খানুয়ার যুদ্ধ: মুঘল বনাম রাজপুত সংঘাত

দিল্লির অধিপতি সম্রাট বাবর অস্থির চিত্তে পায়চারী করছেন। কোনো কিছুতেই তিনি ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারছেন না। সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাকে, কিন্তু সে তুলনায় রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে না। একে তো প্রচণ্ড গরম, তার উপর আবার মশার উপদ্রব। হিন্দুস্তান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখলেও হিন্দুস্তানের এই আবহাওয়া তার মোটেও ভালো লাগছে না। তিনি মধ্য এশিয়ার ঠাণ্ডা অঞ্চলের মানুষ, হিন্দুস্তানের এই আবহাওয়া তার কাছে একেবারেই নতুন এবং বিরক্তিকর লাগছে।

তবে যা-ই হোক, সম্রাট বাবরের শান্তি ভঙ্গের কারণ এই সামান্য মশা আর হিন্দুস্তানের উষ্ণ আবহাওয়া না। তিনি তার আর তার স্থাপিত নতুন মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। প্রায় এক বছর হতে চললো তিনি হিন্দুস্তানে অবস্থান করছেন। কিন্তু এ সময়ের মাঝে দিল্লি আর আগ্রা বাদে অর্জন বলতে তেমন কিছুই হয়নি। হিন্দুস্তানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তার কাছে নিয়মিত গোয়েন্দা রিপোর্ট আসছে। রিপোর্টগুলোও খুব একটা সুবিধার না।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে আফগান লোদি রাজবংশের পতন ঘটলেও আফগানরা মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে হিন্দুস্তানের পূর্বাঞ্চলে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আলোয়ারের হাসান খান মেওয়াটি, বায়ানার নিজাম খান, সম্ভলের কাসিম সম্ভলি আর গোয়ালিয়রের তাতার খান নিজ নিজ দুর্গে গিয়ে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। হিন্দুস্তানের অন্যান্য আফগান আমিররাও বাবরকে অস্বীকার করেছে। তারা বিহার খানের পুত্রকে সুলতান মাহমুদ উপাধি দিয়ে সিংহাসনে বসিয়েছে। নিসার খান লোহানি, মারুফ ফারমুলকসহ বেশ কিছু শক্তিশালী আফগান আমিরদের সহযোগীতায় সুলতান মাহমুদ ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। তবে এখনো সুলতান মাহমুদ বাবরের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেননি। কিন্তু এভাবে চলতে দিলে শীঘ্রই সুলতান মাহমুদ বাবরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে, মারগুব নামে ইব্রাহীম লোদির এক অনুগত ক্রীতদাস আগ্রা থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে মাহাবানে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে বাবরকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তবে আশার কথা, নিসার খান লোহানী আর মারুফ ফারমুলকের মতো কিছু শক্তিশালী আমির আবারো বাবরের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। বিদ্রোহী আমির আর সর্দারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ছোট ছোট অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ফিরোজ খান, শেখ কররানি, তাতার খানসহ বেশ কিছু বিদ্রোহী নেতা বাবরের কাছে আত্মসমর্পন করেছে। আত্মসমর্পণকারী সব নেতাই নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী জায়গীর পাচ্ছেন।

বাবর জানেন, কিছুটা সময় দিলে এই আত্মসমর্পণের পরিমাণ আরো বাড়বে। তবে একইসাথে সেনা অভিযানও অব্যহত আছে। বাবর হুমায়ুনের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী সম্ভলের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হুমায়ুন সম্ভলের কাসিম সম্ভলিকে বন্দী করে সম্ভলের শাসনভার বুঝে নেন। বায়ানার দিকে বাবর আরেকটি সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন। তারা বায়ানা অবরোধ করে বসে আছে।

