ইউরি গ্যাগারিনের মৃত্যু: এক অমীমাংসিত রহস্য

১৯৬৮ সালের মার্চ মাসের সেই দিনটি ইউরি গ্যাগারিনের জন্য ছিল ‘অ্যানাদার ডে অ্যাট অফিস’। রুটিনমাফিক ইন্সট্রাক্টর ভ্লাদিমির সেরিয়োগিনকে সাথে নিয়ে চিরপরিচিত মিগ-১৫ প্লেনে করে সফেদ শুভ্র মেঘমালার ভেতর দিয়ে দূরন্ত গতিতে ছুটতে হবে, আবার ঠিকমতো অবতরণ করে চলে আসতে হবে বিমানঘাঁটিতে- এই ছিল সেদিনকার কাজ। সোভিয়েত রাশিয়ার মিগ-১৫ ফাইটার জেটের ককপিট গ্যাগারিনের খুব পরিচিত, অসংখ্যবার সেখানে বসেছেন। এই ফাইটার জেটে করে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশে গতির ঝড় তোলা হয়েছে অনেকবার। তাই সেদিনও যে অন্যান্য দিনের মতোই আরেকটি দিন হতে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহের অবকাশ ছিল না কারও।

কিন্তু প্রকৃতি সবসময় ব্যাকরণ মেনে চলে না। প্রকৃতির অদ্ভুত আচরণগুলো আমাদের বার বার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। মেঘমুক্ত আকাশও ধূসর গম্ভীর মেঘে ঢেকে যায় মুহুর্তের ব্যবধানে, রোদেলা বিকেলে হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসে, চিরশান্ত শহরটি একসময় প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায়। নিয়তি যার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছে, তা খণ্ডন করা যায় না, কখনোই না। গ্যাগারিন যদি জানতেন ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসের ২৭ তারিখের সেই ফ্লাইটটি হতে যাচ্ছে তার কৃতিত্বপূর্ণ জীবনের শেষ ফ্লাইট, তাহলে হয়তো সেদিন কােনোভাবেই রানওয়ের আশেপাশে ভিড়তেন না। কিন্তু নিয়তি যে তার মৃত্যু ঠিক করে রেখেছে সেই অতিপরিচিত মিগ-১৫ যুদ্ধবিমানের দুর্ঘটনার মধ্যেই!

১০টা বেজে ১৮ মিনিটের সময় মস্কো থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্যালোভস্কি বিমান ঘাঁটিতে পরিচিত মিগ-১৫ বিমানের কাছে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গ্যাগারিন। এর এক ঘন্টা পরেই ফ্লাইটের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল গ্যাগারিনের আরেকজন বন্ধু ও সহকর্মী ভ্লাদিমির এক্সিওনভর। দুজনে একসাথে কাজ করেছেন, একে অপরের পরিচিত আগে থেকেই। সময় যখন ১০টা বেজে ৩০ মিনিট, তখন আবহাওয়াগত কারণে গ্যাগারিনের বন্ধু ভ্লাদিমির এক্সিওনভের সেদিনের ফ্লাইট বাতিল করা হলো। পাইলট এক্সিওনভ রানওয়ে থেকে বিমানঘাঁটিতে ফিরে আসলেন। ততক্ষণে পাইলট গ্যাগারিন ও তার ইন্সট্রাক্টর সেরিয়োগিন আকাশে উড়াল দিয়েছেন।

আনমআচচ
ভ্লাদিমির সেরিয়োগিন এবং ইউরি গ্যাগারিন- অভিজ্ঞতার কমতি ছিল না কারও; image source: spacesafetymagazine.com

১০টা বেজে ৩০ মিনিটের দিকে যখন গ্যাগারিনের বন্ধু ভ্লাদিমির এক্সিওনভের ফ্লাইট বাতিল করা হলো, তখনও তিনি জানতেন না গ্যাগারিনের মিগ-১৫ যুদ্ধবিমানের সাথে ক্যালোভস্কি বিমানঘাঁটির কন্ট্রোল রুমের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। রানওয়ে থেকে ফিরে এসে জানতে পারলেন গ্যাগারিন ও ভ্লাদিমির সেরিয়োগিনের সাথে হয়তো খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। ১০টা বেজে যখন ৩২ মিনিট তখন শেষবারের মতো গ্যাগারিনরা কন্ট্রোল রুমে জানিয়েছিলেন, তারা ফিরে আসছেন। এরপর সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।

