ওপেনিংয়ে ডার্লিঙের সাথে নেমে করলেন সেঞ্চুরি, অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জিতলো ইনিংস ও ৫৫ রানে। সিরিজে ১-১ এ সমতা।
অ্যাডিলেডে হলো তৃতীয় টেস্ট। ব্যাট হাতে তেমন কিছু করতে পারলেন না ম্যাকলিওড, করলেন ৩১ রান মাত্র। আগের টেস্টের মতো এই টেস্টেও ফলোঅনে পড়লো ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে বল করেননি। সেই রাগ থেকেই কি না কে জানে, দ্বিতীয় ইনিংসে ঘাতক হয়ে উঠলেন তিনি। ৫ উইকেট নিয়ে যখন ইংল্যান্ডকে অলআউট করলেন, ইনিংস পরাজয় এড়াতে তখনও লাগে ১৩ রান। সিরিজ ২-১।
চতুর্থ টেস্ট আবার মেলবোর্নে। বল হাতে দুই উইকেটের সাথে করলেন একটি হাফ সেঞ্চুরি, দল আবার জিতলো। সিরিজ ৩-১।
পঞ্চম টেস্ট আবার ফিরে এলো সেই সিডনিতে। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৩৩৫ রানের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া করলো ২৩৯, ম্যাকলিওডের ব্যাট থেকে এলো সর্বোচ্চ ৬৪। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৭৮ রানে অলআউট হয়ে গেল ইংল্যান্ড, আগের ইনিংসের ৯৬ রানের লিড যুক্ত হয়ে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য দাঁড়ালো ২৭৫ রানের। জো ডার্লিংয়ের চোখ ধাঁধানো ১৬০ রানে মাত্র ৪ উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছে গেল তারা। অস্ট্রেলিয়া ৪-১ ব্যবধানে হারালো ইংল্যান্ডকে।
সেই সিরিজে ৫৮.৬৭ গড়ে ৩৫২ রান করেছিলেন ম্যাকলিওড, বল হাতে নিয়েছিলেন ১০ উইকেট। তবে এগুলোর কিছুতেই হয়তো তিনি ততটা তৃপ্তি পাননি, যতটা পেয়েছিলেন প্রতিশোধ নেয়ার পর।
ম্যাকলারেনের উপরে প্রতিশোধ নেয়ার পর!