নতুন করে এক সমস্যা উদ্ভব হয়েছে বাবরের নিজ সেনাবাহিনীতেই। ইস্পাতসম মুঘল সেনাবাহিনী হিন্দুস্তানের বৈরী আবহাওয়ায় বাবরের মতোই নিজেদের একেবারেই মানিয়ে নিতে পারছে না। বাবরের যোদ্ধারা ঠাণ্ডা তুষারাবৃত অঞ্চলে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত। হিন্দুস্তানের প্রচণ্ড গরম আর মশার উপদ্রবে তারা ভীষণ অতিষ্ঠ। তাছাড়া বাবরের মতোই হিন্দুস্তান মুঘল সেনাবাহিনীর কাছে তেমন ভালোও লাগেনি। এখানের বেশিরভাগ জায়গাই ধু ধু মরুভূমি ধরনের। হিন্দুস্তানের খাবারেও তারা অভ্যস্ত হতে পারছে না। আর তাই হিন্দুস্তানে দীর্ঘসময় অবস্থান না করে দ্রুত হিন্দুস্তান ত্যাগেই বেশি আগ্রহী তারা। বাবরের জেনারেলরা বাবরকে তাদের হিন্দুস্তান ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানাতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু তাদের হাবভাব দেখে বাবর যা বোঝার তা ঠিকই বুঝে নিয়েছেন। বাবর নিজেও জানতেন তার হিন্দুস্তান অভিযান মোটেও সহজ হবে না। চারদিক থেকে নানান সমস্যা তাকে ঘিরে ধরছে। এসব সমস্যা অবশ্যই তাকে সামাল দিতে হবে। তা না হলে হিন্দুস্তান যেভাবে খুব সহজেই তার হাতে ধরা দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই খুব সহজেই তার হাত থেকে ফসকে বেরিয়েও যাবে।

বাবর এতসব ঝামেলা নিয়েও অবশ্য খুব বেশি চিন্তিত নন। এসব সমস্যার সমাধান খুব সহজ না হলেও খুব একটা কঠিন না। কিন্তু বাবরের শান্তি কেড়ে নিয়েছে মেওয়াটের মুসলিম রাজপুত রাজা হাসান খান আর মেবারের হিন্দু রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহ। মেওয়াটের এই রাজপুতরা মুসলিম হলেও মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। এমনকি হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও তারা পালন করতো। তবে হিন্দুস্তানের অন্যান্য মুসলিমদের উপরেও রাজা হাসান খানের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। আর রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহকে তো বাবর শুরু থেকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এর অবশ্য যথাযথ কারণও ছিল।

হিন্দুস্তান ভূখণ্ডের অভ্যন্তর থেকে বাবরকে হিন্দুস্তান আক্রমণে আমন্ত্রণ জানানো ব্যক্তিদের মাঝে রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহও ছিলেন। হিন্দুস্তানে ইব্রাহীম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের আক্রমণ শুরু হলে তিনি ভেতর থেকে বাবরকে সহায়তা করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। চুক্তিটি এরকম ছিল- বাবর আর ইব্রাহীম লোদির মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে রানা সংগ্রাম সিংহ আগ্রা আক্রমণ করে ইব্রাহীম লোদিকে উভমুখী চাপে ফেলবেন। বিনিময়ে যুদ্ধের পর এই রাজপুত রানা সংগ্রাম সিংহ পাবেন কালপি, বায়ানা আর ধোলপুর।

তবে রানা সংগ্রাম সিংহ ভেবেছিলেন বাবর হিন্দুস্তান আক্রমণ করে দস্যুদের মতো কিছু সম্পদ কুক্ষিগত করে কাবুল ফিরে যাবেন। ইব্রাহীম লোদির নেতৃত্বে লোদি সাম্রাজ্য বাবরের সাথে যুদ্ধে জয়ী হোক বা পরাজিত হোক, যুদ্ধে অবশ্যই তাদের শক্তি হ্রাস পাবে। আর তখন এই দুর্বল লোদি সাম্রাজ্যের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি হিন্দুস্তানের ভূখণ্ডগুলো দখল করে নেবেন। কিন্তু তিনি যখন বাবরের মনোভাব বুঝতে পারলেন, তখন তিনি তার প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে আসেন। এমনকি তার মত পরিবর্তনের কথা বাবরকে জানাননি পর্যন্ত। পানিপথের যুদ্ধে জয়ের পর বাবর এই খবর পান। বাবর রানা সংগ্রাম সিংহকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাকে প্রতিশ্রুত ভূখণ্ড প্রদান থেকে বিরত থাকেন।

রাজপুতরা সে সময় মূলত হিন্দুস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমের ভূখণ্ডগুলো শাসন করতো। বর্তমান রাজস্থান নামে পরিচিত এ এলাকাটি তখন রাজপুতানা নামে পরিচিত ছিল। উত্তর হিন্দুস্তানের কিছু ভূখণ্ডও তাদের দখলে ছিল। তবে রাজপুতরা কোনো একক কমান্ডের অধীনে ছিল না। বরং অনেকগুলো ছোট ছোট রাজপুত রাজ্য মিলে একটি কনফেডারেশন গঠন করেছিল, যার নেতৃত্ব ছিল রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহের অধীনে। রানার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিচ্ছিন্ন হিন্দুস্তানের ভূখণ্ডগুলোকে এক করে রাজপুত পতাকার নিচে নিয়ে আসা। আর রানার এই পরিকল্পনার বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছিলেন স্বয়ং মুঘল সম্রাট বাবর। তাই পানিপথের যুদ্ধে বাবরের বিজয়ের পর রানা সংগ্রাম সিংহ সম্রাট বাবরকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজপুতরা সিকান্দার লোদির তৃতীয় পুত্র মাহমুদ লোদিকে ‘বাদশাহ’ খেতাব দিয়ে সিংহাসনে বসায়। আপাতত তাকে সামনে রেখেই বাবরকে পরাস্ত করা যাক। পরে মাহমুদ লোদির ব্যবস্থাও করা যাবে! মাহমুদ লোদিকে সিংহাসনে বসানো রাজপুতদের দূরদর্শী এক কূটনৈতিক চাল ছিল।