কন্ট্রোল রুম থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তন্ন তন্ন করে খোঁজ চালানো হলো ক্যালোভস্কি বিমান ঘাঁটির আশেপাশের এলাকাগুলোতে। দুপুর ২টা বেজে ৫০মিনিটের সময় হেলিকপ্টারের ক্রুরা বিমানঘাঁটি থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে মিগ-১৫ বিমানের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করলেন। যেভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল, তাতে করে ইউরি গ্যাগারিন ও তার সহকর্মীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। কেউই প্রত্যাশা করেনি তাদের দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে। সিট ইনজেক্টের মাধ্যমে বেঁচে থাকার যেটুকু আশার প্রদীপ নিভু নিভু করে জ্বলছিল, তাতে পানি ঢেলে দিয়ে পরের দিন পাওয়া গেল দুজনের লাশ। তাদের দুজনের লাশের এতটাই বিকৃতি ঘটেছিল যে কোনটি গ্যাগারিনের বা সেরিয়োগিনের লাশ তা চিহ্নিত করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছিল সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের।

ইউরি গ্যাগারিন, সেই বিখ্যাত রাশিয়ান ব্যক্তি যিনি বিশ্বের প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথে ভ্রমণ করেছেন, পেয়েছেন পৃথিবীর ‘প্রথম মহাকাশচারী’র খেতাব। স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে আমেরিকার আগেই সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে মহাশূন্যে পা রেখে জানান দিয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার। ইউরোপের দেশগুলো এবং মার্কিন প্রশাসনের জন্য ইউরি গ্যাগারিনের মহাশূন্যে পা রাখাটা বিব্রতকর হলেও আমেরিকার শান্তিপ্রিয় মানুষ সসম্মানে তার অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তার সাথে লাঞ্চ করেছেন, মিশরের প্রেসিডেন্ট কায়রো ও আলেক্সান্দ্রিয়া শহরের সোনার চাবি তুলে দিয়েছেন তার হাতে, কিউবার বিখ্যাত বিপ্লবী রাষ্ট্রনেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো তাকে বুকে টেনে নিয়েছেন। সেই ইউরি গ্যাগারিনের শেষটা হয়েছিল এমন মর্মান্তিক!

গশহশহচহচ
মহাকাশ জয় করার পর যেখানেই গিয়েছেন, রাজকীয় সংবর্ধনা পেয়েছেন; image source: back-in-ussr.com

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, তা বিস্তৃত হয়েছিল দুই দেশের বিজ্ঞানীদের মাঝেও। সামরিক প্রযুক্তির পাশাপাশি পৃথিবীর ব্যপ্তি ছাড়িয়ে মহাশূন্যে যাবার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে দুই দেশ। অর্থনৈতিকভাবে যদিও আমেরিকার নের্তৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক এগিয়ে ছিল, তারপরও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বিনির্মাণে সোভিয়েত রাশিয়া কোনো কার্পণ্য করেনি। এরই প্রমাণ পাওয়া যায় যখন পুরো পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে সোভিয়েত পাইলট ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথ ভ্রমণ করেন। পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নে তাকে বীর হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। সে সময় রাশিয়ার এমন কোনো তরুণ ছিল না, যে গ্যাগারিনের নাম জানতো না।