ইতোমধ্যে রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহের নেতৃত্বাধীন রাজপুত বাহিনী বায়ানার সীমান্তে তাণ্ডব চালিয়ে ফতেহপুর গিয়ে পৌঁছায়। তারা বেশ কিছু মুঘল শহরে লুটপাট চালায়। অসংখ্য মসজিদে অগ্নিসংযোগ করে, মসজিদের ইমামদের হত্য করে। নারী এবং শিশুদের সাথেও অশোভন আচরণ করা হয়। বাবর বুঝতে পারেন, এবার যুদ্ধ আসন্ন। এ সময় বাবরের পুত্র মির্জা হুমায়ুন জৈনপুরে অবস্থান করছিলেন। বাবর দ্রুতগতিতে হুমায়ুনকে তার কাছে চলে আসার নির্দেশ দিয়ে পত্র পাঠান। হুমায়ুন জুনায়েদ মির্জার কাছে জৈনপুরের দায়িত্ব দিয়ে ১৫২৭ সালের ৬ জানুয়ারী পিতার সাথে যোগ দেন।

পানিপথের প্রান্তরে ইব্রাহীম লোদিকে খুব সহজে পরাজিত করা গিয়েছিল। কিন্তু এবার যুদ্ধবাজ রাজপুতদের ক্ষেত্রে ব্যপারটা আর তেমন হচ্ছে না, বাবর এটা বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তিনি মন্ত্রণাসভার আয়োজন করেন। বাবরের আমিররা বিভিন্ন অভ্যন্তরীন সমস্যা আর রাজপুত সেনাবাহিনীর বিশাল আকার বিবেচনা করে যেভাবেই হোক এই মুহূর্তে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা আগ্রা দুর্গের নিরাপত্তায় যথেষ্ট পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন করে রেখে বাবরকে পাঞ্জাবে অবস্থানের পরামর্শ দিচ্ছেন। এর ভেতরে মুঘল সেনাবাহিনী আগ্রায় শক্তি বৃদ্ধি করবে আর বাবর পাঞ্জাবে। পরিস্থিতি অনুকূলে আসলে রাজপুতদের সমস্যা মেটানো যাবে। বাবর তার জেনারেলদের কথা খুব মনোযোগের সাথে শুনলেন, কিন্তু তাদের মত অনুযায়ী কাজ করলেন না। তিনি জানেন, রাজপুতদের সাথে তার এই যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী এবং তা দ্রুতই এগিয়ে আসছে। আজ হোক বা কাল, রাজপুতদের সাথে লড়াইয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হবেই। এই যুদ্ধ এড়ানোর কোনো উপায়ই নেই।

রাজপুতরা মুঘল সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের উপর নির্ভর করে হিন্দুদের সমর্থন আদায় করছে। আর এদিকে মুঘল সেনাবাহিনী হিন্দুস্তান ত্যাগেই বেশি উৎসাহী। এই পরিস্থিতিতে বাবরের পশ্চাদপসরণের অর্থ হচ্ছে নিজ ধর্ম আর ধর্মের সম্মানকে জলাঞ্জলী দেয়া। বাবর ভাবলেন মুঘল সেনাবাহিনীকেও ধর্মীয় চেতনায় উজ্জীবিত করে তাদের হারানো মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে। হিন্দুস্তান কাদের? মুঘলদের নাকি রাজপুতদের? খুব শীঘ্রই এই প্রশ্নের অবসান করা জরুরী।

বাবরের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট এসে পৌঁছেছে, রাজপুতরা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে রণথম্বোর থেকে এগিয়ে এসে ফতেহপুরের দিকে সমবেত হচ্ছে। আর হিন্দুস্তানের অধিকাংশ হিন্দু রাজপুত রাজারা রানা সংগ্রাম সিংহকে সহায়তা প্রদান করছেন। আম্বার, মারওয়ার, রামপুরা, গড়গাঁও, চান্দেরি, বুন্দি, রায়সিন, সিক্রি, আজমিরসহ অন্যান্য হিন্দু শাসনাধীন অঞ্চল থেকে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ও সেনাসাহায্য পাচ্ছেন রাজা সংগ্রাম সিংহ।

এছাড়াও, রাজপুত রাজা সিহলাদি ৩০ হাজার, চান্দেরির মেদিনী রাও ১০ হাজার, সুলতান মাহমুদ লোদি ১০ হাজার সৈন্য দিয়ে সংগ্রাম সিংহকে সহায়তা করেছিলেন। সম্রাট বাবরের বিরুদ্ধে রাজপুত রাজা সংগ্রাম সিংহকে প্রায় ১২ হাজার সৈন্য দিয়ে সহায়তা করেছিল মুসলিম রাজপুত রাজা হাসান খান মেওয়াটি। মুসলিম হওয়ায় বাবরের ধারণা ছিল হাসান খান মেওয়াটিকে রাজপুত বাহিনী থেকে আলাদা করে ফেলা সম্ভব হবে। তিনি পানিপথের যুদ্ধে বন্দী হওয়া হাসান খান মেওয়াটির পুত্র নাহার খানকে বিনা শর্তে সসম্মানে মুক্তি দেন। বাবরের ধারণা ছিল পুত্র মুক্তির ফলে হাসান খান কৃতজ্ঞ হয়ে বাবরের বিরুদ্ধে রাজপুত বাহিনীর পক্ষের সেনা সাহায্য স্থগিত করবে। কিন্তু বাবরের এই ধারণাটি সত্য হয়নি। হাসান খান মেওয়াটি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহের সাথেই অবস্থান করে।

রাজপুত রাজা রানা সংগ্রাম সিংহ; Source: eternalmewarblog.com

রাজপুতরা বেশ ভালোভাবেই জানতো ইব্রাহীম লোদির বিরুদ্ধে পানিপথের যুদ্ধে মুঘল সেনাবাহিনী বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাছাড়া মুঘল সেনারা হিন্দুস্তানে থাকার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছে। সুতরাং, মুঘলদের উপরে আঘাত হানার এটাই উপযুক্ত সময়। রাজপুতরা তাদের জয়ের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিল। কারণ, ইতোপূর্বেই তারা ইব্রাহীম লোদির সাথে যুদ্ধ করে লোদি সালতানাতের বেশ কিছু ভূখণ্ড নিজেদের হস্তগত করতে পেরেছিল। রাজপুতরা লোদি সেনাবাহিনী আর মুঘল সেনাবাহিনীকে একই পাল্লা দিয়ে মেপে হিসাব করছিল। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, তারা মুঘল সেনাবাহিনীর শক্তিমত্তা সম্পর্কে সঠিক ধারণাটুকু পর্যন্ত করতে পারেনি। ‘দ্য গ্রেট মোগল’ বই থেকে ভিনসেন্ট এ স্মিথ-এর একটি উক্তি থেকেই এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি বলেছেন,

‘কয়েক বছর পর (পানিপথের প্রথম যুদ্ধের) তিনি (গুজরাটের বাহাদুর শাহ- সম্রাট হুমায়ুনের প্রতিপক্ষ) মুঘলদের সাথে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি হিন্দুস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে মুঘল সেনাবাহিনীর তুলনা করে বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুঘলরা হলো পাথরের মতো শক্ত আর হিন্দুস্তানিরা হলো কাঁচের মতো ভঙ্গুর। আর তাই এই দুই পক্ষের মধ্যকার যে কোনো লড়াইয়ে হিন্দুস্তানিরাই পরাজিত হবে।’

বাস্তবেও কিন্তু তা-ই হয়েছিল।

১১ ফেব্রুয়ারী, ১৫২৭ সাল। বাবর তার সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রা থেকে রানা সংঘের অবস্থানের দিকে অগ্রযাত্রা করেন। রাজপুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য কিছু আফগান আমির আর হিন্দুস্তানি মিত্র বাবরের সাথে যোগ দেন। কিন্তু বাবর তাদের উপর ঠিক নির্ভর করতে পারেননি। বাবর তার নিজের সেনাবাহিনীর সামর্থের উপরেই আস্থাশীল ছিলেন বেশি।