গ্যাগারিনের মৃত্যুর পর তার প্লেন দুর্ঘটনার কারণ বের করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২৯ ভলিউমের একটি বিশাল রিপোর্ট সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করে। কিন্তু রিপোর্টটি ‘সোভিয়েত স্বার্থে’ পুরোপুরি ক্লাসিফাইড করে রাখা হয়। ২০১১ সালে গ্যাগারিনের মহাশূন্যে ভ্রমণের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সেই তদন্ত রিপোর্টের কিছু অংশ ডিক্লাসিফাইড করা হয়। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উড়ন্ত কিছুর (আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করার বেলুন কিংবা সুখোই ফাইটার জেট, যেটি সেদিন ওড়ানো হয়েছিল) সাথে সংঘর্ষ থেকে বাঁচার জন্য পাইলট ইউরি গ্যাগারিন ও তার ইন্সট্রাক্টর ভ্লাদিমির সেরিয়োগিন মিগ-১৫ ফাইটার জেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভূপাতিত হন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সোভিয়েত সামরিক বিশেষজ্ঞদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

ময়ময়ময়হয়ন
মিগ-১৫ যুদ্ধবিমানের ককপিটে গ্যাগারিন অসংখ্যবার বসেছেন; image source: space.com

যেহেতু ইউরি গ্যাগারিনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি, তাই বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উদ্ভব হয়। কেউ কেউ দাবি করেন, সম্ভবত গ্যাগারিন মদ্যপ অবস্থায় ককপিটে বসেছিলেন। ফলে একটা সময়ে গিয়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, মিগ-১৫ ফাইটার জেট ভূপাতিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল সংখ্যক মানুষ এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।

আরেক দল মানুষ মনে করতেন, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা গ্যাগারিন ও তার ইন্সট্রাক্টর সেরিয়োগিনকে অজান্তেই বিষাক্ত নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করেছিল। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীরা মনে করতেন, গ্যাগারিনের মহাশূন্য ভ্রমণ ছিল পুরোপুরি নিকিতা ক্রুশ্চেভের সাফল্য। তাই পরবর্তীতে যখন ব্রেজনেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসন ক্ষমতা হাতে নেন, তখন স্বাভাবিকভাবে পূর্বসূরীর সাফল্যের মূল কারিগরকে সুনজরে দেখেননি। এ কারণে রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়। এই তত্ত্বের পেছনেও কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই।

এছাড়াও এলিয়েনদের স্পেসশিপের সাথে ধাক্কা খাওয়া, নিচে হরিণের ছবি তুলতে বা হরিণ দেখতে ব্যস্ত থাকায় গ্যাগারিনরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন- এরকম উদ্ভট ষড়যন্ত্র তত্ত্বও হাজির হয়, যেগুলোর কোনো ভিত্তি ছিল না, স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না। তাই এসব তত্ত্ব বেশিদিন ধোপেও টেকেনি।

গ্যাগারিনরা যেদিন দুর্ঘটনা ঘটান, সেদিন বাস্তবেই সুখোই সিরিজের একটি ফাইটার জেটের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের কথা ছিল। আর গ্যাগারিনদের মিগ-১৫ ফাইটার জেটের ওড়ানোর সময়সূচির সাথে সেই সুখোই সিরিজের প্লেনের মিল ছিল। সম্ভবত আবহাওয়া মেঘলা হওয়ার কারণে সুখোই সিরিজের ফাইটার জেট গ্যাগারিনদের ফাইটার জেটের খুব কাছাকাছি চলে আসে। এ কারণে গ্যাগারিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটিতে থাকা একজন ব্যক্তি একটি ইন্টারভিউয়ে এই বিস্ফোরক তথ্য দেন। মোটামুটি এই কারণটিই সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

গ্যাগারিনের মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতীয় স্বার্থের জন্য কিছুটা ক্ষতিকর হতো। কারণ আমেরিকা ও তার মিত্র পুঁজিবাদী দেশগুলো তখন প্রতিটা মুহূর্তে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতে সিদ্ধহস্ত ছিল। ইউরি গ্যাগারিনের মতো একজন বিখ্যাত মানুষের মৃত্যুর জন্য সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা সামনে এলে আমেরিকা সেটার সর্বোচ্চ ফায়দা লুটতো, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সব মিলিয়ে গ্যাগারিনের মৃত্যু আজও রহস্যময় একটি বিষয় হয়ে আছে।

Related Articles

Exit mobile version