ইতোমধ্যেই রাজপুত বাহিনী খানুয়ার প্রান্তরের কাছাকাছি পৌছে গেছে। খানুয়ার প্রান্তরে কিছু পানির উৎস ছিল। এই উৎসগুলো রাজপুতরা দখল করে নিলে মুঘল সেনাবাহিনী বেশ অসুবিধাতেই পড়ে যাবে। তাই বাবর খানুয়ার আশেপাশের জায়গাগুলো দ্রুত দখল করে নিলেন। এর ভেতরেই আগ্রার কাছাকাছি বায়ানা দুর্গ দখলে মুঘল আর রাজপুত সেনাবাহিনী ছোটখাট সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছিল। এসময়েই মুঘল সেনাবাহিনী অনুধাবন করতে পারে রাজপুতরা হিন্দুস্তানের অন্যান্য সেনাবাহিনীগুলোর মতো দুর্বল আর ভীতু না। রাজপুতরা লড়াই করে জীবন বাজী রেখে। যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুই তাদের কাছে অধীক শ্রেয়। বিশেষত মুঘল সেনারা রাজপুত সেনাবাহিনীর দক্ষতা টের পায় যখন মাধাকুরের কাছে প্রায় দেড় হাজারের একটি মুঘল বাহিনী রাজপুতদের কাছে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। রাজপুতরা প্রায় ৪/৫ হাজার সৈন্য নিয়ে হঠাৎ করেই এই ক্ষুদ্র বাহিনীটির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুঘল সেনাবাহিনীর এই ক্ষুদ্র ইউনিটটির অধিকাংশ যোদ্ধাই হয় নিহত হয়েছিলেন, নয়তো বন্দী হয়েছিলেন।

রাজপুত সেনাবাহিনীর আকার ছিল আক্ষরিক অর্থেই বিশাল। এর পূর্বে মুঘল সেনাবাহিনী এত বড় কোনো বাহিনীর মোকাবেল করেনি। বিশেষত, এমন যোদ্ধাদের সাথে, যারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে বলেই যুদ্ধ করে। রাজপুত বাহিনীর তুলনায় আকারে মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ হওয়ায় মুঘল সেনারা চূড়ান্ত রকমের দোটানায় পড়ে যায়। সম্রাট বাবর তার সেনাবাহিনীর এই মনোভাব বুঝতে পারেন। মুঘল সেনাবাহিনীর এই ক্রান্তিলগ্নে তাই তিনি তার সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে একটি আবেগময় ভাষণ দেন। বাবরেরই কন্যা গুলবদন বেগমের ‘হুমায়ুননামা’ গ্রন্থে বাবরের এই ভাষণটি উল্লেখ করা আছে এভাবে,

“তিনি (সম্রাট বাবর) বুঝতে পারলেন এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনা দরকার। তাই তিনি যে সকল আমির-ওমরাহ, অভিজাত, খান, সুলতান তাকে ছেড়ে যাননি, তিনি তাদের ঐক্যবদ্ধ করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, আপনারা জানেন আমাদের পিতৃভূমি এবং পারিবারিক শহর এখান থেকে মাসাধিককালের পথ। এ যুদ্ধে যদি আমরা হেরে যাই, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে? আল্লাহপাক যদি আমাদের এ বিপদ থেকে বাঁচিয়েও দেন, তাহলে এরপর আমরা কোথায় যাবো? আমাদের জন্মভূমি কোথায়? আমাদের শহর কোথায়? স্থানীয়দের মাঝে আমরা আগুন্তক বা বিদেশি ছাড়া আর কিছু নই। তাই এই বিপদাপন্ন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। এক, আমাদের শপথ নিতে হবে। আর দুই, একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। যদি আমরা জিতে যাই তো গাজি হব। আর, মৃত্যুবরণ করলে শহীদের সম্মান পাবো। এ দুটি পথই আমাদের নৈতিক শক্তি যোগাবে। আমরা সেই শক্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারবো।”

সম্রাট বাবর তার বাহিনীর যোদ্ধাদের সাথে খুবই আন্তরিক আচরণ করতেন, তাদের সাথে রাজকীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে অযথা দূরত্ব তৈরি করতেন না; Source: weaponsandwarfare.com

নিজেদের সম্রাটের এই হৃদয়স্পর্শী ভাষণ শুনে মুঘল সেনাবাহিনী বিরাট রাজপুত বাহিনীর প্রতি ভয়কে দূরে ছুড়ে ফেলেন। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, সম্রাটকে ফেলে তারা তাদের জীবন নিয়ে পালিয়ে যাবে না বলে কথা দেয়। বাবর তার সেনাদের পরিবর্তিত মনোভাব দেখে আরেকটি ঘোষণা দেন। যুদ্ধের পর সব যোদ্ধাদেরই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য ছুটি দেয়া হবে। বাবর জানতেন, এই ঘোষণার ফলে তারা অবশ্যই জীবন বাজি রেখে লড়াই করবেন। ১২ মার্চ, ১৫২৭ সাল। বাবর রাজপুত সেনাবাহিনীর অবস্থান থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে এসে অবস্থান গ্রহণ করেন।

১৫২৭ সালের ১৫ মার্চ রাতে আরেকটি ঘটনা ঘটে। এ রাতে সুলতান হোসেন মির্জার নাতি কাসিম হুসাইন বাবরের সেনা অবস্থান থেকে ১০ ক্রোশ দূরে অবস্থান করে বাবরের নিকট একটি বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তায় তিনি জানান, রানা সংগ্রাম সিংহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাবরকে সহায়তা করতে তিনি ৫০০-এর কিছু বেশি যোদ্ধা নিয়ে খোরাসান থেকে হিন্দুস্তানে এসেছেন। বাবর এই পত্র পেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন। তবে বাবর এক্ষেত্রেও একটি সূক্ষ্ম চাল চাললেন। তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে প্রায় ১০০০ মুঘল সৈন্য কাসিম হুসাইনের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। আর পত্রে কাসিম হুসাইনকে জানালেন, বাবরের পাঠানো এই ১০০০ সৈন্যসহ তিনি তার সাথে আনা সৈন্যদের নিয়ে যেন পরেরদিন সকালে বাবরের মূল সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হন।

বাবরের এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুবাহিনীকে বিভ্রান্ত করা। কারণ, পরেরদিন সকালে এই বাহিনীটি যখন বাবরের বাহিনীর কাছাকাছি আসবে, তখন শত্রুবাহিনীর মাঝে এই ধারণা জন্মাবে যে, বাবরের সাহায্যে আরো নতুন নতুন সেনাদল এসে পৌঁছাচ্ছে!

১৬ মার্চ, ১৫২৭ সাল। বাবর পাঁচগুণ ছোট একটি বাহিনী নিয়ে আগ্রার ৬০ মাইল পশ্চিমে খানুয়ার প্রান্তরে যুদ্ধবাজ রাজপুতদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। একমনে তিনি আল্লাহকে ডাকছেন। এই যুদ্ধে জয়ী হলে হিন্দুস্তানের অন্য যেকোনো সেনাবাহিনী পাথরের মতো দৃঢ় মুঘল সেনাবাহিনীর সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। কিন্তু পরাজিত হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। বাবরের সাথে মাত্র ২৫ হাজার সেনা। এই ২৫ হাজার সৈন্য দিয়েই তাকে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টাতে হবে।

খানুয়ার প্রান্তরে অবস্থা নিয়ে পানিপথের যুদ্ধের মতোই বাবর একটি পরিখা খনন করান, যেন শত্রু সৈন্যরা সহজেই মূল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঢুকে যেতে না পারে। অটোমান রীতিতে পরিখার পেছনে থাকে শিকল দিয়ে বাঁধা গরু আর ঘোড়ার গাড়ির প্রাচীর। প্রাচীরের মাঝে রিজার্ভ সেনাদের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখা হয়। আর গাড়ির প্রাচীরের আড়ালে মোতায়েন করা হয় তীরন্দাজ, ম্যাচলকধারী সেনাদের, আর কিছু কামান।

পানিপথের যুদ্ধে বাবর আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, কিন্তু খানুয়ার যুদ্ধে শত্রুদের তুলনায় সৈন্য স্বল্পতার জন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন। তবে সৈন্যবিন্যাস পানিপথের যুদ্ধের মতোই ছিল। মূল বাহিনীকে তিনি তিন ভাগে ভাগ করেন। মধ্যভাগ, ডানবাহু আর বামবাহু। মধ্যভাগে বাবর নিজে অবস্থান নিয়েছিলেন। বাবরকে সহায়তা করছিলেন তার চাচাতো ভাই তিমুর খান। ডানবাহুর দায়িত্ব ছিল মীর্জা হুমায়ুন, কাশিম খান, হিন্দাল মির্জা আর খসরু শাহ কোকুলতাশের উপর। আর বামবাহুর দায়িত্ব ছিল সৈয়দ মেহেদী খাজা, জামান মির্জা, মীর আবদুল আজিজ আর মীর মুহাম্মদ আলী খানের উপর। সেনাবাহিনীর এই অংশে মুঘল যোদ্ধারা ছাড়াও হিন্দুস্তানে বাবরের মিত্রদের পাঠানো যোদ্ধারাও অবস্থান করছিলেন। মধ্যভাগের অবস্থানের ঠিক সামনে অবস্থান নেয় ওস্তাদ আলী কুলী খানের নেতৃত্বাধীন মুঘল আর্টিলারী বাহিনী। ম্যাচলকবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন অটোমান কমান্ডার মোস্তফা রুমি।

সেনাবাহিনীর অবস্থানের দুইপাশ আর পশ্চাৎভাগ নিরাপদ রাখার জন্য শক্তিশালী অশ্বারোহী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। আর মূল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যুদ্ধ এড়িয়ে শত্রু বাহিনীর অবস্থানের পেছন আর পার্শ্বদেশ আক্রমণের জন্য দুটি আলাদা বাহিনী মূল সেনাবাহিনীর দুই পাশে রাখা হয়েছিল। এই বাহিনী পূর্বের মতোই ‘তুগুলামা’ কৌশলে পারদর্শী ছিল।

অন্যদিকে রানা সংগ্রাম সিংহের অধীনে ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের বিশাল এক সেনাবাহিনী। এছাড়াও রাজপুত বাহিনীর নিকট প্রায় ১ হাজার হাতির সমন্বয়ে তৈরি একটি বিরাট হস্তীবাহিনী ছিল। রাজপুত বাহিনীর কমান্ডারদের বেশিরভাগই ছিলেন রাজপুত রাজারা। এই বাহিনীতে সংগ্রাম সিংহের পক্ষে রাজপুতদের থেকে যোগ দিয়েছিলেন ৭ জন রাজা, ৯ জন রাও আর মোট ১০৪ জন রাওয়াল ও রাওয়াট।

প্রবল আত্মবিশ্বাস থাকায় রানা সংগ্রাম সিংহই প্রথম আক্রমণের সূচনা করেন। তিনি মুঘল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথমে হস্তিবাহিনীকে প্রেরণ করেন। হস্তীবাহিনী এগিয়ে আসলে মুঘল কামানগুলোও গোলাবর্ষণ শুরু করে দেয়। কামানের গোলা আর গর্জনে ভীত হস্তিবাহিনী যুদ্ধবিন্যাস ছেড়ে দিয়ে চারিদিকে ছোটাছুটি করতে থাকে। ফলে হাতির পায়ের নিচে চাপা পড়ে রাজপুত সৈন্যরাই গণহারে মারা যেতে থাকে।

খানুয়ার যুদ্ধ। বামে রাজপুত সেনাবাহিনী, আর ডানে মুঘল সেনাবাহিনী; Source: Wikimedia Commons

হস্তীবাহিনী ব্যর্থ হলে রাজপুত অশ্বারোহীরা মুঘল সেনাবাহিনীর বাম আর মধ্যভাগে তীব্র আক্রমণ চালায়। ম্যাচলকবাহিনী আর কামানের সহায়তায় তাদের প্রতিরোধ করা হয়। কিন্তু দুইপার্শ্বে নিয়োজিত বিশেষ মুঘল বাহিনী, যাদের দায়িত্ব ছিল মূল যুদ্ধ এড়িয়ে পেছন থেকে রাজপুত বাহিনীকে ঘিরে ধরবে, রাজপুত অবস্থানের পেছন থেকে আক্রমণ চালালে রাজপুত অশ্বারোহীরা তাদের প্রতিরোধ করে। কোনভাবেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে না পেরে বাবর কৌশল পরিবর্তন করে সবগুলো ইউনিট নিয়ে একযোগে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। কামানগুলো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজপুত বাহিনীর উপর টানা গোলাবর্ষণ করা হয়। রিজার্ভ পদাতিক আর অশ্বারোহীদের মধ্যভাগের ডান আর বামপাশ থেকে আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

মুঘল সেনাবাহিনীর এই পরিবর্তিত আচরণে রাজপুতরা হতবাক হয়ে যায়। অন্যদিকে ‘তুগুলামা’ কৌশলের ফাঁদে পরে বিপুল সংখ্যক রাজপুত সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু রাজপুতরা অবশ্য তাতেও দমে যায়নি। তারাও একযোগে মুঘল বাহিনীর মধ্যভাগে আক্রমণ চালায়, কিন্তু বাবরের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের সামনে কোনোভাবেই রাজপুতরা সুবিধা করতে পারে না। সারাদিনব্যাপী যুদ্ধ চলতে থাকে। বিকালের দিকেই রাজপুত বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা কমে যায়, আর সন্ধ্যার দিকেই তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। বিক্ষিপ্ত রাজপুত সৈন্যরা আবার যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালাতে না পারে, সেজন্য মুঘল সৈন্যরা তাদের ৩/৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ধাওয়া করে। পরাজয়ের ঠিক কিছুক্ষণ আগে রাজপুত রানা সংগ্রাম সিংহ আহত হন। তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।

এই যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ তার বহু বিশ্বস্ত মিত্রকে হারান। রাজা রায়মহল রাঠোর, উদয় সিংহ, রতন সিংহসহ রানা সংগ্রাম সিংহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এ যুদ্ধে মারা যায়। মেওয়াটের মুসলিম রাজা হাসান খানও এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।

১০

খানুয়ার যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে রাশব্রুক উইলিয়াম মন্তব্য করেছিলেন,

“বিগত বছরগুলোতে (খানুয়ার যুদ্ধের পূর্বে) মুসলিমদের মনে রাজপুতদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে যে ভীতি সঞ্চার হয়েছিল, সেই ভীতি চিরদিনের জন্য দূর হয়ে যায় (যেহেতু, খানুয়ার প্রান্তরে মুঘল বনাম রাজপুত সেনাবাহিনীর অনুপাত ছিল ১:৫। অর্থাৎ, মুঘল সেনাবাহিনী চাইলেই খুব সহজে রাজপুত শক্তিকে পরাজিত করতে সক্ষম।)। একটি একক বিশাল পরাজয়ে শক্তিশালী রাজপুত কনফেডারেসি ভেঙ্গে পড়ে। এই যুদ্ধের পর থেকেই এ কনফেডারেসি হিন্দুস্তানের রাজনীতিতে একক আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর এ যুদ্ধের পরই হিন্দুস্তানে মুঘল সাম্রাজ্য দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দুস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো বাবরের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর এ যুদ্ধের পরই বাবরের শক্তিকেন্দ্র কাবুল থেকে হিন্দুস্তানে স্থানান্তরিত হয়।”

খানুয়ার যুদ্ধে জয়লাভ করে সম্রাট বাবর গাজি উপাধি গ্রহণ করলেন। আর খানুয়ার প্রান্তরে বিজয় লাভ করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বাবর খানুয়ার নাম রাখলেন শুকরি। এই শুকরিই পরবর্তীতে রূপ নেয় ফতেহপুর সিক্রিতে। দাদার স্মৃতিকে ধরে রাখতে বাবরেরই নাতি নির্মাণ করেন ফতেহপুর সিক্রি।

খানুয়ার যুদ্ধে বাবর চূড়ান্তভাবে বিজয় লাভ করলেন, মুঘল সেনাবাহিনী একটি অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনলেন আর ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিলেন। খানুয়ার প্রান্তরে রাজপুত শক্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি, এটা সত্য। তবে এই যুদ্ধে রাজপুতদের মেরুদণ্ড চিরদিনের মতো ভেঙ্গে যায়। আর তাদের রাজপুত শাসিত হিন্দুস্তানের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। এই যুদ্ধের পর মুঘলদের হুমকি দেয়ার মতো আর কোনো বাহিনীই হিন্দুস্তানের ছিল না। তবে এরপরও কেউ কেউ আবারো মুঘল সেনাবাহিনীর সামনে দাঁড়ানোর মত সাহস দেখাতে চাইলো। তারা শীঘ্রই রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর উত্তাপের আঁচ টের পাবে!

তথ্যসূত্র

  1. বাবরনামা- জহির উদ দিন মুহাম্মদ বাবুর (অনুবাদ: মুহাম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস)
  2. হুমায়ুননামা- মূল গুলবদন বেগম (অনুবাদ: এ কে এম শাহনাওয়াজ)
  3. মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায়- সাহাদত হোসেন খান

এই সিরিজের আগের পর্বসমূহ

১। প্রাক-মুঘল যুগে হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা

২। তরাইনের যুদ্ধ: হিন্দুস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেওয়া দুই যুদ্ধ

৩। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: দাস শাসনামল

৪। রাজিয়া সুলতানা: ভারতবর্ষের প্রথম নারী শাসক

৫। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: খিলজী শাসনামল

৬। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তুঘলক শাসনামল

৭। দিল্লি সালতানাতের ইতিকথা: তৈমুরের হিন্দুস্তান আক্রমণ ও সৈয়দ রাজবংশের শাসন

৮। দিল্লী সালতানাতের ইতিকথা: লোদী সাম্রাজ্য

৯। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর গঠন এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

১০। রাজকীয় মুঘল সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রশস্ত্র

১১। জহির উদ-দিন মুহাম্মদ বাবুর: ‘একজন’ বাঘের উত্থান

১২। বাদশাহ বাবরের কাবুলের দিনগুলো

১৩। বাদশাহ বাবর: হিন্দুস্তানের পথে

১৪। বাদশাহ বাবরের হিন্দুস্তান অভিযান: চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি

১৫। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান: হিন্দুস্তানে বাবরের চূড়ান্ত লড়াই

ফিচার ইমেজ: Pinterest.com

Related Articles

Exit mobile version